মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৫ জিলকদ ১৪৪৭

ফিচার
  >
ভ্রমণ

সাইকেলের ডানায় উড়াল (৮ম পর্ব)

আঞ্জুমান লায়লা নওশিন ১ ডিসেম্বর , ২০২৩, ১৪:৩৪:২০

828
  • সাইকেলের ডানায় উড়াল (৮ম পর্ব)

(২৩/০৭/২০২১)

‘আবারও আসব’ পালক অভিনাষ বাগী দাদাকে এমন কথা দিয়ে আমরা আমাদের পথ ধরলাম। গুচ্ছ গ্রামকে বিদায় জানিয়ে কিছুদূর এগুতেই পেলাম দুর্গাপুরের বহেরাতলী বাজার। এখানকার চৌরাস্তার মোড়েই আছে হাজংমাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ। আমরা সাইকেল রেখে স্মৃতিসৌধের সামনে গেলাম।

রাশিমনি হাজং ছিলেন টংক ও কৃষক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী।  জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন তিনি। ১৯৪৬ সালে ৩১ জানুয়ারি কুমুদিনী হাজংকে বাঁচাতে গিয়ে মুখোমুখি সংগ্রামে ব্রিটিশ বাহিনীর গুলিতে বহেরাতলী গ্রামে সহযোদ্ধা সুরেন্দ্র হাজংসহ শহিদ হন রাশিমনি হাজং। এই বীর যোদ্ধার স্মরণে হাজংমাতা রাশিমনি মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এই স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিবছর ৩১ জানুয়ারি রাশিমনি দিবস ও টংক শহিদ দিবস পালন করা হয়।

এখান থেকে অল্প পথ সাইকেল চালিয়েই আমরা পেলাম সোমেশ্বরী নদী। নৌকাটা তখন ঐ পাড়ে। নৌকা আসতে দেরি হবে দেখে রত্না আপু ও নিশু আপু গতকাল রাতে বৃষ্টি কাদায় মাখানো পোশাকগুলো ধুয়ে ফেলতে নদীতে নামলেন। বেশ কড়া রোদ উঠেছে। সাইকেলে ঝুলিয়ে নিলে দ্রুতই শুকিয়ে যাবে।

নদীর পাড়ে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর এপি আপু। নৌকা পাড় হয়ে ঐ পাড়ে যেতে প্রায় ৯/১০ সদস্যের এক পরিবার সেখানে এলো। মনোয়ারা চাচীর পরিবার। যাবেন গৌরীপুর। এপারে মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। আজ ফিরে যাচ্ছেন। দিনমজুর পরিবার চাচীদের। চার মেয়ে দুই ছেলে। চাচা আগে রিকশা চালাতেন। এখন ছেলে চাকরি করে সংসার চালায়। কথা বলতে বলতেই চাচি বেশ আপন করে নিলেন আমাদের। আমরা আজ কোথায় যাব, কোথায় থাকব এ নিয়ে নাকি সারাদিন মন পোড়াবে তার।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রলারটা ঘাটে ভিড়ল।  নৌকা পাড় হয়ে  চাচীকে বিদায় জানিয়ে আমরা আমাদের পথে চললাম। বিরিশিরির পাশ দিয়েই আমরা সামনে এগুতে থাকলাম। আমার গতি স্লো বলে আমি একটু এগিয়ে চালাচ্ছিলাম। আরেকটা বাজার পার হয়ে বোতলে পানি ভরে পেছনে তাকিয়ে দেখি কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। দেরি হবে ভেবে একটি চায়ের দোকানে বসলাম।  কিছুক্ষণ পর রত্না আপু এলেন। বললেন পেছনের ক্যারিয়ারে শুকাতে দেয়া নিশু আপুর জামাটা সাইকেলের চাকায় আটকে গিয়েছিল। চাকা খুলে অনেক কষ্ট করে চাকু দিয়ে কেটে জামা বের করতে হয়েছে। এজন্যই দেরি হচ্ছে।

রত্না আপু আর আমি গল্প করছি চা খেতে খেতে। এখানে আছে তামিম নামের এক ৭/৮ বছরের ছেলে। চায়ের দোকানদার চাচার ছেলে সে। ব্যাগ থেকে দুইটা গল্পের বই বের করে তুলে দিলাম ওর হাতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশু আপু আর এপি আপু আসলে আমরা আবারও এগুলাম সামনের দিকে।

আজকের পথটাও বেশ চমৎকার। স্নিগ্ধ সবুজ গাছগাছালি ঢাকা রাস্তা। আশপাশে বিলের মতো জলাশয়। আমার গতি স্লো বলে এবারও আমি সামনে আছি, যতদূর টেনে চালানো যায় আরকি। কিছুদূর গিয়ে পূর্ব বিলাশপুরে গিয়ে দেখি আবারও পেছনে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সাইকেল রেখে ছোট্ট একটা ব্রিজের উপর দাড়ালাম। চারপাশটা ভীষণ সুন্দর। সেখানে ছোট্ট একটা বাচ্চার সাথে গল্প করতে করতেই চলে এলেন এপি আপুরা। এপি আপুর হেলমেটে একটা বকের ছানা। দেখে মনে হচ্ছে কেবল উড়তে শিখেছে। জানা গেল রাস্তার ধারে পড়ে ছিল বকের ছানাটা। কয়েকটা বাচ্চা ছানাটাকে নিয়ে কী জানি করছিল। উড়তে পারছিল না বকটি। বাচ্চারা বকের ছানাটিকে মেরে ফেলে কিনা এই আশঙ্কায় রত্না আপু সেখান থেকে তুলে এনেছেন ছানাটিকে। এবার নিরাপদ কোনো জায়গায় ছানাটিকে রাখার জন্য সামনে এগুলাম আমরা।

একটু এগিয়েই একটা পুকুরের পাশে থামলাম। রাস্তা থেকে একটু দূরে বন ঝোঁপঝাড় দেখা যাচ্ছে। বর্ষাকাল হওয়ায় আশপাশের জমিগুলোতে পানিও জমে আছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম মাঠের মধ্যে দূরের ঐ গাছগুলোর কাছে বকটাকে রেখে আসলে সঙ্গীসাথিরা নিয়ে যাবে। বাচ্চাকাচ্চারা ওখানে যেতে পারবে না। ছানাটিকে হাতে নিয়ে রত্না আপু নেমে পড়লেন কাদা পানিতে ডোবানো জমিতে। কিছুদূর হেঁটে গিয়ে দূরের গাছের তলায় রেখে আসলেন ছানাটিকে। ছানাটিকে নিরাপদ জায়গায় রেখে এক ধরনের তৃপ্তির আনন্দে আমরা আবারও প্যাডেল মারলাম সামনের দিকে।

কিছুদূর চালাতেই আকাশটা একটু মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। সূর্যের তাপ নেই। নির্মল হাওয়া বইছে। আমরা যে পথে যাচ্ছি দুই পাশে বিস্তৃত মাঠ, কোথাও কোথাও জমে আছে বর্ষার পানি। মনে হচ্ছিল হাওরের পথে চলছি। অদ্ভুত এক ভালোলাগা নিয়ে আমরা সাইকেল চালাতে লাগলাম। ফোন থেকে ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস গানটা প্লে করলাম। গানটার সাথে আমাদের এই যাত্রা যেন দারুণ মিলে গেল!

বেশ কিছুক্ষণ পর আমরা পৌঁছুলাম ঢেউটুকুন গ্রামে কংশ নদীর পাড়ে। এই কংশ নদী দেখেই মনে পড়ল হুমায়ুন আহমদ, নির্মলেন্দু গুণের কথা। ওনাদের লেখায় এই নদীর নাম অনেকবার পেয়েছি। নৌকায় কংশ পাড় হতে হতে আমরা সহযাত্রীদের কাছে খোঁজ নিচ্ছিলাম রাস্তায় পুলিশ আছে কি না। আজ ঈদের পরে কঠোর লকডাউনের প্রথম দিন। এই ভেবে আমাদের ভয়ও লাগছিল। পুলিশ আটকায় কিনা। সকলেই অভয় দিলেন সাইকেলে আছি বলে আমাদের কেউ কিছু বলবে না।

নৌকা পাড় হয়ে আমরা আবারও পেলাম ভীষণ চমৎকার হাওরের মত পথ। মনটা বেশ ফুরফুরে লাগলেও পেটে ক্ষুধা মাথা চাড়া দিচ্ছিল।  আমরা হোটেল আর দোকান খুঁজছিলাম। কিন্তু গ্রামের পথ হওয়ায় খাবার হোটেলের দেখা মিলল না। কিছুদূর এগিয়ে নদীর পাশে একটি চায়ের দোকানে বসলাম আমরা। টিউবওয়েল থেকে পানি বোতলে ভরে তৃষ্ণা মেটালাম সবাই। দোকানে চায়ের অর্ডার দিয়ে পিছন দিকে নদীর পানে মুখ করে বসে পরলাম। রত্না আপু আজও হাজির হলেন মাতৃরূপে। আসলে রত্না আপুকে এই ট্যুরের আগে যেমন দেখেছি এবার পেলাম পুরাই অন্যরূপে। অন্য রকম মুগ্ধতা আর ভালোলাগায় পুরো ট্যুরেই আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন তিনি। আজও নিজ দায়িত্বেই নুডুলস, স্যুপ বের করে চায়ের দোকানের চুলাতেই বানাতে বসালেন।

চা খাচ্ছি। কাছে নদীটির পাড়ে দ্বীপের মতো এক গ্রাম দেখা যাচ্ছে। আর নদীর মাঝখানটাতে চরের মতো মনে হচ্ছে। যেন বালু চিকচিক করছে। সামনেই ঢালু পানির জমিতে খেলা করছে এক পাল হাঁস।

রত্না আপু সহজেই গ্রামের সাধারণ মানুষদেরদের সাথে কি দারুণভাবে মিশে যাচ্ছেন। চায়ের দোকানে বসা চাচাদেরকে বললেন আমাদের ভ্রমণের বৃত্তান্ত। সবাই অবাক হয়ে আমাদের ভ্রমণের গল্প শুনছিলেন। শুভকামনাও জানালেন আমাদের।

খাওয়া শেষ করে এবার আমরা ধরলাম বিকল্প পথে গ্রামের রাস্তা। গ্রামের গাছগাছালি ঢাকা রাস্তায় চলছি আমরা। এই রাস্তাটাতেও হাওর হাওর ফিল হচ্ছিল। স্নিগ্ধ সমীর জুড়িয়ে দিচ্ছে প্রাণটা। শন শন করে কথা বলছে আশপাশের গাছগাছালিগুলো। পাশের ঢালু জমিতে ভরা পানিতে ইচ্ছেমতো ডুব দিচ্ছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। দারুণ আনন্দে মাতামাতি করছে ওরা। ওদের দেখে আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরেই পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে ছুটতাম বুড়িতিস্তা নদীতে। পানিতে ডুবে ডুবে কত ধরনের খেলা খেলতাম। ঘন্টা পর ঘণ্টা দাপাদাপি করে চোখ লাল করে বাড়িতে ফিরলেই মায়ের বকুনি। আহা। সেইসব দিনগুলি। সোনার খাঁচার দিনগুলি মোর!

এমন চমৎকার সুশীতল পথ ধরে কিছুদূর চলার পরপরই দেখি  আবারও নিজের সর্ব তেজ দিয়ে কিরণ ঢালছেন সূর্যমশাই। তপ্ত রোদে পিঠ পুরিয়ে  অনেকটা পথ চালিয়ে নেত্রকোণার একেবারে কাছাকাছি চলে আসি আমরা।  ঢোকার আগে দেখি ম্যাজিস্ট্রেট রেইড দিচ্ছেন। দেখে ভয় হচ্ছিল, আটকায় কিনা। একজন পথচারী বললেন, নির্ভয়ে যান, সাইকেল আটকাবে না। জোরে টান মারলাম আমরা। একটু এগিয়ে দেখি বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ বস্তা নিয়ে রিকশায়, ভ্যানে, অটোতে, ফুটপাতে, রাস্তায় অসংখ্য মানুষ অপেক্ষা করছে। এনারা আসলে ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে এসেছেন। আবার ঢাকায় ফিরতে হবে কাজে। কিন্তু লকডাউনের কারণে বিরম্বনায় পড়েছেন। তাই হয়তো হরেক রকম যানবাহন পরিবর্তন করে করে, কিছু হেঁটে হেঁটে গন্তব্যে যেতে যাচ্ছেন।

কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই নেত্রকোনা সদরে পৌঁছুলাম আমরা। শুক্রবারের দিন। খাঁ খাঁ করছে নেত্রকোনা সদর। দেখলাম বারহাট্টা রোড। বারহাট্টা রোড দেখতেই মনে পড়ল নির্মলেন্দু গুনের কথা। ওনার জন্ম এখানেই।  ইচ্ছে থাকলেও সময়ের অভাবে ঘুরে আসা হল না কবির জন্মভিটেয়।

নেত্রকোনা সদর পাড় হয়ে দুপুরের দিকে আমরা চলছি নেত্রকোনা কেন্দুয়ার পথ ধরে। কিছুদূর এগিয়ে গাছপালা ঢাকা একটি মাঠে বিশ্রাম নিলাম আমরা। সেখান থেকে কাঠফাটা রোদে সাইকেল চালিয়ে মদনপুর বাজারে পৌঁছালাম। সেই বাজারে ছোট্ট একটা হোটেলে ভাত খেলাম আমরা।

খাওয়ার পরপরই আমাদের অভিযাত্রীর জুনায়েদ ভাই কল দিলেন।  আজ রাতে কিশোরগঞ্জে জুনায়েদ ভাইয়ের মামার বাসাতেই থাকব আমরা।  তাই আমরা কতদূর আছি তা জানার জন্য ভাইয়া মাঝে মাঝে কল দিচ্ছেন। মদনপুরে আছি শুনে ভাইয়া বললেন পাশেই বিখ্যাত এক মাজার আছে। হজরত শাহ সুলতান কমর উদ্দীন রুমি (রাহ:) এর মাজার।  আমরা চাইলে সেটা দেখে যেতে পারি। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বলল কয়েক সেকেন্ড লাগবে এখান থেকে। আমরা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত চলে গেলাম মাজারের দিকে।

মাজারে ঢোকার আগেই মেলার মতো ভাসমান দোকানপাট চোখে পড়ল। কেউ দুইটা মুরগি নিয়ে বসেছে, কেউ অল্প কিছু ডিম নিয়ে, কেউ ক্ষেতের সামান্য সবজি-ফলমুল এনেছে। এমন অনেক কিছু বস্তা বিছিয়ে বিক্রি হচ্ছে সেখানে। আমার মনে হচ্ছিল মাজারে যারা এটা সেটা দিয়ে মানত করতে আসে তারা হয়ত সামর্থ্য মতো এখান থেকে কিনে নিয়ে মাজারে জমা দেয়। অথবা এমনও হতে পারে, অনেকেই নিজের ক্ষেতের বা ঘরের অনেক জিনিসই মানত করে থাকে। সেগুলো মাজারে দিয়ে যায়। প্রতিদিন এমন অনেক জিনিস মাজারে জমা হয়। সেগুলো হয়তো মাজার কর্তৃপক্ষ বিক্রি করে অল্প দামে। সেই পণ্যগুলোই পরে এভাবে বস্তা বিছিয়ে বিক্রি হয় হয়ত।

মাজারের পাশে একটা বট গাছের নিচে বসে পড়লাম আমরা। নিশু আপু আর রত্না আপু সেই ভাসমান দোকানগুলো থেকে পেয়ারা আর চা আনলেন। আমরা সাইকেল নিয়ে এখানে এসেছি দেখে অনেক মহিলা সেখানে জড়ো হল। গল্প করছেন আমাদের সাথে। আমরা আমাদের সঙ্গে থাকা বিস্কুটের একটা প্যাকেট ওনাদের খেতে দিলাম। পাশেই কয়েকটি বারামখানা মতো জায়গা আছে। প্রতি বৃহস্পতিবার এখানে আসর বসে। করোনার কারণে এ সপ্তাহ বন্ধ আছে সেই আয়োজন। মহিলারা বললেন ভীষণ জাগ্রত এই মাজার। তাই আশপাশের জেলাসহ দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসে এখানে মানত করতে।

উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী ছিলেন একাদশ শতাব্দীর একজন সুফি মুসলিম ব্যক্তিত্ব। বলা হয়ে থাকে তিনি প্রথম সুফি যিনি বাংলায় ভ্রমণ ও বসতি স্থাপন করেছিলেন। নেত্রকোণায় ইসলামের প্রসারেও তার নাম জড়িয়ে আছে।

নিশু আপু আর আমি এগিয়ে গেলাম মাজারের দিকে। এখানে মাজারের একদম কাছে  নারীরা যেতে পারে না। মাজারের সামনের দিকে আছে মানত ও শিরনী আদায়ের স্থান। সেখানে দেখি এক পরিবার এসেছে কালো রঙের এক ছাগল নিয়ে। ছোট্ট একটা ছেলে, সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা, মাথায় কাপড়ের টুপি। ছাগলের দড়িটা নিজের হাত থেকে তুলে দিল সেখানকার তত্ত্বাবধায়কের হাতে। সাথে নিয়ে এসেছে আগরবাতি, মোমবাতি ও ঝকঝকে রঙিন কাগজের মালা। পাশে দাঁড়িয়ে আছে শিশুটির মা, বাবা ও বোন। কথা বলে জানলাম, ওনারা এসেছেন ময়মনসিংহ থেকে।  ছেলে সন্তানের আশায় পরপর তিন মেয়ে সন্তান  আসে তাদের ঘরে। একটি ছেলে সন্তানের আশায় মানত রেখেছিল শাহ সুলতান রুমীর দরবারে। তারা বিশ্বাস করে সেই মানতের কারণেই  পূত্রসন্তান এসেছে  তাদের সংসারে। সেই সন্তান জন্মেছে প্রায় ৫ বছরে হয়ে গেছে। সেই মানত দিতেই তারা মাজারে এসেছেন আজ। বাকি জীবনটা যেন তাদের সন্তান দুধে ভাতে থাকে, তাকে না ছোঁয় কোন বালা মছিবত।

মাজার থেকে বেরিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম এবার একটা লম্বা টান হবে। কিন্তু একেই বলে কপাল! পরের প্রায় ১০ কি.মি.র মতো পথ পুরোটাই ছিল ভাঙাচোরা। সূর্যের তেজ অনেকটা কমে আসলেও ইটের ভাঙাচোরা রাস্তায় সাইকেল চালাতে চালাতে আমাদের অবস্থা প্রায় কাহিল। একটু চালিয়ে, একটু বিরতি দিয়ে আমরা পেরুলাম সেই পথটা। কেন্দুয়া না গিয়ে বাইপাস দিয়ে আমরা ধরলাম কিশোরগঞ্জের পথ। বলে না, অন্ধকারের পরে আলোর দেখা মেলে, আমরাও ভাঙাচোরা রাস্তার পর পেলাম চমৎকার পিচঢালা রাস্তা। শেষ বিকেলে রাস্তার দু পাশের মনোরম সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা পেরুলাম নান্দাইল চৌরাস্তা।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে প্রায় ৯৯ কি.মি. চালিয়ে আমরা পৌঁছুলাম কিশোরগঞ্জ সদরে। সেখানে জুনায়েদ ভাইয়ের মামা এসে বাসায় নিয়ে গেলেন আমাদের। দ্রুত গোসল সেড়ে ক্লান্তিকে বিদায় জানিয়ে আমরা চলে গেলাম জুনায়েদ ভাইয়ের চাচার বাসায়। গিয়ে দেখি পুরো ঈদের খাবারের আয়োজন। পোলাও, রোস্ট, গরুর মাংস, হাওরের মাছের ভর্তা ভাজি, ফলমুল আরো কত কী!  জুনায়েদ ভাইয়ের পরিবার বরাবরই বেশি আন্তরিক। এর আগেও হাওর ট্রিপে আমরা গিয়েছি ওনার মামার বাসায়। সব  এলাহী ব্যাপার স্যাপার। মামার বাড়ির আদর কাকে বলে! হাওর ট্রিপে দুই দিনের জন্য হাঁস, মুরগি, মাছসহ ট্রলার ভরে দিয়েছিলেন রকমারি সব খাবারে। এজন্যই কিশোরগঞ্জ, ইটনা, মিঠামঈন আমাদের অভিযাত্রীর জাতীয় মামার বাড়ি হয়ে উঠেছে। এখানে এলে আপ্যায়নের কোনো কমতি নেই।

সেদিক থেকে জুনায়েদ ভাইয়ের চাচারাও কম যান না। চাচা নিজ হাতে পরিবেশন করলেন আমাদের। গাপুস গুপুস পেট ভরে খেতে খেতেই ঘুমে চোখ একেবারে  ঢুলুঢুলু। চাচার বাসা থেকে ঘুমে এমন অবস্থা যে আর হাঁটতে পারছি না। জুনায়েদ ভাইয়ের নির্দেশমতো রাত প্রায় সাড়ে ১০ টায় মামা আমাদের নিয়ে গেলেন শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ দেখাতে। আমি গো ধরেছি যাবো না। ঘুমাব। কিন্তু অগত্যা রত্না আপুর ঘাড়ে মাথা রেখে যেতেই হলো শোলাকিয়া মাঠে। শোলাকিয়া মাঠ থেকে ফিরে রাত ১১টার দিকে দিলাম সেই ঘুম। কালকে আমরা ঢাকায় ফিরব।

চলবে...

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers