মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৫ জিলকদ ১৪৪৭

ফিচার
  >
ভ্রমণ

সাইকেলের ডানায় উড়াল (শেষ পর্ব)

আঞ্জুমান লায়লা নওশিন ৮ ডিসেম্বর , ২০২৩, ১২:৫৩:২১

636
  • সাইকেলের ডানায় উড়াল (শেষ পর্ব)

২৪ জুলাই, ২০২১

সাধারণত সাইক্লিং ট্রিপে খুব ভোরে, মানে ৪টা সাড়ে ৪টার দিকে উঠে চালানো শুরু করে থাকেন সবাই। সকাল সকাল ঠান্ডা আবহাওয়ায় ক্লান্তিহীন অনেক পথ চালানো যায় বলে। আমাদেরও তেমনই প্ল্যান ছিল। কিন্তু  এবারের যাত্রায় প্রথম দিন ব্যতীত আর কোনো দিনও আমরা ৬টার আগে শুরু করতে পারিনি। ঢাকায় ফেরার দিন যাতে ভোর ভোর শুরু করতে পারি সেজন্য আগের রাতে এলার্ম দিয়ে রেখেছি সাড়ে তিনটার। ভলিয়ুম লেভেলও বাড়িয়ে দিয়ে রেখেছিলাম। ভোর সাড়ে তিনটার দিকে সেই এলার্মের শব্দে আতঙ্কগ্রস্ত হয়েই একেকজন উঠে পড়ল। এমন কান ঝালাপালা করা এলার্ম এর আগে কেউ নাকি শোনে নাই। এপি আপুতো পারলে আমাকে মাটিতে পুঁতে দেয়।

যাই হোক এ দিন, ভোর চারটার দিকে ঘুম থেকে উঠে ব্যাগ গুছিয়ে সাইকেল নিয়ে বের হতে হতে ৫টা। জুনায়েদ ভাইয়ের মামার বাসা থেকে মূল সড়কে আসতেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বৃষ্টি কী জোরে আসবে? পঞ্চো পরব কি না এসব ভাবতে ভাবতেই চলে গেল বৃষ্টি। সড়কে উঠেই হতভম্ব। দেখি সাইকেল নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের শামীম ভাই। শামীম ভাইয়ের বাড়িও এই কিশোরগঞ্জে। ঈদের আগে বাড়িতে এসেছেন। সাইকেল এনেছিলেন বাসের ছাদে করে। আমাদের সারপ্রাইজ দেবেন বলে এপি আপুর সাথে যোগাযোগ করে আগে ভাগেই চলে এসেছেন।

আমরা এগিয়ে চলছি। আসলে গত দুইদিন থেকে নিশু আপু বেশ টেনশনের মধ্যে আছেন। আমরাও আছি, তবে নিশু আপুর মতো অতটা না। কারণ হলো গিয়ে, লকডাউনে ঢাকায় ঢুকতে পারব কি না সেই আশঙ্কা। লোকমুখে শুনছি কঠোর লকডাউন চলছে। এমনিতেই লকডাউনে বাইরে বের হওয়া ঠিক না। তার ওপর সাইকেল নিয়ে আমরা ঘুরতে বেরিয়েছি। নিঃসন্দেহে এটাও আইনের লঙ্ঘন। পথে পুলিশ আটকালে কী জবাব দিব এসব ভেবে একেবারেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আমাদের নিশু আপু।

কিছুদূর আরও চালিয়ে গ্রামের একটা দোকানে আমরা চায়ের ব্রেক দিলাম। দোকান থেকে চা খেয়ে যখন ভালো লাগলো না তখন নিজেরাই গরম পানি নিয়ে কফি বানিয়ে নিলাম। এসময় শামীম ভাই বললেন, কাছেই ঈসা খাঁর জঙ্গলবাড়ি আছে, আমরা  চাইলে সেখানে ঘুরে যেতে পারি। আমরা সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। পাকুন্দিয়া পাড় হয়ে একটু বাম দিক দিয়ে আমরা ঢুকে গেলাম ঈসা খাঁর জঙ্গলবাড়ির উদ্দেশে। ঈসা খাঁর জঙ্গলবাড়ি আমি আগেও একবার এসেছি। সেই পথের সাথে এই পথের মিল খুঁজে পাচ্ছি না। আসলে এখানে ঈসা খাঁর আমলের এক ঐতিহাসিক মসজিদ আর বারামখানা আছে। শামীম ভাই সেটাকেই ভুল করে ঈসা খাঁর জঙ্গলবাড়ি বলেছেন।

এক লোককে জিজ্ঞেস করতেই পাশেই একটি টিলা মতো দেখিয়ে দিলেন। মোঘল আমলের কোনও দুর্গ হবে এটা। এখান থেকে বেরিয়ে আমরা চলে গেলাম গ্রামের ভিতর দিয়ে শাহ মাহমুদ মসজিদ ও বালাখানায়। সেখানে গিয়ে রীতিমত চমকে গেলাম আমরা। এত চমৎকার মসজিদ! বালাখানাটা যেন জোড়বাংলার মন্দিরের মতো। পুরো মসজিদটিই স্থাপত্য কলার সুনিপুণ নিদর্শন। সুবেদার শায়েস্তা খাঁর আমলে ১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে এগারোসিন্দুরের তৎকালীন প্রখ্যাত ব্যবসায়ী শাহ মাহমুদ এক গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। বাইরে একটি দো চালা পাকা ঘর আছে যার নাম বালাখানা। মসজিদটি ভিতরে এবং বাইরে সুলতানী আমলের চিত্রফলক দ্বারা নির্মিত। মসজিদটির সামনে ঘাট বাধা একটা পুকুরও আছে। চারপাশে একটু ঘুরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরেই উঠে পড়লাম প্রধান সড়কে। ব্রিজ দিয়ে পার হলাম  ব্রহ্মপুত্র নদ।

সুন্দর পিচঢালা রাস্তা। মাঝে মাঝে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। সাইকেল চালাতে ক্লান্তি আসছে না তেমন। ইতোমধ্যেই আমরা ঢুকে পড়েছি গাজীপুর জেলার কাপাশিয়া উপজেলায়। বীর উজলি নামক স্থানে আসতেই রাস্তার পাশে সাইনবোর্ডে লেখা বৃদ্ধাশ্রম। পাশেই একটি গাছে বৃদ্ধাশ্রম সাইনবোর্ড নতুন করে টানাচ্ছেন দুজন বৃদ্ধ। বৃদ্ধাশ্রমটি দেখে যাওয়ার ইচ্ছের কথা জানাতে জানাতেই আমরা পেরিয়ে গেলাম ওনাদের। আমাদের ইচ্ছের কথা শুনতে পেয়েছেন পেছনের গাছে সাইনবোর্ড টানানো ভদ্রলোক। তিনি জোড়ে আমাদের ডাকছেন। আমি ওনার ডাক শুনে ভয়ে আরও জোরে চালাচ্ছিলাম কি না কি বলে এই ভেবে। শেষমেশ ওনার ডাকে থামতেই হল। ভদ্রলোক বললেন বৃদ্ধাশ্রম দেখে যেতে।

এই কথা শুনে এপি আপু বেশ উত্তেজিত হয়ে বৃদ্ধাশ্রমের দিকে প্যাডেল মারতেই উল্টে গেলেন সাইকেলসহ।  একেবারে চিৎপটাং। ভাগ্যিস হেলমেট মাথায় ছিল। না হলে উপরওয়ালাই জানেন কী কপালে ছিল।

ভিতরে ঢুকতেই অরণ্যানী দিয়ে ঢাকা নির্মল পরিবেশের এক আবাসিক। পাখপাখালি, গাছপালা কবুতর মুরগি কোনো কিছুরই যেন কমতি নেই এখানে।

এর আগে টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি বৃদ্ধাশ্রম। বাস্তবে এই প্রথম কোনো বৃদ্ধাশ্রমের ভিতর ঢুকলাম। নাম আব্দুল আলী সেবাশ্রম। এখানে বিনামূল্যে অসহায় ও বয়ঃবৃদ্ধদের রাখা হয়। 

সেবাশ্রমটির পরিচালক মো. শাহজাহান কবীর। ওনার বাবার নামে এই সেবাশ্রম। জনাব কবির একজন সাবেক সচিব। ওনার বাবার ব্যাপক সম্পত্তি ছিল। রিটায়ারমেন্টের পর সেই সম্পত্তি দিয়েই করেছেন এই সেবাশ্রম। সাইকেলে আমাদের দলটিকে দেখেই ওনার আগ্রহ হয়েছিল। তাই তো পেছন থেকে ডাক দিয়েছেন আমাদের।

ভিতরে গিয়ে দেখি কী অসামান্য নির্জন বসবাসের জায়গা। চারদিকে ফলফুলের বাগান।  তারই এক কোনে সেবাশ্রমের বাসিন্দাদের থাকার জায়গা। মাঝখানে উঠোন। উঠোনের মাঝেও উঠে আছে হলুদ, গোলাপি রঙিন সব ফুল। পোষা কবুতর। বারান্দার এক কোনে সাদা বোর্ডে সেবাশ্রমের বাসিন্দাদের নাম লেখা।

কবির সাহেব আমাদেরকে বারান্দায় বসতে দিলেন।

বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দারাই এনে দিলেন সেখানকার গাছের পাকা কাঁঠাল আর মুড়ি। সবাই বেশ মজা করে ফলাহার করছিল আর আলাপ চলছিল কবির সাহেবের সাথে। কবির সাহেবও ভ্রমণপিপাসু মানুষ। বহু দেশ ঘুরেছেন। বিভিন্ন জাতি ধর্ম ‍নিয়ে ওনার ব্যাপক আগ্রহ। বৃদ্ধাশ্রমে ছোট্ট একটা সংগ্রহশালা ও লাইব্রেরি আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নানা সুভেন্যুর সেখানে রাখা। আমরা ঘুরে দেখলাম। বাসিন্দাদের সাথে গল্প করলাম।

কবির সাহেব ধর্ম নিয়ে লেখা ওনার একটা বই উপহার দিলেন আমাদের। উনি ঢাকাতে থাকেন। সপ্তাহান্তে এখানে বেরাতে আসেন। মূলত নিজের পরিবারের লোকজনের আর্থিক সহায়তায় চলে  বৃদ্ধাশ্রমটি।

সেখানে এলাকার মানুষদের কারিগরি শিক্ষার জন্য একটি কম্পিউটার ল্যাবও আছে। আছে মাটির দোতলা ঘরে  ছোট্ট একটি ক্লিনিকও। বেশ ভালো লাগছিল সেখানে। থাকতে ইচ্ছে করছিল আরও অনেক সময়। কিন্তু তাড়া আছে। ফিরতে হবে অনেকদূর। আমরা বিদায় নিয়ে চলে এলাম।

কিছুদূর চালিয়েই ঘুমে ঢলে পড়ছিলাম আমরা। নিশু আপুকে অনুরোধ করে রাস্তার পাশে একটি শালবাগানে  ম্যাট বিছিয়ে চিত হয়ে শুয়ে ঘন্টাব্যাপী দুর্দান্ত এক ঘুম দিয়েছি আমরা। সাথে নির্মল হাওয়ার পরশ। পুরো সময়টা নিশু আপু পাশে বসে থেকে পাহাড়া দিয়েছেন আমাদের পরম মমতায়।

ঘুম থেকে উঠে আমরা ধীরে ধীরে প্রবেশ করলাম গাজীপুরের দিকে। গাজীপুরের কালিগঞ্জ পেরিয়ে চমৎকার সুন্দর সব গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে চলছি। লকডাউন চলায় গ্রামের দোকানপাট, বাজারঘাট সব বন্ধ। সবুজ একটা গ্রাম পেলাম, সম্ভবত ভাকোয়ান্দি নাম। একেবারেই যেন ছায়া সুনিবিড় শান্তির গ্রাম। এমন নীরব নির্জন গ্রাম আমি আগে দেখি নাই।  আপন মনে গল্প করতে করতে এই গ্রামে আবার আসব এমন আশা নিয়ে পথ চলতে থাকি।

অনেক বেলা হয়েছে। লকডাউনে দোকানপাট বন্ধ থাকায় আমাদের আর খাওয়া হয়নি। ক্ষুধায় চো চো করছে পেট। একটা বাজার মত দেখে ভিতরে ঢুকে দেখি কোন খাবারের দোকান খোলা নাই।

একটু এগিয়ে পথে মধ্যবয়েসি এক চাচির সাথে দেখা। ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম কোথাও খাবারের দোকান আছে কি না। আমরা ঢাকায় যাব। খুব ক্ষিদে পেয়েছে আমাদের। না খেলে চলতে পারব না। মজা করে কিনা জানি না, উনি বললেন, আমার বাড়িতে আসো সবাই। আমি বললাম সত্যি! বললেন, মিথ্যা হবে ক্যান? আমি বললাম, আমরা কিন্তু ছয় জন। এত মানুষের খাবার হবে? বললেন মেহমানের জন্যই আজ রান্না করেছি। বেশি মেহমান আসে নাই। অনেক খাবার আছে। তোমরা আসো। আমি যেন হাতে আকাশের চাঁদ পাইলাম। কোনো সংকোচ না করে চিৎকার করে সবাইকে ডাকলাম।

একটু এগিয়েই চাচির বাসা। একটা ছোট্ট টিনের ঘর। বস্তি টাইপের।  চাচিরা তিন বোন ওখানে থাকে। পরপর ঘর। চাচির নাম নসিবা খাতুন। গ্রাম পুলিশের চাকরি করেন।

ছোট্ট টিনের ঘরটিতে আমাদের বসিয়ে সেকি এলাহী কাণ্ড। ভাত, মুরগি, গরু, মাছ, ডাল, সবজি নানা খাবার দিয়ে ভরিয়ে দিলেন। গাপুস গুপুস খেয়ে বাইরে বেড়িয়ে দেখি উঠোন ভরা মানুষ। চাচির পুরো পরিবার জড়ো হয়েছে। সবাই আন্তরিকতার সাথে কথা বলছে আমাদের সাথে। নসিবা চাচির সাথে অদ্ভুত এক মায়ায় জড়িয়ে পড়লাম আমরা। আমাদের ব্যাগে থাকা কয়েকটা বই দিয়ে দিলাম চাচির নাতি নাতনির হাতে। সাথে আমাদের সঙ্গে থাকা নুডুলস আর স্যুপগুলোও।

ঘন হয়ে বসলাম বাড়ির উঠোনে। রত্না আপু চা বানালেন। সবাই একসাথে বসে চা খেয়ে অনেক গল্প করলাম। আবার দেখা হবে, অনেকদিন মনে থাকবে চাচিকে এমন কথা বলে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করে আমরা বিদায় নিলাম। এমন সরল মানুষ আর দেখিনি। কী পরম মমতায় অচেনা পথিকদের আপন করে নিয়ে খাওয়ালেন!

ছায়া সুনিবিড় রাস্তা। বিকেলের সূর্য হেলে পড়েছে। একটু এগিয়েই সামনে একটা বিলের মতো পেলাম আমরা। আরেকটু এগিয়ে একটা চার্চ। চার্চের ভিতর ঢুকে বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ঢাকা এখনো অনেক দূর। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ৩০০ ফিট বা পূর্বাচল দিয়ে যাব। পূর্বাচলে পৌঁছাতেই পশ্চিমাকাশ এক অদ্ভুত রঙিন আলোয় ভরে উঠল। আমরা বসে পড়লাম সেখানে। কিছুক্ষণ পূর্বাচলে চালাতে চালাতেই আকাশে ভেসে উঠল পূর্ণিমা চাঁদ। অদ্ভুত! চাঁদের আলোর মাদকতায় আমাদের সাইকেলযাত্রা যেন পূর্ণতা পেল। এই যাত্রায় যেন আর কিছুই অপূর্ণ নেই। আমরা আবারও একটা চায়ের দোকানে থেমে চাঁদের আলোয় অবগাহন করে চা খেলাম। তারপর আবার যাত্রা।

এর মধ্যে ৩০০ ফিট। ৩০০ ফিটের রাস্তা যে ভেঙে নতুন করে করা হচ্ছে তা জানা ছিল না আমাদের। ঢুকে আমাদের মাথায় পুরো আকাশ ভেঙে পড়ল। ভাঙা রাস্তায় বহু কষ্টে সাইকেল চালিয়ে রাত ১০টা নাগাদ আমরা পৌঁছাই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। কষ্ট হলেও  অদ্ভুত এক ভালো লাগাকে আচ্ছন্ন করে যে যার মতো ঘরে ফিরি আমরা।

 

নিউজজি/নাসি

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers