রবিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৫ মাঘ ১৪২৯ , ৭ রজব ১৪৪৪

সাহিত্য

পৃথিবীর সুন্দরতম আত্মহত্যা

রাশেদ আহমেদ সাদী ২১ জানুয়ারি , ২০২৩, ১৬:১২:০০

289
  • রাশেদ আহমেদ সাদী

উঁচু-নিচু জমির ভেতর দিয়ে চলে গেছে এক পথ। দুদিকে আনারসের ক্ষেত। দূর থেকে দূরে, তারও দূরে নেই কোনো ঘরবাড়ি, নেই মানুষের চিহ্ন। ক্ষেতের মাঝে কচিৎ দেখা মেলে কাকতাড়ুয়া একটা লিকলিকে শয়তানের মতো কালো কাপড়ে কালো মুখে স্থবির অভিব্যক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে।

একটা বিচিত্র রঙ পাখি এসে বসল কাকতাড়ুয়ার মাথায়। ফরিদ দৃশ্যটি দেখে একটা দির্ঘশ্বাস ছাড়ল। কেন এই দীর্ঘশ্বাস  সেটা কিন্তু সে জানে না। হঠাৎ কেন যেন বুকটা শূন্য হয়ে গেল। চোখের দৃষ্টি পাতলা হয়ে একটা তপ্ত নিশ্বাস  ফিতার মতো বেরিয়ে চাঁদের বুড়ির চুলের মতো উড়ে গেল বাতাসে। এখন এসবের কোনো মানে নেই।

নীল আকাশে নিউটনের চুলের মতো কয়েক খণ্ড  মেঘ দাঁড়িয়ে আছে। সেসব চুলের শরীরজুড়ে বিচিত্র চিত্র। সেই আকাশের তলে আনারস বাগানের মধ্যেকার নিঃসঙ্গ এক পথ ধরে হেঁটে চলেছে ফরিদ। কাঁধে ব্যাগ, হাতে বেডশিড দিয়ে মোড়ানো দু তিনটা কাথা। পাটের রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়েছে। অপর হাতে একটা বস্তা; বস্তা বোঝাই বই। বোঝার বৈচিত্রে্য এক মুটের ভাষ্কর্য।

এক মনে হেঁটে চলেছে ফরিদ। কোথাও একটু থেমে কাঁধের ব্যাগ, হাতের মুঠোয় কায়দামতো করে নিচ্ছে। ফলে কাঁধে একটু ঝাকি, মুঠা আলগা করে ফের শক্ত করে ফেলছে। উঁচুতে উঠতে কিছুটা ঋজু হয়ে যাচ্ছে, ঢালুতে নামতে সতর্কতা ফুটে উঠছে দেহভঙ্গিমায়।

এ এক অপরিচিত জায়গা ফরিদের জন্য। যেখানে আসার কথা সে কোনো দিনও ভাবেনি।

 

রংপুরে জন্ম ফরিদের। মঙ্গা এলাকার লোক। এমনও নাকি হয়েছে দুমাস চলে গেলেও একমুঠো ভাতের মুখ দেখেনি। কচু-ঘেচু, শাক-পাতা খেয়ে চলে গেছে দিন।

তার ওপর সৎ মায়ের ঘর। এসব এলাকার সৎ মাতো দূরের কথা; পেটে ধরা মা’রাই যেন কেমন। কম্বলে মোড়ানো জীবন আমাদের কাছে ওখানকার মায়েদের আচরণ লোভী, অসৎ, হিংস্রও মনে হতে পারে। নিরক্ষর তাদের বুকের তল পাওয়া, ভালোবাসার থই খোঁজা অতো সোজা না।

ফরিদের বাবা তার মা মরার দশ দিনের মাথায় আরেকটা বিয়ে করে। সে মা বছর বছর বিয়িয়ে ছেলে-মেয়েতে ভরিয়ে ফেলে অভাবের সংসার।

এদিকে, ফরিদকে পৃথিবীতে এনেই পেটে ধরা মায়ের দায়িত্ব হয়েছিল শেষ। মায়েরা মরে আসলে ফরিদের মতো সন্তানদেরকে কষ্ট দিতেই। তা নয়তো কেনইবা জন্ম দিলি? দিলিই যখন মরলি কেন, মা? হ্যাঁ, কখনো কখনো মন এমন অবুঝ হয়ে ওঠে। শিশুর মতো প্রশ্ন করতে শুরু করে।

সৎ মায়ের হাত থেকে রেহাই দিতে ছোট্ট ফরিদকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল দাদী। তার কাছে থেকেই এক এক করে অনেকগুলো বছর কাটিয়ে দিয়েছিল ফরিদ। এই ছিল তার জীবনের এক মাত্র নিশ্চিন্ত জীবন। যা সবার জীবনেই একবার আসে। খাওয়া, না-খাওয়া; ঘরে থাকা, পথে থাকা দিয়ে একে বিচার করা যায় না।

অথচ সাত ছেলে থাকার পরও বিধবা নসিমনকে মানুষের দ্বারেদ্বারে হাত পেতে, চেয়ে চিন্তে খেতে হতো। তার সব চিন্তা তখন কেন্দ্রিভূত হয়ে ছিল এই মা-মরা ফরিদকে ঘিরে। কীভাবে ওর মুখে দুটো দানা তুলে দেবেন, রাত-দিন তার সেই চিন্তা। কিন্তু দুঃখ কষ্ট যার ছায়া হয়ে গেছে, দুর্ভাগ্য তাকে ছাড়বে কেন? ফরিদকে দশ বছরে রেখে সেই বুড়িও পগার পার; যেন মরে বাঁচল।

সেই থেকে ফরিদের একার জীবন। কোনোদিন আর দোকলা হওয়া হয়নি। চেষ্টা ছিল হয়তো একটু প্রশ্রয়ের, একটা নির্ভর করা যায় এমন হাতের হয়নি। হয়নি একটি ঘরও। বাপের বাড়ি থেকে সেই যে বেরিয়েছে, সেই থেকে ঘরহারা। সৎ-ভাইবোনে ভরপুর সেই আস্তাকুড়ে ফেরার কথা সে আর কল্পনাতেও আনতে পারেনি।

পড়াশুনোয় ভালো বলে নির্মল স্যারের কল্যাণে প্রাইমারি পাস। মনসুর স্যারের জাইগির হয়ে হাইস্কুল শেষ। বাবা অনেক চেষ্টা করেছিল ফরিদকে পড়া থেকে ছাড়িয়ে নিতে। দেখা গেল একটা হোটেলের কাজে লাগিয়ে দিয়েছে, বাবা বাড়ি আসার আগেই ফরিদ স্কুলে গিয়ে হাজির। কত মার, কত বাঁধা, এসব কিছুর পরও সে পড়াটাকে ছাড়েনি। পড়াটাকে তার কাছে মনে হয়ে ছিল আশ্রয়। মায়ের কোল; যে মাকে সে হারিয়েছে।

সেবার এইচএসসিতে আশাতীত ভালো করল। নিঃসন্তান নির্মল স্যারের আনুকূল্যে কার মাইকেল কলেজে ভর্তি হওয়া গেল। টিউশানি করে চলল পড়ালেখা। ফরিদের তখন মনে হলো, তার আর ফিরে তাকানোর কিছু নেই।

এদেশের প্রত্যেক ফরিদই তাই ভাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পালাতে থাকে সেই ধারণা। দিনের পর দিন সে বুঝে, বুঝতে শেখে, জীবনটা আসলে একটা বারবার ফিরে তাকানোরই জায়গা। একটা বোঝামাত্র। পাটিগণিতের ‘নিয়ম’ মনে করে একে হালকা বানাতে হয়; সত্যিকার অর্থে ওজন আরও বাড়ে, বাড়তে থাকে। কেউ তার ভারে চিড়ে চ্যাপ্টা, কেউ যায় বেঁচে। পরে যাকে আমরা নাম দিই দৈবক্রমে...।

ফরিদও তাদের একজন। বাড়ি বলতেতো তার কিছু নেই। কারমাইকেলে ভর্তির পর একবারমাত্র এসেছিল ফেলে আসা সেই গাঁয়ে, যেখানে একটা ময়লা ‘তেনা’র মতো মা তাকে ফেলে গিয়েছিল। যেখানে নির্মল স্যার, মনসুর স্যার আর দাদীরও কবর রয়েছে। যদিও মায়ের কথা তার কিছুতেই মনে পড়ে না। মানুষের যে একজন মা থাকতেই হবে, এ সে কোনোদিনও মানতে পারেনি। হ্যাঁ, সৎমা থাকতেই পারে।

সেবার নির্মল স্যার, মনসুর স্যারের সঙ্গে দেখা করে, দাদির কবরের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে জন্মস্থান নামক ওই আস্তাকুড় ত্যাগ করেছিল ফরিদ। কবরস্থান থেকে বেরিয়ে আর কোনো দিকে না তাকিয়ে, এক মুহূর্তকাল বিলম্ব না করে সোজা ফিরে এসেছিল কলেজে। এ আসা মানে চলে আসা, চিরতরে চলে আসা। এরপর আর কোনোদিনই বাড়িতে ফেরা হয়নি তার।

কার মাইকেলে অনার্স শেষ করে সোজা ঢাকা।

 

টিউশানি করিয়ে কিছু টাকা জমিয়ে ছিল ফরিদ। তাই নিয়ে চাকরির সন্ধানে ঢাকায়। একটা মেসে উঠে ছিল সিট ভাড়া নিয়ে।

সিট ভাড়া বলতে তিনটা রুমে গাদাগাদি করে সতের-আঠারজনের একটা জটলা। একটা ছাদের উচ্চাভিলাসের জন্য কিছু টাকা গুনা আরকি। না হয় পথে থাকা আর এখানে থাকার মধ্যে পার্থক্য সমানই। বরং এখানে যেন দমবন্ধ হয়ে আসত তার। সিগারেট, গাঁজা, চিৎকার, চেঁচামেচি সব আছে এখানে। একেক জনের একেক রকম পেশা। ব্যতিক্রমী এবং অদ্ভুত অদ্ভুত পেশার মানুষের সবার পেচ্ছাব এক হয়ে একটা ঘোট পাকিয়ে যায় যেখানে। তার নাম এই মেস।

কর্মহীন কেবল ফরিদ। কাজের সন্ধানে সেই সকালবেলা বেরিয়ে যায়, ফেরে মধ্যরাতে। সকালে ওয়াশরুমের জন্য দাঁড়ালে দুপুর পেরিয়ে যায়, তাই সকাল সকাল হাত-মুখ না ধুয়ে দুটো নাকে-মুখে দিয়েই বেরিয়ে যেতে হয় তাকে। পথের কোথাও এক জায়গায় হেগে নেয়। অবশ্য কোনো কোনোদিন তো হাগার জায়গাও খুঁজে পাওয়া যায় না। সে দিন প্রকৃতির চাপ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় মানুষের দ্বারে দ্বারে; একটা চাকরির প্রত্যাশায়। গভীর রাতে যখন সবাই ঘুমায়, বাথরুমে গিয়ে আয়েশ করে হাগে।

হ্যাঁ, এতো কিছুর পরও তার মধ্যে কেমন যেন একটা আয়েশি ব্যাপার রয়ে গেছে। যদিও যে পরিবারে ফরিদের জন্ম; অমন হওয়ার কথা না। কিন্তু পড়ালেখা জিনিসটাই বোধ হয় এমন; মানুষকে কিছুটা আয়েশি; বুর্জোয়া প্রকৃতির করে ফেলে।

তবে ঐ হাঁটা কমে না তার। জুতার শুকতলা ক্ষয় হয়ে হয়ে পা ছোঁয়। রাস্তায় ঘষা খেতে খেতে পায়ের তলের চামড়া মোটা হয়ে যায়। সেখানে কিছুর সঙ্গে ঘা খেয়ে একটা ক্ষত হয়েছে। রাত হলে পুঁজ ঝরে, দিনের বেলা রাস্তায় ঘষা খেয়ে আবার রক্ত। তবু সোনার হরিণ চাকরির দেখা নেই।

কিছুদিন হকারিও করেছিল। কেমন অস্বস্তি হয় ফরিদের। ভালো করে কথাও বলতে পারে না। আর চাপার জোর না থাকলে কীভাবে মানুষ হকারি করে খায়! ফলে সেটাও তাকে দিয়ে হয়নি।

বাড়ির যে কী অবস্থা কে জানে! রংপুর থেকে ঢাকায় এলো তাও মাস পাঁচেক হয়ে যায়, এর মধ্যে এক টাকাও বাড়িতে মানি অরডার করতে পারেনি। রংপুর থাকতে টিউশানি করত, ভরপুর কাঁচা টাকা কামাত, খেয়েপড়ে আরও থাকত, তা থেকে কিছু বাড়িতে পাঠাত, কিছু জমিয়ে রাখত।

সে তো রংপুরে থাকার সময়ের গল্প। এ তো রংপুর না, ঢাকা, দেশের রাজধানী। এখানে নাকি টাকা ওড়ে। কিন্তু একটাও টিউশানি মেলে না। মানুষকে নাকি বিশ্বাসই করতে নেই। তাই যাকে তাকে ঘরে ঢোকার অনুমতি দেয় না এ শহরের মানুষ। তার জন্য চাই পোক্ত আইডেন্টিটি। সেই কোথাকার কোন রংপুরের ফরিদ তুমি, আউটসাইডার,এসেই টিউশানি চাবে আর পেয়ে যাবে, অতো সোজা না।

এদিকে দিনকেদিন অর্থহীন হয়ে পড়ছে ফরিদ। কাজ নেই, আগের জমানো টাকাও শেষ; ফুটোপাইও বাকি নেই। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে নাকি মানুষ কত কী করে ফেলে। কোথায়? ফরিদকে দিয়ে তো কিচ্ছু হলো না।

ফরিদের চিন্তা হয় তার বাবাকে নিয়ে। এক গোয়াল ছেলেপেলে নিয়ে বাবার সংসার। সব তার একার কাঁধে। রোজগেরে আর আছেই বা কে? বাড়ির সবচেয়ে বড় ছেলে মিজান, আস্ত একটা ভাদাইম্যা। খায় আর মাজারে মাজারে ঘুরে, সংসারের কোনো খোঁজ তার কাছে নেই। তার পরেরটা বিয়ে করে ভিন্ন হয়ে গেছে। পরের দুটো মেয়ে, তাদের বিয়ে হয়েছে। আরও একগণ্ডা বোধ হয় বাড়িতে রয়ে গেছে। বাবার কাঁধে খায়, ঘাড়ের উপর হাগে। এসব খবর নির্মল স্যারের কল্যাণে পাওয়া। ঢাকায় আসার পর নির্মলস্যারের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। তাই কারো খোঁজও তার জানা নেই।

চিন্তাটা সেজন্য যেন আরও বেশি। বাবা একাকীভাবে সামলাচ্ছে? পারে না তো নিশ্চয়, তবু চালিয়ে নেয়। কীভাবে নেয় সেই জানে। তবে পারলে ফরিদ বাড়িতে দুটো টাকা পাঠানোর চেষ্টা করে। পারলে বলতে, পাঠাত এতদিন পর্যন্ত। ঢাকায় আসার পর থেকে বন্ধ।

গত পাঁচমাসে তো একটা টাকাও পাঠাতে পারেনি বাবাকে। এখন নিজের থাকা-খাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। চাকরিটা কি কোনো দিনই হবে না ফরিদের!

কারও কারও জীবনে চাকরিটা আসলে কেবল চাকরি না; বেঁচে থাকার অক্সিজেনও।

 

দু’ মাস হলো মেসের কোনো টাকাই সে দিতে পারেনি। ব্যর্থ মনরথে রাতে বাসায় ফিরে দেখে তার বিছানাপত্র সব বন্ধ দরজার বাইরে এলোমেলো ছড়িয়ে পড়ে আছে। ঘটনাটা আর বুঝতে বাকি থাকে না। কারণ ইতোমধ্যে মেস মালিকের যে অকথ্য কথার নির্যাতন তাকে সহ্য করতে হয়েছে, সে তুলনায় এ যেন রীতিমতো সদাচার। জিনিসপত্রগুলো আটকে দেয়নি! অবশ্য আটকাবে যে আছেইবা-কি। এগুলো বরং আরও বোঝা। যে বোঝা সব সময় মানুষ কমাতে চায়।

এ সব জিনিসপত্র; বহুদিনের পরিচিত কাঁথা-বালিশ, বই-খাতাগুলো গাট্টি বেঁধে নিয়ে সোজা রেল স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে উঠে বসে। তার তামাটে মুখটা ভাবলেশহীন। ওখানে যেন একশত বছরের জমা হৈম। যা দেখে বোঝা যায় না, লোকটা বেঁচে আছে, না মরে গেছে।

ট্রেনটি এক অজানা স্টেশনে নামিয়ে দেয় তাকে। স্টেশন সংলগ্ন বাসস্টপে গিয়ে একটা বাসে উঠে বসে। অন্ধকার রাতের পেটে কাঁথার গায়ে সুঁইয়ের মতো নৈঃশব্দে বাস ঢুকে পড়ে। চলতে থাকে বাস। হঠাৎ বাসটা মৃগী রোগীর মতো কুঁকড়েমুকড়ে যেতে থাকে। একে তো খারাপ রাস্তা, তার ওপর এই উঁচু, তো ওই নিচু। পথের সঙ্গে চাকা এক রকম ঝগড়া করে করে এগিয়ে চলে।

কন্ট্রাকটর এলো ভাড়া তুলতে। ফরিদ ছোট্ট করে উত্তর দিল তার কাছে কোনো টাকাপয়সা নেই।

 –ভাড়া নেই মানে?

 –নেই মানে নেই।

 –নেই তো অমন ঢেং-ঢেং করে বাসে উঠতে বলছে কে আপনারে?

 –আমাকে যেতে হবে না তো!

 –এমনভাবে বলছেন যেন আপনার বাপ-দাদা গাড়িটা কইরা দিয়া গেছে। আসবেন আর চেয়ারে পা চেগায়া বসবেন, যেখানে মন চায় চলে যাবেন। আর আমরা রাত জাইগা আপনারে পাহারা দিব।

 –অত কথা না বলে নামিয়ে দাও তো, বাপু।

 –নামেন না। আপনারে আটকায়া রাখছে কে? ‘ওই ওস্তাদ, গাড়ি থামান, লোক নামব।’ কন্ট্রাকটর চিৎকার দিয়ে ওঠে।

গাড়ি থামে। ঘুমন্ত যাত্রীদের মুখে বিরক্তি ফুটে ওঠে। গন্তব্যে ফেরা কতগুলো মানুষের মাঝ দিয়ে ফরিদ গাড়ি থেকে নেমে যায়। অঘ্রাণ মাসের শীতশীত রাত কোনো রকম রাস্তার পাশেই কাটিয়ে দিয়ে ভোরের কুয়াশার ভেতর দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। একেই হয়তো বলে হাজার বছরের পথ চলা। যে চলার কোনো গন্তব্য নেই। যা তাকে এক আনারসের দেশে নিয়ে আসে।

যেখানে চোখে পড়ার মতো কোনো পথ নেই, পথিক নেই, শুধু আনারসের ক্ষেত। যতদূরে চোখ যায় আনারস আর আনারস।

 

গাছ আর বুনোলতা-পাতায় ছাওয়া একটা ঝোপ। সেখানে থামল ফরিদ। এ যেন আনারসের সমুদ্রে ছোট্ট একটা দ্বীপ। যে দ্বীপে নির্বাক কিছু প্রাণীর বাস। সেখানে আশ্রয় নেয় ফরিদ। ঝোপটার ধারে জিনিস পত্র রেখে মাটিতে বসে পড়ে।

ঝোপে বসবাস করা পাখিরা ইতোমধ্যে জেগে উঠে কিচির-মিচির জুড়ে দিয়েছে। ফরিদ খুব করে সে-সব জানা, না জানা পাখির শব্দ শুনল। ভেতরের একটা ধু-ধু প্রান্তরে পাখিদের কিচিরমিচিরের প্রতিধ্বনি উঠছে, অতঃপর সূক্ষ্মতম ধমনির সেখানেই মিশে যাচ্ছে।

ফরিদ কতগুলো আনারসের সারি লক্ষ করে। কোনো আনারসের চিহ্নমাত্র নেই। অগত্যা একগুচ্ছ আনারসের পাতা ছিড়ল। পাতাগুলোর গোড়ায় মোলায়েম, কিছুটা টকস্বাদের কচিপাতা থাকে। এটা খাওয়া যায়।

অনাহার, অর্ধাহারের দেশের মানুষ ফরিদ। কত কী খেয়ে বেঁচে থাকা যায়, তা সে জানে।

পাতার গোড়ার নরমগুলো খেয়ে কিছুটা ক্ষিধা মিটল। অতঃপর আর দেরি করবে না বলে ঠিক করে ফেলল। ইতোমধ্যে পাখিরা পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিজেদের নিয়ে। কুয়াশার চাদর গুটিয়ে নিয়ে সোনালি মুখ মেলে ধরেছে দিন। আকাশে কয়েক খণ্ড মেঘ থ মেরে দাঁড়িয়ে।

এমন এক মুহূর্তে ফরিদ তার আজীবনের সঙ্গী বিছানাটা বিছিয়ে দিল। বইয়ের বস্তা খুলে মাস্টার্সের গাইডগুলো বের করে রাখল সিঁথানের দিকে। পায়ের দিকে ডেলকার্নেগি আর মোহাম্মদ লুৎফররহমানের মোটিভেশনাল বইগুলো। বইগুলো একটার উপর আরেকটা খুব যত্ন করে সাজিয়ে নিল।

ব্যাগ থেকে সাদাশার্ট আর তবন পড়ে নিল। শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বাংলাদেশের কবিদের একটা কবিতার সংকলন বের করে ব্যাগটা জঙ্গলে ছুড়ে ফেলল।

বালিশে শুয়ে সশব্দে কিছু সময় কবিতা পড়ল, কিছুক্ষণ নীরবে। কিছুক্ষণ বইয়ের ভেতর আঙুল দিয়ে মার্ক করে রেখে পৃথিবীর বিচিত্র দৃশ্য দেখল, শব্দ শুনল। যেন অন্য কোথাও চলে যাওয়ার আগে পৃথিবীর কিছু শব্দ-দৃশ্য সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চায় ফরিদ।

তিনটা সুঁইচোর উড়ে গেল ফরিদের একদম চোখের উপর দিয়ে। কোথায় যাচ্ছে অমন তাড়াহুড়ো করে? মেঘ খণ্ডগুলোকে আর দেখা গেল না। এত বড় আকাশে কোথাও হারিয়ে গেছে হয়ত।

ফরিদের কানে অনেক রকমের শব্দ এসে ঢুকছে। শব্দগুলোর কোনোটা পাখির, কোনোটা ডাল ভেঙে পড়ার, কোনো পাতা ঝড়ে পড়ার, কোনোটা হয়ত ব্যাঙের ডাঙা থেকে পানিতে লাফিয়ে পড়ার। এসব শব্দরা সন্তর্পণে এসে কর্ণকুহরে গুটি গুটি পায়ে এসে ঢুকছে।

ফরিদের মনে হলো এসব শব্দের সমষ্টির জীবনই কবিতা। এমন কবিতা যা তাকে মুগ্ধ করেছে। এমন এক কবিতা–যা মানুষকে সানন্দে তার পরিসমাপ্তির দিকে ধাবিত করে।

বইটার কভারের ভেতর স্কচটেপ দিয়ে আটকানো প্যাকেট বের করল। যা সে কারমাইকেলে থাকতে কিনেছিল। সেই জাকিয়া, সে কেমন আছে ফরিদ জানে না। হয়তো একটি সুন্দর মেয়ে হয়েছে তার। গুটিগুটি পায়ে পৃথিবীর পথে পা ফেলছে। হোক না। ফরিদের মেয়ে তো আজকের এই দিনটা আর সে আজকের মা। যাকে সে মা বলে ডাকবে।

ফরিদ ভাবে, ‘পৃথিবীর সবার মা হতে হয়। না হলে সত্যিকার অর্থে পুরোপুরি কিছুকে বোঝা যায় না। আজকে আমি মা। কারণ আমার মা নেই। আমার মা ছিল–তার সঙ্গে যদি আমার এ যাত্রায় দেখা হয়ে যায়–তোমাদের সবাইকে আমি মা হতে অনুরোধ করব। তোমরা ভাই হও, বোন হও কিংবা বন্ধু হও–তাতে মাতৃত্ব রেখো।’

 

নিউজজি/নাসি 

 

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন