শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২৩ সফর ১৪৪৮

সাহিত্য

নেরুদার প্রেম, পৃথিবী ও মহাদেশ

অমৃতা ইশরাত ১৮ জুলাই , ২০২৬, ২১:০২:৩১

567
  • নেরুদার প্রেম, পৃথিবী ও মহাদেশ

পাবলো নেরুদার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তাঁর বহুমাত্রিক পরিচয়। তিনি একই সঙ্গে প্রেমের কবি, রাজনৈতিক চেতনার কবি, ইতিহাস ও ব্যক্তিগত জীবনের অসংখ্য  বিতর্কে আবৃত এক জটিল মানুষ। ফলত নেরুদাকে নিয়ে আলোচনা প্রায়শই তাঁর সাহিত্যিক কৃতিত্বের চেয়ে জনপ্রিয়তা, মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিজীবনের প্রসঙ্গেই বেশি হয়। কিন্তু একজন কবির কিংবা সাহিত্যিকের প্রকৃত মূল্যায়ন তাঁর জীবনের ঘটনাপঞ্জি বা বহুল উদ্ধৃত কিছু কবিতার ভিত্তিতে নয়, সমগ্র সৃষ্টির অন্তর্নিহিত প্রবণতা ও নির্মাণশৈলীর ওপর গড়ে ওঠে। নেরুদার কবিতার জগৎ কেবল প্রেমের উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়, ব্যক্তি অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে সমাজ, রাজনীতি, প্রকৃতি ও অস্তিত্বের বিস্তৃত প্রশ্নকে ধারণ করে। তাই তাঁকে বুঝতে হলে পরিচিত কয়েকটি ধারণার বাইরে গিয়ে একজন বিশ্বকবির সৃজন-পরিসরকে সামগ্রিকভাবে পাঠ করা জরুরি।

প্রশ্ন জাগতে পারে, নেরুদার সাহিত্যকর্ম নিয়ে এমন ক্লিশে ঘটনা কেন ঘটেছে? খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা প্রায়শই একজন কবি ও সাহিত্যিকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়, অতিপ্রচার বহুলাংশে অপপ্রচার হয়ে ওঠে। কবিতার বদলে কবির জীবনী পড়তে শুরু করলে পাঠক শেষ পর্যন্ত কবি এবং কবিতা দুটোই হারিয়ে ফেলেন। নেরুদার বেলায়ও সেই বিপত্তি ঘটেছে। তাঁর জীবন নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, কবিতার ভাষা নিয়ে ততটা নয়। অথচ বিশ শতকের কবিতায় তাঁর সবচেয়ে মৌলিক অবদান বিষয়ের বিস্তারে নয়, ভাষার অভ্যাস ভেঙে দেওয়ায়। এজন্য  নেরুদাকে পড়তে হবে সকল বস্তুগত প্রাপ্তি, খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার বাইরে গিয়ে।

নেরুদার প্রথম দিকের কবিতার শিল্পশক্তি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। ‘আজ রাতে আমি লিখতে পারি সবচেয়ে বিষণ্ন পঙ্ক্তিগুলি’ আজও বিশ্বকবিতার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পড়া প্রেমের কবিতা। কবিতাটির স্থায়িত্ব প্রেমের আবেগে নয়, স্মৃতিতে। নেরুদা দেখিয়েছেন স্মৃতি কখনও অতীতকে ফিরিয়ে আনে না বরং অনুপস্থিতিকে গভীর করে।

এখানেই নেরুদা তাঁর সমসাময়িক কবিদের থেকে আলাদা।

প্রায় অর্ধশত বইয়ের মধ্যে নেরুদার কবিতার বইয়ের সংখ্যাই চল্লিশটি। ‘বিশটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান’ বইটির পাঠকপ্রিয়তা নেরুদাকে বিশ্বসাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে অন্যান্য বইয়ের পাঠক তুলনায় অনেক কম। ফলত নেরুদার একটা অসম্পূর্ণ প্রতিকৃতি আমরা দেখতে পাই—যেখানে তিনি মূলত প্রেমের কবি। অথচ তাঁর কাব্যিক বিবর্তন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রেম পথের শুরু, পরিণতি নয়। ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি পৌঁছেছেন সভ্যতার স্মৃতিতে, মুখ থেকে মহাদেশে; একজন মানুষের নিঃসঙ্গতা থেকে ইতিহাসের সমবেত নীরবতায়। এই বিবর্তনকে উপেক্ষা করলে নেরুদার কবিতা নয়, কেবল তাঁর জনপ্রিয়তাই পড়া হয়।

‘পৃথিবীতে বসবাস’ (Residencia en la Tierra, ১৯৩৩-১৯৩৫) নেরুদার কবি জীবনের বড় বাঁক। যে পাঠক ‘বিশটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান’ পড়ে তাঁকে কেবল প্রেমের কবি বলে ভেবেছিলেন, এবার তাদের ধারণা ভেঙে যায়। এই বইয়ে প্রেম প্রায় অনুপস্থিত, গভীর অস্তিত্বসংকটই মুখ্য। পৃথিবী যেন হঠাৎ পরিচিত বাসস্থান থেকে এক অদ্ভুত, অপরিচিত ভূখণ্ডে পরিণত হয়। মানুষ, গাছ, পাথর, বৃষ্টি, ঘর, পোশাক—সবকিছু যেন নিজের স্বাভাবিক পরিচয় হারিয়ে ফেলে। নেরুদা এই বইটিতে শুধু  বাস্তবতাকে বর্ণনা করেননি, বাস্তবতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অস্বস্তিকে ভাষা দিয়েছেন। তাঁর উপমা ও চিত্রকল্প এতটাই গভীর আর অপ্রত্যাশিত যে অনেক সমালোচক বইটিকে স্প্যানিশ ভাষার পরাবাস্তববাদী কবিতার ভিত বলে উল্লেখ করেন। তবে নেরুদার পরাবাস্তবতা ইউরোপীয় অনুকরণে নয়, মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও আধুনিক সভ্যতার সংকটকে প্রকাশ করবার নিজস্ব ভাষা।

এই বইয়ের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য—বস্তুজগতের প্রতি নেরুদার নূতন দৃষ্টি। একপাটি ছেড়া জুতো, একটা জানালা কিংবা ভাঙা দেয়াল—সবকিছুই তাঁর কবিতায় অস্তিত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। তিনি বস্তুকে মানুষের অধীন হিসেবে না দেখে, তাদের নিজস্ব জীবন ও নীরবতার স্বীকৃতি দেন।

স্পেনের গৃহযুদ্ধ নেরুদার কবিতা আমূল বদলে দেয়। ‘হৃদয়ে স্পেন’ (España en el corazón, ১৯৩৭) শুধু একটি রাজনৈতিক কাব্যগ্রন্থ নয়, নেরুদার নৈতিক চেতনা। বন্ধু ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা হত্যার পর নেরুদা বুঝতে পারেন, কবিতা শুধু ব্যক্তিগত সৌন্দর্যের ভাষা যথেষ্ট নয়, পৃথিবী রক্তাক্ত হলে কবিতাকেও ইতিহাসের সাক্ষী হতে হয়। এই বইয়ে তাঁর ভাষা আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রত্যক্ষ, অনেক বেশি উচ্চারণমুখর। এখানে তিনি মানুষের প্রতি কবিতার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করেন। তখন কবিতা আর নিভৃত শিল্পচর্চার বিষয় নয়, স্মৃতি সংরক্ষণের  নৈতিক উপায়।

এই অভিজ্ঞতা পূর্ণতা লাভ করে ‘মানুষের গান’ (Canto General, ১৯৫০) মহাকাব্যে। পনেরোটি অংশে বিস্তৃত বইয়ে নেরুদা  মহাদেশের ভূতত্ত্ব, উদ্ভিদ, প্রাণী, আদিবাসী সংস্কৃতি, উপনিবেশবাদ, শ্রমিক, খনি, নদী, পাহাড়, বিপ্লব এবং সাধারণ মানুষের ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন। বইটি পড়ে পাঠক আন্দেস পর্বতমালাকে সৌন্দর্যের লীলা-লাস্যে থেকে আলাদা করে ইতিহাসের অংশ হিসেবে ভাবতে শেখে।

‘মাচু পিচ্চুর শিখরসমূহ’ (Alturas de Macchu Picchu)  কবিতাটির কথাই ধরা যাক। নেরুদা সেখানে ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাননি, খুঁজেছেন নামহীন মানুষদের, যাদের ঘাম ও শ্রমে এই নগর নির্মিত হয়েছিল। তিনি মৃত শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন—'উঠে এসো, আমার সঙ্গে জন্ম নাও।’

অন্যদিকে ক্যাপ্টেনের পদাবলি (Los versos del capitán, ১৯৫২) প্রমাণ করে, রাজনৈতিক কবিতার মধ্যেও নেরুদার প্রেম প্রবহমান। এই প্রেম তরুণ বয়স আর উচ্ছ্বাসের পুনরাবৃত্তি নয়, পরিণত মানুষের আত্মসমর্পণ। এখানে প্রেম শুধু শরীরের আকর্ষণ নয়, দীর্ঘ সহাবস্থানের গভীর বোধ। নেরুদার ভাষাও এখানে বদলে যায়—চিত্রকল্পে জটিলতার পরিবর্তে কবিতার ভাষা আরও সহজ হয়ে ওঠে। পাঠক বুঝতে পারেন এই সরলতা অর্জিত, সহজ হওয়ার জন্য তাঁকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।

পঞ্চাশের দশকে প্রকাশিত ওদাস এলেমেন্তালেসসহ তিনটি বই নেরুদার আরেক বিস্ময়কর রূপ সামনে নিয়ে আসে। তিনি রান্নায় ব্যবহৃত সবজি টমেটো, পেঁয়াজ, আলু; নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মোজা, চামচ, বই, কাঁচি এমনকি সমুদ্র ও মৌমাছির প্রশস্তি করে কবিতা লিখতে শুরু করেন। আপাতদৃষ্টিতে এই বিষয়গুলো তুচ্ছ মনে হলেও নেরুদার কাছে এসব মানব সভ্যতার ভিত্তি।

জীবনের শেষ পর্বের বইগুলোতে নেরুদা  রাখঢাক না রেখেই আত্মসমালোচনা করেছেন। স্মৃতিসৌধ  (Memorial de Isla Negra) বইটিতে তিনি নিজের জীবন ফিরে ফিরে দেখেছেন। প্রচলিত আত্মজীবনীর মতো স্মৃতির কালানুক্রমিক বিবরণ এখানে নেই। সময় আর জীবনকে পরস্পরের সাথে জুড়েছেন কিছুটা আক্ষেপে। ফিন দেল মুন্দো (Fin del mundo, ১৯৬৯) বইয়ে আত্মসমালোচনার সুর বেশ প্রবল। পৃথিবীও তখন শীতল যুদ্ধ, পারমাণবিক আতঙ্ক আর রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে দাঁড়িয়ে। নেরুদা আশাবাদী কবি হলেও সরল আশাবাদী নন। শেষ দিকের কবিতায় দায়বদ্ধতাই বেশি স্পষ্ট।

এই দীর্ঘ কাব্যযাত্রায় নেরুদা কখনো একই কবি হয়ে থাকেননি। তিনি প্রেম থেকে ইতিহাসে গেছেন, ইতিহাস থেকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ফিরে এসেছেন, শেষে আবার স্মৃতির ভেতর দিয়ে মানবসভ্যতার অর্থ খুঁজেছেন। এজন্য নেরুদা বোধহয় সমানভাবে আজও  প্রাসঙ্গিক।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers