বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ৭ সফর ১৪৪৮

বিদেশ

শক্তিশালী হচ্ছে ‘এল নিনো’, বাড়ছে দুর্যোগ শঙ্কা

নিউজজি ডেস্ক ৮ জুলাই , ২০২৬, ১২:৫৪:০৩

70
  • সংগৃহীত

ঢাকা: জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, ‘এল নিনো’ এরই মধ্যে সক্রিয় হয়েছে এবং চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি আরও শক্তিশালী হতে পারে। সংস্থাটির আশঙ্কা, এবারের এল নিনো অতীতের তুলনায় বেশি শক্তিশালী হয়ে আবহাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা ও অন্যান্য চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এল নিনোর সময় মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন দেখা দেয়।

সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনোর আবির্ভাব ঘটে এবং এর প্রভাব প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এল নিনোর পাশাপাশি এর বিপরীত জলবায়ু পরিস্থিতি ‘লা নিনা’ পর্যায়ক্রমে ফিরে আসে, আর এর মাঝামাঝি সময়ে থাকে স্বাভাবিক বা নিরপেক্ষ অবস্থা।

ডব্লিউএমও’র বরাতে জেনেভা থেকে ৩ জুলাই এএফপি জানায়, জলবায়ুবিষয়ক এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি দ্রুত তীব্রতর হবে। তাই সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় দেশগুলোকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

ডব্লিউএমওর মাসিক ‘গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট’-এ বলা হয়েছে, ‘জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছাবে।’

সংস্থাটি এল নিনোকে দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী ও অত্যন্ত শক্তিশালী- এই চার শ্রেণিতে ভাগ করে। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী এটি তৃতীয় স্তর অর্থাৎ ‘শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছাবে।

ডব্লিউএমও জানায়, ‘ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসে এটি দ্রুত শক্তিশালী হবে। এর ফলে বিশ্বের বহু অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বাড়বে।’

ডব্লিউএমওর জলবায়ুবিজ্ঞানী আলভারো সিলভা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত মাসের তুলনায় এখন অনেক বেশি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে যে বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসে যদি দেখা যায় এটি আরও তীব্র রূপ নেবে, তাহলে আগামী মাসগুলোতে ডব্লিউএমও নতুন হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করবে।

জেনেভাভিত্তিক সংস্থাটি জানায়, বিভিন্ন বৈশ্বিক জলবায়ু কেন্দ্রের মডেলভিত্তিক পূর্বাভাসে মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ধারাবাহিক ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ডব্লিউএমও’র মতে, গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ অঞ্চলে মৌসুমি গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বাড়তে পারে। উত্তর গোলার্ধের শরৎকালজুড়ে এল নিনো আরও শক্তিশালী হবে এবং এর প্রভাব বিশ্বের বহু অঞ্চলে বিস্তৃত হবে।

সবশেষ এল নিনোর প্রভাবে ২০২৩ সাল রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর হয়েছিল। আর ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর, যখন বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব (১৮৫০-১৯০০) সময়ের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

এল নিনো সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছে, তবে এর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব সাধারণত পরে আরও স্পষ্ট হয়।

সিলভা বলেন, এল নিনোর প্রভাব চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত এবং ২০২৭ সালেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হবে।

কৃষি ও স্বাস্থ্যসহ জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোকে প্রস্তুত রাখতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে ডব্লিউএমও।

সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, মানুষের জীবন রক্ষা এবং অর্থনীতি ও সমাজে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে এসব আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এল নিনো ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং দ্রুত শক্তিশালী হবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এর ফলে বহু অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি, স্থলভাগে তাপপ্রবাহ এবং সমুদ্রে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও বাড়বে।

ডব্লিউএমওর হালনাগাদ পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ অক্ষাংশের ৬০ ডিগ্রি থেকে উত্তর অক্ষাংশের ৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব জনবসতিপূর্ণ স্থলভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

ডব্লিউএমও জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর ঘনঘন সৃষ্টি বা তীব্রতা বৃদ্ধির কোনো প্রমাণ নেই। উষ্ণতর সমুদ্র ও বায়ুম-ল চরম আবহাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও আর্দ্রতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে এল নিনোর কারণে উষ্ণ সমুদ্রের পানি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়াতে পারে। বিপরীতে আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি ও বিকাশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে বৃহস্পতিবার পেরু এল নিনোজনিত ভারী বৃষ্টিপাতের ‘আসন্ন ঝুঁকির’ কারণে দেশটির ১ হাজার ৮০০টি পৌরসভার মধ্যে ৮০০টিতে ৬০ দিনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। দেশটিতে ৯৩ লাখেরও বেশি মানুষ বন্যা ও ভূমিধসের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সতর্ক করা হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: এল নিনোর বছরগুলোতে এশিয়ার অনেক অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক পরিস্থিতি ও খরা দেখা দেয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যার ফলে ভারতসহ উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে কৃষিকাজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বৃষ্টিপাত কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের কৃষি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পরিকল্পনা প্রস্তুত করছেন।

অস্ট্রেলিয়া: এল নিনোর কারণে অস্ট্রেলিয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করে, যা সেখানে তীব্র খরা, তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আফ্রিকা: আফ্রিকার ‘হর্ন অফ আফ্রিকা’ অঞ্চলে এর প্রভাবে বৃষ্টিপাত বাড়লেও দক্ষিণ, পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক ও খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়।

দক্ষিণ আমেরিকা: উপকূলীয় পেরু ও ইকুয়েডরসহ পশ্চিম দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে। এর বিপরীতে, উত্তর ব্রাজিলে দেখা দেবে শুষ্ক আবহাওয়া, যা আমাজন বনে দাবানলের বড় কারণ হতে পারে।

নিউজজি/এস আর

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers