বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২ , ২ রমজান ১৪৪৭

সাহিত্য

আহমদ ছফার ‘গাভী বিত্তান্ত’: বুদ্ধিবৃত্তিক নপুংসকতার এক নির্দয় ইশতেহার

বাহাউদ্দিন গোলাপ ২৩ জানুয়ারি , ২০২৬, ১৬:৩৯:৩৯

9K
  • আহমদ ছফার ‘গাভী বিত্তান্ত’: বুদ্ধিবৃত্তিক নপুংসকতার এক নির্দয় ইশতেহার

বাংলা সাহিত্যের আকাশে আহমদ ছফা কোনো মিঠে রোদ নন, তিনি এক দহনকারী মধ্যাহ্ন। তিনি ছিলেন আমাদের চিন্তার জগতের এক একনিষ্ঠ সত্যসন্ধানী বুদ্ধিজীবী, যিনি পাণ্ডিত্যের ছদ্মবেশে নিজেকে আড়াল করেননি। ছফার দর্শন ছিল আপসহীন—তিনি জানতেন, চাটুকারিতার মাধ্যমে অর্জিত বিদ্যা আসলে এক প্রকার আত্মিক নপুংসকতা। তাঁর গদ্যে মেকি অলংকার নেই, আছে সত্যের শাণিত ছুরি। যখন পচন মজ্জায় পৌঁছায়, তখন মোলায়েম ভাষা আসলে এক প্রকার শৈল্পিক ভণ্ডামি; তাই তিনি ‘গোবর’, ‘বিষ্ঠা’ আর ‘যোনিদ্বারের’ মতো রুক্ষ শব্দে সমাজকে এক প্রকার অ্যাসিড বাথ করিয়েছেন। জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’ যেমন রাজনৈতিক ভণ্ডামির রূপক, ছফার ‘গাভী বিত্তান্ত’ তেমনি আমাদের মেধার মন্দিরে ঢুকে পড়া এক দুর্গন্ধময় গোয়ালঘরের উপাখ্যান।

​উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র উপাচার্য আবু জুনায়েদ কেবল একজন সুবিধাবাদী নন, তিনি আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের হীনম্মন্যতার এক কদর্য প্রতিচ্ছবি। কান্ট বা হেগেল পড়ানো একজন অধ্যাপক যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন হয়েও সেমিনার রুম ছেড়ে গাভীর যোনিদ্বার তদারকিতেই জীবনের সার্থকতা খোঁজেন, তখন সেই পতন কেবল একজন ব্যক্তির নয়, বরং একটি শিক্ষিত মস্তিকের নর্দমায় পরিণত হওয়ার বিলাপ। আবু জুনায়েদ পরিস্থিতির চাপে পশুর সেবক হননি, বরং উপাচার্য পদের হালুয়া-রুটি আর গদি রক্ষার লোভে স্বেচ্ছায় মেরুদণ্ড বিসর্জন দিয়েছেন। এটি কেবল চারিত্রিক বিচ্যুতি নয়, বরং এটি একটি জাতির সাথে চরম জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্বাসঘাতকতা (Epistemological Betrayal)। তিনি তাঁর তথাকথিত ‘সরলতা’কে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা এক চতুর ভণ্ড। যেখানে মেরুদণ্ড একটি বিলাসিতা, সেখানে চাটুকারিতাই আজ টিকে থাকার একমাত্র নগ্ন ব্যাকরণ।

​ছফা এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নগ্ন দলীয় লেজুড়বৃত্তিকেও ব্যবচ্ছেদ করেছেন। উচ্চশিক্ষার স্বায়ত্তশাসন যখন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে গিয়ে মাথা কুটে মরে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় একটি রাজনৈতিক ক্লাবে পরিণত হয়। উপাচার্য আবু জুনায়েদ যখন একটি গরুর চিকিৎসার্থে সরকারের আমলাতন্ত্রের দরজায় দরজায় ধরনা দেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই তথাকথিত স্বায়ত্তশাসিত গরিমা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। এখানে ফুটে ওঠে এক বিভীষিকাময় প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকারের বিকৃতি। যেখানে লাইব্রেরি বা ল্যাবরেটরির উন্নয়নের চেয়ে উপাচার্যের কাছে একটি গাভীর স্বাস্থ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে প্রজ্ঞার কফিন তৈরি হতে সময় লাগে না। এই বিদেশি গাভীটি আসলে সেই নব্য-উপনিবেশবাদী রাজনীতির প্রতীক, যা আমাদের জাতীয় প্রজ্ঞাকে চিবিয়ে খাচ্ছে। আমরা আজ মেধার চাষ ছেড়ে প্রজেক্ট-বিলাসিতায় মত্ত হওয়া এক বিশাল রাষ্ট্রীয় খামারে বাস করছি।

​আবু জুনায়েদের এই পতন কেবল প্রশাসনিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও বটে। উপাচার্য ভবনের অন্দরমহলে তাঁর স্ত্রীর পরকীয়া কেবল একটি নৈতিক বিচ্যুতি নয়; এটি আবু জুনায়েদের ইন্টেলেকচুয়াল ইমপোটেন্সি বা বুদ্ধিবৃত্তিক ধ্বজভঙ্গের বিরুদ্ধে এক অবধারিত জৈবিক উপহাস। উপাচার্য যখন বাইরে ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করেন, ঘরেও তিনি তাঁর অস্তিত্বের সার্বভৌমত্ব হারান। স্বামীর নপুংসক চাটুকারিতার বিপরীতে স্ত্রীর এই বিদ্রোহী শরীর মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত সিস্টেমের মুখে এক চরম চপেটাঘাত—যা প্রমাণ করে যে, নৈতিক পরাজয় শরীরকেও পঙ্গু করে দেয়। আবু জুনায়েদ যখন পশুর বংশলতিকা উদ্ধার করতে সক্ষম হন অথচ নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেন, তখন তা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার শেষ সীমানা হিসেবে উন্মোচিত হয়।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ‘গাভী বিত্তান্ত’ পড়া মানে নিজেরই নগ্ন প্রতিবিম্বের মুখোমুখি হওয়া। ছফার এই নির্দয় ব্যবচ্ছেদ কেবল ধ্বংসের জন্য নয়; এটি একটি ‘সৃজনশীল ধ্বংস’। তিনি চেয়েছিলেন পাঠক আবু জুনায়েদের আয়নায় নিজের কুৎসিত চেহারা দেখে লজ্জিত হোক। এই ‘লজ্জার রাজনীতিই’ ছফার মূল অস্ত্র। তবে এই পতনের দায় কেবল আবু জুনায়েদদের নয়, বরং আমাদের এই যৌথ নীরবতারও; যারা আমরা প্রতিদিন উচ্চশিক্ষার এই মৃত্যু দেখেও নির্বিকার দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে ঘাস চিবুচ্ছি। আজ যখন দেখি মেধাবীরা উচ্ছিষ্ট ভোগের মিছিলে শামিল হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে সেই বিদেশি গাভীটি আজও বিদ্যাপীঠের ঘাস খেয়ে ওলান ভারী করছে। আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা আজ সৃজনশীলতার বদলে ক্ষমতার এঁটো নিয়ে স্রেফ জাবর কাটা প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। ছফার এই দূরদৃষ্টি আজ আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের বিরুদ্ধে এক নান্দনিক ও রূঢ় আর্তনাদ।

পরিশেষে বলা যায়, ‘গাভী বিত্তান্ত’ লৈঙ্গিক রাজনীতি এবং মেধা বিক্রির এক নির্মোহ ময়নাতদন্ত যেখানে আহমদ ছফা একইসাথে তদন্তকারী এবং জল্লাদ। আজ কয়েক দশক পরেও দৃশ্যটি একই রয়ে গেছে—উপাচার্যরা আজও সেই বিদেশি গাভীর ওলানের দিকে তাকিয়ে আছেন, আর পেছনে ধসে পড়ছে একটি জাতির মেরুদণ্ড। ‘গাভী বিত্তান্ত’ পড়ার পর আয়নার সামনে দাঁড়ালে প্রতিটি বুদ্ধিবৃত্তিক চাটুকারের নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—তিনি কি একজন জ্ঞানসাধক, নাকি ক্ষমতার গোয়ালঘরে স্রেফ একজন রোমন্থনকারী গৃহপালিত প্রাণী? উত্তরটি আপনি জানেন, কিন্তু এই পচা দুর্গন্ধযুক্ত সত্য স্বীকার করার সাহস কি আপনার আছে?

লেখক: কলামিস্ট, সংস্কৃতি কর্মী।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন