রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ৯ শ্রাবণ ১৪২৮ , ১৪ জিলহজ ১৪৪২

সাহিত্য

মানচিত্রের কবি রুদ্র

নিউজজি ডেস্ক ২১ জুন , ২০২১, ১২:৪৩:১৬

  • মানচিত্রের কবি রুদ্র

ঢাকা: যে কবি বাংলাদেশের আধুনিক কাব্য ধারার চেতনাকে ধারণ করে নিজের গ্রামের গ্রামীন পটভুমিকে কবিতায় বারবার তুলে এনেছেন শৈল্পিক শব্দমালায়। যার কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে তার স্মৃতি বিজড়িত সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। যাপিত জীবনে তারুন্যের দুরন্তপনা, প্রেম, ভালোবাসা, অবহেলা, স্বদেশচেতনা, ও ভাবনার সেই কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ স্বল্প সময়ে জীবনকে দেখেছেন অভিনবত্বে, নতুন সৃষ্টির একাগ্রতায়। কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছাড়াও নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তার কবিতাকে করেছে আত্বপ্রত্যয়ী ও আন্দোলিত। আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে বারবার রাজনৈতিক চেতনা ও জীবনের টানাপোড়েন। মৃত্তিকার্স্পশী কন্ঠস্বরের কবি মাটি ও মানুষ ও প্রাকৃতজনের শোষণ ও বৈষম্যের চিত্র অংকন করেছেন কবিতায় নিয়ত। 

নিজস্ব শব্দমালায় নিরীক্ষাপ্রবণ কবিতায় মূর্ত হয়েছে পাওয়া না পাওয়ার বেদনাবোধ। তাইতো তিনি জাতিকে জাগিয়ে তোলার শব্দাবলি উচ্চারণ করেছেন অনায়াসেই। “দক্ষিণ সমুদ্রের মতো আজ আমাকে প্লাবন হতে দাও হতে দাও অপ্রতিরোধ্য বিপুল টাইফুন এখন আমাকে মুখোমুখি হতে দাও চিহিৃত শত্রুর হাতে তুলে নিতে দাও সন্মিলিত মানুষের বিক্ষুব্ধ হৃদয় আর তার সঠিক প্রতীক ও আগ্নেয়াস্ত্র, বুলেটের বিরুদ্ধে আমাকে আজ হাতে তুলে নিতে দাও আগুন ও বারুদ ভাষা। (আগুন ও বারুদের ভাষা – মৌলিক মুখোশ) মাটি ও মানূষ ও ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধ তার কাব্য শোষণ, সৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বলিষ্ট উচ্চারণ প্রতিফলিত হয়েছে বারবার নতুন সুষ্টির বৈচিত্র্য ও তার শিল্প নিরীক্ষায়।   

১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উপদ্রুত উপকূল’ প্রকাশিত হয় বরেণ্য মনীষী , চিন্তাবিদ ,গবেষক, কবি আহমদ ছফার অনুকুল্যেতে। বইটি প্রকাশ করে তরুণ কবিতা কর্মীর সৃষ্টিশীলতাকে বুঝতে কষ্ট হয়নি আহমদ ছফার। ১৯৮০ সালে কবি কামাল চৌধুরী ও কবি মুহম্মদ নুরুল হুদাকে নিয়ে দ্রাবিড় প্রকাশনী প্রতিষ্টা হলে কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ‘ ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’ এই প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৪ সালে সব্যসাচী প্রকাশনীন থেকে তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মানুষের মানচিত্র’ প্রকাশিত হলে ভিন্নধর্মী কাব্য ও নিজস্বতার জন্য বিপুলভাবে প্রসংশিত হন কবি। ১৯৮৪ সালে চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘ছোবল’ ও ১৯৮৭ সালে পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘গল্প’ প্রকাশিত হয় নিখিল প্রকাশনী থেকে। ১৯৮৮ সালে ষষ্ঠ কাব্য ‘দিয়েছিলে সকল আকাশ’ প্রকাশিত হয় মুক্তধারা প্রকাশনীর থেকে। ১৯৯০ সালে সপ্তম কাব্যগ্রন্থ “মৌলিক মুখোশ প্রকাশিত হয় সংযোগ প্রকাশনী থেকে। অগ্রজ কবি অসীম সাহা’র সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিলো অপ্রকাশিত কবিতাবলী সহ ‘শ্রেষ্ট কবিতা’ গ্রন্থটি। 

১৯৮৯ সালে কাব্য কবিতার পাশাপাশি গান ও রচনা শুরু করেন কবি। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসাবেও অর্ন্তভুক্ত হন। নিজেও গানের সুরারোপ করেন। কবির লেখা গান ‘ভালো আছি, ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ গানটি একটি চলচ্চিত্রে সংযোজিত হলে তিনি বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি প্রদও ১৯৯৭ সালের শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসাবে (মরণোত্তর) সন্মাননা লাভ করেন। কবি জীবদ্দশায় ‘ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম কাব্যগ্রন্থের জন্য ‘মুনীর চৌধূরী সাহিত্য পুরস্কার’ সহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন। স্বৈরাচার বিরোধী নব্বইয়ের গণ আন্দোলনের সময় কবির কলম ছিলো প্রতিবাদ মূখর। সে সময়কার সামরিক জান্তা সশস্ত্র বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে তার কবিতা জাগিয়ে ছিলো নতুন চেতনায়। তাকে গ্রেফতারের জন্য হন্ন হয়ে খুঁজেছিলো পুলিশ। যেমন- ‘দাঁড়াও নিজেকে প্রশ্ন করো কোন পক্ষে যাবে? রাইফেল তাক করে আছো মানুষের দিকে। সঙ্গীন উঁচিয়ে আছে দূর্ত নেকড়ের মতো । পায়ে বুট, সুরক্ষিত হেলমেটে ঢেকে আছো মাথা। সশস্ত্র তোমার হাত, সুসংঠিত , কে তোমাকে ছোঁয়। তোমার বুলেট মানুষের বুক লক্ষ্য করে ছুটে যাচ্ছে তোমার বুলেট মানুষের মাথার খুলি উড়িয়ে দিচ্ছে তোমার বুলেট মানুষের হৃদপিন্ড স্তব্দ কোরে দিচ্ছে তুমি গুলি ছুঁড়ছো, তুমি গুলি ছুঁড়ছো মানুষের দিকে। দাঁড়াও নিজেকে প্রশ্ন করো কোন পক্ষে যাবে? 

সমাজ ও রাজনীতির পট পরিবর্তনের ছায়া কবির কবিতার অবলম্বন হলেও তিনি নাগরিক কবি, প্রেম, মৃওিকা সংলগ্নতার কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। গ্রামীন মানুষের নিসর্গ জীবনকে গভীরভাবে ধারণ করেছেন কবি কবিতার পংক্তিতে। অর্ন্তগত রোমান্টিকতার যন্ত্রণা প্রবলভাবে উপলব্দি করেছেন জীবনযাপনে, ভালোবাসার চরম র্ব্যথতায়, জীবনের দু;সময়ে তিনি ন্যুজ হননি, নিজস্ব অস্তিত্বে ধারণ করেছেন সকল বেদনাবোধ। যেমন- ‘তোমাকে ফেরাবে প্রেম, মাঝরাতে চোখের শিশির, বুকের গহীন ক্ষত, পোড়া চাঁদ তোমাকে ফেরাবে। ভালোবেসে ডাক দেবে আশ্বিনের উদাসিন কুসুম, তোমাকে ফেরাবে স্বপ্ন, পারিজাত মাটির কুসুম। তোমাকে ফেরাবে প্রাণ, এই প্রাণ নিষিদ্ধ গন্ধম, তোমাকে ফেরাবে চোখ,এই চোখ শাণিত আগুন, তোমাকে ফেরাবে হাত, এই হাতে নিপুণ নির্মাণে, তোমাকে ফেরাবে তনু, এই তনু বিকশিত হেম। (অনুতপ্ত অন্ধকার- গল্প) এ মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জীবনের এক চেতনাবাহী অধ্যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধকে কবি উপলব্দি করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের অমনবিক বর্বরতা কবিকে ব্যাথিত করেছে বারবার। তাইতো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ভুলতে পারেননি আজন্ম । 

মুক্তিযুদ্ধেও সময়কে ধারণ করে কবি উচ্চারণ করেছেন অসামান্য সেই কবিতা“ বাতাসে লাশের গন্ধ’। যেমন- ‘বুকের কাফনে মোড়া কুকুরে খেয়েছে যারে , শকুনে খেয়েছে যারে, সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা। স্বাধীনতা- সে আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন, স্বাধীনতা- সে আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল। ধর্ষিতা বোনের শাড়ি ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা। (বাতাসে লাশের গন্ধ- উপদ্রপ উপকূলে) 

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ আজীবন ছিলেন প্রতিষ্ঠান বিরোধী। মানবিক মূল্যেবোধ নির্ভর মুক্ত জীবনের স্বপ্নই তাকে তাড়িত করেছে শেষ দিন পর্যন্ত। সমাজের সব বৈষম্য অনাচার, সাম্প্রদায়িকতা, ধমান্ধতা, আর অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে তার আজীবন কলম যেমন ছিলো সোচ্চার তেমনিভাবে তার মননে প্রেমের অর্ন্তলীন স্বপ্ন ও প্রেমে ব্যর্থতার গ্লানি তাকে তাড়িত করেছে সব সময়। তবুও তার কবিতার বৈশিষ্ট্য শব্দের ব্যবহারে অভিনবত্বে নিজস্বতা, স্বকীয়তা তাকে বিপুল পাঠকপ্রিয়তা এনে দিয়েছিলো।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers