শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০ , ১৩ শাবান ১৪৪৫

খেলা
  >
ক্রিকেট

স্মরণীয় হোক সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ’র শেষ বিশ্বকাপ

শামীম চৌধুরী ৭ অক্টোবর , ২০২৩, ০৭:৫৪:৩৭

439
  • এক ফ্রেমে সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ।ছবি-ইন্টারনেট

পঞ্চ পান্ডবের নেতা মাশরাফির বিশ্বকাপ অভিযাত্রা থেমেছে ক্রিকেটের সবচেয়ে অভিজাত ভেন্যু লর্ডসে-৪ বছর আগে। অবশিষ্ট তিনজনের মধ্যে এই বিশ্বকাপে মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে ছিল শঙ্কা।

বিশ্বকাপের আগে ৬ মাস ক্রিকেটের বাইরে থাকায় এবারের বিশ্বকাপ অনিশ্চিত ছিল তার। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজে তার ফেরাটা ছিল এসিড টেস্ট। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে ৪৯ রানের ইনিংসে পেয়েছেন ‘ ইয়েস কার্ড’।

অথচ, ২ মাস পর ইনজুরি কাটিয়ে যার ফেরাটা ছিল শুধুই ম্যাচ ফিটনেস পরীক্ষা, সেই তামিম নেই বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। এখানেই বাংলাদেশ ক্রিকেট ফ্যানরা খেয়েছেন ধাক্কা। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এই একটি ইস্যুতে দেশজুড়ে হচ্ছে আলোচনা-সমালোচনা। চায়ের টেবিলেও চলছে তামিমের ভিডিও বার্তা, টি-স্পোর্টসে সম্প্রচারিত সাকিবের দুই পর্বের ইন্টারভিউ নিয়ে আলোচনা।

এই দুই ক্রিকেটারকে লম্বা সময় আগলে রেখেছেন যিনি, সেই মাশরাফি মুরব্বীর ভুমিকায় অবতীর্ন হয়ে উভয়ের ভুল ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়েছেন বক্তব্য। বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়করাও বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সুখের ঘরে দুঃখের আগুন দেখতে পাচ্ছেন। 

ওডিআই ক্রিকেটকে গুডবাই জানিয়েও আড়াই বছর পর ফেরানো হয়েছে বেন স্ট্রেককে। ৬ মাস সব ধরণের ক্রিকেটের বইরে থাকার পরও ফিরিয়ে আনা হয়েছে কেন উইলিয়ামসনকে। বিশ্বকাপের আগে ফিটনেস নিয়ে সন্দিহান থাকার পরও কেন উইলিয়ামসনের জন্য জায়গাটা রেখেছে নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেট। রবিচন্দন অশ্বিনকে একটা সুযোগ খুঁজে শেষ মুহুর্তে নেয়া হয়েছে রিপ্লেশমেন্ট হিসেবে। বড় আসরে অভিজ্ঞরা গড়ে দেন ব্যবধান,এই যুক্তিটা শুধু প্রযোজ্য হয়নি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে।   

পঞ্চপান্ডব এখন নেমে এসে ত্রয়ীতে। সাকিব-মুশফিকের পাশে মাহমুদউল্লাহ। পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে গেছেন সাকিব-মুশফিক। তাদের কাতারে থাকতে পারতেন তামিম। ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে বাংলাদেশের এই ম্যাচ উইনারকে থামিয়ে দেয়া হয়েছে। এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে আইসিসির সর্বোচ্চ ক্রিকেট আসরে মাহমুদউল্লাহ’র অংশগ্রহন হবে চতুর্থবারের মতো।

মাহমুদউল্লাহ’র বয়স এখন ৩৮-এর কাছাকাছি। সাকিব-মুশফিক সেখানে ৩৬।বয়সটা বলছে, ৪ বছর পর বিশ্বকাপে খেলা তাদের জন্য অসম্ভব। 

এবারের বিশ্বকাপই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক সাফল্যের এই তিন নায়কদের শেষ বিশ্বকাপ। এই  ঘোষণাটা দিয়েই এবারের বিশ্বকাপ অভিযাত্রায় বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। বিশ্বকাপে একমাত্র বাংলাদেশী ক্রিকেটার হিসেবে হাজার রানের মাইলফলক ছুঁয়েছেন তিনি।

২০০৭ থেকে ২০১৯, এই চার আসরে ২৯ ম্যাচে ৪৫.৮৪ গড়ে ১১৪৬ রানে বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের মধ্যে সবার উপরে। ১১৪৬ রানের পাশে ২৯ উইকেটে ইতোমধ্যে বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারের স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। এই বিশ্বকাপে বেশ কিছু মাইলস্টোনের হাতছানি এই বিশ্বসেরার সামনে। 

বিশ্বকাপের এই আসরে ৩৫২ রান করতে পারলে শচীন (২২৭৮), পন্টিং (১৭৪৩), সাঙ্গাকারার (১৫৩২) পর চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে ১৫০০ ক্লাবের সদস্যপদ পাবেন। বিশ্বকাপে হাজার রানের এলিট ক্লাবের সদস্যপদের হাতছানি দিচ্ছে মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সামনে। আর মাত্র ১২৩ রান দূরে মুশফিকুর রহিম। মাহমুদউল্লাহকে করতে হবে সেখানে ৩৮৪ রান।এই বিশ্বকাপে রাউন্ড রবীন লিগে ৯টি ম্যাচের সব ক’টি খেলতে পারলে সাকিব-মুশফিক ছুঁয়ে ফেলবেন সর্বোচ্চ সংখ্যক ম্যাচ খেলার তালিকায় ৬ষ্ঠ অবস্থানে থাকা জয়সুরিয়াকে। 

যে দলটি ওডিআই সুপার লিগে পয়েন্ট তালিকায় যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকার সুবাদে পেয়েছে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার টিকিট। সেই দলটিই এই প্রথম দেশবাসীকে কোনো স্বপ্ন না দেখিয়ে বিশ্বকাপ অভিযাত্রায় বাংলাদেশ দল। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজ শেষ করে মাত্র ক’ঘন্টার বিশ্রাম নিয়ে বিশ্বকাপ যাত্রার কারনে আনুষ্ঠানিক ফটো সেশন, সংবাদ সম্মেলন হয়নি।

২০০৭ এবং ২০১৫ বিশ্বকাপ যাত্রার প্রাক্কালে সংবাদ সম্মেলনে খুব বেশি কিছুর আশা ছিল না বাংলাদেশ দলকে ঘিরে। গ্রুপ রাউন্ডের হার্ডল পেরুনোর স্বপ্নটা দেখানোর মতো সাহস ছিল না ওই দুটি আসরের প্রাক্কালে। অথচ, ওই দুটি আসরেই বাংলাদেশ করেছে সেরা পারফরমেন্স। ২০০৭ সালে ভারত, শ্রীলঙ্কার গ্রুপে পড়ে যেখানে গ্রুপ পর্ব শেষে বাংলাদেশ দলের ফিরে আসার কথা, সেখানে সময়ের সেরা ভারতকে বিদায় করে বাংলাদেশ খেলেছে সুপার এইট-এ। অস্ট্রেলিয়া-নিউ জিল্যান্ডের কন্ডিশনে খেলতে যেয়ে সাহস, মনোবল হারানোর শঙ্কা দেখেছেন যারা, তাদের শঙ্কাকে ভুল প্রমান করে ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খেলেছে কোয়ার্টার ফাইনালে।

এবারের বিশ্বকাপেও কী এমন কিছু’র সম্ভাবনা আছে ? বিশ্বকাপের একক কোনো আসরে ৩টির বেশি ম্যাচ জিততে পারেনি বাংলাদেশ। এবার সে লক্ষ্যটা বাড়িয়ে নিয়েছেন বাংলাদেশ দলের হেড কোচ হাতুরুসিংহে। তার টার্গেট ৪ থেকে ৫টি ম্যাচ জয়। তা সম্ভব হলে বাংলাদেশ দলকে প্রথমবারের মতো ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসরে সেমিফাইনালে দেখতে পাবে ক্রিকেট বিশ্ব। ধর্মশালা থেকে সে স্বপ্নযাত্রার স্বপ্ন দেখছে পুরো দেশ। 

এবারের বিশ্বকাপ ভারতে বলেই কণ্ডিশন নিয়ে দুর্ভাবণার কারণ নেই। স্পোটিং পিচ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই। ইতোমধ্যে সব ধরণের পিচের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার প্রস্তুতিটা নিতে পেরেছে বাংলাদেশ দল। এই প্রথম ৫ পেসার নিয়ে বাংলাদেশ দলের বিশ্বকাপ অভিযাত্রার সাহসও প্রতিপক্ষদের আঁতকে দেয়ার মতো।

স্পিন ডিপার্টমেন্টেও আছে বৈচিত্র।দুই বাঁ হাতি স্পিনারের পাশে দুই অফ স্পিনার। নাজমুল হোসেন শান্ত হয়ে উঠেছেন দলটির ব্যাটিংয়ে নিউক্লিয়াস। লিটন, তাওহিদ হৃদয় বড় ম্যাচের ক্রিকেটার। মেহেদী হাসান মিরাজ সাকিবের জায়গাটা ধীরে ধীরে নিচ্ছেন ধারাবাহিকভাবে অলরাউন্ড পারফর্ম করে।   

সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ’র শেষ বিশ্বকাপটা স্মরণীয় করে রাখার দায়িত্বটা এখন কনিষ্ঠ টিমমেটদের। কারণ, বাংলাদেশের ক্রিকেটে পান্ডবদের পদচারণার শেষ যে দেখতে পাচ্ছে সবাই। অভিজ্ঞ-তারুন্যের মিশ্রনে গড়া দলটির ট্র্যাম্পকার্ড হতে পারেণ তরুণরাই। তাওহিদ হৃদয়, তানজিদ হাসান তামিম, তানজিম হাসান সাকিব, হাসান মাহমুদ,শরিফুল হাসানরা ৩ বছর আগে ছোটদের বিশ্বকাপ (অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ) জিতিয়ে এখন দেখাচ্ছেন অসাধ্য সাধনের স্বপ্ন।

(শামীম চৌধুরীর এই লেখাটি নিউজজি২৪.কম এর বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপলক্ষ্যে ছাপা কাগজে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যা থেকে নেয়া হয়েছে) 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন