সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ আশ্বিন ১৪২৮ , ১১ সফর ১৪৪৩

অন্যান্য
  >
নারী দিবস

নারীর সম্মান মেধা ও মননে, নারী দিবসে নয় !

কাজী সুলতানা শিমি ৮ মার্চ , ২০১৯, ১৭:৩৮:২৬

  • নারীর সম্মান মেধা ও মননে, নারী দিবসে নয় !

সমাজ পরিবর্তনে ফেমিনিজম বা নারীবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সমাজে, রাষ্ট্রে ও জনগুষ্টিতে নারী অধিকার নিয়ে নানা ধরণের আন্দোলন, বিপ্লব ও লড়াই চলছে বহু যুগ থেকে। পৃথিবীতে পুরুষ-শাসিত সমাজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর নানা ভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে নারীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার। ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হতে নারীরা যখন একেবারে প্রান্তিক সীমানায় এসে পৌঁছে তখন অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নামা ছাড়া কোন গতি থাকেনা।
নারীর অধিকার আদায়ের পক্ষে যারা সমর্থন ও সুযোগ সৃষ্টি করে থাকেন তারাই নারীবাদী।নারীবাদ শব্দটি ফরাসি শব্দ থেকে এসেছে। পরিস্থিতির বাস্তবতা ও প্রয়োজনে নারীসমাজকে অধিকার সচেতন হতে হয়। নারীবাদ ও নারীবাদী আন্দোলন শুধু নারীদের একক প্রচেষ্টার প্রতিফলন নয়, বহু পুরুষ এই প্রবর্তন ও বিবর্তনে স্বেচ্ছায় শরীক হন। একথা অনস্বীকার্য যে, অতীতে এবং বর্তমানে অনেক পুরুষই নারীর প্রতিবাদী কণ্ঠ দৃঢ়প্রত্যয়ে সমর্থন করেছেন।
 
আধুনিক নারীবাদের প্রবক্তা মেরীওলস্টোন ক্রাফট বলেন, নম্রতা ও মধুর আবেদনময়ী সৌন্দর্য-ই শুধু চেয়েছে পুরুষ, নারীদের মধ্যে। কোন স্বাভাবিক বিকাশ তারা চায়নি আর সে শিক্ষা শুধু নিরর্থক-ই নয়, ক্ষতিকরও। সাধারণত নারীবাদীদের মতে, নারীকে অধিকার দিতে ভয় পাচ্ছে পুরুষ। তারা মনে করে অধিকার ভাগ হলে পুরুষের প্রাধান্য চলে যাবে। সুতরাং প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্যই নারীকে অধিকার দেওয়া যাবে না।তাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শেখাতে হবে, তারা পুরুষের সমান নয়। সুতরাং সমাজে, রাষ্ট্রে এবং পরিবারে পুরুষের মতো অধিকার তারা পাবে না।
নারীবাদী তত্ত্বের বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে, এর মধ্যে-লিবারেল, মার্কসিস্ট বা সোশ্যালিস্ট, রাডিকাল, ইকো, কালচারাল, গ্লোবাল- এ জাতীয় নানা শ্রেণী বিন্যাস করে বিভিন্ন বিশ্লেষক, গবেষক তার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং গবেষণা দ্বারা নারীবাদের প্রকারভেদ নির্ধারণ করেন।জুডিথ অ্যাস্টেলারা তার বইতে নারীবাদ সম্পর্কে বলেছেন, নারীবাদ হচ্ছে সামাজিক পরিবর্তন ও আন্দোলনের লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা, যা নারী নিপীড়ন বন্ধ করার লক্ষ্যে চেষ্টা করে থাকে। এ প্রসঙ্গে ভার্জিনিয়া উলফ-এর একটি উক্তি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তার মতে, আত্মার মাঝে দু’ধরণের শক্তি রয়েছে- পুরুষ সুলভ ও নারী সুলভ। পুরুষদের মস্তিষ্কে নারীসুলভ শক্তির উপর পুরুষসুলভ শক্তি প্রাধান্য বিস্তার করে আর মেয়ের মস্তিষ্কে এর বিপরীত। স্বাভাবিক ও সুখকর অবস্থা তখনই আসবে যখন এ দুয়ের সমন্বয় সাধন ঘটবে। পুরোপুরি পুরুষসুলভ ও পুরোপুরি নারীসুলভ মন কোনটাই সম্ভবত সৃষ্টি শীল কিছু ভালোমতো করতে পারে না। 
 
লিবারেল ফেমিনিস্টরা পুরুষকে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করেন না।লিবারেল ফেমিনিজম মনে করে, আইনগত বৈষম্য, চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতাই নারী-পুরুষ বৈষম্যের মূল কারণ। নারীদের অধস্তন অবস্থানটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গ্রহণ করায় এ অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পেতে আরও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। অবস্থান পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সমাজ সচেতনতা এবং শিক্ষা বিস্তার। তবে নারী যত দিন সচেতন না হবে, তত দিন নারীর অধস্তনতা দূর হবে না।লিবারেলবাদীরা সমাজ পরিবর্তনে বিপ্লবের প্রয়োজন মনে করেন। তাদের মতে, বর্তমান সমাজব্যবস্থার মধ্যে থেকেও পরিবর্তন আনা সম্ভব। নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে সমতা আনা যায়, তবে তার জন্য প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। তাদের অধিকাংশই মনে করেন, সমাজ সংশোধনের আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনটি সম্ভব।
সমাজতন্ত্রী বা মার্কসীয় নারীবাদে বিশ্বাসীরা মনে করেন, সভ্যতার ঊষালগ্নে নারীদের এই অধস্তন অবস্থানটি ছিল না। বরং সমাজে তারা নেতৃত্ব দিতেন। পরিবার প্রতিপালনের দায়িত্ব ছিল প্রধানত নারীদের। পুরুষরা সেই যুগে খাবার সংগ্রহে বা শিকারে যেতেন। কিন্তু বহির্মুখী কর্মপ্রয়াস হওয়ায় এ দুটো ছিল অনিশ্চিত। অন্যদিকে নারীরা নিশ্চিত খাবার অর্থাৎ ফলমূল জোগাড় এবং সন্তান লালনের কর্তব্য কাঁধে নেওয়ায় তারা সমাজ ও পরিবারের প্রধান আসনটি দখল করে নিয়েছিলেন।
 
কিন্তু সভ্যতার ক্রমবিকাশের ফলে চাষাবাদের অগ্রগতি, নিত্যনতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার, সমাজ জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনলেও ধীরে ধীরে নারীর আসনটিকে সমাজে পুরুষের চেয়ে অধস্তন করে দেয়। বহির্মুখী প্রবণতা ও স্বভাব গত বৈশিষ্ট্যে পুরুষ প্রযুক্তিগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এ সময়ে নারীরা পারিবারিক পরিচ্চায় মনোনিবেশ করে।সময়ের বিবর্তনের পাশাপাশি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়-  পুরুষতান্ত্রিক পরিবার, ব্যক্তি মালিকানা, শ্রেণীবিভক্ত সমাজ। এগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয় রাষ্ট্র, পুরুষের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে।সেই যে নারীরা বৈষম্যের শিকার হলো, যুগের পর যুগ তা-ই চলে আসছে।
সব যুগ, বিশেষ করে পুঁজিবাদী যুগ নারী শোষণকে আরো তীব্রতর করেছে। পুঁজিবাদ নারীর নারীত্বকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে, আবার পুরুষের সঙ্গে একই শ্রমে নারীকে মজুরি কম দিচ্ছে। যেহেতু ব্যক্তি মালিকানা এবং শ্রেণী বিভাজিত পুঁজিবাদ সমাজে পুরুষ প্রাধান্য এবং নারী বৈষম্যের মূল কারণ, সুতরাং নারী মুক্তি এবং নারী-পুরুষ সমতার জন্য সমাজে একটি ’সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব’ প্রয়োজন। একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব দ্বারাই সমাজে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এই বিপ্লবই উৎপাদন এবং বণ্টন উভয় প্রক্রিয়ায় নারী ও পুরুষ উভয়ের মাঝে সমতা আনবে।
 
এদিকে, রাডিক্যাল ফেমিনিস্টদের মতে, পুরুষের পুরুষত্ব একেবারেই মানসিক ব্যাপার; এবং এই পুরুষত্ব প্রকাশের জন্যই সমাজে নারী-পুরুষ বৈষম্য। রাডিক্যাল ফেমিনিজমের ধারণা সাম্প্রতিক বিশ্বের বিশ শতকের সত্তর দশক থেকে। শুলামিথ ফায়ারস্টোন তার গ্রন্থে এ ধারণাটি বিশ্লেষণ করেন। তারা পুঁজিবাদকে নারী বৈষম্য-বঞ্চনার উৎস হিসেবে স্বীকার করে না। বরং বলা হয়, নারী-পুরুষ বৈষম্য প্রকৃতিগত। প্রকৃতি নারীকে সন্তান ধারণের ক্ষমতা দিয়েছে, যার ফলে নারী অধস্তন। সন্তান ধারণের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই নারী দুর্বল-পুরুষের চেয়ে অধস্তন।
যতদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে জন্মনিয়ন্ত্রণের অন্যকোনো উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন না হবে, তত দিন পর্যন্ত নারী-পুরুষের বৈষম্য থাকবেই। উপনিবেশবাদ, পুঁজিবাদ, বর্ণবাদ-রাষ্ট্র এবং সমাজের সব ধরনের শোষণ-বঞ্চনা পুরুষত্বের বহিঃপ্রকাশ। নারী-পুরুষের বৈষম্য ও বঞ্চনা প্রাকৃতিক। তারা মনে করেন-উন্নত প্রযুক্তি, সঠিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, কৃত্রিম পদ্ধতিতে প্রয়োজনে সন্তান জন্ম দান–এসব বিকল্প পন্থার অণুশীলনের মধ্যেই নিহিত আছে নারীমুক্তি। অর্থনৈতিক কারণটি এখানে মুখ্য নয়।
 
সোশ্যালিস্ট ফেমিনিস্ট এবং রাডিক্যাল ফেমিনিস্ট- উভয়ের মতে নারীরা বৈষম্য-বঞ্চনার শিকার। ফায়ারস্টোনের মতে, নারী নিপীড়নের মূল যেহেতু জৈবিক, কাজেই উভয়লৈঙ্গিক সমাজ গঠিত হলে সমাজে নারীর ওপর অত্যাচার থাকবে না। সোশ্যালিস্ট ফেমিনিস্ট মনে করে, অর্থই অনর্থের ভূমিকা পালন করছে।
ব্যক্তিগত সম্পত্তি তথা পুঁজিবাদ এর মূল কারণ। রাডিক্যাল ফেমিনিস্ট মনে করে, পিতৃতন্ত্র অথবা পুরুষ প্রাধান্য অথবা পুরুষত্বই নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ। তবে দুটি মতই পৃথিবীতে শান্তিপূর্ণ সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা চাচ্ছে। তারা মনে করেন, সব মানুষ জন্মগতভাবে এক। কাজেই মনুষ্যত্ব বিকাশেও আত্মবিকাশে সবার জন্য একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত।রাডিক্যাল ফেমিনিস্টরা মনে করেন, বেশির ভাগ নারীরা এখনো পরিবার ও কর্মক্ষেত্র দুটো কাজেই  নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
 
এতোসব সমাজ বিবর্তন, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও সময়ের ক্রমবিকাশের পর ও আধুনিক সমাজে মূলত মানসিক ভাবে আমরা এখনো সমবাদী হতে পারিনি। সমাজে নারী পুরুষের অবদান সমান বলে কেবল প্রতীকী মনোভাব দেখালেই সমাজ সমবাদী হয়ে যাবেনা এর জন্য প্রয়োজন মন থেকে গ্রহণের সদিচ্ছা। একটি আলোকিত পৃথিবী গড়া তখনি সম্ভব যখন নারীপুরুষ উভয় পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক-এ মানসিকতা তৈরি হবে। অন্যথায় লিবারেল, সোশ্যালিস্ট আর রাডিক্যাল-এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ চলবে আরও বহুকাল-বাস্তব প্রয়োগ দুরাশা মাত্র! 
 
 
 
 
নিউজজি/এসএফ

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers