রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২ , ২৯ রজব ১৪৪৭

সাহিত্য

বিদায় সুকুমার বড়ুয়া, ছড়ার জাদুকর

মাঈনুদ্দীন দুলাল ৩ জানুয়ারি , ২০২৬, ১৮:০০:৪১

244
  • বিদায় সুকুমার বড়ুয়া, ছড়ার জাদুকর

"সুকুমার বড়ুয়া। তাকে নান অভিধায় ভূষিত করা হয়। বলা হয়, ছড়া সম্রাট, ছড়ার রাজা, ছাড়ার জাদুকর, ছড়ার রাজপুত্র। যে বিশেষণে সম্মানিত করা হোক। তিনি বাংলা ছড়া সাহিত্যে অনিবার্য নাম ও কীর্তি। গত ২ জানুয়ারি তিনি পৃথিবীর আলো-বাতাসকে বিদায় জানালেন।শ্রদ্ধার্ঘ তার জন্যে।

সুকুমার বড়ুয়াকে উপাধি দেয়া হয়েছে  ছড়া সম্রাট। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার রায়, অন্নদাশংকর রায়, শিবরাম চক্রবর্তীদের উত্তরসুরী তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামেরও রয়েছে উল্লেখযোগ্য কিছু ছড়া। সুকুমার বড়ুয়া সাহিত্যের এই শাখাতেই আজীবন কাজ করেছেন।

 তার ছড়ার বিষয়-বৈচিত্র্য, সরস উপস্থাপনা, ছন্দ ও অন্তমিলের অপূর্ব সমন্বয় তার ছড়াকে করেছে স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত। প্রাঞ্জল ভাষায় আটপৌরে বিষয়কেও তিনি ছড়ায় ভিন্নমাত্রা দেন। তার ছড়া একাধারে বুদ্ধিদীপ্ত, তীক্ষ্ণ , শাণিত আবার কোমলও বটে। যেমন মাথায় টোকা দেয়। তেমন সুবাতাস বয় হৃদয়ে। তোলে হাসির হিল্লোলও।

ছড়া বাংলা সাহিত্যের একটি প্রাচীন শাখা। সাহিত্যের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ছড়ার বিকাশ ও উৎকর্ষও ঘটেছে। প্রাচীনকালে সাহিত্য রচিত হতো মুখে মুখে আর ছড়াই  ছিল সাহিত্যের প্রথম প্রকাশ এবং ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। সত্য প্রকাশে কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ছড়াকাররা সচেষ্ট ছিলেন। বাংলায় দীর্ঘকাল ধরে ‘ছেলে ভোলানো ছড়া’, ‘ঘুম পাড়া নিয়া ছড়া’ ইত্যাদি ছড়া প্রচলিত আছে।

বাংলাদেশের যে কয়েকজন ছড়াশিল্পী বিশেষ বুৎপত্তি ও খ্যাতি  অর্জন করেছেন, তাদের অন্যতম ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া। তার ব্যক্তি জীবন সংগ্রাম ও যাপনের দিকে তাকালে বোঝা যাবে আমাদের ব্রাত্যজন, সাধারণ মানুষের জীবন যাপন, সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনের নানান অনুষঙ্গ তিনি গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। প্রাণঞ্জল ও সরস ভাষা ও ভঙ্গিতে প্রকাশ করেছেন।

খুব কম বয়স থেকেই সুকুমার বড়ুয়া বিভিন্ন সময়ে জীবনের প্রয়োজনে নানান পেশার কাজ করেছেন। একসময় তিনি চানাচুর, আইসক্রিম, বুটবাদাম, ফলমূল ইত্যাদি ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরে তিনি ঢাকায় চলে আসেন ১৯৬০ সালে। ১৯৬২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে পদোন্নতি পেয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৯৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টোর কিপার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ছড়ার প্রতি তার প্রেম ও দরদ নিয়ে একটি ঘটনা উল্লেখ করি।

চট্টগ্রামে ধ্বনি আবৃত্তি সংগঠন ৩ দিন ব্যাপী এক আবৃত্তি উৎসবের আয়োজন করে। ওখানে কবি শামসুর রাহমান, কবি মহাদেব সাহা,নির্মলেন্দু গুণ,আবৃত্তিকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, কাজী আরিফ, শিমুল মোস্তফা, ইস্তেকবাল হোসেন আমন্ত্রিত।এত বড় অনুষ্ঠানে ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া না থাকলে চলে? তার ছড়া আবৃত্তির অনুষ্ঠানে অনিবার্য। তাকেও নিমন্ত্রণ জানানো হল। তিনি ঢাকা থেকে যাবেন। বাসে তার টিকেট কাটা হয়েছে। কিন্তু কাউন্টারে টিকেট পেতে দেরী হচ্ছে। তিনি বারবার আয়োজকদের ফোন করে অস্থির করে ফেলছেন। অবশেষে এলেন।  এত অস্থিরতার কারণ জানতে চাইলে শিশুর সারল্যে বল্লেন, এতএত বড় কবি, আবৃত্তিকারদের মিলন মেলায় ছড়াকার না থাকলে কেমন হয়? ছড়ার প্রতিনিধি থাকতে হবে। নতুন লেখা ৫টি ছড়াও নিয়ে এসেছেন। ছড়ার প্রতি এমনই ভালোবাসা ছিল তার।

জীবন ঘনিষ্ট এই ছড়াকারের দুটো ছড়ার অংশ বিশেষ পড়লে বুঝতে পারব স্বপ্ন ও বাস্তবতা নিয়ে তার ভাবনা।

১."এমন যদি হতো

ইচ্ছে হলে আমি হতাম প্রজাপতির মতো।

নানান রঙের ফুলের পরে

বসে যেতাম চুপটি করে

খেয়াল মতো নানান ফুলের সুবাস নিতাম কতো।"

 

২." খাদ্যে ভেজাল পথ্যে ভেজাল

ভেজাল শখের জিনিসে,

চলছে ভেজাল দিল্লি-ঢাকা

বিলেত-জাপান-ভিনিসে।

ভেজাল কত রইল মিশে

মানুষজনের চরিত্রে,

অমনি শাদা, অমনি কালো,

অমনি কেন হরিৎ-রে?

হিংসাতেও ভেজাল থাকে

নইলে আবার মিলে যে,

স্নেহের ভেজাল ধরতে পারি

কানমলা-চড় কিলে যে।"

গত ২ জানুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে সুকুমার বড়ুয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। মৃত অনিবার্য। অবশ্যম্ভাবীকেই আলিঙ্গন করলেন। তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পদকসহ বিভিন্ন পুরষ্কার বোগলদাবা করেছন।

 

 

লেখক: সাংবাদিক

বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন