বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮ , ১৩ সফর ১৪৪৩

খেলা

আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশের অভিষেকের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন

শফিকুল হক হীরা, সাবেক অধিনায়ক,ম্যানেজার জুলাই ২৮, ২০২১, ২৩:২০:৫৫

  • বিসিবির সাবেক সভাপতি কমোডোর (অব.) মুজিবুর রহমান এবং প্রথম আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশের দলের অধিনায়ক শফিকুল হক হীরা।ছবি-সংগৃহিত

সিজার ভাই-এর সঙ্গে আমার পরিচয় পূর্ব পাকিস্তান আমলে।উনারা ৪ ভাই ইরানী,ইকবাল,জিয়াউদ্দিন টিটু এবং সিজার ভাই একসঙ্গে খেলতেন জিমখানায় ।দারুণ ব্যাটিং করতেন।

সিজার ভাইয়ের কভার ড্রাইভ ছিল দেখার মতো।ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে আমি যখন ইগলেটসে খেলি,তখন ওনাকে কিছুদিনের জন্য টিমমেট হিসেবে পেয়েছিলাম।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ক্রিকেট পুনর্গঠন প্রক্রিয়া যখন চলছে,তখন উনি সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন।তখন তিনি নেভির সেকেন্ড ইন চীফ।বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিবি) একাদশের ব্যানারে ১৯৭৭ সালের ৭ থেকে ৯ জানুয়ারি এমসিসির বিপক্ষে আমরা ঐতিহাসিক তিনদিনের বেসরকারী টেস্ট ম্যাচ খেলেছি, সেই দলের ম্যানেজার ছিলেন উনি।

তখন দামাল ভাই (পাকিস্তান আমলের প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটার মরহুম মাজহারুল ইসলাম দামাল) এর সঙ্গে নির্বাচকের দায়িত্বেও ছিলেন। নৌবাহিনীর বড় পদে চাকুরি করে সময় বের করা কষ্টকর। তারপরও আমাদের অনুশীলন দেখতে মাঝে মাঝে চলে আসতেন।

১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ প্রথম স্বীকৃত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলেছে আইসিসি ট্রফিতে। ইংল্যান্ডের সেই টুর্নামেন্টে সিজার ভাই ছিলেন টিম ম্যানেজার, আমি বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক।আইসিসি ট্রফিতে আমাকে অধিনায়ক নির্বাচিত করা হবে,তা কখনো কল্পনায়ও ভাবিনি। আশরাফুল,রকিবুল,ইউসুফ বাবু দলে আছে বলে একজন উইকেট কিপার কাম ব্যাটসম্যান হয়ে দলে থাকতে পেরেই খুুশি ছিলাম।

ইংল্যান্ড যাত্রার আগে আমাদের কন্ডিশনিং ক্যাম্পটা হয়েছিল নেভাল হেডকোয়ার্টারে।কন্ডিশনিং ক্যাম্প শেষে উনি আমাকে ওনার অফিসে ডেকে নিলেন। আমকে বসতে দিয়ে বললেন-'হীরা, আইসিসি ট্রফিতে তুই বাংলাদেশ দলের ক্যাপ্টেন।' আমি তো অবাক। কৌতুহলবশতঃ জানতে চাইলাম, -' আশরাফুল, রকিবুল নয় কেন ? ইংল্যান্ডে আইসিসি ট্রফিতে খেলব আমরা। ওখানে লেখা-পড়া করেছে আশরাফুল। খেলেছেও ক্রিকেট সেখানে। ওই কন্ডিশন,কালচার-সবই ভাল জানে আশরাফুল। তাকে ক্যাপ্টেন করাই তো উচিৎ ছিল।'

এ প্রশ্ন করেও থমকে যেতে হলো। আমি সারগোদা ক্যাডেট ছিলাম, উনিও ক্যাডেট ছিলেন। হয়তবা এ কারণেই অধিনায়ক হিসেবে আমাকে উনি মনোনীত করেছেন।

এখন বড় বড় টুর্নামেন্ট সামনে রেখে ক্রিকেটে কন্ডিশনিং ক্যাম্প বাধ্যতামূলক হয়েছে।সে সময়ে এমন কিছু অনেক দেশই ভাবতো না। অথচ,আশ্চর্য হলেও সত্য,১৯৭৯-এর আইসিসি ট্রফিতে অংশ নেয়ার আগে নেভাল ক্যাম্পে ৬ সপ্তাহের জন্য কন্ডিশনিং ক্যাম্প-এর বন্দোবস্ত উনি করেছিলেন। তখন ক্রিকেট বোর্ডে টাকা-পয়সা ছিল না বলে নেভাল হেড কোয়ার্টারে এই ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। নেভাল হেড কোয়ার্টারে তখন সব কিছু নতুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে রানিং। নেভাল হেড কোয়ার্টার থেকে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত। আমাদের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল নৌবাহিনীর এক সার্জেন্টকে। এতো লম্বা পথ দৌড়ুতে হতো। আমরা কেউ কেউ ফাঁকি দিতে চেষ্টা করতাম। রিক্সা পেলে উঠে পড়তাম। একবার ধরা খেয়েছি আমি। 

সকালে রানিং শেষে ক্যাম্পে ফিরে নাস্তা খেয়ে কিছুক্ষণ ফিল্ডিং। সেই ফিল্ডিং অনুশীলন করাতেন কোচ আলতাফ ভাই। বল ভিজিয়ে বলতেন-'ক্যাচ ধর।' ওনাকেও ক্যাম্পে আমাদের সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন সিজার ভাই। ফিল্ডিং শেষে আধঘন্টা সুইমিং।নেভাল হেড কোয়ার্টারে আমাদের জন্য উইকেটও তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে চলতো বিকেলে নেটস।প্রতি সপ্তাহে একদিন ছুটি পেতাম।শুরুতে কষ্ট মনে হলেও একটা সময় আমরা সবাই এই কন্ডিশনিং ক্যাম্প মানিয়ে নিয়েছিলাম।   

১৯৭৯ আইসিসি ট্রফি শুরুর আগে উনি আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন-'তোমাদের সবার পূর্ব পাকিস্তান আমলে প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা আছে। এই লেভেলে তোমরা পারফর্ম করবে-এ ব্যাপারে আমি আশাবাদি।' উনি তখন নেভির সেকেন্ড ইন চীফ বলেই আমরা যখেষ্ট শ্রদ্ধা করতাম। আমাদের দৈনিক হাত-খরচাটা ওনার কাছ থেকে নিতে হতো না। সহকারী  ম্যানেজার ছিলেন রেজা-ই-করিম ভাই, উনিই প্রতিদিন আমাদেরকে দৈনিক হাত খরচা বাবদ ১১ পাউন্ড করে দিতেন। 

১৯৭৯ আইসিসি ট্রফিতে আমাদের দলের সঙ্গে ছিলেন না কোন কোচ। তবে ইংল্যান্ডে পা রেখে পরামর্শক কোচ হিসেবে পেয়েছিলাম পাকিস্তানের লিজেন্ডারি ক্রিকেটার মুস্তাক মোহাম্মদকে। সিজার ভাই-ই তাকে আমাদের ব্যাটিং টিপস দিতে নিয়ে এসেছিলেন।সম্ভবতঃ সিজার ভাই-এর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই আমাদের নেটসে মাঝে-মধ্যে আসতেন। দিতেন প্রয়োজনীয় টিপস।

আইসিসি ট্রফির সেই আসর চলাকালে রানী এলিজাবেথের পক্ষ থেকে বাকিংহাম প্যালেসে সৌজন্য ডিনারের আমন্ত্রন পেয়েছিলাম। পরিপাটি থাকার ব্যাপারে সিজার ভাই খুব সচেতন ছিলেন। স্যুট-টাই ঠিকঠাক মতো আছে কি না, তা উনি নিজে চেক করেছেন। এমনকি কারো মোজা থেকে দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে কি না, বাকিংহাম প্যালেসে যাওয়ার সময় সেটাও চেক করেছেন !

১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৮৩ সালের ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত উনি ছিলেন বিসিসিবির সভাপতি। ওনার আমলে ১৯৮২ সালে আইসিসি ট্রফিতেও বাংলাদেশ দলের ক্যাপ্টেনসি করেছি। সেবারও এই পদে আমি ওনার পছন্দের তালিকায় ছিলাম। আইসিসি ট্রফিতে দল ঘোষণার পর আমাকে অধিনায়ক মনোনীত করা হলো। সহ-অধিনায়ক মনোনয়নে সিজার ভাই মতামত নিয়েছেন আমার।

সিজার ভাই একদিন ডেকে জিজ্ঞেস করলেন-' তুমি তো ক্যাপ্টেনসি করবে, তাই কাকে ডেপুটি হিসেবে পেলে ভাল হয়, এটা তুমিই সিদ্ধান্ত নাও। ভাইস ক্যাপ্টেন পদে একজনের নাম দাও ?' আমার মতামত যখন চেয়েছেন সিজার ভাই, তখন আমি দিলাম বাদশাহ'র নাম। আমার এই পছন্দে আপত্তি করলেন না সিজার ভাই।

১৯৮২ সালে আইসিসি ট্রফিতে অংশ নেয়ার আগে ভারতের হায়দারাবাদ ব্লুজকে বাংলাদেশ সফরে এনেছিলেন সিজার ভাই। ওই দলটিতে ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটার চেতন চৌহান,রজার বিনি,অংশুমান গায়ইকোয়াড,চন্দ্রশেখর। তাদের সাথে খেলে আইসিসি ট্রফ্রির প্রস্তুতিটা ভালই হয়েছে আমাদের।১৯৭৭ সালের ৭ থেকে ৯ জানুয়ারি এমসিসির বিপক্ষে ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) অনুষ্ঠিত তিন দিনের বেসরকারী টেস্ট ম্যাচের অধিনায়ক শামীম কবির এবং সহ-অধিনায়ক এ এস এম ফারুক ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ায় এই দুইজনকে ১৯৮২ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফিতে ম্যানেজার এবং সহকারী ম্যানেজারের দায়িত্ব দিয়ে ক্রিকেট দলের সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন সিজার ভাই। তার এই সিদ্ধান্তও ছিল প্রশংসনীয়। 

সিজার ভাই বিসিসিবির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে যে দুই বছর এই পদে ছিলেন, তখন বিসিসিবির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কে জেড ইসলামকে। তার এই পছন্দটি ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বিস্তৃত করার মাইলফল। সিজার ভাই-এর আমলেই কে জেড ইসলাম প্রবর্তন করেছেন নির্মাণ স্কুল ক্রিকেট। সিজার ভাই যখন ব্রাজিলের দূত হয়ে ঢাকা ছাড়েন, তার আগে কে কেজ ইসলামকে বিসিসিবির সভাপতি হিসেবে মনোনীত করার প্রস্তাব করেছিলেন সে সময়ে বাংলাদেশের সরকার প্রধানের কাছে।তার সে প্রস্তাব গৃহিত হয়েছে।

২০০৩ সালে বিসিবিতে ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের খেলা দেখতে গিয়েছিলাম দক্ষিণ আফ্রিকায়। বিশ্বকাপের সেই আসরে বাংলাদেশ যাচ্ছ-তাই খেলেছে। কেনিয়া,কানাডার মতো আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশের কাছে লজ্জাজনকভাবে হেরেছে। টিম ম্যানেজার ছিলেন ফারুক (এ এস এম ফারুক)।তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। তার চোখ ফাঁকি দিয়ে কোন কোন খেলোয়াড় রাতে টিম হোটেল থেকে বেরিয়ে গভীর রাতে ফিরেছে হোটেলে। মিডিয়ায় এসব নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে।

বিসিবির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, এমন দু'জনকে দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন বিসিবির তৎকালীন সভাপতি আলী আসগর লবি। ওই তদন্ত কমিটি গঠনের আগে আমার কাছে চেয়েছিলেন তিনি তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে একজনের নাম। আমি সিজার ভাই-এর নামটা দিয়েছিলাম। তিনি পানি সম্পদ মন্ত্রানালয়ের সাবেক সচিব শামীম আহসানকে নিয়ে তদন্ত করেছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৪৪ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্ট দিয়েছেন তিনি।

সেই রিপোর্টে অভিযুক্তদের দায়িত্ব থেকে বাদ দেয়ার সুপারিশ করেছিলেন তিনি। সেই সুপারিশেই পাইলট হারিয়েছে ক্যাপ্টেনসি।এ এস এম ফারুক ম্যানেজার পদে অযোগ্য ঘোষিত হয়েছে। বিসিবি পরিচালনায় পেশাদারীত্ব প্রথা প্রবর্তনে একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের ফর্মূলাও দিয়েছিলেন তিনি ওই তদন্ত রিপোর্টের সুপারিশমালায় । তার এই তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেছে। সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বিসিবি। এবং রিপোর্টের আলোকে যথাযথ ব্যবস্থাও গ্রহন করেছে বিসিবি।

সিজার ভাই-এর অনেক স্মৃতি আছে ।তার সঙ্গে চট্টগ্রামে গলফ খেলেছি দিনের পর দিন। তবে বাংলাদেশের প্রথম স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে আমার প্রথম ক্যাপ্টেনসির আসরে উনি ছিলেন ম্যানেজার। উনিই আমাকে অধিনায়ক মনোনীত করেছেন-যতোদিন বেঁচে থাকবো,ততোদিন তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো আমি।দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়েছেন,চিকিৎসার জন্য একটা হাত কাঁটা পড়েছিল তার।বাংলাদেশের ক্রিকেটের দুঃসময়ের কান্ডারিকে হারানোর কষ্টটা উপলদ্ধি করছি। ক্রিকেটে ওনার সাংগঠনিক কর্মকান্ড বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেটার-ক্রিকেট সংগঠকদের কাছে উপস্থাপনের দায়িত্বটা নিতে হবে বিসিবিকে।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers