মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৫ জিলকদ ১৪৪৭

ফিচার
  >
ভ্রমণ

সাইকেলের ডানায় উড়াল (৭ম পর্ব)

আঞ্জুমান লায়লা নওশিন ২৪ নভেম্বর , ২০২৩, ১৫:০৬:০৪

997
  • সাইকেলের ডানায় উড়াল (৭ম পর্ব)

(২২.০৭.২০২১)

নেত্রকোনার বিজয়পুরে পালক অভিনাষ বাগী দাদার সাথে কথা বলার পর থেকেই আমাদের মাঝে এক ধরনের স্বস্তি কাজ করছিল। পাহাড়ি এলাকায় কোথায় থাকব, তা নিয়ে একটু দুশ্চিন্তাতেই ছিলাম আমরা। রাত্রিযাপনের ব্যাপার স্যাপার নিশ্চিত হওয়ার পর অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে দাদার সাথে টিলার দিকে হাঁটছি আমরা। বিকেল সাড়ে ৫টার মতো বাজে। গোধুলী নেমে এসেছে চারদিকে । সমতলের তুলনায়  যে কোনো  পাহাড়ের কোলে দ্রুতই অন্ধকার নেমে আসে। এখানেও তেমনটাই। পশ্চিমাকাশ এক অদ্ভুত বিষন্ন রঙ ধারণ করেছে। যেন আশপাশের টিলাগুলোর পেছনেই আকাশটা নেমে গেছে। টিলাগুলো পেরিয়ে গেলেই যেন আকাশটা দেখা পাব। এমন ভাবতে ভাবতেই  চমৎকার একটি ঝিরি পেরিয়ে আস্তে আস্তে উপরে উঠে গেলাম  আমরা। গুচ্ছগ্রামের টিলার নিচে গোল একটি পুকুর। পুকুর পেরিয়ে বেশ কষ্ট করেই সাইকেল ঠেলে টিলার উপর গুচ্ছগ্রামে তুলতেই  হতভম্ব আমরা।  প্রকৃতি যে এমন বিস্ময় আমাদের জন্য রেখেছে তা কল্পনাতেও ছিল না। উপরে উঠেই মনটা আনন্দে নেচে উঠল।  ঠিক চার্চের মাথায় দুধের সরের মতো চাঁদ। ধবল দুধের মতো যেন আলো ছড়াচ্ছে জোৎস্নার। এই টিলার মাঝে ফকফকা আলো ঢেলে দিয়ে গ্রামটাকে আরও অপরূপ করে তুলেছে মায়াবি চাঁদটি।  আহা! প্রকৃতির এত আনন্দ আয়োজনের যোগ্য কি আমরা?

চার্চের পাশেই কয়েকটা বাড়ি। এই গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা ওনারা। আমাদের বেশ সাদরেই গ্রহণ করলেন তারা। আমাদের ইচ্ছে ছিল চার্চের সামনে তাবু টানাব। কিন্তু দাদা বললেন তাবু না টানিয়ে চার্চেই থাকতে। আমরা আপত্তি জানালেও রাতে বৃষ্টির আশঙ্কায় ভিতরে থাকতে রাজি হয়ে গেলাম। সাইকেলগুলো একপাশে রেখে আমরা আমাদের প্যানিয়ার-ব্যাগ বারান্দায় রেখে দিয়ে টিলার  নিচের পুকুরে গোসল করতে নামলাম।

উপরের ঝকঝকে চাঁদ। জোৎস্নার ঝলকানিতে গাছের পাতাগুলো চিকচিক করছে। চারপাশে টিলা। আমরা চার কন্যা ছাড়া আশপাশে আর কোনো জনমানুষ নেই। পাশের বন থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। আর একটি দুটি করে শতটির মতো জোনাকি উড়ছে চারদিকে। পুকুরের পানি ততটা গভীর ছিল না। পানির মধ্যে গা এলিয়ে দিয়ে আমরা চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি। যেন জোৎস্নাজলে স্নান।  এমন মেলবন্ধন এর আগে কখনো আমার জীবনে হয়নি। পৃথিবীর সকল আনন্দ যেন প্রকৃতি আজ এই টিলার মধ্যিখানে আমাদের জন্য জমা রেখেছিল সবটা  আমাদের উজাড় করে দেবে বলে। মনে হচ্ছিল এই যে এত আয়োজন, এই ঝকঝকে জোৎস্না, এই নিস্তব্ধ রাত, এই পুকুরের জলে স্নান এত আনন্দ আয়োজন শুধুই আমাদের জন্য। অথচ কী-ই বা দিয়েছি এই পৃথিবীকে?

পুকুরের পানিটা ততটা শীতল ছিল না। এখানে আসার সময় আমরা যে ছোট্ট ঝিরিটা পেয়েছি সিদ্ধান্ত নিলাম সেখানে গিয়ে গোসল শেষ করব। সবাই উঠে পড়লাম। ঝিরির পাশে রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল করে বলে কিছুটা আড়ালে গিয়ে আমরা নামলাম। এবার শীতল জলে গা এলিয়ে দেয়ার পালা। এখানেও ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি পোকা অপার আনন্দে  নাচানাচি করছে চারদিকে। যেন এক’শ একটা বাতি জ্বালিয়ে পাহাড়া দিচ্ছে আমাদের। সেই ঝিরির জলে যে আনন্দ নিয়ে সেদিন আমরা আমরা অবগাহন করেছি তার তুলনা হয়তো অন্য কিছু দিয়েই হবে না। এমন মুহূর্ত জীবনে খুব কমই আসে।  লিখে আর কতটুকু প্রকাশ করা যায়। যা দেখেছি, যা উপভোগ করেছি তার সিকি ভাগও নয়। রাত প্রায় সাড়ে আটটা বাজে। আমাদের দেরি দেখে অভিনাষ দাদা টর্চললাইট জ্বালিয়ে খুঁজতে এসেছেন আমাদের। আমরা দ্রুত গোসল শেষ করে দাদার পিছু পিছু টিলায় উঠে পড়লাম।

পেটে প্রচণ্ড ক্ষিদে। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় দোকান পাট আগেই বন্ধ হয়। আমাদের কাছে স্যুপ নুডুলস ছিল কিন্তু চুলাটা নষ্ট হওয়ায় আমরা চাচ্ছিলাম বাজারে কোনো হোটেলে গিয়ে খেতে। অভিনাষ দাদার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। মেইন সড়কে গিয়ে দেখি সব বন্ধ। একটা অটো রিকশাও নেই। অভিনাষ দাদা একজনকে ফোন করে একটা অটো নিয়ে আসলেন। সেই অটোতে উঠে আমরা গেলাম বহেরাতলী বাজারে। বাজারে গিয়ে দেখি খাবার হোটেল সব গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। যে দুয়েকটা খোলা আছে তাতে ভাত নেই। একটাতে ঠান্ডা কিছু ভাত আছে। আরেক হোটেলে আছে বুটের ডাল। আমরা হোটেলওয়ালাকে ডিম ভাজতে বললাম। বুটের ডাল আর  ডিম ভাজি দিয়ে সে রাতের মতো ক্ষুধা নিবারণ করে ফিরে এলাম আমাদের থাকার জায়গায়।

গুচ্ছগ্রামে ফিরতে ফিরতেই প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস শুরু হয়ে গেল। আমরা দৌড়ে চার্চে এসে দেখি সেখানে অবস্থান করা সুধীন রুরাম দাদা নিজের থেকেই বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে আমাদের সাইকেলগুলো চার্চের বারান্দায় এনে রেখেছেন বেশ গুছিয়ে। দড়ি থেকে তুলে রেখেছেন আমাদের কাপড়গুলোও।

সুধীন রুরাম দাদার কথা আগে বলা হয়নি। সত্তুরোর্ধ্ব এই মানুষটি এখানে আসার পর  থেকেই আছেন আমাদের সঙ্গে। তিনি এই চার্চেই থাকেন। অভিনাষ দাদার নিত্যসঙ্গী। সাইকেলের প্রতি ওনার গভীর প্রেম। সেই আশির দশকে সাইকেলে চেপে উনি  নেত্রকোনা থেকে ময়নামতি গিয়েছিলেন । একবার যশোরেও গিয়েছিলেন। সাইকেলের প্রতি আকর্ষণ ও আমাদের মতো অভিযাত্রীদের প্রতি নির্মল এক মায়া থেকেই নিজের থেকেই চার্চের ভিতর সব পরিপাটি করে রেখেছেন আমাদের জন্য। আমরা তড়িঘড়ি করে ব্যাগ প্যানিয়ার নিয়ে চার্চে ঢুকলাম। চার্চের ভিতর এর আগেও প্রবেশ করেছি। কিন্তু এবার এসেছি রাতে ঘুমানোর জন্য। কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠলো। ঘুমে  চোখ একেবারে বুজে এসেছে। অভিনাষ দাদা আমাদের হাতে তুলে দিলেন লোকাল বাজারের গুলগুলা নামের এক খাবার। সেটা খেয়ে দ্রুত ম্যাট পেতে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমরা যখন ঘুমের সাগরে, তখন নিশু আপু ঝড়ের পড়ে যাওয়া আমাদের সকলের কাপরচোপড় গুলো একাই মাটি থেকে তুলে এনে শুকাতে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। আর একপাশে আমাদের নিরাপত্তার জন্য প্রহরীর মতো শুয়ে থাকলেন সুধীন রুরাম দাদা।

পরদিন ঘুম থেকে উঠতে প্রায় ৬টা বাজল। তড়িঘড়ি করে ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হলাম আমরা।  আমাদের প্ল্যান ছিল কলমাকান্দা যাওয়ার। এখান থেকে কলমাকান্দা আরো ৫৫ কি.মি.। কলমান্দায় গেলে আমাদের আরও একদিন বেশি লাগবে। সবার ছুটিও নেই। তাই কলমাকান্দা যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে কিশোরগঞ্জের যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা। ম্যাপ অনুযায়ী কিশোরগঞ্জ এখান থেকে ১০৪ কি.মি.।

সবকিছু সাইকেলে তুলে চার্চের সামনে একটু ডাকলেন অভিনাষ দাদা। আমাদের নিয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করলেন। বাকি পথ যেন আমরা নিরাপদে চলতে পারি সেই প্রার্থনা। এরপর  সেই গ্রামেরই একটি চায়ের দোকানে চা খেতে বসলাম আমরা। এখানেও সবাই আমাদের বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করলেন। বড়দিনে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন অন্তর থেকে।

রোদ উঠে গেছে। সাইকেল নিয়ে আমরা নামছি টিলা থেকে। সঙ্গে আছেন অভিনাষ দাদা ও সুধীন দাদা। নিচের রাস্তা পর্যন্ত আমাদের এগিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন ওনারা। আমরা কথা দিলাম কোন এক বড়দিনে আমরা আবারও আসব এই গুচ্ছগ্রামে।

চলবে...

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers