বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১ , ৮ শাওয়াল ১৪৪৫

সাহিত্য

একা এবং একাকিত্ব: নশ্বর জগতে অবিনশ্বর পথচলা

অঞ্জন আচার্য ১ এপ্রিল , ২০২৪, ১১:৪৪:৫২

141
  • একা এবং একাকিত্ব: নশ্বর জগতে অবিনশ্বর পথচলা

অনেক দিন আগে ইংরেজিতে একটি উক্তি পড়েছিলাম, “I never feel alone because loneliness is always with me.” যার বাংলায়ন করলে দাঁড়ায়, “আমি কখনো নিঃসঙ্গ হই না। কেননা, নিঃসঙ্গতা সবসময় আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকে।” কথাটি কার, জানা নেই। তবে উক্তিটি আজ খুব করে মনে পড়ছে একটি বই পড়ে। কবিতার বই। কবি মাহবুব সাঈদ মামুন। বইয়ের নাম ‘একা এবং একাকিত্ব’। এ বইয়ের ফ্ল্যাপের অংশটি তুলে ধরলে আশা করি পাঠকদের খানিকটা সুবিধা হবে, কেন এই একাকিত্ব ভর করেছে আমার ওপর: “মানবজীবন কী? কেনই বা এত আয়োজন? চূড়ান্ত অর্থে আদৌ কি এর কোনো মানে আছে? নাকি সবই ক্ষণিকের আসা আর যাওয়া? মহাবিশ্বের অনুপাতে মানুষ নগণ্য কণার সমানও নয়। তারপরেও মানুষ সম্পর্ক গড়ে মানুষের সঙ্গে। গড়ে ওঠে প্রেম-ভালোবাসার জটিল সমীকরণ। সেই সম্পর্ক মানুষকে নিয়ে যায় এক স্বপ্নের জগতে। স্বপ্নের মাঝেও প্রতিনিয়ত চলে ভাঙা ও গড়ার খেলা। এভাবেই নিয়ত নির্মাণ ও ধ্বংসের ভেতর দিয়ে জাগতিক সব কিছু বয়ে যায়, একসময় ক্ষয়ে যায়। ক্ষণিকের দর্শক হয়ে সেগুলো দেখে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না কারও। এ বইটিতে অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি কবিতাই এই দর্শনের আলোকে লেখা। সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম— এই ব্রত নিয়ে কবি লিখে গেছেন তাঁর প্রতিটি কবিতা।” 

কবি মাহবুব সাঈদ মামুনের এই কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৭৩টি কবিতা। আপাতদৃষ্টিতে প্রতিটি কবিতারই আকৃতি ও প্রকৃতি আলাদা। তবে তার অন্তর্নিহিত ভাবার্থ এক—‘একাকিত্ব’। শুরুর কবিতা ‘অবিনশ্বর’-এ কবি লিখছেন, “লিখি, শব্দের পর শব্দ/ লিখে কী হয় জানি না।/ শব্দের রাজ্য মাথায়/ দিগ্‌বিদিক উড়ে বেড়ায়/ যেন আকাশের সাদা-কালো মেঘ,/ শ্রাবণের বৃষ্টি/ ক্ষণকাল পর তার রেশ থাকে না।” এইটুকুতে শেষ হলে একটা সিদ্ধান্তে আসা যেত বৈকি! কিন্তু সেই কবিতাই তিনি শেষ করলেন এভাবে: “আমি মহাকালের অন্ধকারে ভেসে বেড়াই/ যার কোনো শুরু নেই, আবার শেষও নেই।/ সময়ের স্রোতে আমি তাই অবিনশ্বর।” নিজেকে অবিনশ্বর ঘোষণা করা কে এই কবি? খানিকটা জানা যাক তাঁর সম্পর্কে: “মাহবুব সাঈদ মামুন। জীবনকে নিংড়ে দেখা একজন মানুষ। জীবনের জটিল সব সমীকরণের হিসাব কষে নিজেকে আজ এ জায়গা দাঁড় করিয়েছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিচিত্র মানুষ ও প্রকৃতিকে দেখেছেন তিনি নিবিড়ভাবে। পুরোদস্তুর জ্ঞানচর্চায় ব্রতী তিনি। প্রিয় বিষয় দর্শন ও বিজ্ঞান। যাপিত জীবনের সব কিছু বিশ্লেষণ করেন নিজস্ব দর্শনের আলোকে। ভালোবাসতে ভালোবাসেন। মানুষকে আপন করে নেওয়ার সহজাত প্রবৃত্তি আছে তাঁর। যে হৃদয় প্রেমহীন, সেই হৃদয় কবির হতে পারে না— এমন ভাবনাই তাঁকে তাড়িত করে প্রতিনিয়ত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থটি কবির প্রথম বই।”

২.

প্রতিটি কবিতার নিচেই আছে তার সাল-তারিখ। সেই সূত্রে অনায়াসেই বোঝা যায়, কবি লিখছেন দীর্ঘ দিন ধরেই। কিন্তু নিভৃতচারী বলেই হয়তো এত দিন কবি তাঁর সত্তাকে আত্মগোপানে রেখেছেন। নইলে এটাই কেন হবে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ? 

‘একলা আকাশ’ ছবিটির সেই গানটিও গুনগুন করে কানে বাজছে: “আমার একলা আকাশ থমকে গেছে রাতের স্রোতে ভেসে, শুধু তোমায় ভালবেসে”। কেন বাজছে সেটা বলি: 

“হাবুডুবু খায় মন/ অনবরত বেদনায়/ ছটফট করে সারাক্ষণ,/ চুরমার হয় ভেঙে/ যেন অযুত-নিযুত কাচখণ্ড,/ আজীবন বেদনার করুণ সুর বেজে ওঠে প্রাণে।” [বেদনা-সুখের বালুচরে] 

এই পঙ্‌ক্তিগুলো পড়ে কোথায় যেন আর্তনাদ শুনতে পাওয়া যায়। 

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র সেই বিখ্যাত কবিতার লাইন: “চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়—বিচ্ছেদ নয়/ চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী/ চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে/ আমার না-থাকাজুড়ে।” এই না-থাকাজুড়ে থাকার অনুভূতি লিপিবদ্ধ হয় কবি মাহবুব সাঈদের ‘মৃত্যুর ছায়া এবং বিদায় ২০২২ সাল’ কবিতায়। কবি লিখছেন: গত হয়েছে আজই আমারই স্বজন, চাচাতো ভাই আহমদউল্ল্যা, মাত্র ৬১ বছর বয়সে,/ তার সাথে আমার কত স্মৃতি, কত স্মরণ!/... কী আজব ব্যাপার, কাল রাতেও তার কথা মনে হয়েছে,/ তার কথা প্রায়ই মনে হতো আমার/ ...কোথায় জানি তার প্রতি ভীষণ শর্তহীন উষ্ণ মমতা ছিল আমার আজীবন।/ কেন এমন হতো?” নিজেকেই প্রশ্ন করে উত্তর খুঁজছেন কবি। উত্তর মেলেছে কি না জানি না। কেবল জানি, ‘চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়’।  

কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, “পৃথিবী একটি নিষ্ঠুর জায়গা, এবং আমি তার অসহায় শিকার।” সেই শিকারে বিদ্ধ কবি লিখছেন, “মূল্য নেই মূলত কোনো কিছুরই/ হোক সেটা জীবন, জগৎ বা মহাবিশ্ব। মহা অন্ধকার মহাবিশ্বের/ মূল্য নির্ধারণ করে শেষত/ কসমোলজির অনন্ত তারা-নক্ষত্ররা/ যারা ডুবে আর ভাসে মাল্টিভার্সের অনন্ততায়।” [মূল্যহীন মুল্লুক]

৩.

মার্কিন সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও দার্শনিক রালফ ওয়ালডো এমারসন যথার্থই বলেছিলেন, “পথ যেদিকে নিয়ে যায় সেদিকেই যেও না। যেদিকে কোনো পথ নেই, সেদিকে হাঁটো এবং নিজের চিহ্ন রেখে যাও।” এই দর্শন যে কবি লালন করে তা তাঁর ‘উড়তে থাকা বালক’ কবিতাটি পড়লেই বোঝা যায় :

দুচোখ জেগে থাকে স্বপ্নের গহিনে

দুরন্তের মেঠো পথে হেঁটে যায় বালক

বাধা অতিক্রম করে সব অসম্ভবের

অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে—

অবিরাম চলতে থাকে বালক

এ-গাঁ থেকে ও-গাঁয়ে

শহর থেকে শহরে 

বন্দর থেকে বন্দরে

দেশ থেকে দেশান্তরে 

পৃথিবীর পথে পথে।” 

সেই সঙ্গে আমরাও পথ চলি উড়ন্ত বালকের ডানায় চড়ে। 

চার্লি চ্যাপলিনের বিখ্যাত সেই উক্তি হয়তো অনেকের জানা: ‘কাছ থেকে দেখলে জীবন হচ্ছে ট্র্যাজিডি, কিন্তু দূর থেকে দেখলে সেটা কমেডি।’ সম্ভবত কবি মাহবুব সাঈদও সেটা মনে করেন। ‘বিক্ষিপ্ত মন, স্মৃতিহীন স্মৃতি’ কবিতায় তিনি লিখছেন :

খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘ যেন সাদা কাশফুল,

ভেসে বেড়ায় আকাশের পরম শূন্যতায়।

মেলে না মনের হদিস,

মেলে না হদিস পথের এ-মাথা থেকে ও-মাথায়

এ-কোনা থেকে অন্য কোনায় 

এ-চিহ্ন থেকে ও-চিহ্নের মাঝে,

এ-কথা থেকে ও-কথায়

এ-মানুষ থেকে ও-মানুষে।

গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাসের ভাষায়, “তোমার যা আছে তা কখনো অপচয় করো না। মনে রেখো, তোমার এখন যা আছে, তা একসময়ে তোমার স্বপ্ন ছিল।” সেই স্বপ্নের আলোকে মাহবুব মামুন লিখছেন, থেমে যাওয়ার নাম জীবন নয়, জীবনের কথা নয়/ কবির মনে এত এত সীমাহীন কথামালা জমে থাকে/ যেন অনন্ত আকাশের তারাপুঞ্জ।” [কবিতার কবি অথবা কবির কবিতা]

জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘শরীর রয়েছে, তবু মরে গেছে আমাদের মন!/ হেমন্ত আসেনি মাঠে ,—হলুদ পাতায় ভরে হৃদয়ের বন!।’ অন্যদিকে কবি মামুন লিখছেন, “মন-প্রাণ, প্রাণের আকুতি, ভাবের মিলন থেমে গেছে/ তাই হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে ভালোবাসারা।” [হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে ভালোবাসারা] 

কিংবা ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতায় যেমন জীবনানন্দ লিখেছেন: “আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত রাত্রিটিরে ভালো,/ খড়ের চালের পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার:/ পুরোনো পেঁচার ঘ্রাণ; অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো!/ বুঝেছি শীতের রাত অপরূপ, মাঠে-মাঠে ডানা ভাসাবার/ গভীর আহ্লাদে ভরা; অশথের ডালে-ডালে ডাকিয়াছে বক;/ আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এই সব নিভৃত কুহক।” তেমনই কবি মাহবুব সাঈদ মামুন লিখছেন: 

“ভালোবাসা আর ঘৃণার হাত ধরাধরি 

খুঁজে মরে আজীবন ভালোবাসার মানুষ। 

আঘাতে আঘাতে জীবন ক্ষত-বিক্ষত

সেই কবে, কতকাল আগে...”

কবির ‘ঝরে পড়ে’ কবিতাটি পড়লে মনে পড়ে যায় হুমায়ুন আজাদের ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’ বইটির কথা। কেন মনে পড়লো, সেটাই তুলে ধরছি:

সবকিছু ঝরে পড়ে 

গাছের পাতারা ঝরে পড়ে কালবৈশাখীর হাওয়ায়

ঝরে পড়ে ফুল, লতাপাতা, আম-জাম, বনবনাদি 

প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে।

ভেঙে চুরমার নিশ্চিহ্ন হয় গ্রাম-শহর,

মজবুত ঘরবাড়ি, দালানকোঠা 

প্রচণ্ড ভূমিকম্প, সুনামির আঘাতে। 

পাল্টে যায় দেশের সীমানা

পৃথিবীর সীমানা এক লহমায়।

যদিও ঠিক তার পরের কবিতাটির নামই ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’। সেখানে কবি লিখছেন:

সবকিছু ভেঙে পড়ে—

আছড়ে পড়ে উল্কাপিণ্ডরা

হামলে পড়ে ভূমিকম্প

উছলে পড়ে সুনামিরা

জল ‘স্থল’ হয়

স্থল হয় ‘জল’

পাহাড় ‘সাগর’ হয়

সাগর হয় ‘পাহাড়’

জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়

সভ্যতা বিলীন হয়

এবং

সবকিছু শেষমেশ হারিয়ে যায়

নিরর্থকতার মহাসমুদ্রে।

৪. 

মাদার তেরেসার কথা ধার করে বলছি, ‘মানুষের সবচেয়ে ভয়ানক অভাব হলো একা আর প্রেমহীন হয়ে যাওয়া।’ বলছি, কবির ‘প্রেমের আলিঙ্গন’ কবিতাটি পড়ে:

“চারপাশে কেউ নেই

আছে শুধু নীল আকাশ, সাগরের ঢেউ,

চোখের সামনে পতপত করে উড়ে যায় 

এক জোড়া গাঙচিল।” এ যেন শূন্যতার হাহাকার শূন্য আকাশ ভরিয়ে তুলে গেল। আহ!

সৃজিত মুখার্জির ‘বাইশে শ্রাবণ’ মুভিটি সম্ভবত অনেকেই দেখা। সেখানে অনুপম রায়ের লেখা ও রূপঙ্কর বাগচীর গাওয়া সেই জনপ্রিয় গানটির নিশ্চয়ই মানে আছে: “গভীরে যাও, আরো গভীরে যাও/ এই বুঝি তল পেলে, ফের হারালে, প্রয়োজনে ডুবে যাও।” অন্যদিকে কবি মামুন লিখছেন, “ভাব বিনিময় হয়/ ভাবের মিলন হয়/ আরও গভীর হয়/ অথবা আর এগোয় না/ ভাবের আবেগ নুয়ে পড়ে/ লজ্জাবতী লতার মতো।” [অবিরাম খেলা চলে]

বিখ্যাত চীনা ভিডিওগেম ডিজাইনার জেনোভা চিন বলেছিলেন, “আমরা সকলই একা জন্মাই, আবার একাকী মরে যাই। তাই একাকিত্ব যাপিত জীবনেরই একটি অংশমাত্র।” কবি মাহবুব সাঈদ তার নাম-ভূমিকার কবিতাতেই সেই কথাটিই তুলে ধরতে চেয়েছেন, বলেছেন: 

“কোনো দেশ-কাল নেই শেষতক কারোরই

যেখানেই যাক না কেন মানুষ 

এবং

যা কিছুর জন্ম দেয় মানুষ 

শেষবেলায় দেখে পাশে কেউ নেই

সবাই শুধু নিজের তরে।

তাদেরও কি শেষবেলায় কেউ থাকে?

থাকে না। 

জীবনের ধর্মই এটা,  

এবার যেভাবেই সাজানো হোক না জীবন, 

শেষবেলায় সবাই আমরা একা 

এবং

আরও বেশি একাকিত্ব অনুভব হয় 

মগজের ভেতর চিন্তার এলোমেলো, হিজিবিজির মনোজগতে।” [একা এবং একাকিত্ব]

জনপ্রিয় মোটিভেশনাল লেখক শ্যানন অ্যাল্ডারের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, “চাঁদ তার আলো দিয়ে আপনাকে সারারাত পথ দেখাবে, কিন্তু সে নিজে সবসময়ই অন্ধকারে থাকতে ভালোবাসে।” এই বেদনার সুর বাজে মাহবুব সাঈদের ‘চাঁদানি রাত’ কবিতায়: 

প্রেমের সে কী তাণ্ডব-লীলাখেলা

ঘূর্ণিঝড়ের সাগরের ঢেউ যেন

উথাল-পাতাল করে আমাদের 

নিয়ে যেত আদিমতায়,

ভাসতে ভাসতে আমরা যেন

অনন্তের সীমাহীনতায় ভেসে যেতাম...

তুমি নেই আজ যেন কিছুই নেই

উদ্‌ভ্রান্ত, উন্মাদ হয়েছি আমি তোমারই তরে

যেদিকে তাকাই, দেখি খাঁ খাঁ শূন্য বিরানভূমি তুমি বিহীন

স্মৃতিরা সারাক্ষণ আমায় কুরে কুরে খায় 

অস্পর্শহীনতায় আমি পাথর, বোবা বনেছি তোমারই কাতরে”

প্রাচীন চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের একটি কথা আছে, “সবকিছুর সৌন্দর্য আছে, তবে সবাই তা দেখে না।” কিন্তু মাহবুব সাঈদ প্রকৃত কবি বলেই সৌন্দর্যকে আলিঙ্গন করতে পেরেছেন। তিনি তার ‘সৌন্দর্য, এবং’ কবিতাটিতে লিখছেন: 

“ছোট্ট বাবুই পাখির নিখুঁত ঘর বোনা দেখে

তার সৌন্দর্যে আষাঢ়ের প্লাবনে প্লাবিত হই আমি,

লেবুগাছের ডালে চড়ুই পাখির টিসটিস, টাসটাস

অস্থির নাচানাচি দেখে

চঞ্চল উতলা হয়ে ওঠে মন আমার,

জুঁই ফুলের ডালে কবুতরের বারবার কুককু-রু-কু

ডাক ভাটিয়ালি সুরের মূর্ছনার আনন্দে ভাসায় যেন আমায়,

ডাক শুনে ‘আলমোডোবারের’ টক টু হার

ছবির গানের সুর বিমূর্ত চেতনায় অবশ করে আমায়,

চম্পা ফুলের ডালে বসে এক জোড়া টিয়াপাখির

নাচানাচি শরীরে আমার নৃত্যের কেতন খেলে

চঞ্চলা মন বলে ওঠে আমার ‘ভালোবাসি’ তোমায়।”

৫.

আবারও সেই জীবনানন্দ দাশের কাছে ফিরে যেতে হয়, ‘তবু তোমাকে ভালোবেসে মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে বুঝেছি অকূলে জেগে রয় ঘড়ির সময়ে আর মহাকালে যেখানেই রাখি এ হৃদয়’। সাঈদ মামুন লিখেছেন: “ভালোবাসা মাখানো প্রতিটি খেলা যেন আমার প্রেম/ সেই প্রেমের সম্পর্ক গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়/ তারপর মিলন হয়

পরিণতিতে কাব্য হয়/ সব কাব্যই আমার কবিতা/ শেষতক সব কবিতাই/ আমার এক একটি ভালোবাসার সন্তান।” [ভালোবাসার সন্তান]

আইরিশ নাট্যকার, ঔপন্যাসিক এবং কবি অস্কার ওয়াইল্ডের চমৎকার একটি কথা আছে: “অভিমানের ফলে ভালোবাসা বাড়ে। তবে সেই অভিমান ভাঙাতে না জানলে ভালোবাসার মানুষটাই হারিয়ে যায়।” সম্ভবত কবি মামুনের জীবনেও তেমন কোনো অভিমান ছিল। না হলে কেন তিনি প্রেমের একটি কবিতায় লিখলেন নশ্বর জীবনের কথা :

“আকাশের কালো মেঘেরা হাওয়ায় ভেসে যায়

হঠাৎ ঝপঝপ বৃষ্টি নামে

সংবিৎ ফিরে পায় প্রেমময় যুগলেরা,

দমকা হাওয়া আর বৃষ্টিজল মান-অভিমান ধুয়ে দেয়

আবার তারা আবদ্ধ হয়

একে অপরের বাহুবন্ধনে,

নরম তুলতুলে ঠোঁটের মিলন হয়

দু’চোখের গভীরতায় ডুবে গিয়ে,

আবার তারা অর্থ খুঁজে পায়

মান-অভিমানময় নশ্বর জীবনে।”

মার্কিন লেখক জোসেফ ক্যাম্পবেলের কথা দিয়ে লেখাটির ইতি টানবো: “জীবনের লক্ষ্য হলো আমাদের হৃদস্পন্দনকে মহাবিশ্বের স্পন্দনের সঙ্গে মেলানো, আমাদের প্রকৃতিকে বিশ্বের প্রকৃতির সঙ্গে মেলানো।” কবি মাহবুব সাঈদ মামুন প্রতিনিয়ত সেই কাজই করে যাচ্ছেন; কবিতায়, কাজে ও জীবনে। এই নশ্বর জগতে তিনি অবিনশ্বর হয়ে থাকুক, এই প্রত্যাশা রইলো।

কাব্যগ্রন্থ: একা এবং একাকিত্ব; কবি: মাহবুব সাঈদ মামুন; প্রকাশনা: সহজ প্রকাশ; প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৩; প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত; পৃষ্ঠা: ৯৬; মূল্য: ২৪০ টাকা।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন