রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ , ৬ জুমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

বিদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় ইরানে তীব্র ওষুধ সংকট

নিউজজি ডেস্ক ৯ সেপ্টেম্বর , ২০২৬, ১৬:২৩:৫৫

100
  • ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং নৌ অবরোধের প্রভাবে ইরানে ওষুধের সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৮০০ ধরনের ওষুধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ৯০টি ওষুধকে জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি গত এক বছরে বেশ কিছু ওষুধের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ইনসুলিনের মূল্য বেড়েছে সর্বোচ্চ ছয় গুণ পর্যন্ত।

তেহরানের ৫৯ বছর বয়সী বাসিন্দা ফারাহ এত দিন নিজের অটোইমিউন রোগের চিকিৎসায় সুইজারল্যান্ডে তৈরি একটি ওষুধ ব্যবহার করতেন। সরবরাহ সংকটের কারণে এখন তাকে ইরানে উৎপাদিত একই ধরনের ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে বাজারে দেশীয় ওষুধটির সরবরাহও খুব শিগগির সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। খবর আল জাজিরা

আল জাজিরাকে শুধু নিজের প্রথম নাম জানিয়ে ফারাহ বলেন, ‘দাম ও সহজে পাওয়ার কারণে আমি ইরানে তৈরি ওষুধ ব্যবহার শুরু এসেছি। পরে বিদেশে তৈরি ওষুধটি হয়তো আর পাওয়া যাবে না। আবার বারবার ওষুধ বদলানোও সম্ভব নয়, কারণ এগুলোর মান ও কার্যকারিতা এক নয়।’

এখন ইরানে তৈরি ওষুধটির সংকট দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কায়ও প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর মধ্যে দেশটির ওষুধ খাতে সংকট আরও গভীর হচ্ছে। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ক্যানসারসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগের ওষুধের সংকট বাড়ছে।

ইরানিয়ান ফার্মাসিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র হাদি আহমাদির তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৮০০ ধরনের ওষুধের সংকট রয়েছে। এর মধ্যে ৯০টি ওষুধকে জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে গত সপ্তাহে তিনি বলেন, এসব ওষুধের মধ্যে ৪০০টি ইরানেই তৈরি হয়।

এদিকে ওষুধের দামও দ্রুত বাড়ছে। মৃগী ও স্নায়ুর ব্যথার চিকিৎসায় ব্যবহৃত গ্যাবাপেন্টিনের দাম গত এক বছরে ২২০ শতাংশ বেড়েছে। ব্যথা ও জ্বরের ওষুধ অ্যাসিটামিনোফেনের দাম বেড়েছে ৩৭৫ শতাংশ, অ্যান্টিবায়োটিক অ্যামোক্সিসিলিনের ২৮৫ শতাংশ এবং বিষণ্নতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ফ্লুওক্সেটিনের দাম বেড়েছে ১০০ শতাংশ। ডায়াবেটিস রোগীদের প্রতিদিন প্রয়োজন হয় এমন ইনসুলিনের দাম এখন এক বছর আগের তুলনায় ছয় গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। খবর মেহর নিউজ এজেন্সি

দেশটিতে মূল্যস্ফীতির বড় সংকটের অংশ হিসেবেই এসব দাম বাড়ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির দেশগুলোর একটি ইরান। আগস্ট পর্যন্ত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম ১২৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। রান্নার তেলের মতো কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম তিন গুণেরও বেশি হয়েছে।

যদিও অন্যান্য শিল্পের মতো ওষুধ খাতেও স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করে আসছে ইরান। কয়েক বছর ধরে দেশটি ওষুধ তৈরির কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রস্তুত ওষুধ দেশে উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও দুর্লভ ওষুধের জন্য খাতটি এখনও আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।

ওয়াশিংটনের বছরের পর বছর ধরে চলা ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির নিষেধাজ্ঞায় চিকিৎসাসামগ্রী আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে মানবিক পণ্যের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার কিছু ছাড় থাকলেও আমদানি ব্যয় অনেক বেড়েছে।

আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ওই যুদ্ধে প্রায় ৪৪টি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০ জন কর্মী নিহত বা আহত হয়েছেন।

যুদ্ধের সময় বোমা হামলার শিকার হওয়া বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর একটি ছিল তওফিক দারু। তওফিক দারুর বিক্রয় বিভাগের পরিচালক মরিয়ম ফারাহানি আল জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের বিমান হামলায় প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও উৎপাদনের সবগুলো লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফারাহানি বলেন, ‘আমাদের মূল ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই ক্যানসার ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগী। আমরা যে ওষুধগুলো তৈরি করতাম, সেগুলো শুধু আমরাই তৈরি করতাম।’

তিনি জানান, উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ না রাখতে প্রতিষ্ঠানটি পরে বিকল্প একটি উৎপাদন লাইন ভাড়া নিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আকাশপথ, রেলপথ ও স্থলপথে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

ফারাহানি বলেন, ২৬ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে ব্যবহৃত ডেটাবেস, সার্ভার এবং অসংখ্য বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ইসরায়েলের বিমান হামলায় ধ্বংস হয়েছে। তার ধারণা, আংশিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠনে অন্তত দুই বছর এবং কোটি কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে তথ্য ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে হারিয়ে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষকেরা।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী গত মার্চের শেষ দিকে জানায়, তওফিক দারুকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সংস্থা এসপিএনডির ফেন্টানিলের প্রধান সরবরাহকারী ছিল। ইসরায়েল অভিযোগ করে, এসপিএনডি রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির গবেষণায় এই ওষুধ ব্যবহার করত।

তবে তওফিক দারু এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তারা শুধু ফেন্টানিলের সিট্রেট-লবণ ধরনের ওষুধ অল্প পরিমাণে তৈরি করত। অস্ত্র তৈরির জন্য নয়, অস্ত্রোপচারে অচেতন করার মতো অনুমোদিত চিকিৎসা কাজে ব্যবহারের জন্যই এসব তৈরি করা হতো বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ফারাহানি আরও বলেন, তওফিক দারু গ্লাটিরামার অ্যাসিটেটও তৈরি করত। এটি বারবার দেখা দেয়া মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ইনজেকশন। এর মূল সংস্করণ কপ্যাক্সোন তৈরি ও বাজারজাত করেছিল ইসরায়েলি কোম্পানি টেভা। পরে বিভিন্ন দেশে এর বিকল্প ওষুধ তৈরি হওয়ার আগে দীর্ঘদিন বিশ্ববাজারে এই ওষুধের আধিপত্য ছিল।

ফারাহানি বলেন, ‘ইরানজুড়ে যেসব জায়গায় হামলা চালানো হয়েছে, তার অনেকগুলোই ছিল গবেষণাকেন্দ্র। আর একটি দেশের উন্নয়নে গবেষণার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ..., সেটিই সবচেয়ে দুঃখজনক।’

অবশ্য পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হলেও ইরানের কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার সক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করছে। তাদের দাবি, দেশটির অর্থনীতির অন্যান্য খাতের মতো ওষুধ শিল্পও চাপের কাছে ভেঙে পড়তে রাজি নয়।

মঙ্গলবার এক ওষুধ প্রদর্শনীর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ইরানের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের প্রধান মাহদি পিরসালেহি বলেন, ‘শত্রুপক্ষ ওষুধকে দেশের স্পর্শকাতর খাতগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা তথ্য ছড়িয়ে ইরানের পরিস্থিতিকে খারাপ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।’

তিনি দাবি করেন, গত বছরের তুলনায় ইরানে ওষুধের সংকট কমেছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো পরিসংখ্যান দেননি।

তেহরানের এক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশেই তৈরি বিকল্প ওষুধসহ বিভিন্ন ওষুধের দাম সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে বেড়েছে, তা ‘অবিশ্বাস্য’। অনেক ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য এই দাম এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, চিকিৎসাসামগ্রী আমদানিতে সরকার ধীরে ধীরে ভর্তুকি দেয়া বৈদেশিক মুদ্রার সুবিধা কমিয়ে আনা এবং বীমা কোম্পানিগুলোর ফার্মেসিগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়া থাকাও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৮ কোয়াড্রিলিয়ন রিয়াল, যা ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের সমান।

ওই চিকিৎসক বলেন, ‘সামুদ্রিক অবরোধের কারণে রোটাভাইরাসের টিকা আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে এবং শিগগিরই ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকাও একই সমস্যায় পড়তে পারে—এমন খবর দেশজুড়ে টিকায় প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগ ঠেকানোর প্রচেষ্টার জন্য গুরুতর ও উদ্বেগজনক হুমকি।’

পরিস্থিতির অবনতিতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন ওই চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য এবং শিশু, নবজাতক ও গর্ভবতী নারীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের প্রয়োজনীয় খাবার না পাওয়ার পরিস্থিতি অপুষ্টির শুরু ও বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।’

এর ফলে ‘সংক্রামক ও অসংক্রামক—দুই ধরনের রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

নিউজজি/এস আর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
 নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers