বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ , ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

সাহিত্য

প্রেমিকা ও বেশ্যা

আদনান আলী ২৪ জুলাই , ২০২৬, ১৫:৫১:২৬

822
  • ছবি: রামকিঙ্কর বেইজ

আমার প্রেমিকা আমাকে ভালোবাসে ভীষণভাবে। ওর সাথে পরিচয়ের প্রথম দিন থেকেই আমি খুব করে অনুভব করি, ও অন্য সবার চেয়ে একদম আলাদা । কীভাবে ও এতটা অন্যরকম হলো, নিজেকে আলাদা করে ফেললো অন্য সবার চেয়ে, এই সত্যটা অনেক চেষ্টা করেও আমার পক্ষে উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয় নি। এমন না যে ও আমার জীবনের প্রথম নারী, প্রেম ও প্রেমিকা বিষয়ক নানারকম বোঝাপড়ায়, আমাকে একেবারে আনাড়ি বলা যায় না। আর অভিজ্ঞতা মানে তো কেবল নিজে যতটুকু যাপন করা হয় ততটুকু নয়, মানুষের অভিজ্ঞতার সঞ্চয় পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই ঘটতে পারে। তো, এত সব অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও, আমি আমার প্রেমিকাকে চেনা কোন ছাঁচে ফেলতে পারি নি। হয়তো প্রজ্ঞা বলে যেই ব্যাপারটা নিয়ে বুদ্ধিজীবিরা খুব শ্লাঘা অনুভব করে, যেটা না থাকলে বাকি পাঁচ ইন্দ্রিয় বেয়ে আসা সব খবরেরা ভুলভাল অর্থ নিয়ে দাঁড়ায়, সেটা আমার নেই। তাই আমি কেবল অনুভব করি ওর ভিন্নতার ব্যাপারটা, কিন্তু নিজের কাছে নিজেই ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারি না। অনেকটা সেই ব্যথার মতো, যেটা আছে, কিন্তু কোথায় আছে তা ঠিক ঠাহর করা যায় না। এরকম ব্যথায় মানুষ বিনিদ্র রজনী কাটায় না, কিন্তু জেগে থাকার একটি মুহুর্তও এর ফলে সে শান্তি খুঁজে পায় না। অবশ্য আমার নানা বিষয়ে তালেবর বন্ধুরা আমাকে বলে, এই ব্যথাটাকেই নাকি প্রজ্ঞা নামে ডাকা হয়।

আসল কথায় ফিরি। এরকম একজন প্রেমিকার অধিপতির কাছ থেকে আপনারাও নিশ্চই খুব গতানুগতিক কিছু আশা করেন না? করাটা আমার কাছেও ঠিক সুবিবেচনার কাজ বলে মনে হয় না। তাই আপনাদের এই সব চাহিদার চাপে পড়ে, আলাদা হওয়ার জন্য আমি প্রথমেই এই অনন্য সাধারণ প্রেমিকাকে পৃথিবীবাসীর কাছে প্রদর্শন করে বেড়ানোর লোভ সংবরণ করে ফেলেছিলাম। আমি আর সে ছাড়া এই দুর্দান্ত ও ঈর্ষনীয় প্রেমের খবর যেন আর কেউ জানতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্কতার কোন কমতি রাখি নি। আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হতো লুকিয়ে, এমনকি ফোনে কথা বলার সময় ও ব্যবহার করতাম নানা রকম সাংকেতিক শব্দ আর উপমা। যখন আমরা পাশাপাশি হেঁটে রাস্তা পার হতাম, ওর প্রতিটি পদক্ষেপের প্রতি সযত্ন নজর রেখেও আমি এমন ভাবে হাঁটতাম যেন মনে হয় মহাবিশ্বে লক্ষাধিকবার পুনরাবৃত্তি হতে থাকা নানা রকম সম্পর্কহীন ঘটনার মতোই, আমাদের এই পাশাপাশি রাস্তা পার হওয়ার ঘটনাও একটা কাকতাল মাত্র । এবং একবার রাস্তা পেরিয়ে যাওয়ার পর এই চার কোটি মানুষের শহরে আমাদের দু'জনের রাস্তা আরেকবার মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। সে যখন বুটিকশপে নিজের জন্য জামা বাছাই করত, তখন আমি শুধু এক পাশে দাঁড়িয়ে তারিফের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম, যাতে আমাদের সম্পর্কের গভীরতা তো দূরে থাক, ন্যূনতম কোন আঁচও কেউ টের না পায়। আমি জানি, কারো কারো মনে হতে পারে জামাটা আসলেই তার গায়ে কেমন মানালো এ বিষয়ে বিজ্ঞ মতামত না জানালে তার পক্ষে বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু সেটার আসলে কোন প্রয়োজনই পড়তো না। কারণ আমার প্রেমিকার প্রতিটি সিদ্ধান্তই ছিল নিখুঁত আর পৃথিবীতে তৈরি হওয়া প্রতিটি বস্তুই তার গায়ে অসাধারণ মানাত ।

আচ্ছা, সে না হয় এতটা নিখুঁত বলে, কোন আলাপচারিতা ছাড়াই কেনাকাটার বিষয়টা শেষ করে ফেলাটা কঠিন কিছু ছিল না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে? তার নিখুঁত সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে আমার পক্ষে কি সম্ভব ছিল না দুনিয়ার বুকে নিজেকে আর একটু গ্রহণযোগ্য করে উপস্থাপন করার? আসলে এ ব্যাপারটাও খুব জরুরি ছিল না। সত্যি বলতে কি, পৃথিবীর কোন বস্তুই যে আমার গায়ে ঠিক খাপ খায় না, এ ব্যাপারটাতেও আমরা একমত ছিলাম। বস্তুত, বেশিরভাগ বিষয়ে এরকম একমত থাকার ক্ষমতাই আমাদের প্রেমটাকে এতটা সুমধুর রূপ দিয়েছিলো। অথচ কোন এক বোকা পণ্ডিত অনেক কাল আগে বলেছিলেন, কথোপকথনের সময় সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক জিনিসটি নাকি মতৈক্য। তিনি জানতেনই না, মতৈক্যের মত সুমধুর বিষয় দুনিয়াতে আর একটিও নেই। মতৈক্যের মায়াজালই কেবল পারে অস্থির পৃথিবীকে সবরকম শব্দদূষণ থেকে মুক্ত করে, শান্ত ও নীরব করে দিতে। পৃথিবীর যাবতীয় অশান্তি আর ঝামেলার মূলে তো ঐ একটা বিষয়ই, মতদ্বৈততা। তাই বার বার কেন নিজের প্রেমটাকে এত মহিমান্বিত করার চেষ্টা করছি এই কৈফিয়ত যদি কেউ চেয়েই বসে, তার জন্য আমার জবাব একটাই, আমাদের একমত হওয়ার ক্ষমতাই আমাদের প্রেম অনবদ্য হয়ে উঠার প্রধান কারণ।

এজন্য আমার কেনাকাটার বিষয়ে তার মতামত আমি কখনোই প্রত্যাশা করতাম না, কারণ জবাবটা আমাদের দুজনেরই জানা ছিলো। সদ্য কেনা যে কোন টি-শার্ট, জুতো, শার্ট, পাঞ্জাবী, স্যুটে আমাকে এতটাই বেখাপ্পা লাগতো, মনে হতো আমি অন্য কারো জামা গায়ে গলিয়ে ঘুরছি। প্রতিটি পদক্ষেপেই মনে হতো যেখানে পা ফেলছি, সেইখানে আসলে অন্য কারো পা রাখার কথা ছিলো। শ্বাস নেয়ার মুহূর্তগুলোতে আমি সব সময় অপরাধবোধে ভুগতাম, যেন অন্য কোন মহত্বর মানুষের নিঃশ্বাসটুকু চুরি করে আমি বেঁচে আছি। ফলে আমার প্রেমিকার সাথে আমার আগন্তুক হয়ে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়টা যে মোটেই বেখাপ্পা নয়, সেটা ও মেনে নিয়েছিলো বলে ভালোবাসার পাশাপাশি এক ধরনের কৃতজ্ঞতাবোধেও আমি আচ্ছন্ন থাকতাম।

আমাদের দুজনের একসাথে কাটানো শ্রেষ্ঠ সময় ছিল খাবারের সময়টা। রেস্টুরেন্টে আমরা কখনো পাশাপাশি বসতাম না, বসতাম সামনাসামনি । বাসের পাশাপাশি সীটে বসে থাকা অচেনা সহযাত্রী হয়ে থাকার কোন ইচ্ছাই আমাদের ছিল না। রেস্টুরেন্টের একটা প্রায়ান্ধকার কোনায়, আমরা মুখোমুখি বসে থাকতাম চুপচাপ। সস্তা রোমান্টিক উপন্যাসের অর্বাচীন পাঠকেরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে ভেবে বসে আছেন যে আমরা চোখে চোখে তাকিয়ে থাকার জন্য সামনাসামনি বসতাম। আসলে বাস্তবতা থেকে দূরে থাকলে এরকম অনেক কষ্ট-কল্পনাতেই তো ডুবে থাকা যায়। কিন্তু একটু মাথা ঘামালেই বুঝতে পারা উচিত যে এই প্রায়ান্ধকার কোণায় চাইলেও একজন আরেকজনের চোখ থেকে ঠিকরে বের হওয়া ভালোবাসার পাঠোদ্ধার করা সম্ভব নয়। ফলে চোখ বা মুখের দিকে না তাকিয়ে, আমরা একে-অপরের খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। অনেকেই হয়তো জানেন না, মানুষের সত্যিকারের রূপ বের হয় হয়ে আসে খাবার টেবিলে। সৃষ্টির আদিতে যখন সে অন্য উঁচু স্তরের মাংশাসীদের ফেলে যাওয়া উচ্ছিষ্টের জন্য লড়াই করতো বা এখন কোন সুউচ্চ অট্টালিকায় মিশেলিন স্টার রেস্টুরেন্টে বসে সযত্নে শব্দহীন কসরতে খাবার চিবোয়, কিছু সর্তকতা সে কিছুতেই মনে রাখতে পারে না। সম্পদ বন্টনের অনিচ্ছা, অবন্টিত সম্পদ হরণের লোভ, আগত কোন দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মজুদের ভাবনায়; চোখের  চাহনি, মুখের তির্যক ভঙ্গি, উত্তেজনাপূর্ণ চাপা হাসি, হামলে পড়ার ভঙ্গি বা নিক্ষিপ্ত হতে থাকা খাদ্যকণা ইত্যাদির মাধ্যমে সে প্রকাশ করে ফেলে খাদ্য শৃঙ্খলে মাঝখানে তার নিজের অনিশ্চিত অবস্থানের কথা। ফলে নিজেদের সম্পর্ক বিশ্লেষণে আমাদের প্রিয় গবেষণার বিষয় ছিলো, খাবারের প্লেটের সাথে আমাদের মিথষ্ক্রিয়ার ধরণ।

পৃথিবীর প্রায় সব বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করতাম. কেবল নিজেদের সম্পর্কের বিষয়টা বাদে। দৈবাৎ নিজেরা আলোচিত হলেও সেটা খুব দ্রুতই একঘেয়ে আর ক্লান্তিকর হয়ে পড়তো। আমাদের কন্ঠস্বর শোনাতো সংবাদ পাঠক যেই স্বরে পোকার আক্রমণে ফসল নষ্ট হয়ে কৃষকের দুরবস্থার বর্ণনা দেয়, বা বাসে হকার যেমন করে একই সাথে ইরেজার হিসাবে ব্যবহারযোগ্য টুথব্রাশের গুণাগুণ বর্ণনা করে, ঠিক তেমনই একঘেয়ে ও নিরাবেগ। নিজেদের বিষয়ে আলোচনা শুরু হলে দ্রুতই তা অন্য দিকে মোড় নিয়ে সামনের প্লেটে রাখা খাবার ছাড়িয়ে দেশ-বিদেশে উৎপাদিত খাদ্য পণ্যের বৈচিত্র ও মান বিষয়ে আমাদের বিশেষজ্ঞতার প্রদর্শনীতে পর্যবসিত হতো।

এ পর্যন্ত এসে যে আপনাদের অনেকের অবিশ্বাসে ভ্রু কুঁচকে গেছে তা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত বা অস্তিত্ব সংকটে ভোগা একজন মানুষ হিসেবে আমাকে চিহ্নিত করে, প্রেমিকার পুরো বিষয়টি আমার কল্পনাপ্রসূত, হয়তো এমনটাই আপনারা ভাবছেন। কিন্তু সমস্যাটা মোটেই আমার নয়, সমস্যাটা আপনাদেরই। প্রেম বিষয়ক ধারণাটিকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ করে ফেরার যে প্রাচীনপন্থী প্রবণতায় আপনার আক্রান্ত এ তারই ফল। আমাদের সম্পর্কের বর্ণনা শুনে আপনাদের কাছে অস্বাভাবিক লাগছে, অথচ দেখুন এর চেয়ে অনেক অস্বাভাবিক বিষয়কেই আপনারা বেশ সহজভাবে গ্রহণ করেছেন। আমি হলপ করে বলতে পারি ছেলে ধরা সন্দেহে একজন নারীকে পিটিয়ে মেরে ফেলা বা নিকটতম আত্মীয় কর্তৃক শিশু ধর্ষণের খবর শুনলে আপনাদের ভ্রু এর এক-পঞ্চমাংশও  কুঁচকায় না । গতকাল যে দুটো শিশুকে হাঁড় কাঁপানো শীতের রাতে বাইরে ফেলে গেল তাদের বাবা-মা, আপনাদের মধ্যে থেকেই কেউ কেউ হয়তো তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে আসার সময় কান্নার শব্দ শুনেও ইচ্ছে করে ফিরে তাকাননি। ভেবেছেন থামলেই অহেতুক কোন দায়িত্ব ঘাড়ে এসে পড়তে পারে। তখন আপনাদের মধ্যে কেউ হয়তো ভুগছিলেন নতুন কেনা শীতের জ্যাকেটটার দামাদামিতে আর দুইশ টাকা কম বলতে না পারার অপরাধবোধে, কেউ ক্যান্সার আক্রান্ত বাবাকে দেখে ফিরতে ফিরতে কষছিলেন আগামীকাল দোকান খোলার আগে সবজিতে ক্যামিকেল স্প্রে করার ছক। আর এ সবের মধ্যেই, কেবল আমার প্রেমটাই আপনাদের কাছে দেশের একমাত্র অসংলগ্ন জিনিস বলে মনে হয়। আমি জানি যে আপনাদের দোষ দিয়েও কোন লাভ নেই, বারবার প্রতারিত হতে হতে আপনাদের এ সমস্ত বিষয়ে সংবেদনশীলতা একবারে কমে গেছে। আর আপনাদেরকে দোষ দিবো কি, আমি নিজেও কিন্তু খবরটা পড়ার সময় মূলত আমার প্রেমিকার একটি স্তন নিয়ে ভাবছিলাম। কিছুক্ষণ পরে যখন শিশুদের একজনের মৃত্যুর কথা জেনে দুঃখবোধে আক্রান্ত হতে যাবো, দ্বিতীয় স্তনটির ভাবনা আমাকে মৃত্যু ও শীতের কথা ভুলিয়ে দেয়।

হ্যাঁ, মৃত্যু ও শীতের কথা ভুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা স্তনের আছে বটে। স্তনের কথা ভাবলে নতুন জীবন সৃষ্টির কথাই বরং বেশি করে মনে আসে। তবে সেসব উপমা বা আন্তঃসম্পর্কের কথা তোলার আগে যে প্রশ্নটা আসার কথা, সেটা হলো দুটি স্তনের কথা কি আলাদা করে ভাবা যায়? ধারাপাতের মত একের পর দুই এমন করে কি বলা যেতে পারে স্তনদের কথা? হ্যাঁ, জেনে অবাক হবেন হয়তো, দুটো স্তনের কথা আলাদা করে ভাবা সম্ভব। যদিও বৃহত্তর চেতনায় দেখলে, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ দেশ বা জাতিগোষ্ঠীর মানুষকেও কি আপাতদৃষ্টিতে আলাদা করতে পারা সম্ভব? আপনার-আমার চোখে দুজন চৈনিক মানুষকে হয়তো হুবুহু একই রকম মনে হয়, অথচ চিন্তাচেতনায়, কাম-প্রেম-বেদনা-দ্রোহে, ব্যক্তিগত দুঃখবোধের ভিন্নতায়, যৌন চেতনার নানা স্তরবিভাগে, বিপ্লব-সাম্য-মৈত্রী, ক্যাপিটালিজম বনাম সমাজতন্ত্র কিংবা বোধবুদ্ধিহীন পশুসুলভ মৌলিক চেতনাতেই হয়তো তারা একে অপরের চেয়ে আলোকবর্ষ পরিমাণ দূরে অবস্থিত। আর এসবের কথা ছেড়ে দিলেও, তার নিজের সমাজে নিশ্চয়ই চেহারা ও আদলের ভিত্তিতেই দুজনের মধ্যে বিরাট পার্থক্য চিহ্নিত হয়। আবার আমরা দুজন ভিন্ন চেহারার বাঙালি, নানা সুযোগ-সুবিধা বা আনুকূল্য লাভের লড়াইয়ে শুধুমাত্র চেহারা বা আদলগত কারণে যাদের অবস্থান পুরোপুরি ভিন্ন মেরুতে, ওই চৈনিক মানুষটির কাছে আমাদের চেহারা হুবহু এক। তাই এ সমস্ত আপাত সাদৃশ্যের কচুরিপানা সরালে, আমাদের হৃদয়ের পরপর দুটো স্পন্দনের মাপও যেখানে পুরোপুরি এক নয়, সেখানে দুটো স্তনকে নিয়ে আলাদা করে ভাবতে পারার মধ্যে খুব বিস্ময়কর কিছু মোটেই নেই।

তবে অন্যসব সূক্ষতম বিষয়ের মতই, এইসব মৌলিক পার্থক্যের ধারণা গভীর তাত্ত্বিক পড়াশোনা বা জ্ঞানলাভের মধ্যে দিয়ে অর্জিত হয়না। বরং বিশেষ কোন মুহুর্তে এই সমস্ত জ্ঞান বোধির মত আমাদের কাছে ধরা দেয়। ফলে প্রেমিকার উন্মুক্ত বক্ষদেশে হাত বুলানোর অন্যমনস্ক মুহূর্তগুলোতেও এই চিন্তা আমার কাছে ধরা দেয়নি, বরং এই সবকটা অকস্মাৎ আমি পেয়েছিলাম এক বেশ্যার সান্নিধ্যে।  আমি ঠিক জানি না বেশ্যা শব্দটা ব্যবহার করা পলিটিক্যাল ক্যারেক্টনেস এর ব্যত্যয় কিনা। শব্দের ব্যবহার নিয়ে প্রায়শই আমাকে নানা রকম ধন্দ্বে পড়তে হয়। শব্দের রাজনীতি বুঝি না বলে পরিচিত মহলে আমাকে বারকয়েক বেশ সমালোচনারও শিকার হতে হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বেশ্যা শব্দের ব্যবহারজনিত দুর্বলতাকে কেবল শব্দ ব্যবহারে আমার পারঙ্গমতার অভাব হিসেবে না দেখে, সমাজের বোধগম্যতাজনিত দৈন্যের উপরেই চাপিয়ে দিতে চাই।

যা হোক , আপনারা তাকে বেশ্যা নামে ডাকতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করুন বা বারবণিতা, তার সাথে আমার পরিচয় কোন বেশ্যালয়ে নয়, বা চুক্তিভিত্তিক কোন প্রকার সঙ্গমেও আমরা লিপ্ত হইনি। আমাদের আলাপ হয় মূলত ঢাকার অভিজাত এলাকার খানিকটা কম অভিজাত এক পানশালায়, যেখানে সে পেশাগত কারণেই একজন রেগুলার। পারস্পরিক নানা ধরনের সম্মতি উৎপাদনের মায়াবী খেলা যখন জমে উঠার পথে, তখনই হঠাৎ বেরসিকের মতো সে জানায় যে খেলাধুলার উত্তুঙ্গে উঠার খায়েশ থাকলে আমি যেন আরও খানিকটা কর্মতৎপরতা প্রমাণ দেই; কেননা সামনের মাসে আসলে ওকে আর পাওয়া যাবে না। আগামী মাসের শুরুতেই, ওর শুভ বিবাহ।

আমার হাত তখনও ওর স্তনবৃন্তে নড়াচড়া করছিল। মূলত সেই মোক্ষম মুহূর্তেই আমি আবিষ্কার করেছিলাম, মানুষের জীবনের আর সবকিছুর মতোই, পাশাপাশি দুটো স্তনের ভারসাম্য বিন্দুও এক নয়, তারা একে-অপরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটি সত্ত্বা। সুরার সান্নিধ্যে আসলে এমনিতেই সবকিছুকেই একান্ত আপন, একান্ত নিজের মনে হয়। পকেটে থাকা চাবির রিং, গতদিনের না ফেলে দেওয়া কয়টা বাদামের খোসা, বলপয়েন্ট কলম, রাস্তা, বাড়ি, ঠিকানা, দুই আঙ্গুলের ডগায় আটকে থাকা স্তনবৃন্তসমেত নারী, এসব কিছুই মনে হয় জন্ম-জন্মান্তর ধরে একান্ত নিজের। এই অবস্থাতে পর্দার আড়ালের অনেক কিছু আমাদের কাছে উন্মোচিত হয়ে পড়ে, আর এজন্যই হয়তো এইসব অনুভূতির জন্ম নিজের প্রেমিকার পাশে বসে থাকার সময় না হয়ে, হয়েছিলো সেই বারবনিতার সাথে নানারকম কসরৎ করার সময়ে। কিন্তু এটাই কি স্বাভাবিক? সুরাই কি এসব ঘটনার পিছনে প্রধান ক্রীড়ণক? নাকি আমাদের প্রেম শেষ পর্যন্ত প্লেটোনিক রুপ নিয়েছিলো? নাকি যেমন করে নির্দিষ্ট বয়সে, বিশেষ কোন স্থানে জ্ঞানের জন্ম হয় আমাদের কলবের অভ্যন্তরে, তেমনি করেই হঠাৎ হল এই উপলব্ধি?

আপনার নিশ্চয়ই শ্লেষের হাসি হাসতে হাসতে ভাবছেন, প্রেমিকার সাথে আমার সম্পর্কের অস্বাভাবিকতাই যখন স্বাভাবিক, তার মানে আমাদের দুজনের মধ্যে কোন দৈহিক ভালোবাসার আদান-প্রদানও নিশ্চয়ই ঘটেনি।  অথবা আপনারা হয়তো আমার প্রেমিকার শরীর মোটেই আকর্ষণীয় নয় বলে কষ্ট-কল্পনা করছেন। যদি সত্য জানতে চান, তবে বলতেই হচ্ছে, আমার প্রেমিকার স্তন আলোচ্য বারবনিতার চেয়ে অনেক বেশি সুডৌল। এতটাই যে, তার অন্যমনস্ক হয়ে হাই তুলতে তুলতে আড়মোড়া ভাঙার মুহূর্তগুলোতে, আশেপাশে অনেক পুরুষেরই চিত্ত চাঞ্চল্য দেখা দেয়। কিন্তু এই পার্থক্যের ব্যাপারটা ধরতে না পারার পিছনে ওগুলোর সুষম কাঠামোর কোন ভূমিকা নেই। মূল কারণ হলো, অন্য সব সময়ের মতোই দৈহিক ভালোবাসা বিনিময়ের মুহূর্তগুলোতেও আমরা সচেতন থাকতাম নিজেদের ভালবাসাহীনতার একটা অভিনয়  চালিয়ে যেতে। যদিও সাধারণত এ ধরনের মুহূর্তগুলোতে আমরা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থাকতাম, কিন্তু অপরিচিতের ভূমিকায় অভিনয়ের বহুদিনের অভ্যাস আমাদেরকে একরকম বাধ্য করত এসব বিষয়ে উদাসীন থাকতে। কালেভদ্রে বিছানায় বাহুলগ্ন থাকার মুহূর্তেও আমাদের দৃষ্টি নিমগ্ন থাকতো টিভির পর্দায়, অভিনেতা-অভিনেত্রী বা সংবাদ পাঠিকার দোষ-গুণ ব্যবচ্ছেদ চলত তুমুল চুম্বনের সময়ও। এমনকি সঙ্গমের সময়, যখন আর টিভির পর্দায় চোখ রাখা সম্ভব নয়, তখন আমাদের মন হন্যে হয়ে খুঁজতো অমনোযোগী হয়ে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কোন একটা বস্তু। কখনো খাটের মাথার দিককার অলংকরণ, কখনো বুনতে থাকা মাকড়সার জাল, কিংবা দূরূহ কোণে বসে একাগ্রচিত্তে তাকিয়ে থাকা টিকটিকির দিকে আমরা মনোযোগ নিবদ্ধ করতাম। আর এভাবেই এসব অন্তরঙ্গ মুহূর্তে অনুপস্থিত কিন্তু মনোযোগী শত-সহস্র চোখকে অনায়াস দক্ষতায় বোকা বানাতাম নিজেদের সম্পর্কের বিষয়ে। সঙ্গম শেষে সিগারেট টানার সময়টাতে আমরা পুলক অনুভব করতাম এবারের খুঁজে পাওয়া মনোযোগ সরানোর নতুন কোন অগুরুত্বপূর্ণ বস্তুর কথা ভেবে। অনুসন্ধিৎসু সহস্র চোখকে ফাঁকি দিতে পারার ভাবনাই, আমাদের সঙ্গমকালীন না হওয়া অর্গাজমের অভাব পূরণ করে দিতো।

আমাকে আবার এত বৃদ্ধ ভাববেন না, যে মানুষজন আছে এমন কোন জায়গায় প্রেমের প্রদর্শনী করতে ভয় পাই। ওসব করেছি অনেকবারই, এতই ডাল-ভাত লাগে যে এখন আর নতুন করে কোনো থ্রিল পাই না। বিশ্বাস করুন, তার চেয়ে অনেক বেশি উত্তেজনা অনুভব করি নিতান্ত অবহেলায় একজন আরেকজনের দিকে কোন মনোযোগ না দেয়ার ভঙ্গিতে শরীর হাতানোতে। এমনকি মানুষজনের অনুপস্থিতিতেও। এই যে অমনোযোগীতার খেলা, কেউ কারো নই ভঙ্গিতে অবলীলায় নানান নিষিদ্ধ জায়গায় অনায়াস ভ্রমণ, এমনকি বেশ্যার সাথেও হয়তো একজন খদ্দের এরচেয়ে বেশি শৃঙ্গারে মত্ত হয়। এই অবহেলা আর তাচ্ছিল্যে ভরা যৌনতার চেয়ে আকর্ষণীয় কোন কিছু পৃথিবীতে আছে বলে আমি বিশ্বাসই করি না। তাই বিশেষ করে রেস্টুরেন্টে, যখনই আমাদের আঙ্গুলগুলো চামচ ছেড়ে দিয়ে ভাব বিনিময়ের নতুন মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হতে চেষ্টা করত, ওদেরকে প্রবল ভাবে দমন করে আমরা চোখ, নাক আর জিহ্বাকেই বেশি গুরুত্ব দিতাম। পারস্পরিক আমিষের স্পর্শে নয়, গোটা পৃথিবীর সাথে সাথে এই বদ্বীপে চিংড়ির অর্থনৈতিক অবদান বা মানুষের সভ্যতার বর্তমান পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার পিছনে কলকাঠি হিসাবে মুরগীর ভূমিকার কথা ভেবেই আমরা কেপে কেঁপে উঠতাম। এজন্যেই দেহসৌষ্ঠব অনুভবের মতো অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা ঐসব সময়ে আমাদের মাথায় আসতো না।

এতসব আলাপের ফাঁকে একটা কথা কবুল করে নেই, আজ এই পানশালার অন্ধকারে স্তনের দ্বিচারিতা বা জৈবিক তাড়না এসব কিছু ছাপিয়ে, আমি মূলত ভীষণ আলোড়িত হই বিয়ে বিষয়ক আলাপের উপস্থাপনে। এর আগে কখনো এ বিষয়ে কোন আলাপ কোথাও করিনি। বিয়েকে যদি জীবন ও মৃত্যুর মতই অবশ্যম্ভাবী কিছু বলে গণ্য করি, তাহলে আমার ও প্রেমিকার অবিস্মরণীয় প্রেমটির পরিণতি হিসাবে এটাতো একরকম ধরাবাঁধাই ছিলো। কিন্তু প্রেমটি অবিস্মরণীয় বলেই, এরকম একটা গতানুগতিক পরিণতি বিষয়ে কথা বলার কথা কখনো আমাদের মাথায় আসেনি। তাছাড়া মানব সমাজের এসব তুচ্ছ আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে এক ধরনের উন্নাসিকতা চিরকালই আমি সযত্নে লালন করেছি। এসব উন্নাসিকতা ছাড়া, তৃতীয় বিশ্বের নিস্তরঙ্গ জীবনে নিজেকে আলাদা করার মতো বিশেষ কিছু খুঁজে বের করাও আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিন্তু বাহুলগ্ন নারীটি কোনো একক পুরুষের সাথে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সামাজিক সম্পর্কে লিপ্ত হবে, এই ভাবনাতেই আমি হঠাৎ কেমন যেন হতবিহাল হয়ে যাই। আমার এতদিনের লালিত নানারকম আলাদাপনা যেন কোন কঠিন দেয়াল বা অনতিক্রম্য বাধা-বিপত্তি ছাড়াই, যেনবা হাওয়ার মুখোমুখি হয়েই মুখ থুবড়ে পড়ে। আপনারা এখন যেমন ভাবছেন, আমি কিন্তু ততটা উন্নাসিক বা পুরুষতান্ত্রিক নই। বহু পুরুষের ভোগের সামগ্রী থেকে উদ্ধার হয়ে নারীটি আর দশজনের মত করে সুখের সংসার করবে এটা আমার কাছে এমন কোন অরুচিকর বিষয় নয়। আমি কেঁপে উঠি, কারণ টের পাই যে নিজের জীবন সম্পর্কে এমন সুনিশ্চিত এবং সময়োচিত সিদ্ধান্ত আমারই জানা নেই। এই উপলব্ধিজাত হতাশা আমাকে গ্রাস করে ফেলার আগেই আমি বিয়ের পুরো আয়োজনটির সাথে ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্টতা অনুভব করতে থাকি। যেন হবু বর না হলেও, আমি এই বিয়েতে সম্পৃক্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। স্তনবৃন্তের পরিধি মাপার প্রচেষ্টায় ক্ষান্ত না দিয়েই, বিয়ের আয়োজনের নানা খুঁটিনাটি আলাপে দুজন রীতিমত ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কখনো কোন একটা বিষয়ে একমত হয়ে তুমুল হাসিতে উৎফুল্ল হই, কখনো বাহাস করতে করতে অভিমানে চুপ করে যাই। অথবা কম গুরুত্বপূর্ণ কোনো এক ব্যক্তির আনাড়িপনা বা অহেতুক নাক গলানোতে যুগপৎ হাস্যরস ও বিরক্তি প্রকাশ করি। এই আলোচনার বাইরের বাকি সব কিছুকে মনে হতে থাকে একেবারেই অর্থহীন। আশেপাশের অমূলক আলাপ করতে থাকা মানুষগুলোর জন্য করুণা জাগে, কারণ ওরা জানতেও পারছে না জীবন সম্পর্কিত কি অসাধারণ সব পরিকল্পনা করে ফেলেছি আমরা দুজন, এই প্রায়ান্ধকার পানশালায় বসেই। আলাপের মাঝখানে একবার বেশ খানিকটা মুষড়েও পড়ি, যখন জানতে পারি এই পানশালায় তো বটেই, এই শহরেই আমার বর্তমান সঙ্গিনীটিকে ভবিষ্যতে আর পাওয়া যাবে না।

এ সমস্ত আলোচনা আর নানা পরিকল্পনার উত্তেজনায় বেশ কয়েক ঘন্টা কেটে যায়। বরাবরের মতেই কুৎসিত ঘন্টি বাজিয়ে পানশালা বন্ধের সংকেত আসে। ওয়েটার এসে শেষ মুহূর্তের অর্ডার দিয়ে দেয়ার ব্যাপারে তাগাদা দেয়। তাগাদার উপস্থিতিতে হঠাৎ আমার প্রেমিকার কথা খেয়াল হয়। প্রচন্ড বিস্ময়ের সাথে টের পাই, অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই তার নাম বা চেহারা মনে করতে পারছি না। প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও তার ব্যাপারে তুচ্ছাতিতুচ্ছ কোন তথ্যও মনে করতে ব্যর্থ হই। এক পর্যায়ে আমার সন্দেহ হতে থাকে যে, আদৌ আমার কোন প্রেমিকা কখনো ছিলো কিনা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম প্রেমিকার অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ তৈরী হওয়ায়, দুঃখ ও অপরাধবোধে আক্রান্ত হতে হতে, এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দেই। হাতে সময় বেশি নেই, আসন্ন বিয়ের খাবারের মেনু বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আলাপ শুরুর আগে, ওয়েটারকে ডেকে আমার প্রিয় পানীয় দুপেগ নিয়ে আসার জন্য হাঁক দেই। পানীয়টার নাম যদিও কিছুতেই মনে করতে পারছি না, তবে সেটা এই মুহূর্তে মোটেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নয়।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers