সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮ , ১৫ জিলহজ ১৪৪২

সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

নারী জাগরণের অনন্য পথিকৃৎ বেগম সুফিয়া কামাল

ফারুক হোসেন শিহাব নভেম্বর ২০, ২০১৯, ১৭:২১:২০

  • নারী জাগরণের অনন্য পথিকৃৎ বেগম সুফিয়া কামাল

আধুনিক বাংলাদেশের নারী প্রগতি আন্দোলনের অন্যতম একজন কবি তিনি। মহীয়সী এই নারী লেখালেখির পাশাপাশি নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িক দেশগঠন, মানবতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে সোচ্চার ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের নারী সমাজের এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় ব্যক্তি ছিলেন তিনি। দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিকসহ সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তার ছিল দীপ্ত পদচারণা। ধর্মান্ধতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অকুতোভয় এক যোদ্ধা। 

বলছি, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, লেখক ও নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ বেগম সুফিয়া কামালের কথা। কবি সুফিয়া কামাল, নামটির সাথে মিশে আছে অসংখ্য আবেগ, অনুভূতি, ভালো লাগা ও ভালোবাসার সরলতা ও নারীর আত্মবিশ্বাস দৃঢ় করার মনোবল। শুধুমাত্র তিনি কবিই নন, একাধারে ছিলেন সাহিত্যিক, দার্শনিক, সমাজ সেবক, শিক্ষক ও সংগ্রামী নেতৃত্ব । তার কবিতার স্তবকে মিশে আছে প্রেম, প্রকৃতি, ব্যক্তিগত অনুভূতি, বেদনাময় স্মৃতি, স্বদেশের প্রতি মমতা, মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা এবং ধর্মীয় আবেগ।

আজ ২০ নভেম্বর মহীয়সী এই নারীর প্রয়াণদিবস। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। ১৯১১ সালের ২০ জুন তিনি বরিশালের শায়েস্তাবাদ গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় বিশ্বজুড়ে ছিল অস্থিরতা। বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব আর ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তাল পৃথিবী। বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কার আর সাহিত্যে নতুন রূপের সূচনা।

তার পিতা সৈয়দ আবদুল বারি পেশায় ছিলেন উকিল। সেই আমলে মেয়েদের পড়ালেখা ও ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করার খুব একটা সুযোগ ছিল না। সুফিয়া কামাল তার মা সৈয়দা সাবেরা খাতুনের কাছে বাড়িতেই পড়াশোনা করে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। সুফিয়ার যখন সাত বছর বয়স তখন পিতা গৃহত্যাগ করেন। নিরুদ্দেশ পিতার অনুপস্থিতিতে তিনি মা সৈয়দা সাবেরা খাতুনের স্নেহ-পরিচর্যায় বেড়ে ওঠেন। 

মায়ের সাথে ছোট্ট সুফিয়া চলে আসেন নানাবাড়িতে। তখনকার দিনে বাঙালি মুসলিম মেয়েরা কঠোর পর্দা প্রথা মানতো। নানাবাড়ি ছিল বিশাল আর সব কিছুর চাইতে সুফিয়াকে বেশি টানতো মামার লাইব্রেরি। গোপনে মায়ের সাহায্যে লাইব্রেরি থেকে বই পড়তেন। কারণ, তখন মেয়েদের পড়া ছিল বারণ। তখন পরিবারের কথ্য ভাষা ছিল উর্দু। অন্দরমহলে মেয়েদের আরবি-ফারসি শেখার ব্যবস্থা ছিল। তবে বাংলার চর্চা সেভাবে হত না। রাতে যখন মামা দেশ-বিদেশের গল্প আর উপন্যাস বোঝাতেন ছোট্ট সুফিয়া মন দিয়ে শুনতেন। ধীরে ধীরে বাংলার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ জন্মায়। 

সে সময় মেয়েরা থাকতো ঘরে আর ছেলেরা পরিপাটি হয়ে যেত স্কুলে। ছোট্ট সুফিয়ার এ নিয়ম মোটেই পছন্দ হল না। নাছোড়বান্দা মেয়েকে নিয়ে কী করবেন মা? অগত্যা তিনি তাকে ছেলের সাথে তাকেও ছেলেদের পোশাক পরিয়ে টুপি মাথায় চাপিয়ে দিয়ে ছেলেদের সাজে পাঠাতে লাগলেন স্কুলে।

এ নিয়ম বেশিদিন চললো না। ভাই পড়তে গেলো অন্য শহরে আর তারও বন্ধ হলো স্কুলে যাওয়া৷ কিন্তু এ কিছুতেই মানতে পারলেন না সুফিয়া। বাড়িতেই টুল, টেবিল, ব্ল্যাকবোর্ড সাজিয়ে স্কুলের আদলে চলতে লাগলো লেখাপড়া। আত্মবিশ্বাসই তাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। রাত জেগে গোপনে আর দিনের বেলা কাজের ফাঁকে দরজা বন্ধ করে লিখতেন। মামাতো ভাইরা তা দেখে ভীষণ অবাক হলেন। ছুটিতে বাড়িতে এলে তারা যোগ দিতেন এই স্কুল স্কুল খেলায়।

এভাবে খেলাচ্ছলে সুফিয়া শিখলেন ইংরেজি, বাংলা, অংক। ভাইদের তাক লাগিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। পুরস্কারস্বরূপ নিজের বৃত্তির টাকায় তাকে ‘সন্দেশ’ পত্রিকার গ্রাহক করে দিলেন তার ভাই। ভাইয়ের পাঠানো বইগুলো তার কাছে ছিল মণি-মুক্তার চেয়েও দামী। সাত বছর বয়সে মায়ের সাথে কলকাতায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান তিনি। শান্তশিষ্ট মিষ্টভাষী সুফিয়াকে সকলে খুব আদর করতেন। সে বাড়িতে একদিন এলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসাইন।

তাকে দেখে মুগ্ধ হন সুফিয়া। রোকেয়া তাকে দেখে আদর করে বলেন, ‘এই মেয়ে, পড়ছো তো?’ মায়ের ইচ্ছা ছিল সুফিয়া বেগম রোকেয়ার স্কুলে পড়ুক। কিন্তু তারা তো কলকাতায় থাকতেন না। আর স্কুল, কলেজে পড়া হয়নি সুফিয়ার। অনেক কাল পরে বেগম রোকেয়া আক্ষেপ করেছিলেন। তবে সুফিয়া কামাল হারিয়ে যাননি। তার ভেতরে যে সাহিত্যের বীজ ছিল তা ধীরে ধীরে ডালপালা ছড়িয়ে মহীরুহ হয়ে ওঠে। 

সুফিয়া কামালের লেখালেখি শুরু সেই শৈশব থেকেই। সুফিয়া সে সময়ের বাঙালি সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে শুরু করেন। প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়তে পড়তে অদ্ভুত এক মোহগ্রস্ত ভাব এসে মনকে যে কোন অজানা রাজ্যে নিয়ে যেতো। এরপর দেখতাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বেগম সারা তাইফুর লিখছেন। কবিতা লিখছেন বেগম মোতাহেরা বানু। মনে হলো ওরা লিখছেন আমিও কি লিখতে পারি না? লেখার পথে শুরু হলো তারও যাত্রা।

মাত্র বারো বছর বয়সে প্রথম গল্প “সৈনিক বধূ” ছাপা হয় “তরুণ” নামের একটি মাসিক পত্রিকায়। ১৯২৬ সালে পনের বছর বয়সে সওগাত পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ প্রকাশ পায়। ষোল বছর বয়সে প্রথম গল্পের বই “কেয়ার কাঁটা” প্রকাশিত হয়। তার প্রথম গ্রন্থ ছোটগল্পের বই ‘কেয়ার কান্তা’ প্রকাশ পায় ১৯৩৭ সালে এবং প্রথম কবিতার বই ‘সাঁঝের মায়া’ প্রকাশ পায় ১৯৩৮ সালে। 

মাসিক ‘সওগাত’ পত্রিকায় তাঁর কবিতা ‘সাঁঝের মায়া’ পড়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম মুগ্ধ হন৷  পরে ‘সাঁঝের মায়া’ গ্রন্থের মুখবন্ধ লিখেন কাজী নজরুল ইসলাম। বিশ্বকবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বইয়ের প্রশংসা করেন এবং আর্শীবাণী পাঠান। সেই সময়ে একজন মুসলিম নারীর এই সাফল্য সবাইকে মুগ্ধ করে।লেখালেখির বিভিন্ন সময়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়’র সাহচার্য পান।

শৈশবের গণ্ডি না পেরোতেই রক্ষণশীল পরিবারের নিয়মানুযায়ী ১৯২৪ সনে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে সুফিয়ার বিয়ে দেওয়া হয়। নেহাল অপেক্ষাকৃত আধুনিকমনস্ক ছিলেন, তিনি সুফিয়া কামালকে সমাজসেবা ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। সাহিত্য ও সাময়িক পত্রিকার সঙ্গে সুফিয়ার যোগাযোগও ঘটিয়ে দেন তিনি।  

১৯২৯ সালে সুফিয়া কামাল বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত মুসলিম মহিলা সংগঠন ‘আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলাম’-এ যোগ দেন। এখানে নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারসহ নারীদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হতো। বেগম রোকেয়ার সামাজিক আদর্শ সুফিয়াকে আজীবন প্রভাবিত করেছে। 

তিনি রোকেয়ার ওপর অনেক কবিতা রচনা করেন এবং তার নামে মৃত্তিকার ঘ্রাণ (১৯৭০) শীর্ষক একটি সঙ্কলন উৎসর্গ করেন। তিনি ‘রোকেয়া সাখাওয়াত স্মৃতি কমিটি’ গঠনে সহায়তা করেন, যার প্রস্তাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হল ‘রোকেয়া’ তাঁর নামে করা হয়। ১৯৩১ সালে সুফিয়া মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম ‘ভারতীয় মহিলা ফেডারেশন’-এর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩২ সালে তার স্বামী মারা যান। ১৯৩৩ থেকে ৪১ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা কর্পোরেশন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

এই স্কুলেই তাঁর পরিচয় হয় প্রাবন্ধিক  আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪) এবং কবি  জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬)-এর সঙ্গে। স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি সুফিয়ার সাহিত্যচর্চাও চলতে থাকে। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় যখন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাঁধে, তখন দাঙ্গাপীড়িতদের সাহায্যের ক্ষেত্রে সুফিয়া সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি  লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজ এ একটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলার ব্যাপারে সাহায্য করেন। পরের বছর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকা প্রকাশ করলে তিনি তার প্রথম সম্পাদক নিযুক্ত হন। তার কর্ম জীবনের প্রথম দিকে দেশভাগ পর্যন্ত প্রায় তিন দশক কলকাতায় বসবাস করেন। 

বেগম সুফিয়া কামালের পরবর্তী জীবন আরও বর্ণাঢ্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসেই বেগম সুফিয়া কামাল সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালে সমাজসেবা ও রাজনীতি হয়ে ওঠে সুফিয়া কামালের ধ্যান-জ্ঞান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বেগম সুফিয়া কামাল নিজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এতে অংশ নেয়ার জন্য নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। 

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে সুফিয়া কামালের অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। তিনি যেসব সংগঠন প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনা করেন তার মধ্যে আছে, বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি, দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা, ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থা। ১৯৫৬ সালে ‘কচিকাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬১ সালে ‘ছায়ানট’-এর সভাপতি, ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি, ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ গঠন এবং এই সময়ে অসহযোগ আন্দোলনে নারী সমাজের নেতৃত্ব দেন।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদবিরোধী সংগ্রামে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অংশগ্রহণ করেন। তার লেখার ঝুলিতে কবিতা ছাড়াও আরও আছে ভ্রমণ কাহিনি, ডায়েরি, ছোট গল্প, উপন্যাস ও শিশুতোষ গ্রন্থ। সব মিলিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০টিরও বেশি। সেসবের মধ্যে কেয়ার কাঁটা, মায়া কাজল, মন ও জীবন, উদাত্ত পৃথিবী, অভিযাত্রিক, ভ্রমণ কাহিনী ‘সোভিয়েত দিনগুলি’, স্মৃতিকথা ‘একাত্তরের ডায়েরি’ ইত্যাদি বিশেষভাবে  উল্লেখযোগ্য।

সাহিত্য ও নানা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য জীবিতকালেই কবি সুফিয়া কামাল অর্ধ শতাধিক পুরস্কার লাভ করেন। যার মধ্যে, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬২), লেনিন পদক (১৯৭০, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে), একুশে পদক (১৯৭৬), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৫), স্বাধীনতা দিবস পদক অন্যতম। তিনি ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকারের ‘তমসা-ই-ইমতিয়াজ’ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।

১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর আলোর পথযাত্রী বেগম সুফিয়া কামাল ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশী নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই সম্মান লাভ করেন। প্রতি বছর এই দিনটিতে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers