সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ আশ্বিন ১৪২৮ , ১১ সফর ১৪৪৩

ফিচার
  >
ভ্রমণ

আমি হাম হামের কথা বলছি

আকাশ আহমেদ, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) ২৭ জুন , ২০২১, ১৫:৪১:০৯

  • ছবি: আকাশ আহমেদ/ নিউজজি২৪

আমি হাম হামের কথা বলছি। হাম হাম শব্দ শুনলেই ছলাত ছলাত জলের গান ভেসে আসে যে কারো কানে। আসবেই তো, কারন গোসলখানার আরবী শব্দ হাম্মাম থেকে আসা মৌলভীবাজারের হাম হাম দেশ বিদেশ থেকে এখানে আসা হাজারো পর্যটকের কাছে এক আকর্ষনীয় জলপ্রপাত। যেখানে প্রায় দেড়শো ফুটের ওপর থেকে চলাত ছলাত করে অবিরত জল ঝরছে তো ঝরছেই। নৈসর্গিক হামহাম জলপ্রপাতের অবস্থান কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কুরমা বনবিট এলাকায়।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে  প্রকৃতির রূপবৈচিত্র উপভোগ করতে আসা একদল পর্যটকের চোখে এ জলপ্রপাত বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় দৃশ্যমান হয়। দুর্গম জঙ্গলে ঘেরা হাম হামের উচ্চতা ১৩৫-১৬০ ফুটের মধ্যে, যেখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু মাধবকুন্ড জলপ্রপাতের উচ্চতা ১৬২ ফুট। বর্ষায় হাম হামের জীবনে যৌবনে পৌঁছায়।

ভারতীয় সীমান্তে চাম্পারায় চা বাগান পেরিয়ে কমলগঞ্জের একেবারে শেষ গ্রাম কলাবন বা তৈলংবাড়ী থেকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দেড় ঘন্টা উচুঁ নিচু দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তবেই হাম হাম জল প্রপাত। হামহাম যাওয়ার জন্য বনের ভিতরে দুটি পথ আছে। বনের শুরুতেই হাতের ডানে এবং বামে পাশাপাশি পথ দুটি। ডান পথে যাবেন,বাম পথে ফিরবেন। কারণ ডানের পথটা দীর্ঘ এবং অনেক উঁচু টিলা ডিঙ্গিয়ে যেতে হয় ফলে ফেরার পথে খুবই কষ্ট। একজন গাইড নিয়ে হামহাম যেতে পারেন। এতে পথ হারানোর সম্ভাবনাও থাকবে না এবং সাথে কোনো সাহায্য চাইলেও পাওয়া যাবে। স্থানীয় তরুনরাই গাইড হিসাবে কাজ করে। খোঁজ করলেই পাওয়া যাবে। হয়তো পাঁচশো থেকে এক হাজার টাকা তাদের পারিশ্রমিক।পাহাড়ী পথে হাঁটার সুবিধার্থে এবং আত্মরক্ষার জন্য আপনার সাথে বাঁশ নেয়া আবশ্যক।

এছাড়া জোঁকের হাত থেকে রক্ষা পেতে সাথে করে লবণ ও সরিষার তেল নিতে পারেন।যাওয়ার পথে উঁচু এবং খাঁড়া যে পাহাড় তার নাম মোকাম টিলা। যা পেরুনো কষ্টকর হলেও পাশের পাথুরে প্রাচীরগুলো দেখলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। এই টিলার পাশেই আরেকটি ছোট ঝর্না আছে যা স্থানীয়ভাবে ‘সীতাব’ নামে পরিচিত। অপরূপ এই ঝর্ণাটি দেখতে ভুলবেন না।

জারুল, চিকরাশি ও কদম গাছের ফাঁকে ফাঁকে রঙিন ডানা মেলে দেয় হাজারো প্রজাপতি। ডুমুর গাছের শাখায চশমা পরা বানরের আনাগোনা। চারদিকে গাছগাছালি ও প্রাকৃতিক বাঁশবনে ভরপুর এ বনাঞ্চল দিয়ে পাথুরে পাহাড়ের ঝিরি পথে হেঁটে যেতে যেতে সুমধুর পাখির কলরব অন্যরকম অনুভূতিতে মন ভরে যাবে। দূর থেকে কানে ভেসে আসবে বিপন্ন বন মোরগের ডাক। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়াার পর শুরুতে দুচোখের সামনে ভেসে উঠবে পাহাড় থেকে ধোঁয়াার মতো ঘন কুয়াশা ভেসে উঠার অপূর্ব দৃশ্য। এভাবেই হাঁটতে হাঁটতেই হাম হামের কাছাকাছি গেলে কানে আসবে জলপ্রপাতের জল ঝরার ছলাত ছলাত শব্দ। নিঃস্বর্গের নান্দনিকতায় রোমাঞ্চকর হাম হামে আনমনে উদাসীন হয়ে যে কেউ হয়ে যাবে প্রকৃতির কবি। মনে হবে অনন্তকাল এখানেই যাপিত হোক জীবন।চারদিকে গহীন জঙ্গল, উপরে আকাশ, পায়ের নীচে বয়ে যাওয়া ঝির ঝির স্বচ্ছ পানির ধারা আর সামনে বহমান অপরূপ ঝর্না। এই স্বচ্ছ শীতল জলের স্রোত মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। স্বচ্ছ জলের নিচে তাকালেই চোখে পড়বে বিশাল বিশাল পাথর! এই জলের স্রোতের উৎপত্তি হয়েছে হামহাম জলপ্রপাত থেকে। তাই এই স্রোতে নেমে পড়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই আপনি ঝর্ণার পানি পড়ার শব্দ শুনতে পাবেন।

পর্যটকদের অনেকেই জলপ্রপাতের উপরে উঠতে চান। কিন্তু এটি খুবই বিপদজনক। কারণ এতে ওঠার কোনো রাস্তা নেই। এছাড়াও এই ঝর্না র আশেপাশের মাটি খুবই পিচ্ছিল। তাই এর উপরে উঠার চেষ্টা করা মানে জীবন বাজি রাখা! আরেকটি কথা, অবশ্যই সন্ধ্যা হওয়ার আগে কলাবনপাড়ায় ফিরতে হবে। সেজন্য ফেরার জন্য কমপক্ষে ৫ ঘন্টা সময় হাতে রাখতে হবে। সূর্যাস্তের পরে জঙ্গলে থাকা খুবই অনিরাপদ। অবশ্যই সাথে থাকা ব্যাগে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, খাবার ও পানি রাখা ভালো। কারণ জঙ্গলে চলার পথে ছোটখাটো ব্যাথা পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

করোনার এ ক্রান্তিকালে রবীন্দ্রনাথের মতো ঘর হইতে দু পা ফেলিয়া যদিও মুক্ত আকাশের নীচে বাহির না হই তবুও সাহসের ডানায় ভর করে দু চোখে স্বপ্ন দেখি একদিন করোনা নির্মূল হবে আর পৃথিবীর সূর্যটা হাসবেই। আর হাম হামের স্বচ্ছ জলে নির্মল নীল আকাশ দেখে দেখে ছলাত ছলাত শব্দে জলের গান গাইবো।

নিউজজি/এস দত্ত

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers