বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ , ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

সাহিত্য

নিষ্ফলা মাঠে আশার বীজ বুনে যাওয়া এক শিক্ষক

তাসমিয়া ইরা ২৪ জুলাই , ২০২৬, ১৪:১৫:৩১

551
  • নিষ্ফলা মাঠে আশার বীজ বুনে যাওয়া এক শিক্ষক

বাংলাদেশে বইপড়া আন্দোলনের কথা উঠলেই যে নামটি সবার আগে উচ্চারিত হয়, তিনি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। একজন শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যচিন্তক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব এবং সর্বোপরি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি কয়েক দশক ধরে আলোকিত মানুষ গড়ার আন্দোলনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষা কেবল পরীক্ষার ফল বা চাকরি পাওয়ার উপায় নয়; শিক্ষা মানুষের ভেতরে জাগিয়ে তোলে মানবিকতা, যুক্তিবোধ, সৌন্দর্যবোধ ও আত্মমর্যাদা। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি গড়ে তুলেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচি, যা দেশের লাখো তরুণের হাতে বই তুলে দিয়েছে এবং চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাঁর শিক্ষকতা, সাহিত্যচর্চা ও সমাজভাবনা বাংলাদেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

এই দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের আনন্দ, হতাশা, আত্মসমালোচনা এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকটের গভীর অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখা ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’। এটি শুধু একটি স্মৃতিকথা নয়; বরং একজন শিক্ষকের বিবেক, স্বপ্ন ও বেদনার দলিল।

একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই বিতরণ করেন না; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিকতা, যুক্তিবোধ, সততা ও মূল্যবোধের বীজ বপন করেন। একজন কৃষক যেমন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে জমিতে বীজ ছড়িয়ে দেন, তেমনি একজন শিক্ষকও আশা করেন—একদিন তাঁর শিক্ষার্থীরাই সমাজকে আলোকিত করবে। কিন্তু যখন সেই স্বপ্ন পূর্ণতা পায় না, যখন শিক্ষা কেবল পরীক্ষার ফলাফল বা চাকরির প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন একজন শিক্ষকের হৃদয়ে যে গভীর বেদনা জন্ম নেয়, তারই শিল্পিত ও আন্তরিক প্রকাশ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’।

এটি মূলত একটি স্মৃতিচারণমূলক ও আত্মজিজ্ঞাসামূলক গ্রন্থ। তবে একে শুধু স্মৃতিকথা বললে এর গভীরতাকে ছোট করা হবে। এখানে লেখক তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, শিক্ষাদর্শন, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং একজন শিক্ষকের আশা-হতাশার দীর্ঘ পথচলাকে তুলে ধরেছেন। ব্যক্তিগত স্মৃতি, সামাজিক পর্যবেক্ষণ ও দার্শনিক ভাবনা মিলিয়ে বইটি হয়ে উঠেছে শিক্ষা নিয়ে এক গভীর দলিল।

গ্রন্থটির নামই বইটির মূল দর্শনকে ধারণ করে। ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’ বলতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বোঝাতে চেয়েছেন সেই শিক্ষককে, যিনি বছরের পর বছর পরিশ্রম করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের বীজ বপন করেন, কিন্তু নানা সামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও জীবনের প্রতিযোগিতামূলক চাপে সেই বীজ অনেক সময় প্রত্যাশিত ফসল ফলাতে পারে না। কৃষকের মতো তিনিও শ্রম দেন, স্বপ্ন দেখেন, অপেক্ষা করেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেক সময় তাঁর হাতে আসে না কাঙ্ক্ষিত ফল। এই রূপকটি শুধু একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত বেদনা নয়, বরং গোটা শিক্ষাব্যবস্থার এক গভীর সংকটের প্রতীক।

বইটির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ঢাকা কলেজের স্মৃতি। দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা জীবনে ঢাকা কলেজকে লেখক দেখেছেন শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিসর হিসেবে। ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর ছিল অত্যন্ত আন্তরিক সম্পর্ক। বইয়ের একটি স্মরণীয় ঘটনায় তিনি দেখান, একজন শিক্ষকের প্রকৃত দায়িত্ব কেবল পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীর মনোজগৎকে জাগিয়ে তোলা। আবার বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষের হাস্যরস, শিক্ষার্থীদের সরলতা, দুষ্টুমি এবং সহকর্মীদের সঙ্গে নানা অভিজ্ঞতা বইটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। এসব স্মৃতির মধ্যেই পাঠক খুঁজে পান এক অন্যরকম ঢাকা কলেজকে—যেখানে শিক্ষা ছিল জীবন গঠনের একটি সুন্দর অনুশীলন।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের লেখার অন্যতম সৌন্দর্য তাঁর সহজ অথচ গভীর ভাষা। তিনি গুরুগম্ভীর আলোচনা করলেও তা কখনো ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে না। মাঝেমধ্যে তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধ, আত্মবিদ্রূপ এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে বলা ছোট ছোট ঘটনাগুলো বইটিকে অত্যন্ত উপভোগ্য করে তোলে। কোনো শিক্ষার্থীর অপ্রত্যাশিত উত্তর, শ্রেণিকক্ষের হাস্যরস কিংবা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্তরিক সম্পর্কের মুহূর্তগুলো বইয়ে এক ধরনের উষ্ণতা এনে দেয়।

তারপর,বইটির সেই ছোট্ট ঘরটি মনে করিয়ে দেয় তৎকালীন ঢাকা কলেজের স্যার সহ,শওকত ওসমানের সেই আড্ডা দেওয়ার দিনগুলি।

তবে বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর আত্মসমালোচনার সাহস। লেখক কেবল শিক্ষার্থীদের সমালোচনা করেননি; বরং নিজেকেও প্রশ্ন করেছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি কী করতে পেরেছেন, কী পারেননি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছেন—এসব প্রশ্নের মুখোমুখি তিনি সৎভাবে দাঁড়িয়েছেন। তাই বইটি কোনো আত্মপ্রশংসার স্মৃতিকথা নয়; বরং একজন শিক্ষকের বিবেকের ভাষ্য।

বইটি পড়তে পড়তে উপলব্ধি হয়, শিক্ষা কখনোই কেবল পরীক্ষার নম্বর বা সনদ অর্জনের বিষয় নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের ভেতরের আলো জ্বালায়, চিন্তা করতে শেখায়, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ করে। কিন্তু যদি সেই আলো জ্বালানোর পরিবেশই না থাকে, তাহলে শিক্ষক যেন সত্যিই এক নিষ্ফলা মাঠের কৃষক হয়ে ওঠেন।

 

কেন পড়বেন বইটি?

যারা শিক্ষা, শিক্ষকতা, সমাজ, মানবিকতা ও জীবনদর্শন নিয়ে ভাবতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য। বিশেষ করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বই। কারণ এটি শুধু একজন শিক্ষকের স্মৃতি নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার আহ্বান। বইটি শেষ করার পর পাঠকের মনে একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে জেগে ওঠে—আমরা কি সত্যিই মানুষ গড়ার শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি শুধু পরীক্ষায় পাস করার শিক্ষা?

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers