বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ , ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

সাহিত্য

​শ্রাবণের মেঘ, অন্তরের সুর

বাহাউদ্দিন গোলাপ ১৪ আগস্ট , ২০২৬, ১৪:৪৪:০০

395
  • ​শ্রাবণের মেঘ, অন্তরের সুর

আষাঢ় ও শ্রাবণের অঝোর ধারায় বঙ্গভূমির মাটি আর মেঘ যখন এক সমান্তরাল সুরে মেতে ওঠে, তখন প্রকৃতি কেবল সবুজ সাজেই সাজে না; বরং বাঙালির অবচেতন মন এক গভীর আত্মভাবনায় জেগে ওঠে। টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির ছন্দ, ভিজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর কদমের ব্যাকুল সুবাসে চরাচর যখন আচ্ছন্ন হয়, তখন তা আর কেবল ঋতু পরিবর্তনের হিসাব থাকে না—হয়ে ওঠে এক শাশ্বত সাংস্কৃতিক ও মানবিক উৎসব। পৃথিবীর আর কোনো ভূখণ্ডে বর্ষাকে ঘিরে মনস্তাত্ত্বিক বিরহ, প্রেম আর আত্মিক ব্যাকুলতার এত নিবিড় বিস্তার দেখা যায় না। বর্ষা ও বাঙালির এই চিরন্তন সখ্যকে উপলব্ধি করেই বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘প্রবন্ধ-সংকলন’-এ লিখেছিলেন, “বাঙালির শ্রেষ্ঠ কবিতা বর্ষার কাব্য; বর্ষাকে অবলম্বন করেই বাঙালির প্রেমের কবিতা।” প্রকৃতিকে যখন মানুষ স্রেফ বাহ্যিক সৌন্দর্য ছাপিয়ে অন্তরের গহিন থেকে দেখতে শেখে, তখন মেঘে ঢাকা বাদলদিন পরমাত্মা ও জীবাত্মার এক গোপন অভিসারের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

বাঙালির এই বর্ষাপ্রেমকে গভীর ও দার্শনিক ধ্রুপদি মাত্রায় রূপ দিয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবি তাঁর ‘ছিন্নপত্র’-এ অকপটে উচ্চারণ করেছিলেন, “বর্ষাঋতুটা বিশেষভাবে কবির ঋতু।” রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় যে উপনিষদীয় অদ্বৈতভাব এবং ‘সীমার মাঝে অসীমের অধরা সন্ধান’ লুকিয়ে ছিল, আষাঢ়ের অঝোর জলধারায় তিনি সেই পরম স্পর্শ পেয়েছিলেন। ১৩২১ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ে রচিত তাঁর ‘আষাঢ়’ প্রবন্ধে (যা পরবর্তীতে ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’ গ্রন্থে সংকলিত হয়) বর্ষার সুরের প্রাধান্য নিয়ে তিনি বলেছিলেন, সংগীতাঙ্গনে ভোট নিলে অন্য সব ঋতুকে পেছনে ফেলে বর্ষারই জয় হবে; কারণ বর্ষার ভাণ্ডারে রয়েছে মেঘ, মল্লার, দেশ ও নানাবিধ রাগ-রাগিণী। কৌতূহলজনক দালিলিক প্রমাণ মেলে কবির কালজয়ী সংগীতসংগ্রহ ‘গীতবিতান’-এ। সেখানে ‘প্রকৃতি’ পর্যায়ের মোট ২৮৩টি গানের মধ্যে এককভাবে ‘বর্ষা’ পর্যায়ের গানই রয়েছে প্রায় ১২০টি, যা বিশ্বসাহিত্যে কোনো একক ঋতুকে নিয়ে রচিত দীর্ঘতম গীতি-আলেখ্য।

রবীন্দ্রমানসে বর্ষার এই আবাহন স্রেফ আধুনিক রোমান্টিকতায় আটকে থাকেনি, বরং তা প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এর মূল স্রোত ধরে বিশ্বজনীন রূপ লাভ করেছিল। কালিদাসের যক্ষ যেখানে বিরহবেদনায় আকাশমুখী হয়ে মেঘকে দূত বানিয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ সেই লৌকিক বিরহকে এক আত্মিক ও দার্শনিক উচ্চতায় উন্নীত করেন। তরুণ বয়সে রচিত তাঁর কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘মানসী’ (১৮৯০)-র ‘মেঘদূত’ কবিতায় কবি বর্ষার সেই রুদ্র-সুন্দর মহাজাগতিক রূপ ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে লিখেছেন:

“আজি অন্ধকার দিবা, বৃষ্টি ঝরঝর, / দুরন্ত পবন অতি—আক্রমণে তার / অরণ্য উদ্যতবাহু করে হাহাকার। / বিদ্যুৎ দিতেছে উঁকি ছিঁড়ি মেঘভার / খরতর বক্রহাসি শূন্যে বরষিয়া।”

এখানে বর্ষা কেবল শান্ত বা কোমল সৌন্দর্যের আধার নয়, বরং তা অরণ্যের হাহাকার আর বিদ্যুতের ক্ষুরধার চমকে সাজানো এমন এক উদ্দীপক শক্তি, যা মানুষকে সংসারের নিত্যদিনের ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্ত করে এক অসীম চেতনার সম্মুখে এনে দাঁড় করায়।

রবীন্দ্রসাহিত্যে বর্ষার সুর প্রধানত দুটি সমান্তরাল অনুভূতির ওপর ভর করে প্রবাহিত—একটিতে আছে নিভৃত বিরহ ও ব্যাকুলতার আকুল কান্না, অন্যটিতে মিলনের অনাবিল উচ্ছ্বাস। শ্রাবণের বারিধারায় সিক্ত হয়ে নিসঙ্গ মন যখন প্রাত্যহিক জীবনের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে অদেখা অধরার টানে ব্যাকুল হয়, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই গুঞ্জরিত হয়— “আজি ঝরঝর মুখর বাদলদিনে / জানি নে, জানি নে কিছুতেই কেন মন লাগে না”। এই ব্যাকুলতা কেবল কোনো পার্থিব মানুষের জন্য নয়, এটি অসীমের প্রতি তৃষ্ণার্ত আত্মার আর্তি। আবার সেই মেঘের আড়াল সরিয়ে কদম্বমঞ্জরী হাতে পেয়ে মানবমন যখন আনন্দের উৎসবে মেতে ওঠে, তখন ‘ক্ষণিকা’ কাব্যের ‘নববর্ষা’ কবিতার ছন্দে বেজে ওঠে— “হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচেরে”। জীবনের মেঘাবৃত বিষাদ যেমন সত্য, তেমনি সত্য সেই বর্ষণ শেষে রোদের আলোয় জেগে ওঠা। তাই বর্ষার বিদায়মুহূর্তে ‘উৎসর্গ’ কাব্যের ‘মেঘমুক্ত’ কবিতায় কবি ডাক দিয়ে বলেন— “মেঘ ছুটে গেল, নাই গো বাদল, আয় গো আয় / আজিকে সকালে শিথিল কোমল বহিছে বায়।”

বর্ষাকে কেবল ব্যক্তিগত কাব্যসাধনায় সীমাবদ্ধ না রেখে রবীন্দ্রনাথ একে রূপ দিয়েছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিবেশবান্ধব সার্বজনীন উৎসব ‘বর্ষামঙ্গল’-এ। শান্তিনিকেতনের রুক্ষ ধূলিমাটিকে বৃষ্টিতে সিক্ত করে বৃক্ষরোপণ উৎসবের মাধ্যমে তিনি মানুষ ও প্রকৃতির মেলবন্ধনের এক অনন্য সংস্কৃতি গড়ে তোলেন। এটি কেবল কোনো সংগীতের অনুষ্ঠান ছিল না, বরং আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষ ও প্রকৃতির বিচ্ছেদ রোধ করার এক মহৎ দার্শনিক প্রয়াস ছিল। এর পাশাপাশি, রবীন্দ্রনাথের লেখায় বর্ষা কেবল কাব্যময়তার মোহজালে আটকে থাকেনি; তা গদ্যের মাধ্যমে নেমে এসেছে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার বাস্তব লড়াইয়ে। ‘গল্পগুচ্ছ’-এর বিখ্যাত গল্প ‘মেঘ ও রৌদ্র’-এ পরাধীন বাংলার করুণ চিত্র এঁকে তিনি লিখেছিলেন, বন্যার সময় গোয়ালঘরের গরুগুলো যেমন পঙ্কিল জায়গায় ভিড় করে করুণ চোখে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকে, পরাধীন বাংলাদেশও বর্ষার কর্দমাক্ত জঙ্গলের মাঝে মুখ বুজে একইভাবে ভিজতে লাগল। আবার ‘সমস্যাপূরণ’ গল্পে বর্ষাকালে নদীর হাটে ইলিশ ও কাঁঠালের বিকিকিনি কিংবা হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টির আশঙ্কায় বাঁশের ওপর কাপড় টাঙিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার জীবনসংগ্রাম অতিপ্রাকৃত সংবেদনশীলতায় ফুটে উঠেছে।

এভাবেই কাব্য, গান, প্রকৃতিপ্রেম ও প্রাত্যহিক সামাজিক বাস্তবতার মেলবন্ধনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষাকে পরম এক আশ্রয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বর্ষা বঙ্গজীবনের এমন এক শাশ্বত ঋতু, যা মানুষের অন্তরের অতি গোপন সংবেদনকে ছুঁয়ে যায়, আর সেই বর্ষাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার একমাত্র আয়না হলেন রবীন্দ্রনাথ। আষাঢ়ের প্রথম কদম কিংবা শ্রাবণের ব্যাকুল বৃষ্টিতে বাঙালি যখনই নিজের চোখ ও হৃদয় খোলে, তখনই সে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পায় রবীন্দ্রসুরের আলোয়। বর্ষার অনির্বচনীয় রূপ, দার্শনিক বিরহ কিংবা জীবনসংগ্রামের করুণ বাস্তবতা—সবকিছুকে যিনি এমন নিখুঁত ও অমর রূপ দিয়েছেন, সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গীয় সংস্কৃতি ও বাঙালির আত্মায় চিরকাল এক অবিচ্ছোদ্য পরম আশ্রয় হয়ে বেঁচে থাকবেন।

(লেখক: গবেষক,সংগঠক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)

নিউজজি/নাসি  

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers