বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ৩ জিলহজ ১৪৪৭

জীবনযাত্রা

কন্টাক্ট লেন্সে পরজীবীর আক্রমণ: বাঁচতে হলে যা করতে হবে

নিউজজি ডেস্ক জানুয়ারী ১২, ২০২৬, ১৬:৩৮:৫১

231
  • ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: টেরেসা সানচেজ তখন মেক্সিকোতে, চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন। প্রায় চার বছর আগের কথা। হঠাৎ ডান চোখে খচখচানি শুরু হলো, মনে হচ্ছিল চোখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ভেবেছিলেন হয়তো কন্টাক্ট লেন্স ছিঁড়ে গেছে। অথবা প্রতিদিনের লেন্সের বদলে মাসব্যাপী ব্যবহারের লেন্স পরায় এমন হচ্ছে। হয়তো শরীর কোনো রোগের সঙ্গে লড়ছে—এমনটাও ভেবেছিলেন তিনি।

কিন্তু পরের তিন মাস যে বিভীষিকা তার জন্য অপেক্ষা করছিল, তা তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। ক্ষুদ্র এক পরজীবী আক্রমণ করেছিল তার চোখের কর্নিয়ায়। তীব্র যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। আর ফলাফল—দৃষ্টিশক্তি চিরতরে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি।

লাস ভেগাসের বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সী সানচেজ সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, 'আমি আমার ঘরের জানালা খুলতে পারতাম না। আলো চোখে পড়লেই অসহ্য ব্যথা হতো।' তিন মাস ধরে ভুল চিকিৎসার পর তিনি নিজেই অনলাইনে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করেন।

লক্ষণ মিলিয়ে সানচেজ বুঝতে পারেন, তিনি হয়তো বিরল 'অ্যাকানথামিবা কেরাটাইটিস' রোগে আক্রান্ত। পরে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ তার এই আশঙ্কা নিশ্চিত করেন। কেরাটাইটিস হলো কর্নিয়ার প্রদাহ। কর্নিয়া চোখের বাইরের স্বচ্ছ স্তর, যা দেখতে অনেকটা গম্বুজের মতো এবং দৃষ্টিশক্তির জন্য অপরিহার্য।

অ্যাকানথামিবা কী?

স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব লা লাগুনার প্যারাসাইটোলজি বা পরজীবীবিদ্যার অধ্যাপক ডা. জ্যাকব লরেঞ্জো-মোরালেস জানান, অ্যাকানথামিবা হলো এক ধরনের এককোষী প্রাণী। বেঁচে থাকার জন্য এর কোনো হোস্ট বা পোষক দেহের দরকার হয় না। সাধারণত পানি ও মাটিতে এটি পাওয়া যায়। এটি কেরাটাইটিস সৃষ্টিকারী অনেক জীবাণুর মধ্যে অন্যতম।

আলাস্কার প্যাসিফিক ক্যাটারাক্ট অ্যান্ড লেজার ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. পল বার্নি বলেন, এই সুবিধাবাদী পরজীবী চোখের উপরিভাগে পৌঁছে কর্নিয়ায় আটকে যায়। যদি কর্নিয়ার এপিথেলিয়াম স্তরে (যা ব্যথার প্রতি খুবই সংবেদনশীল) কোনো ক্ষত থাকে, তবে পরজীবীটি কর্নিয়ার গভীরে ঢুকে পড়ে।

আমেরিকান অপটোমেট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের ট্রাস্টি ডা. বার্নি জানান, অ্যাকানথামিবা কেরাটাইটিস একটি বিরল রোগ। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ২০টি দেশে বছরে ২৩ হাজারের বেশি মানুষ এতে আক্রান্ত হন।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আক্রান্তদের ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশই কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহারকারী। লেন্স পরলে চোখে এমন পরিবেশ তৈরি হয় যা অ্যাকানথামিবার জন্য আদর্শ। লেন্স খোলার সময় বা পরার সময় কর্নিয়ায় আঁচড় লাগতে পারে, যা জীবাণুর প্রবেশের পথ করে দেয়। আবার লেন্সের গায়ে বা লেন্স ও চোখের মাঝখানে পরজীবী আটকে গিয়েও সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

ডা. বার্নি সতর্ক করে বলেন, 'দ্রুত ধরা না পড়লে এবং ঠিকমতো চিকিৎসা না হলে এটি ধ্বংসাত্মক হতে পারে। এটি মূলত কর্নিয়াকে খেয়ে ফেলে, যার ফলে প্রদাহ হয়, টিস্যু নষ্ট হয় এবং শেষ পর্যন্ত দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।'

রোগ নির্ণয়ে ভোগান্তি

রোগটি বিরল হওয়ায় অনেক চক্ষু বিশেষজ্ঞও শুরুতে এটি ধরতে পারেন না। সানচেজের মতো অনেকেই টিকটক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখার আগে এই রোগের নামও শোনেননি। লেন্সের প্যাকেটে বা চিকিৎসকের পরামর্শে গোসল বা সাঁতারের সময় লেন্স খুলতে বলা হলেও অনেকে তা গুরুত্ব দেন না।

কন্টাক্ট লেন্স সোসাইটি অব আমেরিকা (সিএলএসএ) জানায়, লেন্স হলো মেডিকেল ডিভাইস। তাই এর যত্ন ও পরিচ্ছন্নতা—যেমন সাঁতার, গোসল বা ঘুমানোর সময় লেন্স না পরা—অত্যন্ত জরুরি।

ব্যথা, আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা ও ঝাপসা দৃষ্টি ছাড়াও চোখ লাল হওয়া, পানি পড়া এবং চোখে কিছু আটকে আছে এমন অনুভূতি হতে পারে। অন্য সংক্রমণের সঙ্গে লক্ষণ মিলে যাওয়ায় অনেক সময় ভুল চিকিৎসা হয়। সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে ফেলা হয় হারপিস সিমপ্লেক্স কেরাটাইটিসের সঙ্গে।

সানচেজকেও শুরুতে ভুল চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে বলা হয়েছিল তার 'পিঙ্ক আই' বা চোখ ওঠা রোগ হয়েছে। ভুল ড্রপ ব্যবহারের ফলে তার অবস্থা আরও খারাপ হয়। আরেক চিকিৎসক ব্যাকটেরিয়াল পিঙ্ক আই ভেবে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ড্রপ দেন, যার ফলে সানচেজ এক চোখের দৃষ্টি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছর বয়সী গ্রেস জেমিসনও একই ভুক্তভোগী। ডোমিনিকান রিপাবলিকে গোসলের সময় লেন্স পরায় তার দুই চোখেই সংক্রমণ হয়। ভুল চিকিৎসায় স্টেরয়েড ড্রপ ব্যবহারের এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি অন্ধ হয়ে যান।

জেমিসন আক্ষেপ করে বলেন, 'যখন আমার দুই চোখই অন্ধ হয়ে গেল, তখন বুঝলাম আগে যা ছিল তার কদর করিনি। এখন মনে হয়, ইশ! যদি মোবাইল কম দেখতাম আর বাইরের সুন্দর পৃথিবীটা বেশি করে দেখতাম।'

লেন্স ব্যবহারে সতর্কতা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লেন্স পরিষ্কার ও সংরক্ষণের জন্য সব সময় দোকান থেকে কেনা সলিউশন ব্যবহার করতে হবে, পানি নয়। লেন্স কেসের সলিউশন প্রতিদিন বদলাতে হবে। লেন্স পরার আগে হাত ভালো করে ধুয়ে ও শুকিয়ে নিতে হবে।

ঘুমানোর সময় ভুলেও লেন্স পরা যাবে না। এতে চোখ শুকিয়ে যায়, জ্বালাপোড়া করে এবং জীবাণু আটকে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। মাসব্যাপী লেন্সের বদলে দৈনিক ব্যবহারযোগ্য লেন্স ব্যবহার করলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।

নিউইয়র্ক সিটির চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যাশলি ব্রিসেট বলেন, যদি লেন্স ছাড়া পানিতে নামা বা কাজ করা সম্ভব না হয়, তবে চশমা বা পাওয়ার গগলস ব্যবহার করা যেতে পারে। অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ল্যাসিক বা অন্য কোনো লেজার সার্জারি করিয়ে নেওয়া ভালো।

চিকিৎসা লড়াই

রোগ নির্ণয়ের জন্য কর্নিয়ার স্ক্র্যাপিং বা বায়োপসি করে ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। কনফোকাল মাইক্রোস্কোপির মাধ্যমে কর্নিয়ার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অ্যামিবা দেখা যায়। তবে এই পরীক্ষা সব জায়গায় সহজলভ্য নয়।

চিকিৎসা প্রক্রিয়া বেশ জটিল ও যন্ত্রণাদায়ক। ক্লোরহেক্সিডিন বা পিএইচএমবি-র মতো অ্যান্টি-অ্যামিবিক ড্রপ ব্যবহার করা হয়। ডা. লরেঞ্জো-মোরালেস বলেন, এই ড্রপগুলো চোখে তীব্র বিষক্রিয়া ও ব্যথা সৃষ্টি করে।

২৬ বছর বয়সী ভুক্তভোগী হানা বলেন, 'ড্রপগুলো দেওয়ার সময় মনে হতো চোখ জ্বলে যাচ্ছে। তবে সংক্রমণের ব্যথার কাছে এটি কিছুই না। ব্যথায় আমি বাথরুমের মেঝেতে শুয়ে কাঁদতাম আর বমি করতাম।'

চিকিৎসা কয়েক মাস থেকে বছরও চলতে পারে। কখনো কখনো কর্নিয়া ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা প্রতিস্থাপন ছাড়া উপায় থাকে না। সানচেজ আড়াই বছর পর কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করান। পরে ছানি অপারেশনও করাতে হয়। এখন তিনি বলেন, 'আমি খুব ভাগ্যবান যে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছি।'

সানচেজ পরামর্শ দেন, 'ডাক্তারের ওপর ভরসা রাখুন আর ধৈর্য ধরুন। অন্যদের সঙ্গে নিজের তুলনা করবেন না।' হানা বলেন, 'জানি খুব কঠিন, কিন্তু হাল ছাড়বেন না। সুদিন আসবেই।'

সূত্র: সিএনএন

 

 

নিউজজি/এস আর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers