সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ৬ আষাঢ় ১৪২৮ , ১০ জিলকদ ১৪৪২

ফিচার
  >
ভ্রমণ

সন্দ্বীপ: বিচ ক্যাম্পিংয়ের চমৎকার অভিজ্ঞতা

মো. আকবর হোসেন ১৫ ডিসেম্বর , ২০২০, ১৫:৫৫:৪২

  • ছবি: লেখক

উত্তরে বামনী নদী এবং পশ্চিমে মেঘনা নদী ও তৎপশ্চিমে হাতিয়া দ্বীপ, পূর্বে সন্দ্বীপ চ্যানেল এবং চ্যানেলের পূর্ব পাড়ে চট্টগ্রাম এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। বলছি চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত স্থলভাগ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ৩৪টি গ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার কথা।

সন্দ্বীপ নিয়ে তেমন একটা জানতাম না কখনই। আমার বাবা ঢাকায় সন্দ্বীপের এক পরিবারে খাওয়া দাওয়া করতেন। তখন ঐ বাসায় যাওয়া সুবাদে সন্দ্বীপ নামটা প্রথম শোনা আমার। এরপর তেমন একটা শোনা বা জানা হয়নি সন্দ্বীপ সম্পর্কে। কোনো এক লেখায় বা লোকমুখে জানতাম যে সন্দ্বীপ সাগরগর্বে বিলীন হতে যাওয়া এক দ্বীপ। তখন থেকেই সন্দ্বীপ ভ্রমনের তীব্র ইচ্ছে। অবশেষে সে সুযোগটা পেয়ে গেলাম।

সলো ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ (Solo Travellers of Bangladesh) এবং বিডি ট্রিপার্স নামক দুটি ফেইসবুক বেইসড ভ্রমন বিষয়ক গ্রুপের মাধ্যমে পরিচিত দেশ বিদেশে ভ্রমন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিভিন্ন জেলার একদল ভ্রমনপিপাসু মানুষ সন্দ্বীপ ভ্রমনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরিচিত সূত্র ধরে আগে থেকেই সন্দ্বীপের নিরাপত্তা ও বীচ ক্যাম্পিংয়ের জায়গা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে ১৬ নভেম্বর আমরা যাত্রা শুরু করি। যশোর থেকে ২ জন, চট্টগ্রাম থেকে দুজন, সিলেটের ব্যারিস্টার সুমনের এলাকার সদ্য বিবাহিত একজন, ঢাকা থেকে দুজন এবং লক্ষীপুরের লক্ষী ছেলে নোয়াখালীর নতুন জামাই একজন, মোট নয় জন সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে সীতাকুণ্ডের বড় কুমিরা এসে পৌঁছাই। সাধারণত ঢাকার দিক থেকে আগত বাসগুলো ছোট কুমিরায় নামিয়ে দেয়। কিন্তু যারা সন্দ্বীপ যাওয়ার উদ্দেশ্যে আসবেন তারা বাস চালককে বলে আরো ২ কিলোমিটার পরে সন্দ্বীপ ঘাটে নামবেন।

আমাদের কেউ কেউ আগেই সন্দ্বীপ ঘাটে পৌঁছে নাস্তা করলেন। কেউ কেউ বড় কুমিরায় নাস্তা করলেন। তবে যারা সন্দ্বীপ ঘাটে নাস্তা করেছেন, তারা রিভিউ দিলেন যে ওখানের নাস্তা খুবই খারাপ। তাই বাস যেখানে নামিয়ে দিবে, সেখান থেকে একটু পশ্চিম দিকে হাটলে বড় কুমিরা বাজার, সেখানে নাস্তা করতে পারেন।

নাস্তা সেরে আমরা হেটেই ১০ মিনিটে মূল ঘাটে পৌঁছে গেলাম। কেউ চাইলে ১০ টাকাতে অটোতে করে ঘাটে যেতে পারেন।

অবশেষে ঘাটে গিয়েই আমরা সব অদেখা মানুষ একত্রে হলাম। প্রায় ৮টা বাজলো। ভাটার কারনে এখন শুধুই বড় স্পিড বোর্ড চলবে। আমাদের মধ্যে একজন গিয়ে ২৫০ টাকা ধরে টিকেট নিয়ে আসলো। এরপর হাটা শুরু করলাম বিশাল জেটির দিকে। অনেক বড় জেটি, প্রায় ১০ মিনিট হেটে শেষ মাথায় পৌঁছালাম। জেটি থেকে সাগরের সৌন্দর্য অসাধারণ ছিল। একদিকে জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডে বড় বড় কর্তিত জাহাজ চোখে পড়বে যেটা দেখার তীব্র ইচ্ছে অনেকদিন থেকেই আমার ছিল। অন্য দিকে অনেক মাল বোঝাই  ট্রলারের জোয়ারের জন্য অপেক্ষায় ঠায় দাঁড়িয়ে।

স্পিড বোর্ডে আমরা সবাই উঠলাম। সর্বোচ্চ ২০ জন উঠবে। সবাইকে বাধ্যতামূলক লাইফ জ্যাকেট পড়তে হয়। আমরা তাই করলাম। সবাই খুবই উত্তেজিত। স্পিড বোর্ডের দ্রুত ছুটে যাওয়া মুহুর্তটা ধরে রাখতে সবার হাতেই মোবাইল। সন্দ্বীপ চ্যানেলের স্পিড বোর্ড পারাপারটা বিপদজনক হলেও ঐ দিন সাগর অনেকটাই শান্ত থাকাতে নিরাপদে ১৮ মিনিট পর আমরা মূল সন্দ্বীপের জেটিতে পোঁছাই। ভাটার কারনে  জেটি থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার আগেই কাঁদা মাটিতে নামতে হয় আমাদের। জুতা খুলে যার যার ব্যাগ নিয়ে মেঘমুক্ত নীল আকাশের নিচে কর্দমাক্ত সাগরে আমরা প্রায় ২০ মিনিট হেটে মূল জেটিতে পৌঁছাতে সক্ষম হই। যারা নিজে ব্যাগ বহন করতে পারবেন না, তারা কুলির সহযোগিতা নিতে পারবেন টাকার বিনিময়ে।

তবে ব্যাগ বহন করে কাঁদা মাটিতে হাটা যারা এভয়েড করতে চাচ্ছেন, তারা আগে থেকে খোঁজ নিয়ে জোয়ারের সময় আসতে পারেন। জোয়ারের সময় চাইলে ট্রলারে করেও আসতে পারবেন ১৫০ টাকা দিয়ে। সেক্ষেত্রে সময় লাগবে প্রায় ২ ঘন্টা কিন্তু নিরিবিলি সাগর দেখার আনন্দটা হবে আনলিমিটেড।

কর্দমাক্ত পায়ে জেটিতে উঠেই দরদাম করে ৮০ টাকা করে ২টা ভ্যান নিয়ে সিএনজি স্টেশনে (জেটির স্থলভাগের মাথায়) পৌঁছলাম ১/২ মিনিটে। কিন্তু দূরত্ব অনুযায়ী এটা অনেক বেশি ভাড়া। তাই যারা আসবেন, খুব ভারী ব্যাগেজ না হলে, বাজেট ট্রাভেলাররা জেটির দুদিকের সৌন্দর্যটা দেখতে দেখতে হেটেই যেতে পারেন ৫ মিনিটে।

গন্তব্য আমাদের রহমতপুর। প্রতিজন ৭০ টাকায় সিএনজিতে রওয়ানা দিলাম। যতই ভেতরে যাচ্ছি ততই সন্দ্বীপ সম্পর্কে আমার পূর্ব ধারনা পাল্টাচ্ছে। আর ৮/১০টা জেলার মতই একটা জেলা। মসজিদ মাদ্রাসা, স্কুল কলেজ, বাজার ঘাট, ব্যাংক এটিএম বুথ সবই বিদ্যমান। প্রায় ৪০ মিনিট পর আমরা রহমতপুর আমাদের জন্য পূর্ব নির্ধারিত জায়গায় পৌছলাম। কিন্তু জায়গাটা লোকালয়ের খুব কাছেই ছিল বিধায় তাবু করার জন্য সেটা পারফেক্ট ছিল না । আমাদের মধ্যে ২/৩ জন নতুন নিরিবিলি জায়গা খোঁজার জন্য বের হয়ে গেলেন। আর ২/৩ জন বাজারে গেলেন কেনা কাটার জন্য।

২ রাত থাকবো তাবুতে, নিজেরাই রান্না করবো। হাড়ি পাতিল ডেকোরেশন থেকে ভাড়া নিতে চাইলে ২০০০ টাকা দাবি করলো তারা। বাট সৌভাগ্যবশত রহমতপুর  মসজিদের এক মোয়াজ্জিন মুন্না ভাই উনার বাসা থেকে আমাদের পাতিলসহ যাবতীয় জিনিস দিয়ে সহযোগিতা করলেন। শেষ পর্যন্ত আমরা লোকালয় থেকে দূরে খোদাবক্স পাড়ায় এক জায়গায় তাবু সেটআপ করলাম। এরকম টুর আমার জন্য প্রথম ছিল তাই আমার এক্সাইটমেন্টের পারদটা কিঞ্চিত বেশি ছিল। তাবু করার পর আমার আগ্রহের জায়গা ছিল প্রকৃতির ডাকে কোথায় গিয়ে সাড়া দিব। সেটার জন্য চমৎকার একটা ব্যবস্থা হয়ে গেছে খোদাবক্স পাড়া জামে মসজিদের টয়লেট। ঐ মসজিদের ইমাম সাহেব আমাদের জন্য নির্দিষ্ট একটা জায়গায় টয়লেটের চাবি রেখে দিয়েছেন। আর আমাদের তাবুর চারপাশে পরিষ্কার পানি থাকলেও তা ছিল লবনাক্ত। তাই গোসল আমরা মসজিদের বিশাল পুকুরে সেরে ফেলতাম। ২ দিনই আমরা মসজিদের পুকুরে অনেক মজা করে গোসল করছি সাথে ছিল সাঁতার প্রতিযোগিতা। বিশাল পুকুরের ওপারে সাঁতার কেটে যেতে পারলে সিলেটি বন্ধুর নগদ টাকার অফার ছিল ৫০০ থেকে ৫০০০ টাকার। ৫০০০ টাকার অফারে আমিই ৫৯ সেকেন্ডে বিশাল পুকুর সাতরে পার হয়েছি। যদিও শেষ পর্যন্ত ৫০০ টাকা পেয়েই আমাকে খুশি থাকতে হলো।

৯ জনের ৭টা তাবু খাটানো হলো। আমার জন্য আলাদা একটা যেটা ধার করে নেয়া। প্রচন্ড উত্তেজনা নিয়ে তাবুর মধ্যে ঢুকেই বাড়িতে রেখে আসা প্রিয় মানুষটার কথা মনে পড়লো। ইস!! প্রিয় মানুষটা যদি সাথে থাকতো!! ভেতরে ঢুকে ২ দিনের সংসারের জন্য তাবুটা গোছালাম।

এরই মধ্যে নববিবাহিত সিলেটি ভাই ভ্যানের উপর চড়ে বাজার সদাই সব নিয়ে আসলো। রান্নার জন্য নির্ধারিত জায়গায় সব কিছু রাখা হলো। আমরা সেখানে যাওয়ার পর পাশের এলাকার অনেক মানুষ আমাদের দেখতে আসা শুরু করলেন। সেখান থেকে ১০/১২ বছরের একটা ছেলেকে আমাদের সহায়তার জন্য অনুরোধ করি। সে আনন্দে আমাদের সাথে থেকে সহযোগিতা করার জন্য রাজি হয়ে গেল। সে ছেলেকে দিয়ে মসজিদ থেকে ইট নিয়ে এসে চুলা বানানো হলো। মসজিদ পুকুর থেকে পানি নিয়ে এসে রান্নার প্রস্তুতি শুরু হলো। মুরগি আর খিচুড়ি রান্না করার জন্য ২/৩ জন অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাজে লেগে গেল। কেউই আসলে রান্নায় সিদ্ধ হস্ত ছিল না। তবুও একেক জন একেক কাজ করা শুরু করলেন। এরমধ্যে জন দুয়েক ছিলেন জন্মের আইলসা। কোনো কাজেই তারা হাত লাগালো না। নানা মুনির নানা মতের মিশেলে শেষমেষ অনেক কষ্ট করে রান্না প্রস্তুত। প্লাস্টিকের বাটিতে করে সবাই বেশ মজা করে পেট এবং মন ভরে খিচুড়ি খেলাম। সত্যি বলতে মনে হলো অমৃত খেলাম। নিজেরা রান্না করে নিজেদের মত করে খাওয়া যে এত মজা হতে পরে তা জানা ছিল না।

সবাই প্রচণ্ড টায়াড। খাওয়ার পর তাই সেদিন আর বাহিরে ঘোরাঘুরি করা হয় না। বেশ কয়েকটা হ্যামক গাছের সাথে ঝুলানো হলো। আমার কোনো হ্যামক না থাকা সত্ত্বেও একটা আমি দখল করে শুয়ে পড়লাম। দোল খেতে খেতে ঘুমানো যে এত আরামদায়ক তা আমার জানা ছিল না। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে ফুটবল খেলে সন্দ্বীপে প্রথম দিনটা আমি মন খারাপ করে শেষ করলাম। কারণ ফুটবল খেলতে গিয়ে আমি পানিতে পড়ে যাই। পকেটে মোবাইল ছিল আর পানি ঢুকে মোবাইলটা নষ্ট হয়ে যায়।

সন্ধ্যা নেমে আসলো চারপাশে। আগন্তুক মানুষজন এখন নাই। প্রচন্ড ভীতিকর নিরিবিলি এক সন্ধ্যা। দূরে সাগরের গর্জন ভেসে আসছে। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র হালিম ভাই স্যুপ রান্না শুরু করলেন। রান্না শেষে ক্যাম্প ফায়ার সেট করে তার চারপাশে সবাই গোল হয়ে বসে স্যুপ খাওয়া শুরু করলাম। এ এক অন্য রকম সন্ধ্যা!! সবাই সবার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম। সবাই সবার সম্পর্কে জানলাম। চিরস্থায়ী একটা বন্ধুত্বের বন্ধন সবার সাথে সবার হয়ে গেল।

দুপুরের রান্না করা মুরগি আর খিঁচুড়ি খেয়ে আরো ঘন্টা খানেক গল্প করে সবাই যার যার তাবুতে শুতে চলে গেলাম। ভ্রমনে অভিজ্ঞ সাকিব ভাই নিরাপত্তার স্বার্থে সবাইকে সাথে চাকু বা ছুরি নিয়ে ঘুমাতে বললেন। ভাগ্যিস আমার প্রিয় মানুষটা আমাকে ফল কাটার জন্য একটা চাকু দিলেন যেটা আমি সাথে নিয়ে ঘুমাতে গেলাম। কোনো বালিশ ছিল না আমার। ২ লিটার পানির খালি বোতল মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। আমার তাবুটা একদম শেষ প্রান্তে থাকাতে আমার খুব ভয় হচ্ছিল। প্রিয় মানুষটার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে প্রকৃতির সাথে ঘুমিয়ে পড়লাম।

১৭ই নভেম্বর.. প্রকৃতির নিয়মে যথারীতি সূর্য উঠলো। তার আগে আমিই ঘুম থেকে উঠলাম। জীবনে প্রথম বারের মত সাগর পাড়ে তীব্র শীতে তাবুতে ঘুমালাম।  এক সময় কাঁথা বালিশ ছাড়া শুধু মেঝেতে ঘুমানো আকবরের জন্য তাই তেমন কষ্ট হয়নি শীতার্ত মাটির মেঝেতে ঘুমানো। ঘুম থেকে উঠেই তাবুর দরজা খুলে বাহিরে তাকিয়েই এক স্বর্গীয় সুখ অনুভব করলাম। কিচিরমিচির পাখির ডাক, অদূরে সাগরের গর্জন, নিরিবিলি শান্ত পরিবেশের নির্মল হাওয়া... "ঘুম হতে নামাজ ভাল" বলে ডাক দিয়ে লোনা পানিতে ওজু করে নামাজ পড়লাম। প্রশান্তি ছুঁয়ে গেল অন্তরের অন্তস্তলে। সূর্য উঠাও অনেক দিন পর দেখলাম। গোপ্রো ক্যামেরা দিয়ে সূর্য উঠার দৃশ্য ধারন করলাম। শেষ কবে প্রকৃতির মধ্যে এরকম একটা সকাল কাটিয়েছি মনে নাই...  সব কিছু মিলিয়ে সকালটা ছিল অসাধারণ। শোকর আলহামদুলিল্লাহ। 

এরকম সকালে পেতে এরপরে সুযোগ পেলেই অথবা সুযোগ করেই চলে যাবো সংসার আর লোকালয় থেকে অনেক দূরে।

হাজারো ব্যস্ততার ভিড়ে নিজেকে একটুখানি সময় দিতে, নিজেকে বুঝতে, এরকম প্রকৃতির কাছাকাছি আমাদের সবারই যাওয়া উচিত। সুযোগ পেলে নয়, সুযোগ করে....

মোটামুটি সবাই তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে গেল। যার যার মত প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করতে লাগলো। তাবু থেকে অদূরে হাজার হাজার মহিষ দেখতে আমি একা বেরিয়ে পড়লাম। ঘন্টা খানেক পর তাবুতে ফিরে এসে দেখি হালিম ভাই নুডলস রান্না করে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন। আলহামদুলিল্লাহ, সকালের নাস্তা সবাই অনেক মজা করে শেষ করলাম।

সন্দ্বীপে ২য় দিন। বেশ কিছু জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা। হঠাৎ করেই অদ্ভুত রকমের একটা দাওয়াত পেলাম সন্দ্বীপের এক স্থানীয় পরিবার থেকে। আমাদের মধ্যে একজনের এক্স প্রেমিকার বাড়ি সেই সন্দ্বীপে যাদের ব্রেকআপ হয়েছিল ৪ বছরের আগে। সে প্রেমিকা যেকোন ভাবে খবর পেয়ে পুরাতন প্রেমিককে তার বাসায় দাওয়াত দিলেন। যেনতেন দাওয়াত নয়। সিরিয়াস রকমের দাওয়াত। কেউ যাবে, কেউ ভয়ে যেতে চাচ্ছে না। কেউ মনে করলো ঐ মেয়ে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে ধোলাই দিবে। শেষমেষ সাহস করে সবাই রওয়ানা দিলাম এক্স প্রেমিকার বাসায় দাওয়াত খেতে। বিনয়ের বিখ্যাত মিষ্টি নিয়ে ৯০ মিনিট সিএনজি চেপে অবশেষে আমরা সেই বাসায় পৌছলাম। সে কি আপ্যায়ন!! নতুন জামাই সমপরিমাণ আপ্যায়ন। অবাক করা ব্যাপার!! সন্দ্বীপের মানুষজন এতটা অতিথিপরায়ন তা জানতে পারলাম সেদিন। আর সন্দ্বীপের হাসের মাংসও যে এত মজা!! সেটাও বুঝতে পারলাম। আমাদের রাফসান ভাই ২ বাটি হাসের মাংস একাই সাবার করে দিয়েছেন। 

তাবুতে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। দুজন এসেই মুড়ি চানাচুর রেডি করলো। নুডলসও বানালো হালিম ভাই। ক্যাম্প ফায়ার করে আবার সবাই গোল হয়ে বসে সবার ভ্রমন অভিজ্ঞতা শেয়ার করা হলো। আমি সিরিয়াতে এবং নাইজেরিয়াতে কাজের অভিজ্ঞতাটা শেয়ার করলাম।

তাবুতে শেষ রাতের জন্য ঘুমাতে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম। রাত বাজে ১১টা। চাঁদের আলোয় চারপাশ অসাধারণ লাগতেছিল। সবাই যার যার তাবুতে গিয়ে শুলো। আমি আমার প্রিয় মানুষটার সাথে একটু রোমান্টিক আলাপ শুরু করতেই সবাই চিৎকার শুরু করলো। তাদের চিৎকারে মেজাজ খারাপ করে কথা বলা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসছে না আজ। সবাই মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়লো। আমার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি আসলো একটা। আমি আস্তে করে তাবু থেকে বের হয়ে পা টিপে টিপে ২/৩ টা তাবুর চেইন খুলে ফেললাম। সাকিব ভাইয়েরটা খোলা শুরু করলেই উনি টের পেয়ে "কে"চিৎকার দিলেন। আমি তাবুর চারপাশে দৌড়াদৌড়ি শুরু করলাম। সবাই তো প্রচন্ড ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে তাবু থেকে বের হয়ে আসলেন। এসে দেখে আমি!!! এটা নিয়ে অনেকক্ষণ দুষ্টামি করে আবার সবাই ঘুমাতে গেলাম।

এরপরই সম্ভবত এ ক্যাম্পিংয়ের সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটলো। নববিবাহিত সিলেটের সজিব ভাই চিৎকার দিয়ে তাবু থেকে বের হয়ে প্রচন্ড বমি করা শুরু করলেন!! আমিসহ আরো ৩/৪ জন তাড়াতাড়ি তাবু থেকে বের হয়ে গেলাম। কাহিনি কি!? হটাৎ কেন এত বমি!!! উনাকে হালকা সেবা করে জানতে চাইলাম কাহিনি কি? উনি যেটা বললেন সেটা ছিল মহা হাস্যকর। সজিব ভাইয়ের সাথে একই তাবুতে আরেকজন ছিলেন। উনি নাকি হিরোশিমা নাগাসাকি স্টাইলে বায়ু নির্গত করেছেন। সেই নির্গত বায়ুর সু(!!!) গন্ধে সজিব ভাইয়ের এই অবস্থা!!  এটা শুনে আমরা হাসতে হাসতে মাটি গড়াগড়ি অবস্থা!!  হা হা হা...

এ ঘটনা থেকে আমেরিকার রাজনৈতিক অচলাবস্থার একটা সমাধান পেয়ে গেলাম। সিদ্ধান্ত হলো, ট্রাম্প যদি হোয়াইট হাউস ছাড়তে না চায়, তাহলে ঐ ভাইকে হোয়াইট হাউজে এক রাত থাকার ব্যবস্থা করা হবে। উনি আবার সেই বায়ু নির্গত করবেন, যেটার গন্ধে ট্রাম্পও হোয়াইট হাউজে ছাড়তে বাধ্য হবে।

যাই হোক অনেক ঘটন অঘটন শেষ করে সবাই আবার ঘুমাতে গেলাম। খুব ভোরে উঠে নামাজ পড়লাম। বাকিরাও উঠে লাল টুকটুক সূর্য মামার সাথে ছবি-টবি তুলে সন্দ্বীপের উত্তর দিক হরিশপুরে রওনা দিলাম। সকালের সন্দ্বীপ যে কত সুন্দর তা লিখে বা বলে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রায় ঘন্টা খানেক আমরা হাটলাম। হরিশপুরের একটা মাছ বাজারে কতশত রকমের মাছ দেখলাম! অসাধারণ দৃশ্য! আমরা তিন কেজি লাল পোয়া মাছ কিনলাম যেটা এক লোকাল পরিবার আমাদের ভাজি করে দিয়েছেন।

সন্দ্বীপে সময় শেষ হয়ে আসলো। একটু পর সবাই চলে যাব। তাবু গুটিয়ে সবাই পুকুরে গোসল করতে নেমে পড়লাম। খেয়ে ধেয়ে ২টা সিএনজি করে ঘাটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। মসজিদের মুয়াজ্জিন মুন্না ভাই আর ঐ ১০/১২ বছর বয়সের ছেলে ফাহিম এ দুদিন আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন৷। তাদের আমরা জামা কাপড় কিনে দিলাম। উনারা অনেক খুশি হয়েছেন।

আমি এ পর্যন্ত ১৬টি দেশ ঘুরেছি। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ডসের অনেক শহরে ঘুরেছি। আফ্রিকার কয়েকটা শহরও ঘুরছি। কিন্তু সত্যি বলতে সন্দ্বীপের এ দুদিন ছিল সব চেয়ে বেশি আনন্দদায়ক।

এ দুদিন সন্দ্বীপের মানুষদের আন্তরিকতা খুব কাছ থেকে দেখলাম। আসলাম নামে এক ভাই রাত জেগে আমাদের অজান্তে আমাদের পাহারা দিয়েছেন। সারাদিন শতশত মানুষ আমাদের দেখতে এসেছেন।  ওখানকার স্থানীয় রাজনৈতিক ভাইয়েরাও আমাদের দেখতে এসেছেন।  এক কথায় প্রতিটি মানুষ থেকে আমরা আতিথেয়তা পেয়েছি।  তবে এত এত মানুষ আমাদের দেখতে গিয়েছিল যে এটা একটা পর্যায়ে বিরক্তিকর লাগছিল। নিরিবিলি পরিবেশটা দিনের বেলায় একদম ছিল না। তো যারা এরপরে সন্দ্বীপ ক্যাম্পিং করতে যাবেন তারা দ্বীপের দক্ষিণ দিকে বা উত্তরে হরিশপুর গেলে ভাল হবে।

সন্দ্বীপের মানুষজন খুবই আন্তরিক হলেও একটা দিক খেয়াল করলাম সেটা হলো বাহিরের মানুষজন দেখলে জিনিস পত্রের দাম বাড়িয়ে চায় অনেকেই। যেমন আমি সন্দ্বীপের বিখ্যাত মহিষের দই কিনতে চাইলে আমার থেকে ২৫০ টাকা চাওয়া হল অথচ বাজারে দেখলাম ১২০/১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।  ২/৩ টা পাতিল রহমতপুর বাজার থেকে ভাড়া নিতে চাইলে ২০০০ টাকা চাওয়া হয়। আবার সিএনজি ভাড়াও বেশিই মনে হলো। যদিও ওখানকার সিএনজি অক্টেন দিয়ে চালাতে হয়।

শেষমেষ বলতে হয়, দুদিনের সন্দ্বীপ ক্যাম্পিং ছিল এক কথায় অসাধারণ। যেতে চাই সন্দ্বীপ আরেকবার এবং বারবার......

অনেক অনেক ধন্যবাদ সন্দ্বীপবাসী। বিশেষ ধন্যবাদ বাবর বাবু ভাই, হাফেজ মুন্না ভাই এবং কিউট ছেলে ফাহিমকে।

 

লেখক: মনোবিজ্ঞানী ও ট্রাভেলার 

 

নিউজজি/টিবিএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers