মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৭ আষাঢ় ১৪২৮ , ১১ জিলকদ ১৪৪২

সাহিত্য
  >
গল্প

অপ্রত্যাশিত তুমি-আমি

মিম্ মি জুন ৪, ২০১৮, ১৭:২৪:২৫

  • অপ্রত্যাশিত তুমি-আমি

চা খাওয়া হয়নি আর ঐ রাতে। তিয়ানার কেবিন থেকে বের হতেই নার্স ছুটে এসে জানালো NICU তে দুটো বাচ্চা খারাপ। রাতের বাকী সময়টুকু সেখানেই কেটে গেল। ভোরের আলো ফুটতেই হাসপাতালের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। এই সময়টাতে হাসপাতালের চেহারা খুব অন্যরকম থাকে। সারাদিনের ব্যস্ততা হৈচৈ মানুষের ছুটাছুটি এই ভোরের দিকে অনুপস্থিত থাকে হাসপাতালে। বেশিরভাগ রোগী ঘুমে থাকে। তাদের সাথে থাকা আত্মীয়রাও। ফ্লোরে, বেঞ্চে চাদর পেতে শুয়ে থাকে কত মানুষ প্রিয়জনের সুস্থতার প্রত্যাশা নিয়ে। আহারে!

কেন যেন এই সময়ের চুপচাপ শান্ত হাসপাতালের পরিবেশটা মনে দোলা দিয়ে যায় আমার। নাইট ডিউটি থাকলে এই সময়ে প্রায় দিনই সব ওয়ার্ডে চক্কর দেই আমি। জীবনের স্পর্শ খুঁজি হাসপাতালের এ মাথা থেকে ও মাথায়, রোগীর বেডে- বেডে।

সেই আঠারো বছর বয়সে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার পর থেকে হাসপাতাল কম্পাউন্ডকেই তো সেকেন্ড হোম হিসেবে জীবনের সাথে জড়িয়ে নিয়েছিলাম।প্রথম প্রথম একটু একটু ঘেন্না লাগত, বমি পেত হাসপাতালের গন্ধে, নোংরা মনে হতো !

তখনও আমাদের হাসপাতালে ক্লাস শুরু হয়নি। ক্লাস চলে একাডেমিক ভবনে। ঈশানের সাথে তখন আমার নতুন নতুন পরিচয় হয়েছে। দুজনের বাংলা লিঙ্কের লোভনীয় সব অফারে রাত জেগে কথা বলার অধিকাংশ সময়টুকু জুড়ে থাকতো হাসপাতাল, রোগী, আইটেম আর স্যার ম্যামদেরকে নিয়ে। প্রেম প্রেম লুতুপুতু কথা আমাদের মাঝে কম হতো। "লাভ ইউ সুইটি"... প্রেম, বিয়ে দু পর্বে একমাত্র রোমান্টিক ডায়লগ ছিল ওর মুখে। অবশ্য বিয়ের পরের চার বছরে মনে হয় না একবারও বলেছিল আর এসব বুলি।

মেডিকেল কলেজে আমাদের ক্লাস হতো কলেজ ব্লিডিং এ।থার্ড ইয়ারে ওঠার পরে শুরু হল ওয়ার্ডে ক্লাস। মেডিসিন ওয়ার্ডে প্লেসমেন্ট ছিল আমাদের ব্যাচের প্রথমে।ওয়ার্ডের ক্লাসগুলো সাধারণত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে করতে হয়।এক থেকে দেড় ঘণ্টা আমরা ছাত্র ছাত্রীরা কোন একটা কেসকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকতাম ।স্যার ম্যামরা আমাদেরকে হাতে কলমে কেস স্টাডি শেখাতেন। কখনো সখনো টুলে বসে ক্লাস করার সুযোগও পেতাম আমরা।প্রথম প্রথম রোগীর বেডের পাশে দাঁড়ালে কেমন একটা বোটকা গন্ধ নাকে আসত আমার নাকে।রক্ত ঘাম পুঁজ প্রস্রাব-পায়খানা খাবার মেডিসিন সবকিছু মিলিয়ে একটা দম বন্ধ হয়ে যাওয়া অসহ্য অসহনীয় জীবন জীবন গন্ধ...

আমার আবার গন্ধ, ঘ্রাণ সমস্যা আছে। এই সমস্যা এতোই মারাত্মক যে ঈশানের সাথে প্রচণ্ড ঝগড়া হতো এই ইস্যুতে মাঝে মাঝেই।

ওয়ার্ডে যে শুধু সকালে ক্লাস হতো তা কিন্তু নয়।সন্ধ্যার পরেও ক্লাস চলত। হোস্টেলে ফিরতে ফিরতে নটা বেজে যেত।রুমে ফিরেই আমার প্রথম কাজ ছিল শাওয়ার নেয়া।মনে হতো রাজ্যের নোংরা লেগে আছে গায়ে।মজার কথা হলো বছর দুয়েকের মধ্যে এই চিত্র বদলে গেল। হাসপাতালেই খাওয়া-দাওয়া লেখা-পড়া সব কিছু শুরু হলো। ফাইনাল প্রফের সময় সকাল সাতটা থেকে একটানা চারটা পাঁচটা পর্যন্ত হাসপাতালে পড়ে থাকতাম। মাঝে লাঞ্চ কলেজ ক্যান্টিনে। বিকেলে রুমে ফিরে ঘন্টা দুই ঘুমিয়ে আবার দুই ঘন্টার জন্য হাসপাতালে।

কোথায় বসে লেখাপড়া করি নাই ??? কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড, রোগীর বেড, কেবিন, বারান্দা, ছাদ এবং ছাদে ওঠার সিঁড়ি, সুরুজ মামার ক্যান্টিন থেকে খোকনের চায়ের দোকান, লাইব্রেরি, কলেজ ব্লিডিং র সমস্ত গ্যালারি হল সাথে যত ঘুপচি বারান্দা থেকে কলেজ ব্লিডিং এর ছাদ... আহ সেইসব দিনগুলি আমাকে একটু একটু করে হাসপাতাল বান্ধব করে তৈরি করছিল।

ফার্স্ট ইয়ারের সেই বোটকা গন্ধ কই হারালো !!! উল্টো আরো ঐ হাসপাতাল হাসপাতাল গন্ধ নাকে এসে না ঢুকলে কেমন যেন শূন্য শূন্য মনে হতে শুরু করল।কত শত মানুষের জন্ম মৃত্যু দেখতে দেখতে চোখের জল শুকোতে শুরু হল।মন খারাপের দুয়ারে খিল দিয়েছিলাম আরো আগে সেই থার্ড ইয়ারে ফরেনসিক মেডিসিনের পোস্ট মর্টেম ক্লাস করার জন্য যেদিন MMC এর মর্গে যাই।কোনদিনও ভুলতে পারব না সেই লালডুরে শাড়ি পরা কিশোরী বালিকার বিষ খেয়ে মুখে ফেনা তোলা মুখটি।

ভোরের আলো ফোটা সকালে আর গভীর রাতে হাসপাতালের করিডোরে জীবনের গল্প দেখতে পাই আমি।অথচ প্রথম প্রথম নাইট ডিউটি করতে ভয় এবং বিরক্ত লাগতো আমার।

একদিন গাইনীতে নাইট ডিউটি করছিলাম।

গাইনী মানেই কঠিন ডিউটি।যেকোন সময়ই ইমার্জেন্সী।রাত তখন দুইটা কি আড়াইটা হবে।হঠাৎ দেখি ওয়ার্ডে একজন রোগীর স্বামী কি পরম মমতায় রোগীকে প্লাস্টিকের হাত পাখা দিয়ে বাতাস করে দিচ্ছেন আর অন্য হাতে রোগীর মাথায় কপালে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছেন।মহিলার পরদিন সকালে সিজার হবে।এই অপার্থিব দৃশ্য টা দেখে কেন যেন চোখ ভিজে গিয়েছিল আমার।আজোও উত্তর খুঁজে পাই না এর।

শুভ সকাল ডক্টর শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি তিয়ানার বাবা।

ক্লান্তি জড়ানো শুষ্ক চোখে মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে প্রতিউত্তর করলাম।

-খুব বিরক্ত করলাম আপনাদেরকে গতকাল রাতে।

-না তা কেন হবে ? এটাই তো আমার কাজ, দায়িত্ব। তা আমার রোগী কি এখনো ঘুমোচ্ছে ? জানতে চাইলাম।

জ্বী। দু'ভাইবোনই ঘুম।

-আচ্ছা।

-ওদের মা কি অসুস্থ ছিলেন নাকি দুর্ঘটনা কোন ?

এপ্রোনের পকেটে থাকা মোবাইলটা ঠিক তখন বেজে উঠলো।

এক্সকিউজ মি বলে ফোন হাতে নিয়ে দেখি বাসার মোবাইল থেকে কল এসেছে। তেপান্তর ঘুম থেকে উঠেছে তাহলে।

আসছি বলে বিদায় নিয়ে করিডর থেকে ডক্টরস রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম ফোন রিসিভ করে... গুড মর্নিং বাবাই।

-মা তোমার ডিউটি শেষ হয়নি। বাসায় আসো না। একটা স্বপ্ন দেখেছি তো। তুমি আর আমি সামার ভ্যাকেশনে কক্সবাজার যাচ্ছি গ্রীনলাইনে চড়ে... পটর পটর শুরু হয়ে গেল তেপান্তরের।

(চলমান…)

 

 

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers