বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ৭ সফর ১৪৪৮

বিদেশ

৮৪ বছর বয়সে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন মিশরীয় নারীর

নিউজজি প্রতিবেদক ৮ জুলাই , ২০২৬, ১৩:৪২:৫৫

79
  • সংগৃহীত

ঢাকা: জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন নতুন করে লেখা যায়, যদি ইচ্ছাশক্তি বেঁচে থাকে। সেই সত্যের এক অনন্য উদাহরণ মিশরের আমাল ইসমাইল।

মিশরের এক অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম তার। যে বয়সে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, সে বয়সেই কেড়ে নেওয়া হয় বিদ্যালয়ের বেঞ্চ। শৈশবের স্বপ্নগুলোকে বিদায় জানিয়ে অল্প বয়সেই পা রাখতে হয় সংসারের কঠিন বাস্তবতায়।

বিয়ে, পরিবার, সন্তানের দায়িত্ব একসময় চার সন্তানের জননী হিসেবে জীবন যেন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে রান্নাঘর, সংসার আর নীরব আত্মত্যাগের অদৃশ্য গণ্ডিতে।

তবু স্বপ্ন কখনো সম্পূর্ণ নিভে যায়নি। ৩৮ বছর বয়সে একদিন তিনি নিজের ভেতরের সেই সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে আবার জাগিয়ে তুললেন। বহু বছরের বিরতির পর হাতে তুলে নিলেন বই। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। কিন্তু জীবন আবারও তার পথ রুদ্ধ করল। সংসারের দায়িত্ব তাকে পুনরায় পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে দিল।

এরপর আসে আরও কঠিন সময়। দু’দুবার ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি তার শরীরে আঘাত হানে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি অসুস্থতাকে পরাজিত করে ফিরে আসেন। যেন জীবনকে নীরবে বলে দেন ‘আমার পথচলা এখনো শেষ হয়নি।’

সময় গড়ায়। বয়স ছুঁয়ে ফেলে ৭০। যখন অধিকাংশ মানুষ জীবনকে বিশ্রামের দিকে নিয়ে যান, তখন তার মেয়ে ও নাতি-নাতনিরা নতুন করে তার স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলেন। তাদের অনুপ্রেরণায় তিনি আবারও শিক্ষার পথে ফিরে আসেন।

উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর ভর্তি হন মানসুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস অনুষদে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। সেখান থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তারপর শুরু হয় গবেষণার দীর্ঘ যাত্রা।

অবশেষে ৮৪ বছর বয়সে, যে বয়সে অনেকের হাত কলম ধরতেও কাঁপে, সেই বয়সেই তিনি গবেষণার দীর্ঘ সাধনা শেষে প্রথম শ্রেণির সম্মানসহ ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

মিশরের নীল বদ্বীপ অঞ্চলের মানসুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদে অনুষ্ঠিত এক গবেষণা (পিএইচডি) পত্রের চূড়ান্ত উপস্থাপনা (থিসিস ডিফেন্স) অংশ নিয়ে তিনি সফলভাবে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এটি শুধু একটি একাডেমিক অর্জন নয়, বরং অধ্যবসায়, সাহস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অসাধারণ মানবিক গল্প।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচারক প্যানেল তার গবেষণার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বিবেচনা করে তাকে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে ডক্টরেট প্রদান করেন। পাশাপাশি গবেষণাপত্রটি প্রকাশ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিনিময়েরও সুপারিশ করা হয়। আমাল ইসমাইলের গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘সক্রিয় বার্ধক্য এবং কিছু সমাজতাত্ত্বিক চলকের সঙ্গে এর সম্পর্ক: মানসুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত কিছু কেস স্টাডি’।

গবেষণার বিষয়টি ছিল তার নিজের জীবনের প্রতিফলন। তিনি মিশরের দাকাহলিয়া গভর্নরেটের বিভিন্ন গ্রামের ২০ জন নারীর ওপর গবেষণা পরিচালনা করেন। তার লক্ষ্য ছিল প্রবীণদের জীবন, তাদের সামাজিক চ্যালেঞ্জ এবং সক্রিয় বার্ধক্য নিয়ে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

জীবনের নির্মম পরিহাস এখানেই, যে জীবন বারবার তাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছে, আমাল ইসমাইল প্রতিবারই নতুন দরজা খুলে এগিয়ে গেছেন। একটি পথ বন্ধ হয়েছে, তিনি আরেকটি পথ তৈরি করেছেন। পরাজয়কে তিনি কখনো সমাপ্তি নয়, বরং নতুন সূচনার আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

এই কাহিনি শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়, এটি সমাজের প্রচলিত সেই ধারণার বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ শক্তিশালী প্রতিবাদ, যেখানে মনে করা হয় নির্দিষ্ট বয়সের পর শিক্ষা, স্বপ্ন কিংবা আত্মগঠনের আর কোনো প্রয়োজন নেই।

মিশরের শিক্ষার ইতিহাসও একইভাবে সংগ্রামের সাক্ষী। একসময় দেশটিতে নারীদের সাক্ষরতার হার পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, সামাজিক সচেতনতা ও শিক্ষানীতির ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় সেই বৈষম্য অনেকটাই কমে এসেছে। উচ্চশিক্ষায় এখনও কিছু ব্যবধান থাকলেও তা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের নারীদের জন্য আমাল ইসমাইলের জীবন এক গভীর প্রেরণার নাম। বিয়ে শিক্ষা-জীবনের সমাপ্তি নয়, মাতৃত্ব স্বপ্নের সমাধি নয়, আর বয়স কখনো জ্ঞান অর্জনের অন্তরায় হতে পারে না। ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় এবং পরিবারের আন্তরিক সহযোগিতা থাকলে জীবনের যেকোনো প্রান্ত থেকেই নতুন পথচলা শুরু করা সম্ভব।

আমাল ইসমাইল প্রমাণ করে দিয়েছেন, স্বপ্নের ক্যালেন্ডারে বয়সের কোনো সংখ্যা লেখা থাকে না। মানুষ যতদিন শেখে, ততদিনই সে নতুন করে বেঁচে থাকে। সূত্র: যুগান্তর।

নিউজজি/এস আর/এসডি

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers