বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ , ১ মুহররম ১৪৪৮

সাহিত্য

অবিনাশী দ্রোহের মহাকাব্য: সুকান্ত এবং এক অক্ষয় যৌবনের বিশ্বজনীন ইশতেহার

বাহাউদ্দিন গোলাপ ১৩ মে , ২০২৬, ১৭:২৫:১৫

498
  • অবিনাশী দ্রোহের মহাকাব্য: সুকান্ত এবং এক অক্ষয় যৌবনের বিশ্বজনীন ইশতেহার

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে যখন বিশ্বজুড়ে আধিপত্যবাদী শক্তির আস্ফালন আর বাংলায় তেতাল্লিশের কঙ্কালসার মন্বন্তর, ঠিক তখনই ধরণীর ধূলিকণায় এক বিদ্রোহের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতার ৪৩ মহিম হালদার স্ট্রিটের মাতুলালয়ে জন্ম নেওয়া সেই শিশুটির নাম রাখা হয়েছিল সুকান্ত। তাঁর পৈতৃক নিবাস গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার উনশিয়া গ্রামে হলেও চেতনার মূল ভূমি ছিল কলকাতার জীর্ণ মেসবাড়ি আর মিছিলের তপ্ত রাজপথ। পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য ছিলেন কলেজ স্ট্রিটের বই ব্যবসায়ী, যাঁর কল্যাণে বর্ণপরিচয়ের আগেই মলাটবদ্ধ ধ্রুপদী জ্ঞানের সাথে কবির সখ্য গড়ে উঠেছিল। জ্যাঠতুতু দিদি রানির স্নেহে আর মনীন্দ্রলাল বসুর জনপ্রিয় উপন্যাস 'রমলা'র সেই আদর্শবাদী অথচ অকালপ্রয়াত নায়ক `সুকান্ত’র নাম ধারণ করে তিনি যখন শৈশবের আঙিনায় পা রাখলেন, তখন থেকেই যেন এক অলিখিত ট্র্যাজেডি তাঁর ললাটে লেপন করা হয়েছিল। সেই কিশোর সুকান্তই পরবর্তীতে রূপান্তরিত হন শোষিত ভারতবর্ষের এক অবিনাশী বজ্রস্বরে।

​সুকান্ত কেবল কবিতার কারিগর ছিলেন না, তিনি ছিলেন নন্দনতত্ত্বের প্রচলিত কাঠামো ভেঙে দেয়া এক আধুনিক রূপকার। ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর তিনি যখন কলকাতা রেডিওর `গল্পদাদুর আসর’-এ নিজস্ব কবিতা পাঠ করেন, তখনই তাঁর প্রতিভার দ্যুতি বিচ্ছুরিত হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সুকান্তের কাব্যিক সত্তার গভীরে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য, কিন্তু তিনি সেই প্রভাবকে রূপান্তরিত করেছিলেন শ্রমজীবী মানুষের নিজস্ব ভাষায়। যখন সমকালীন সাহিত্য রোমান্টিকতার মায়াবী আবহে আচ্ছন্ন, সুকান্ত তখন সাহসের সাথে ঘোষণা করলেন—ক্ষুধার্ত পেটের কাছে পূর্ণিমার চাঁদ কোনো বিমূর্ত সৌন্দর্য নয়, বরং এক টুকরো ঝলসানো রুটি। তাঁর কালজয়ী `হে মহাজীবন’ কবিতায় তিনি শিল্পের এক নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ করলেন:

​“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় / পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি” (কবিতা: হে মহাজীবন)

শিল্প যখন মানুষের মৌলিক চাহিদাকে অস্বীকার করে, তখন তা স্রেফ বিলাসিতায় পরিণত হয়—এই ধ্রুব সত্যটিই ছিল তাঁর কাব্য দর্শনের মূলভিত্তি। তাঁর অমর সৃষ্টি 'রানার' আজ কেবল এক ক্লান্ত ডাকহরকরার জীবনগাথা নয়, বরং আধুনিক যুগের অবিরাম শোষণের এক সমাজতাত্ত্বিক প্রতীক:

“রানার! রানার! / এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে? / রানার! রানার!” (কবিতা: রানার)

তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে সুকান্ত ছিলেন আন্তোনিও গ্রামশি-কথিত এক প্রকৃত ‘অরগানিক ইন্টেলেকচুয়াল’। ১৯৪৪ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ এবং ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ‘কিশোর সভা’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল এক অনন্য ঐতিহাসিক মাইলফলক। তাঁর রাজনৈতিক লড়াই কেবল মিছিলে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছিলেন জাপানি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের এক সক্রিয় সেনানী। পার্টির কঠিন দায়িত্ব পালনে তিনি নিজের স্বাস্থ্যের তোয়াক্কা করেননি; অর্ধাহার, অনাহার আর নির্ঘুম রাত কাটানো ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। যক্ষ্মার প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও তিনি সংগঠনের কাজে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে বেরিয়েছেন। এই আত্মাহুতিই তাঁকে কেবল কবি নয়, বরং মেহনতি মানুষের এক সত্যিকারের সহযোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তাঁর ত্যাগ ছিল আদর্শের জন্য জীবনের নিঃশর্ত আহুতি, যা ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর।

​সুকান্তের সাহিত্যিক প্রতিভা কেবল পদ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর গদ্য সাহিত্য ও ব্যক্তিগত চিঠিপত্র ছিল চিন্তার স্বচ্ছতা ও যুক্তিবাদের এক অনন্য দলিল। বিশেষ করে তাঁর বন্ধু ও আত্মীয়দের লেখা চিঠিগুলোতে ফুটে ওঠে এক অতি সংবেদনশীল মানুষের জীবন-জিজ্ঞাসা। তাঁর ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ শীর্ষক প্রবন্ধটি পাঠ করলে বিস্মিত হতে হয় যে, শিল্পের ব্যাকরণ ও প্রয়োগ নিয়ে তাঁর চিন্তা কতটা পরিণত ছিল। তিনি কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দিয়ে সমাজব্যবস্থার অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরেছেন। গীতিনাট্য ‘রাখাল ছেলে’ লোকজ সুর ও আধুনিক চেতনার এক অনন্য সংমিশ্রণ। মঞ্চে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ও নাট্যভাবনা প্রমাণ করে যে, তিনি শিল্পের প্রতিটি মাধ্যমকে শোষিত মানুষের জাগরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালের ভয়াবহ মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে তাঁর সম্পাদিত ‘আকাল’ সংকলনটি ছিল সেই সময়ের বিমূর্ত হাহাকারের এক মূর্ত ঐতিহাসিক দলিল।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সুকান্তের অবস্থান স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা কিংবা ফরাসি কবি আর্তুর র‍্যাঁবোর সমান্তরালে। লোরকার মতো সুকান্তও বিশ্বাস করতেন যে, শিল্পীকে অবশ্যই মানুষের অধিকার আদায়ের ময়দানে থাকতে হবে। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সেই রক্তিল প্রেক্ষাপটে তাঁর ‘দুর্মর’ কবিতাটি আজও যেকোনো অবরুদ্ধ জাতির আত্মমর্যাদার এক বিশ্বজনীন ইশতেহার:

​“সাবাস, বাংলা দেশ! এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়: / জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়” (কবিতা: দুর্মর)

অনাগত প্রজন্মের জন্য 'ছাড়পত্র' কবিতায় তাঁর সেই পবিত্র অঙ্গীকার ছিল মানবিকতার এক চিরকালীন সনদ:

“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি / নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার” (কবিতা: ছাড়পত্র)

সুকান্তের কাব্যশৈলীর অন্যতম শক্তি ছিল তাঁর অটল আত্মবিশ্বাস। তিনি তারুণ্যকে দেখেছিলেন সব জরা ও বাধা অতিক্রম করার এক দুর্জয় শক্তি হিসেবে। আঠারো বছর বয়সকে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার গণ্ডিতে না রেখে একে স্পর্ধা ও আত্মবলিদানের এক অনির্বাণ প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করেছেন:

​“আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ / স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি” (কবিতা: আঠারো বছর বয়স)

১৯৪৫ সালে ছাত্র আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে রাজপথ কাঁপানো এই কিশোর রাজনীতির নিবিড় সংশ্রবে থাকায় প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলেও, জীবনের লড়াইয়ে তিনি হয়েছিলেন সর্বোচ্চ মেধার অধিকারী। তাঁর জন্য রাজনীতি কোনো বিলাসিতা ছিল না, ছিল যাপিত জীবনের অংশ। একটি সাধারণ দেশলাই কাঠির রূপকেও তিনি শোষিতের সংহতিকে এক অগ্নিগর্ভ রূপ দান করেছেন:

“আমি একটা ছোট দেশলাই কাঠি / ... সামান্য একটু ঘষায় / জ্বলে উঠবো দাউদাউ করে—” (কবিতা: দেশলাই কাঠি)

 

১৯৪৬ সালের শেষ দিকে যখন কবির শরীর ক্রমশ যক্ষ্মার কাছে হার মানছিল, তখনও তাঁর কলম ও রাজনৈতিক আদর্শ ছিল অবিচল। অবশেষে ১৯৪৭ সালের ১৩ মে কলকাতার ১১৯ লাউডন স্ট্রিটের রেড এড কিওর হোমে মাত্র একুশ বছর বয়সে এই মহাপ্রাণ কবির জাগতিক নির্বাপণ ঘটেছিল। আজ ২০২৬ সালের এই মে-র অপরাহ্নে তাঁর ৭৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি হয় যে, তাঁর এই অকালমৃত্যু ছিল মূলত শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে এক চরম আত্মবিসর্জন। মৃত্যুর পর প্রকাশিত তাঁর কাব্যগ্রন্থসমূহ—ছাড়পত্র, পূর্বাভাস, মিঠে-কড়া, অভিযান, হরতাল—বাংলা সাহিত্যের চিরাচরিত মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

সুকান্ত ভট্টাচার্য কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অবিনাশী চেতনার মানচিত্র। তাঁর প্রয়াণ মানে মহাকাব্যের শেষ নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের সূত্রপাত। যক্ষ্মার করাল গ্রাস তাঁর দেহকে স্তব্ধ করলেও তাঁর কণ্ঠস্বরকে করতে পারেনি। আজকের এই যান্ত্রিক সভ্যতায়, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর পুঁজিবাদের করাল ছায়ায় মানবিকতা ম্রিয়মাণ, সেখানে সুকান্তের ‘দেশলাই কাঠি’ আজও এক প্রচণ্ড সম্ভাবনার আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে। তিনি ছিলেন সেই প্রমিথিউস, যিনি স্বর্গ থেকে আগুন এনেছিলেন মর্ত্যের লাঞ্ছিত মানুষের জঠর জ্বালা মেটাতে। যতক্ষণ এই পৃথিবীতে বৈষম্যের মেঘ জমাট বাঁধবে, যতক্ষণ একটি শিশুও অধিকারহীন অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হবে, ততক্ষণ সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রাসঙ্গিক থাকবেন। তিনি কোনো জাদুঘরের নির্বাক প্রদর্শনী নন, বরং প্রতিটি ন্যায়ের মিছিলে উড়তে থাকা এক রক্তিম পতাকা; আমাদের প্রতিটি লড়াইয়ের অগ্রভাগে এক অবিনাশী পথপ্রদর্শক ও চিরকিশোর সেনাপতি।

লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers