মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৭ আষাঢ় ১৪২৮ , ১১ জিলকদ ১৪৪২

ফিচার
  >
ভ্রমণ

নীলের বুকে সবুজের ছোঁয়া

উপমা মাহবুব ২১ জুলাই , ২০১৯, ২০:০৭:০৭

  • নীলের বুকে সবুজের ছোঁয়া

আকাশ থেকেই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা মুগ্ধ করলো। শুধু সবুজ আর সবুজ। মাঝে মাঝে দু-একটা লাল টালির বাড়ি উঁকি দিচ্ছে। বন্দরানায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছোট হলেও মন্দ নয়। শুনেছি আগে নাকি তেমন সুন্দর ছিল না, যাত্রিদের ভোগান্তি পোহাতে হতো। সম্প্রতি পুরো বিমানবন্দরকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। শ্রীলংকা ভ্রমণের অন্যতম ভালো দিক হলো এখানে অন অ্যারাইভেল ভিসা পাওয়া খুবই সহজ। তবে এয়ার টিকেটের দাম বেশ চড়া।

লাগেজ পাওয়ার পর প্রথম দু’টো কাজ হলো ডলার ভাঙ্গানো এবং মোবাইলে শ্রীলংকান সিম ভরা। প্রথম কাজটা বেশ সহজেই সম্পন্ন হলো। ভালো রেটে শ্রীলংকান রুপি পেলাম। ওখানে থাকাকালীন পরবর্তী দশ দিনে এতো ভাল রেট আর পাই নি। আর হোটেল থেকে ডলার ভাঙ্গানো পুরোই লোকসান। মোবাইলে শ্রীলংকান সিম ভরার অভিজ্ঞতা তেমন ভাল হলো না। এয়ারটেলের দোকান থেকে সহযাত্রী প্লাস সহকর্মী তানিয়া চটপট সিম কিনে ফেলল। বিক্রয়কর্মী ছেলেটির ব্যবহার খুব ভাল। সবগুলো প্যাকেজ সুবিধা বুঝিয়ে বলল, মোবাইলে সিম ভরে দিল। বিপত্তি ঘটল আমার বেলায়। আমি বাংলাদেশ থেকে এয়ারটেলের শ্রীলংকান একটা সিম নিয়ে গিয়েছিলাম। সেই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটার হাসিমুখ বিরক্তিতে ভরে গেল। আমাকে বলল সিমটা চালু করে রিচার্জ বুথ থেকে মোবাইলে টাকা ভরে নিতে। আমি করুণ গলায় তাকে অনুরোধ করলাম মোবাইলে সিমটা অন্তত ভরে দিতে । ছেলেটি রাজি হলো এবং মুহুর্তের মধ্যে আমার মোবাইল থেকে দুটো বাংলাদেশী সিমই খুলে ফেলল। অথচ যারা বিদেশে ভ্রমণ করেন তারা খুবই ভালভাবে জানেন যে মোবাইলে একটা বাংলাদেশের সিম ভরা থাকলে সেটা দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে কতটা কাজে লাগে!

যাই হোক, এরপর শুরু হলো পরবর্তী মিশন। হোটেল থেকে আমাদের নিতে গাইড এসেছেনে, তাকে খুঁজে বের করতে হবে। এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করতে করতে দেখলাম পর্যটকরা চারপাশ সরগরম করে রেখেছে। মঙ্গোলয়েড চেহারার পর্যটকের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। পরবর্তীতে জেনেছি বৌদ্ধ ধর্মের তীর্থভুমি হওয়ায় শ্রীলংকা জাপানিজসহ অন্যান্য বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের অন্যতম প্রিয় পর্যটন গন্তব্য। একটা অদ্ভুত বিষয় খুব চোখে পড়ছিল। অনেকেই গলায় বিচিত্র আকৃতির রঙবেরঙ্গের ফুলের মালা পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ভাবলাম- বাহ, ভালোইতো। শ্রীলংকায় নেমেই মনে রঙ লেগেছে! বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর শ্রীলংকান ঐতিহ্যবাহি কুর্তা আর লুঙ্গি পরিহিত আমাদের হোটেল গাইডের দেখা মিলল। ও মা! হাসিখুশি মানুষটি করমর্দন করেই আমাদের গলায় কাঠগোলাপের মালা পরিয়ে দিলেন। এতক্ষণে মালা রহস্য উদ্ঘাটন হলো। কী সুন্দর দুটো মালা! দারুণ খুশি হলাম।

বিমানবন্দরের বাহিরে আরও অনেক ভালো লাগা অপেক্ষা করছিল। সবুজে ঢাকা ছিমছাম মফস্বল শহর নেগোম্বো। রাজধানী কলম্বো এখান থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে। পরিকল্পিতভাবে ছোট-ছোট দালান-কোঠা গড়ে উঠেছে। বড় বড় গাছগুলো ফুলে ঠাঁসা। প্রকৃতিতে তখন বর্ষার ছোঁয়া। আকাশে হালকা কালো মেঘ, বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। ফেব্রুয়ারি মাসে বৃষ্টির দেখা পাওয়া কতটা আনন্দের তা বাঙালীর চেয়ে ভালো আর কে জানে! মনটা অবশ্যএকটু খারাপও লাগছিল। বাংলাদেশের মফস্বল শহরগুলো গাছে ঢাকা থাকলে আর একটু পরিকল্পিত হলে আমাদের দেশটাও শ্রীলংকার মতোই হতো। প্রকৃতি ওদের যতটুকু দিয়েছে আমাদের তার চেয়ে একটুও কম দেয় নি, বরং বেশি দিয়েছে। ওরা ছোট দ্বীপরাষ্ট্র, ওদেও আমাদের মতো নদ-নদী, হাওড়-বাওড় নেই। প্রচন্ড গরমের দেশ হওয়ায় নেই ছয় ঋতুর খেলা। কিন্তু প্রকৃতি যা দিয়েছে ওরা তা আগলে রেখেছে। পুরো সফরে বেশ কিছু জায়গায় গিয়েছি, সবক্ষেত্রেই মনে হয়েছে বাংলাদেশেও এ রকম জায়গা আছে কিন্তু সেগুলোকে আমরা নষ্ট করেছি।

শ্রীলংকার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত নেগোম্বো দেশটির অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রও বটে। অধিবাসীদের বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে মৎসব্যবসায় জড়িত। নেগোম্বো লেগুন এলাকাটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহুগুণ। সমুদ্রের ধারে বালিয়ারিঘেরা লবণাক্ত জলের হ্রদকে লেগুন বলে। সমুদ্রের পানি হ্রদের আকৃতি নিয়ে শহরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তাতে নদীর মতো ছোট-ছোট ঢেউ। জেটিতে বাধা বিভিন্ন আকৃতির বোট সেই ঢেউয়ের তালে দুলছে। উড়ছে গাঙচিলের দল। ঠিক যেন হলিউড মুভির কোন দৃশ্য, এখনই সাদা শার্ট গায়ে সুদর্শন নায়ক সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে মাছ ধরার বোট থেকে বের হয়ে আসবে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে এ্যারি লেগুন রিসোর্টে। জায়গাটা মূল শহর থেকে বেশ ভেতরে, সমুদ্রের সঙ্গে লাগোয়া। আমরা শ্রীলংকায় এসেছি একটি দলীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন বিষয়ক কর্মশালায় অংশ নিতে। এখানে আমি যে উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করি তার বাংলাদেশ এবং আমেরিকা এই দুই অফিসের সহকর্মীরা এখানে একত্রিত হবো। কর্মশালায় সময় দিতে গিয়ে আমরা যদি ঘোরাঘুরি করার সময় না পাই সেই বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে একেবারে সমুদ্রের পাড়ে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুধের সাধ ঘোলে মেটানো আর কাকে বলে!

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers