সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২২ জিলহজ ১৪৪৭

সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথ ও সমকালীন বিজ্ঞান

জিললুর রহমান ৯ মে , ২০২৬, ১৫:৪৪:২২

224
  • সংগৃহীত

শিষ্য নিলস বোরের সাথে বিতর্ক চলমান সময়কালে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন একদিন চাঁদের দিকে তাকিয়ে পদার্থবিজ্ঞানী আব্রাহাম পাইসকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, "তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো, যখন আমরা চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি না, তখন সেটি সেখানে থাকে না?" অর্থাৎ নিলস বোর যেমনটি মনে করতেন তা হলো, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের 'কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা' অনুযায়ী, কোনো বস্তু বা কণা কোন্ অবস্থায় আছে তা আমরা পর্যবেক্ষণ না করা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব না। পর্যবেক্ষণের পূর্ব পর্যন্ত সেটি একাধিক সম্ভাব্য অবস্থায় বা অবস্থানে থাকতে পারে। আইনস্টাইন এই থিয়োরি একেবারেই মেনে নিতে পারেননি। তিনি মনে করতেন, বাস্তবতা আমাদের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করে না। চাঁদ কেউ দেখুক বা না দেখুক, তার নির্দিষ্ট অবস্থান এবং অস্তিত্ব সকল সময়েই আছে।

আইনস্টাইন ছিলেন 'বাস্তববাদী'। তিনি বিশ্বাস করতেন পৃথিবী আমাদের চেতনার বাইরে এক বস্তুনিষ্ঠ সত্য। কিন্তু বোর মনে করতেন 'পর্যবেক্ষক' এবং 'পর্যবেক্ষণকৃত বস্তু' পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না। আমাদের পরিমাপ বা দেখার ধরনই নির্ধারণ করে দিচ্ছে আমরা প্রকৃতিকে কিরকম ভাবে দেখবো।

তাই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বিতর্কের একটি প্রধান দ্বন্দ্ব হলো ক্লাসিক্যাল ফিজিক্স বনাম কোয়ান্টাম ফিজিক্স। আইনস্টাইন আজীবন চেষ্টা করেছেন প্রমাণ করতে যে, "আমি না থাকলেও পৃথিবী (বা চাঁদ) ঠিকই থাকবে"—কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অদ্ভূত সব নিয়ম আজও বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলে।  কারণ একজন কালার-ব্লাইন্ড কখনো পান্না সবুজ কিংবা চুনি লাল কিনা তা জানতে পারে না। এটা যে দেখে, তার চোখের ভেতর দিয়ে মস্তিষ্কের কোষে সৃষ্টি হওয়া স্বরূপটাই সে দেখতে পায়। যেমন গরু আংশিক কালার ব্লাইন্ড। গরু লাল রঙ আলাদাভাবে চিনতে পারে না। তাদের কাছে লাল রঙ অনেকটা ধূসর বা কালচে দেখায়। তাহলে চুনি'র রং মানুষ লাল দেখলেও গরু তা ধুসর বা কালচে দেখে।

এখানেই রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন অনন্য সাধারণ। এই সব সমসাময়িক বিজ্ঞান-বিতর্ক বিষয়ে সকল তথ্য তিনি নিয়মিত অবহিত থাকতেন। এমন একটা সময়েই তিনি লিখেছিলেন :

"আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ,

চুনী উঠলো রাঙা হয়ে।

আমি চোখ মেললুম আকাশে,

জ্বলে উঠল আলো

পুবে পশ্চিমে।

গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম 'সুন্দর',

সুন্দর হল সে।"

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শ্যামলী' কাব্যগ্রন্থের 'আমি' শীর্ষক কবিতাটি আইনস্টাইন ও নিলস বোরের বিতর্কের সাথে দারুণভাবে মেলে। ১৯৩০ সালে আইনস্টাইনের সাথে রবীন্দ্রনাথের যখন দেখা হয়েছিল, তখন তাঁদের আলাপচারিতার মূল বিষয়ও ছিল এই "বাস্তবতা বনাম চেতনা"। এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়েছেন যে, এই

মহাবিশ্ব আমাদের চেতনার মাধ্যমেই অর্থবহ হয়ে ওঠে। আমি দেখলাম বলেই আমি জানতে পারলাম গোলাপ সুন্দর। এই মহাবিশ্বের সৌন্দর্য বা গুণাবলি (যেমন-রঙ বা রূপ) আমাদের দেখার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। যদি দেখার মতো কোনো চোখ বা অনুভব করার মতো কোনো মন না থাকে, তবে ঐ পান্নার 'সবুজ' রঙের কোনো অস্তিত্বই থাকে না।

আইনস্টাইন বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্ব মানুষের চেতনা ছাড়াও স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অনেকটা 'কোয়ান্টাম মেকানিক্স'-এর পর্যবেক্ষকের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তাঁর বিশ্বাস প্রকাশ করলেন, যেমন কোয়ান্টাম ফিজিক্সের চিন্তা অনুসারে মানুষের চেতনা এবং মহাবিশ্ব একে অপরের পরিপূরক।

আমি মরে গেলে পৃথিবী থাকবে কি না যদি জানতে চাই, তবে রবীন্দ্রনাথ এই কবিতায় তার একটি নিগূঢ় উত্তর দিয়ে গিয়েছেন। পৃথিবী হয়তোবা জড়বস্তু হিসেবে অজ্ঞাত কাল ধরে টিকে থাকবে, কিন্তু 'সবুজ' পান্না অথবা 'সুন্দর' গোলাপের মাধুর্য যা মানুষ অনুভব করে, তা চেতনার বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই বিলীন হয়ে যাবে।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

 

নিউজজি/এস আর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers