সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ আশ্বিন ১৪২৮ , ১১ সফর ১৪৪৩

অন্যান্য
  >
নারী দিবস

নারী, তুমি আছো সমানে সমান

কাজী সুলতানা সীমি ৭ মার্চ , ২০১৯, ১৪:৫২:৫৮

  • নারী, তুমি আছো সমানে সমান

নারীর সম্মান তার মেধা ও মননে, কেবলই নারীত্বতে নয়... নারীর প্রতি ভালো লাগা কিংবা যৌন আকর্ষণ অনুভব করা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। এটা প্রাকৃতিক নিয়ম। ভালো কাউকে লাগতেই পারে। ভালো লাগা বা ভালোবাসা দোষের কিছু নয়। কিন্তু এই ভালো লাগা বা ভালোবাসা যেন বিকৃত লালসা বা কামে রূপান্তরিত না হয় সেদিকে বিশেষ নজর দেয়া দরকার। খেয়াল রাখতে হবে লালসা বা কামে আসক্ত হয়ে যেন কোনো অবাঞ্ছিত ঘটনা না ঘটে। সেটা যেন অনাকাঙ্ক্ষিত বা সমাজে ক্ষতির কারণ না হয়।

খুন বা ছিনতাই যেমন সামাজিক অপরাধ মনে করা হয় তেমনি লালসা বা কামে আসক্ত হয়ে ধর্ষণ করাটা মন্দ কাজ মনে করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। সমাজে নানা ধরনের মানুষের বসবাস তবে সবাই লালসা বা কামে আসক্ত হয়ে যৌনক্রিয়া বা ধর্ষণ করার উদ্যোগ নেয় না। তাদের ভিতর যৌনাকাঙ্ক্ষা জাগলেও তা তাদের মনে মনেই রেখে দেয়। অধিকাংশ পুরুষই চেষ্টা করে নিজেদের সংযত করতে। তারা জানে কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের কামনা-বাসনা সফল করার অভিপ্রায় মানে বিপরীত লিঙ্গকে যৌন নির্যাতন করা। তারা জানে এটা মানবতাবিরোধী কাজ।

আমরা জানি, টেস্টস্টেরন হরমোন নিঃসরণ হওয়ার তারতম্যের জন্য যৌনক্রিয়া বা যৌনাকাঙ্ক্ষা জাগে। কারো কারো রক্তে এ হরমোন অধিক পরিমাণ থাকে। এতে তার নিজস্ব কোনো হাত নেই। সভ্য মানুষের মাঝে সচেতন এমনও কিছু পুরুষ আছে ডাক্তারের পরামর্শে নিজেদের অতিরিক্ত বা অবাধ যৌন-লালসা কমাতে ওষুধ সেবন করে। তারা শরীর থেকে টেস্টস্টেরন হরমোন কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু যারা ইচ্ছা করে নিজেদের সংযত করে না বা করতে চায় না, তারা সুযোগ পেলেই নারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাই শরীর থেকে টেস্টস্টেরন হরমোন কমিয়ে যে যৌনাকাঙ্ক্ষা নিবৃত করা যায় এই মানসিকতা ও সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

নারীদের ভোগ্যবস্তু মনে করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এই কুসংস্কারজনিত মনোভাব দুর করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। কিছু পুরুষ নারী বা শিশু ধর্ষণ করে। তার মানে এই নয় গোটা সমাজ তার জন্য দায়ী। আবার কেউ কেউ শিশু ছাড়া আর কারো প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করে না। এটা একধরনের মানসিক রোগ। তাই কিছু মানসিক রোগীদের জন্য গোটা সমাজ দায়ী হতে পারে না বা ঢালাও ভাবে পুরো পুরুষজাতিকে দোষারোপ করতে পারি না। আবার এটাও দেখা যায়, কারো প্রতি যৌন আকর্ষণ না থাকা কোনো মানসিক সমস্যা নয়, এ নিতান্তই তার স্বভাব।

তাদের মধ্যে যারা সৎ, দায়িত্ববান, তারা নিজেদের যৌনাকাঙ্ক্ষা সংযত করে, আর যারা তা নয় তারা চরম দায়িত্বহীনতার কাজ করে, অন্যায় করে, জোর করে ধর্ষণ করে। যেহেতু মস্তিষ্কের ওপর কারো হাত নেই, তাই কেউ কামুক হয়ে জন্ম নিলে আমরা তাদের দোষ দিতে পারি না। নানা কারণে কেউ কেউ কামুকতা বা যৌনতায় আসক্ত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু কোনো অপরাধ না করলে তাদের ঘৃণা করা বা তাদের একপেশে দৃষ্টিতে দেখা ঠিক নয়। বরং যৌোকাঙ্ক্ষা নিবৃত করার বা ধর্ষণ না করার সব রকম উদ্যোগ নিতে আমরা তাদের অনুপ্রাণিত করতে পারি।

ধর্ষণ কারো একার সমস্যা নয়। এটি একটি সামাজিক সমস্যা। মানুষ যদি একা তাদের সমস্যার সমাধান না করতে পারে, তারা যেন শুভাকাঙ্ক্ষীদের বা পেশাধারী সাহায্য নিতে পারে তার উদ্যোগ নিতে হবে। ধর্ষক হওয়ার আগেই যেন যৌনাকাঙ্ক্ষা নিবৃত করার পদক্ষেপ নেয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষের অবচেতন মনে নানা ইচ্ছা জাগে। সব ইচ্ছা পূরণ করা যায় না বা উচিতও নয়। যেমন রাগ হলে অনেকের যার সাথে রাগ সে মানুষটাকে খুন করে ফেলার ইচ্ছে হয়। কিন্তু খুন করে না। খুন করা উচিত নয় বলে করে না। তেমনি যাদের ইচ্ছে করে ধর্ষণ করতে, তারা যদি তাদের ইচ্ছাটাকে দমন করে। মনে করে যে ধর্ষণ করবে না, কারণ ধর্ষণ করা উচিত নয়। মানুষের ইচ্ছে হতেই পারে ধর্ষণ করার। তাই বলে সব ইচ্ছাপূরণ করা যাবে না এমনকি নারীকে অবলা মনে করলেও নয়।

মস্তিষ্ক খুব জটিল, সমাজের নিয়ম-কানুন আগে থেকে সেখানে তৈরি থাকে না, আমরা একে ভালো-মন্দের শিক্ষা দিয়ে পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তন মস্তিষ্ক থেকে দূর না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থা থেকে উত্তরণ এখনো অনেক সময়ের ব্যাপার। নারী মানে ভোগ্যবস্তু নয়, ধর্ষণের জন্য সহজলভ্য নয় এই মানবিকতা মস্তিষ্কের ভিতর গ্রোথিত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক একটা বিষয় উল্লেখ করছি। জিউফি ক্লাউট ইউরোপের এক মানবাধিকার কর্মী। তিনি পর্ন ইন্ডাস্ট্রির পারফরমারদের হয়ে পর্নবিরোধী প্রচারণায় নেমেছেন। তার প্রচারণা পর্ন সিনেমা দেখবেন না। এর কারণ, ফোনে ভাইরাস বা স্বাস্থ্য সচেতনার জন্য নয়, ব্যাপারটা হলো মানবিকতার।

ক্লাউট বলেছেন, ‘এই যে দুনিয়ার বহু মানুষ যাদের নীল ছবির দুনিয়ায় মুখে রঙ মেখে পারফরম করতে দেখেন। যাদের শরীর, যৌনতা দেখে উত্তেজনা বোধ করেন। তাদের জীবনের আসল সত্যিটা জানলে অন্যরকম ভাববেন।’ ক্লাউটের কথা আপনি যত পর্ন দেখবেন, তত চাহিদা বাড়বে, তত প্রযোজকরা চাপ দেবেন। ক্লাউট বলছেন, এসব বন্ধ হওয়া দরকার। কিন্তু এটাও জানান পর্ন ব্যবসা এতটাই বড় হয়ে গিয়েছে যে সেটা বন্ধ করা যাবে না, তবে কমানো যাবে। ক্লাউটের মতে, বন্ধ একটাতেই সম্ভব যদি আপনি দেখা বন্ধ করেন। তাই আমার মনে হয়, যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের কারণ হিসেবে অধিক মাত্রায় টেস্টস্টেরন হরমোন যেমন দায়ী তেমনি পর্ন দেখার মানসিকতা সমান ভাবে দায়ী।

তাই শুধুমাত্র পুরুষতন্ত্র বা গোটা সমাজকে ঢালাওভাবে দোষারোপ না করে মূল কারণগুলো জেনে সমাধানের চেষ্টা করা দরকার। কোনো নারী নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা ঘটার পর উৎকণ্ঠায়, উদ্বিগ্নতায় কিংবা আবেগে আহা-উহু করি কিছুদিন। তারপর বেমালুম ভুলে যাই। তা না করে পুরো মানসিকতার পরিবর্তনটা আগে করা দরকার। মূল উৎপাটনে সবারই সমান ভূমিকা আছে- সমাজের, পরিবারের, পুরুষের এমনকি নারীদেরও। 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers