সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮ , ১৫ জিলহজ ১৪৪২

সাহিত্য
  >
গল্প

ছোটগল্প : বিপ্রলব্ধ

মাহফুজ রিপন জুন ১৪, ২০১৮, ১৫:১২:৫৫

  • ছোটগল্প : বিপ্রলব্ধ

‘হে নবীন, হে নব- তোমায় অভিনন্দন,

তুমি যেন ভর দুপুরের শিমুল

দূর থেকে দেখলে মনে হয় আগুন,

কাছে গেলে আবার শিমুল’

নবীন বরণ অনুষ্ঠান চলছে। বাংলা বিভাগের ছাত্ররা অনার্স প্রথম বর্ষের নবীনদের নিয়ে পসরা বসিয়েছে তাদের হলো রুমে। বারান্দার মেঝেতে আলপনা, ফুল দিয়ে সাজানো মঞ্চ, কোনোখানেই যেন কমতি নেই। দরজার দুই পাশে ডালিতে গাঁদা ফুলের ঝুড়ি, মাঝখান দিয়ে নবীনরা হেঁটে যাচ্ছে হল রুমের মধ্যে, গাইছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গান “আগুনের পরশ মনি ছোঁয়াও প্রাণে এ জীবন পুণ্য কর’’। বৃষ্টির ফোঁটার মতো গাঁদা ফুল লেগে আছে সবার সারা গায়ে, সবাই বড় আপন হয়ে গেছে আজ। অরুণ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছে। মৌসুমি, সেতু, আইভি, লুনা, হান্নান, ওবাইদুর ওরা সবাই নবীনদের রাখি পরাতে ব্যস্ত। এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে শম্পা হল রুমে ঢুকলো। বড়রা তার বসার ব্যবস্থা করে দিলেন, তাকেও ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হলো। শম্পার বাবা বাংলা বিভাগের প্রভাষক ছিলেন এখন অবসরে। অরুণের স্বরচিত আবৃত্তি শম্পার মনে ধরলো। তার বাবার কণ্ঠের সঙ্গে মিল খুঁজে পেল অনেকটা। গান, আবৃত্তি, কথামালা আর করতালির মধ্যদিয়ে সফল ভাবে নবীন বরণ অনুষ্ঠান শেষ হলো।

অনার্স ১ম বর্ষের পরীক্ষা শেষ। অরুণের বেশির ভাগ সময় কাটছে পাঠাভ্যাসে, ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি থেকে নিয়মিত সে বই তোলে, আজ তুলেছে সাতকাহন। শম্পা প্রথম ক্লাস শেষ করে দোতলা থেকে নামার সময় অরুণের সঙ্গে দেখা হয়, হাতে তার সাতকাহন বইটি দেখে সিঁড়ি ঘরে থমকে দাঁড়ায়, এ বই আজ সকালে তার বাবাকে পড়তে দেখেছে। কেমন করে এমন ভাবে মিলে গেল। শম্পার বন্ধুরা ২য় বর্ষের ভাইয়াদের সঙ্গে হ্যান্ডনোট নেওয়ার জন্য ভাব জমাতে চেষ্টা করছে, বিষয়টা তার একদম ভালো লাগছে না। তবুও সে সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রয়েছে। 

-ডেইজি- ‘জানিস অরুণ দা অনেক মেধাবী ছাত্র ওনার নোট নিতে পারলে! যা হবে না। সবাই বলছে এবার ১ম বর্ষের পরীক্ষায় উনি প্রথম হবে’। 

-শম্পা- ‘ও’,

-ডেইজি- ‘অরুণ দা কেমন আছেন’। 

-অরুণ- ‘হ্যাঁ ভালো তোমরা কেমন আছো’।

-ডেইজি- ‘আমাকে চিনতে পেরেছেন’। 

-অরুণ- ‘তুমি ঠিক’! 

-ডেইজি- ‘আমি পাভেল ভাইয়ার বোন আমাদের বাসায় আপনি গিয়েছেন’।

-অরুণ- ‘ও হ্যাঁ পাভেল এখন কেমন আছে, কোথায় আছে ’। 

-ডেউজি- ‘ভাইয়া তো এখন কানাডায় ওখানে পড়াশোনা করছে, পরিচয় করিয়ে দেই আমার বন্ধু শম্পা’।  

বাইতুলআমান শাখার বকুল তলায় অরুণ ও শম্পা বসে আছে। বকুলের সুগন্ধি বাতাস, পাশদিয়ে বয়ে যাওয়া মরা খালের মাঝে রাজহাঁসের রতি ভাবের উদয় দেখে ওরা লজ্জা পায়, বুকের মধ্যে জমে থাকা না পাওয়ার হাহাকারে পরাণটা পুড়তে থাকে কিন্তু সে আগুন দেখতে পায় না কেউ।

মনের অজান্তেই দুইজন ভাব সাগরে ডুব দেয় পরমসুখের খোঁজে। সময় যতই গড়িয়ে যায় বন্ধন ততই শক্ত হয়। ক্লাস শেষে ওরা ঘুরে বেড়ায় সুইচ গেট, নদী গবেষণা এবং পদ্মার পাড়ে। প্রকৃতির টানে ওদের ছুটে চলা। পুরনো রাজ বাড়ির ঘন অরণ্যের মাঝে দুজন হারিয়ে যায়, সুনালু ফুলের রঙিন আলোয়। চম্বুকের টানে ওদের দু হাত এক হয়ে যায়। হঠাৎ অরুণের ধাবমান মনজগৎতে পাপ বোধ জাগে। সে প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে সুন্দরের জন্য। অবশেষে নিজেকে ফিরিয়ে হাত দুটি পকেটে ঢুকায়, দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে শম্পা। গভীর সে নিঃশ্বাস একটি নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।

অরুণের জ্বর, ঘোরের মধ্যে প্রলাপ বকেছে, রুমমেট সুলতান শুধু বকেই চলে, সুলতান, অরুণ একই মেসে থাকে দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সুলতান- ‘প্রেমে পইড়া হালা কবি হয়া গেছে। এ কেমন প্রেম ভাই, বন্ধু আমার জ্বরে মইরা যায় প্রেমিকার খবর নাই’। বলতে বলতে ক্যাম্পাসের দিকে রওনা হয়। ওদের মেস থেকে ক্যাম্পাস দশ মিনিটের পথ। কিছুক্ষণ পরে শম্পাকে সঙ্গে নিয়ে সুলতান রুমে ফিরে আসে। শম্পাকে দেখে অরুণ অবাক !

অরুণ- ‘একি তুমি এখানে’। শম্পা কোনো কথা বলে না। কেউ তোমাকে দেখে নাই তো, সুলতান- দেখলে কি হইবো বন্ধু, প্রেম করবা আবার ডর করবা মিয়া। আমি গেলাম, রান্না ঘরে খাবার আছে দুই জন খেয়ে নিও কিন্তু, ভাবি কোনো চিন্তা করবেন না। আমি আছি। সুলতান চলে গেল। অরুণ- ‘তুমি কিছু মনে করো না ও একটা পাগল’।  শম্পা অরুণের কপালে হাত রাখতেই যেন সে সুস্থ হয়ে ওঠে। দীর্ঘক্ষণ নীরব থেকে আস্তে আস্তে ওদের ভেতর যৌবন যন্ত্রণার ঢেউ উথাল পাতাল করে উঠে। লজ্জাবতি লতার মতো নেতিয়ে পড়ে অরুণের বুকের উপর। শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে দুজনের। আদিম গন্ধমের বিভ্রম ওদের পেয়ে বসে কিছুক্ষণ। হঠাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলে গভীর ঘোর থেকে ফিরে আসে দুজন। অরুণ- ‘চলো তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি’। দ্বিধা, লজ্জা এবং ভয়ে নীরবে দুজন অন্ধকার ঘর ছেড়ে, বাইরে আলোর কাছে এসে দাঁড়ায়। 

শরৎ এর সাদা ভোরে অরুণ রাজপথ ধরে হেঁটে যায় অনাথের মোড় ঘুরে কলেজ মোড়। ভোরের সূর্য যখন লাল হয় শম্পা ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে আসে আলিপুর থেকে। ভাইকে স্কুলে পাঠিয়ে সে অনার্স শাখায় চলে যায়। দূর থেকে ভালোবাসার জারক রসে ভিজতে থাকে অরুণের দেহ মন প্রাণ। সে স্বপ্ন দেখে ভবিষ্যতের, পরিমিতি আর শুদ্ধতার। এমনি ভাবে কেটে যায় কিছু দিন। সামনে পরীক্ষা তাই পাঠ্য বইতে মনোনিবেশ সবার। শম্পার মনের ভেতর অজানা এক প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে-পুরুষ এমন হয় কাছেই যদি নিয়া যাও মোরে, তবে ক্যান মোচড়াও আমার মন, প্রাণ, সাধের দেহ। নাই কোনো টান, তবে কেন নিয়ে যাও স্বপ্নের ঘোরে,  নাকি সে এমনি জন্মের থেকে। বাইচের নৌকার মতো সে  স্বপ্ন দেখে বড়। শরীরে কি তার একটু জ্বালা নাই। এই ভাবে অন্তর্দ্বন্দ্বের মাঝে কেটে যায় কিছু দিন। গ্রীষ্মের ছুটিতে অরুণ বাড়িতে যায়, মায়ের শিয়রে বসে তাকে সব খুলে বলে।

মা- ‘অরুণ তুই আমার এক মাত্র সন্তান তোর বাপ বেঁচে নাই জমি জমা বন্ধক রাইখা তোরে পড়াইতেছি। ভালোভাবে লেখা পড়া শেষ কর, চাকরি বাকরি কিছু কর তারপর তোর এ সব কথা শুনবো। যা হাত পা ধুয়ে পড়তে বয়। আমি চা দিতে বলছি’। অরুণ পড়ার ঘরে যায় বাবার ছবিটির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। নীল আকাশের মেঘের ভেলায় মনে মনে সে শম্পার ছবি আঁকে। হঠাৎ মনে পড়ে শৈশবের কথা, প্রতিদিন তিন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে সে স্কুলে যেত, বাবা বদলির চাকরির সুবাদে আজ এখানে তো কাল ওখানে। মায়ের সে কষ্ট এখন দিগুণ হয়েছে বাবার বিদায়ে। দুঃখি মায়ের মুখে হাসি ফোটানোই তো সুসন্তানের কাজ। মনে মনে সে সংকল্প করে লেখাপড়া শেষ করে তাকে বড় হতে হবে, অনেক বড়।

পাশের বাড়ি থেকে গাজির গানের বন্দনা ভেসে আসে। দরজা দুটো চাপিয়ে রেখে সে টপিদের বাড়ি যায়। টপি তার স্কুল জীবনের বন্ধু, বাড়িতে ঢুকতেই টপির মা- ‘আস অরুণ বাবা এখানে জলচকিতে বস। তোমার বাপ বাইচা থাকলে সে আসতো সবার আগে। আহারে কি ভালো মানুষটা চলে গেল।’ গাজির গানের দলÑ আসর বন্দনা দিচ্ছে পাঁচ জনের সে দলে ঢোল, হারমনিয়াম, জুড়ি, চামর সবই আছে। মূলগায়েন চামর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আসরের সবার কাছে যায় ভক্তি দিয়ে গান শুরুর অনুমতি নেয়, ঝাঁকড়া চুলে দুইটি দোল দিয়ে  গাইতে শুরু করে-

‘আরে প্রথমে বন্দনা করি মায়ের ও চরণ, মা ছাড়া সন্তানের মন কারবালার প্রান্তর, উত্তরে বন্দনা করি কৈলাস ও পর্বত। পশ্চিমে বন্দনা করি নবীজির কবর, আরে পূবেতে বন্দনা করি পূবের ভানুর স্বর, একদিকে উদয়ের ভানু চৌদিকে পসর। আরো চারকোনা পৃথিবী বান্ধা করিতাম ইতি সুন্দর বন মুকামে রাইখা গাজী জিন্দা পীর’। গাজী কালু চম্পাবতির টানাপড়েনের মূল্যবোধের সুরে গভীর হয় রাত। গ্রামের সরল প্রাণগুলো হারিয়ে যায় বিশ্বাস অবিশ্বাসের ঘোরে। কেউ খুঁজে পায় সঠিক পথের ঠিকানা, আবার অনেকে ফিরে পায় নিজের জীবন। 

ক্যাম্পাসে মিছিল চলছে। চার পাশের শান্ত পরিবেশ হঠাৎ অশান্ত হয়ে উঠেছে। গত রাতে বামপন্থি ছাত্র নেতা রবিউল কলেজ হোস্টেলে সন্ত্রাসীদের হামলায় মারা গেছে। ভালো ছাত্র হিসেবে তার ব্যাপক সুনাম ছিল, সুন্দর গিটার বাজাত ছেলেটা, মনে প্রাণে চাইত মানুষের সাংস্কৃতিক মুক্তি। কি কারণে তাকে হত্যা করা হলো তা কেউ জানে না। অরুণের খুব কাছের বন্ধু ছিল রবিউল। দুর্বার গতিতে মিছিল চলছে শহর ক্যাম্পাসে। মিছিল শেষে ধীরে ধীরে সবাই জড়ো হলো শহীদ মিনারের বেদিতে। দেয়াল লিখন চলছে। বাস চলাচল বন্ধ। সবার চোখে মুখে হতাশা আর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সকল ছাত্ররা যখন মিছিলে তখন দূর থেকে শম্পা, সুমনদের দেখা যায়। সুমন শম্পার ক্লাসমেট। সবকিছু উপেক্ষা করে তারা দুজন ছুটে চলছে পুকুর পাড়ের দিকে, বিষয়টা দেখে অরুণের মনে খটকা লাগে। কি ব্যাপার শম্পার এত পরিবর্তন কেন ? তাহলে কি? নাহ্ এ সব কি ভাবছে সে। মিছিল মিটিং শেষ করে এক বুক জ্বালা নিয়ে সে রুমে ফিরে যায়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আস্তে আস্তে বিষয়টি প্রকাশ হতে শুরু করে। তার বন্ধুরা প্রায়ই বিষয়টি নিয়ে হাসাহাসি করে। অরুণ কথার মাঝে নিজেকে আড়াল করে নেয়। 

শীতের শুরুতে বাংলা বিভাগের ১ম ও ২য় বর্ষের ছাত্ররা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণে যায় সূর্যদ্বয় এবং সূর্য অস্ত দেখার আশায়। কিছুদিন ধরে অরুণ অসুস্থ তারপরেও বন্ধুরা তাকে এক প্রকার ধরে নিয়ে যায় সঙ্গে করে। সারা রাত বাসে করে ওরা ছুটতে থাকে বরিশালের পটুয়াখালীর দিকে। ভোরে পৌঁছায় কুয়াকাটা সমুদ্র পাড়ে। বিশাল সমুদ্রের বুকচিরে উঠে আসছে একটি লাল সূর্য। অরুণ মনে মনে ভাবে এ লাল সূর্য কি আমার মনের কষ্ট বোঝে। দূর থেকে শম্পাকে দেখা যায় বন্ধুদের সঙ্গে, নীল রংয়ের ছালোয়ার কামিজ পরেছে সে। জুতো জোড়া হাতে নিয়ে খালি পায়ে হাঁটছে বালুর মাঝ দিয়ে, যেন প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গেছে অচেনা এই সমুদ্র পাড়ে। সবার সঙ্গে হাসি খুশি মুখটি শুধু অরুণই যেন তার সারা জীবনের অচেনা মানুষ। ভর দুপুরের সমুদ্র স্নান ওদের ভ্রমণকে সার্থক করে তোলে। সমুদ্র পাড়ের গোল পাতা ঘরে দুপুরের ভাত ঘুম। সমুদ্রের গর্জন শোনা যায় সেখান থেকে। অরুণ, ওবাইদুর উঠেছে গোলপাতা ঘরে। সূর্যের আলো কমে আসলে ওরা বেরিয়ে পড়ে রাখাইন মার্কেটের দিকে। রাখাইন মেয়েরা গামছা, লুঙ্গি আর মহুয়া ফলের রস বিক্রি করছে। কাপড় দিয়ে ঘেরা একটি ছোট্ট ঘরের মধ্যে ওরা ঢুকে গেল, বৃদ্ধ এক রাখাইন বাঁশের তৈরি একটি বাটকারার সাহায্যে হাতে দিল দু বোতল মহুয়া। নেশায় বুদ হয়ে ওরা ফিরে এলো সমুদ্রের কাছে। বাতাসে গা ভাসিয়ে হেঁটে চলল অজানার দিকে। ওদের খামখেয়ালি সময়গুলো তীব্র আনন্দে ভেসে বেড়ায় নতুন পথের খোঁজে। 

সময় চলে যায় জমা হয় স্মৃতি। শম্পা এবং অরুণের দূরত্ব ক্রমে বেড়েই চলে। দুজনের মনে জমে থাকা হাজারও প্রশ্নের কোনো উত্তর ওরা খোঁজে পায় না। অরুণ ভাবে ধর্মের ব্যবধান, শম্পা ভাবে সুখের কথা। অন্তর্দ্বন্দ্ব ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। লজ্জা ঘৃণায় ওরা নিজেদের গুটিয়ে নেয়। এই ভাবে কেটে যায় তিন বছর। ফাইন্যাল পরীক্ষা শেষ করে, অরুণ রাজধানীর দিকে পা বাড়ায়। যাপিত জীবনের সংগ্রাম চালিয়ে যায় পরতে পরতে। একে একে অতিক্রম করে সকল ঘাতপ্রতিঘাত। চাকরি নামক সোনার হরিণও ধরা দেয় কচ্ছপ গতিতে, অতঃপর মায়ের আদেশে বসতে হয় বিয়ের পিড়িতে। ঘরে আসে ফুটফুটে এক পুত্র শিশুÑ অনুরাগ।

এক দিন পুজোর ছুটিতে প্লাটফর্মে ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় অরুণ, সঙ্গে শিশু পুত্র অনুরাগ। ফুল লাগবে ফুল গোলাপ ফুল, এই সিগারেট, বাদাম- বাদাম চিনা বাদাম, সার ফুল লন একটা গোলাপ ফুল, জীবন এবং জীবিকার জন্য মানুষের ছুটে চলা। নদীতে জোয়ারের মতো যখন প্লাটফর্মে ট্রেন আসে তখন স্টেশনের গতি বেড়ে  যায়, ট্রেন চলে গেলে গতি কমে যায়। ট্রেন থেকে নামছে মানুষ, উঠছে মানুষ, রংয়ের মানুষ কারো সঙ্গে কারো মিলনেই।  এই মানুষের মধ্যে একটি মানুষকে দেখবার জন্য দুটি চোখের দীর্ঘ দিনের অপেক্ষা। হঠাৎ দাড়ি, টুপি মাথায় পাঞ্জাবি পরা একটি লোক অরুণের সামনে এসে দাঁড়ালো। দীর্ঘ দিন পরে দুই বন্ধুর দেখা। অরুণ- সুলতান! কত দিন পরে দেখা। তুই কেমন আছিস। সুলতান- ভালো তুই, অরুণ- আছি ভালোই বন্ধু, বোরকা পরা পেছনে এ কে দাঁড়িয়ে। বোরকার ভেতর থেকে তার চোখ দুটো শুধু দেখা যায়। অরুণ মনে মনে ভাবে চোখ দুটি তার অনেক চেনা চেনা মনে হচ্ছে। সুলতানের মনে তীব্র অপরাধ বোধ জেগে ওঠে। বোরকার ভেতরে যে নারী রয়েছে সে যে অরুণের শম্পা। শম্পার হাতে থাকা ব্যাগটি পড়ে যায়। হ্যান্ডব্যাগটি তুলে সুলতান বলে- এ তোর ভাবি! অরুণ- ও ভাবি কেমন আছেন ভাবি।

শম্পা-মাথা নাড়িয়ে ভালো আছি জানায়। তার চোখ দুটি ভিজে উঠে জলে। কিঞ্চিত সময়ে অনুরাগের সঙ্গে তার ভাব জমে যায়। অনুরাগকে বাবার নাম জিজ্ঞেস করতেই, সে বলল- আমার বাবার নাম অরুণ মুখার্জি। মুহূর্তেই খুলনাগামী ট্রেন হুইসেল বাজায়, প্লাটফর্ম ব্যস্ত হয়ে উঠে। শম্পার মনের মাঝে যে প্রশ্নটি এত দিন পোড়ামাটির দলা পাকিয়ে ছিল, তার জবাব সে পেয়ে যায়। কি ভুল সে করেছে! তার ভাবনা যে ভুল ছিল, দীর্ঘ দিন পর সে স্পষ্ট হয় এবং মনের মাঝে অরুণের প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা আসন পেতে বসে সারা জীবনের জন্য। খুলনাগামী ট্রেনে উঠে পড়ে ওরা, অরুণ সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে প্লাটফর্মের উপর। ট্রেন ছুটে চলে গন্তব্যে, হাত নেড়ে অনুরাগ বিদায় জানায়, সবাই যেন তার বড় আপন।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers