মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৫ জিলকদ ১৪৪৭

ফিচার
  >
ভ্রমণ

সাইকেলের ডানায় উড়াল (৬ষ্ঠ পর্ব)

আঞ্জুমান লায়লা নওশিন ১৭ নভেম্বর , ২০২৩, ১৪:৩৪:৩৫

829
  • সাইকেলের ডানায় উড়াল (৬ষ্ঠ পর্ব)

(২২.০৭.২০২১)

শেরপুর থেকে কলমাকান্দার উদ্দেশে রওয়ানা করতে প্রায় সকাল ৬টা পেরিয়ে গেছে। আগের দিন শিল্পী আপু চলে যাওয়ায় আজ আমরা ৪ জন। বাড়িওয়ালাকে ঘুম থেকে তুলে চাবি দিয়ে বেরিয়ে গেলাম আমরা। রুট প্ল্যান অনুযায়ীই এগুচ্ছি মূল সড়ক ধরে। সেখানে দুজন চাচা গোছের লোক বিকল্প আরেকটি পথ দেখিয়ে দিলেন। আমরা সেই পথ ধরেই সাইকেল চালাতে থাকলাম নকলার দিকে।

ঈদের দ্বিতীয় দিন আজ। মফস্বল এলাকা। রাস্তায় লোকজন খুব কম। প্রধান সড়ক হওয়ায় ট্রাক চলছে বেশ। কিছুদূর এগিয়েই আমরা গ্রামের পথ ধরলাম। এই রাস্তাটাও ভীষণ সুন্দর। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ রাস্তার দু’ধারে। মাঝে জলাশয়। নিশু আপু বেশ উচ্চগতিতে চালাচ্ছেন সাইকেল। আমার হাঁটুতে ব্যথা হওয়ায় আমি অত জোরে চালাতে পারছি না। এপি আপুকে বললাম আস্তে চালাতে।  আমার গতিতেই এগিয়ে চলল পুরো দল। 

সকাল প্রায় ৯টা পেরিয়ে গেছে। চা খাওয়া হয়নি এখনো। চায়ের দোকান খুঁজছি আমরা। অনেকক্ষণ ধরে খুঁজেও কোনো দোকান না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম নিরিবিলি কোনো জায়গায় বসে নিজেরাই কফি আর স্যুপ বানিয়ে নেব। সেই চিন্তা করে দু’প্যাডেল মারতেই গ্রামের একটি দোকান পেলাম আমরা। ইব্রাহীম চাচার দোকান। গ্রামের নাম বারইকান্দি। নকলা থানার গুণবতী ডিজিটাল ইউনিয়নে পড়েছে গ্রামটি। এখানে বসে দোকানদার চাচার বাড়িতে পোষা গরুর দুধের চা খেলাম আমরা পর পর দু’কাপ করে। সাথে লোকাল কিছু স্ন্যাক্স। সাইকেল নিয়ে আমাদের চার মেয়েকে দেখে পাড়ার অনেকেই এসেছেন সেখানে। আমাদের সাইকেলের পেছনে প্যানিয়ার বাঁধা। প্রত্যেকেই প্রায় একই ধরনের টি-শার্টও পরা। এসব দেখে গ্রামের অনেক মানুষই ভাবেন আমরা কোন কোম্পানি থেকে এসেছি। পরে বললাম শুধু মাত্র ঘোরার উদ্দেশ্যেই আমরা এসেছি। এখানে গ্রামের নারী পুরুষদের পাশাপাশি অনেক শিশুও জড়ো হয়েছে। আছে ইব্রাহীম চাচার ৭/৮ বছর বয়সি ছেলে ইস্রাফিলও। স্থানীয় একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় পড়ে সে। ওর কাছ থেকে কবিতা শুনতে চাইলে বললো কবিতা পারে না। কোরআন তিলাওয়াত করতে পারে। সে একটি সূরা তিলাওয়াত করে শোনালো আমাদের।

আমরা সাথে করে বাচ্চাদের উপযোগী ছোট ছোট কিছু অ্যাডভেঞ্চার ও রূপকথার বই নিয়ে এসেছি। সেখান থেকে ১০টার মতো বেই বের করে জড়ো হওয়া বাচ্চাদের সবার হাতে তুলে দিলাম বইগুলো। বলে দিলাম একজনেরটা পড়া হলে আরেকজনের সাথে শেয়ার করে করে পড়বে। তাহলে ১০টা বইই সবার পড়া হয়ে যাবে। সবাই ভীষণ খুশি হয়ে গল্পের বইগুলো নিয়ে নিল।

এই গ্রামের মানুষগুলো ভীষণ সরল। ইউনিয়নের নামের সাথে ডিজিটাল যোগ করে দিলেও এখনো ডিজিটাল হয়ে ওঠেনি মানুষগুলো। অদ্ভুত এক সারল্য সবার মাঝে। নকলা থানার গুণবতী ডিজিটাল ইউনিয়নের এই বারইকান্দি গ্রামে ভীষণ মায়ার এক গল্প রেখে আমরা এগিয়ে চললাম সামনের দিকে।

কিছুদর এগিয়ে আমরা ঢুকলাম নালিতা বাড়ি থানায়। ভোগাই নদীর উপরে ঝুড়িতে করে মিষ্টি আলুর মতো কী জানি বিক্রি করছিল এক কিশোর। জিজ্ঞেস করতেই বলল শিমুল আলু। নিশু আপু সাইকেল রেখে ওখান থেকে কিনে নিল শিমুল আলু। কিছুদূর চালিয়ে পথের ধারে বসে গল্প করতে করতে সেই আলু খেলাম আমরা।

বেশ কড়া রোদ উঠেছে। পেটের মধ্যে বেশ ক্ষুধার অস্তিত্বও টের পাচ্ছি । এখনো অনেক পথ যেতে হবে। কলমাকান্দা যেতে আরও প্রায় ৯০ কি.মি. পথ পাড়ি দিতে হবে। এর মধ্যেই সাইকেলের চেইন পরে যাওয়ায় নালিতাবাড়ির ভালুকাপাড়া নদীর পাড়ে একটি মসজিদ কাম মাদ্রাসার সামনে থামলাম আমরা। সিদ্ধান্ত নিলাম  এখানে কফি ও স্যুপ খেয়ে বেশ টেনে চলব আমরা। মাদ্রাসার বারান্দায় রত্না আপু স্টোভ জ্বালিয়ে পানি গরম করতে দিলেন। কিছুক্ষণ পর রত্না আপু বললেন পানি কেন জানি গরম হচ্ছে না। পাশ দিয়ে আগুনও দেখা যাচ্ছে। কেন গরম হচ্ছে না? একটু কাছে গিয়েই দেখি গ্যাসের টিউবটা থেকে গন্ধ বের হচ্ছে। চুলায় না জ্বলে আসলে লিক দিয়েই আগুন জ্বলছে। দ্রুত চুলা বন্ধ করলাম আমরা। পরে ভাবলাম লিকের জায়গা টেপ দিয়ে বন্ধ করে দিলেই হয়ত ঠিক হয়ে যাবে। ভাবনা মতো টেপ দিয়ে পেচিয়ে চুলা অন করতেই ধপ করে চুলাসহ পুরো লাইনেই লেগে গেল আগুন। রত্না আপু দ্রুত চুলা বন্ধ করে দিলেন। হাঁত পা কাঁপছিল আমার। কী ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার হাত থেকেই না আজ বেঁচে গেলাম আমরা। আশপাশে জড়ো হওয়া মানুষজন আমাদের কাণ্ড দেখে বললেন, চাইলে পাশের বাড়িতে গিয়ে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় রান্না করে নিতে পারি। তাদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে সামনে কোথাও খেয়ে নিব বলে আমরা সাইকেলে উঠে পড়লাম।

  

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে গিয়ে একটি দোকানে চা খেলাম আমরা। রং চা, তাও খেতে ভালো লাগছিল। দোকানটাতে ক্যাসেটে লোকাল কাওয়ালি টাইপের গান বাজছিল। চাচাদের সাথে গল্প করতে করতে সেই গান শুনতে ভালোই লাগছিল। চাচারাই বললেন বর্ডারের পাশে আরও একটা রাস্তা আছে। এপি আপুর ম্যাপেও তাই দেখাচ্ছিল। কিন্তু পথের দূরত্ব বেশি হবে বলে আমরা আপাতত সেদিকে গেলাম না। এই পথেই আরও কিছুদূর এগিয়ে গেলাম আমরা। এবার  বর্ডারে পাশের রাস্তা দিয়ে যাব বলে গ্রামের মাটির রাস্তা ধরলাম। কী সুন্দর ছায়া সুনিবিড় মাটির রাস্তা! এতক্ষণ সুন্দর পাকা রাস্তা পেয়েছি। কিন্তু রাস্তার পাশে তেমন গাছ ছিল না। ঠাঁ-ঠাঁ পড়া রোদে কষ্ট হচ্ছিল ভীষণ। এবার এই ছায়াঢাকা গ্রামে ঢুকে প্রাণটাই জুড়িয়ে গেল। কিছুদূর এগিয়েই ডাকিয়াপাড়া গ্রামে একটি দোকানের সামনে থামলাম আমরা। ক্ষুধা পেয়েছে ভীষণ। সেখানে লোকাল মিষ্টি খেয়ে বোতলে পানি ভরে নিলাম। চায়ের দোকানে গ্যাসের চুলায় রত্না আপু স্যুপ- নুডুলস বানিয়ে আমাদের সাথে আরও কয়েকটা বাচ্চাকে খেতে দিলেন। খাওয়া শেষে  কিছুদূর চালিয়েই আমরা পেলাম সীমান্তঘেষা হাইওয়ে।

ঐদিকে দেখা যাচ্ছে ত্রিপূরা পাহাড়। পাহাড় দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি আমরা। কাঠফাটা রোদ। যেন জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে সবকিছু। প্রচণ্ড রোদের তাপে আমাদের গতি অনেক কমে এসেছে। তার উপর আমার হাঁটু ব্যাথা। আজ এত পথ পাড়ি দিয়ে কলমাকান্দায় পৌঁছাতে পারব কি না বুঝতে পারছি না। কিছুদূর চালিয়ে আবারও একটি গাছের ছায়ার তলে বসে পরলাম আমরা।

নিশু আপু বললেন, দিনের মধ্যে কলমাকান্দা পৌঁছানো সম্ভব না হলে দূর্গাপূরের দিকে আমরা কোন গারো কমিউনিটিতে থাকার চেষ্টা করব। এখান থেকে কলমাকান্দা আরও ৬৫ কিমি.। সাধারণ বাঙালি কমিউনিটির থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের কাছে থাকাটা অনেক বেশি নিরাপদ বলে মনে হয়েছে আমাদের।

আসলে যাত্রার শুরুতে আমাদের প্ল্যান ছিল কলমাকান্দার বর্ডার ঘেষে পদ্মাবতী দিদির বাড়িতে থাকার। কিন্তু আমাদের যাত্রা শুরুর পর প্রথম দিনেই পদ্মাবতী দিদি জানিয়েছেলেন ওখানে করোনার কারণে এখন ক্যাম্পিং করতে অসুবিধা আছে। কিছু বাধা বিপত্তি আছে। তাই এপি আপু সেখানে আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি আমাদের সব ধরনের সহযোগিতার জন্য প্রস্তত ছিলেন। অপেক্ষাও করছিলেন আমাদের জন্য। কিন্তু দেরি হয়ে যাবে চিন্তা করে কলমাকান্দায় যে দাদা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তাকে সব বুঝিয়ে বললেন এপি আপু। জানালেন সময় থাকলে অবশ্যই যাব আমরা।

সামনে এগিয়েই আমরা পেলাম নিতাই নদী। সীমান্তঘেষা নিতাই নদী। বর্ষাকাল হলেও নদীতে চর পরেছে। পানি তেমন নেই। নৌকায় সাইকেল নিয়ে সেই নদী পাড় হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম আমরা। এই পথে বেশ কয়েকবার জুতা খুলে ছোট ছোট জলাশয় পাড় হতে হয়েছে আমাদের।

সূর্য হেলে পড়েছে। প্রায় ৫টা বাজে। বর্ডারঘেষা চমৎকার রাস্তা ধরে চলছি আমরা। আশপাশে ছোট ছোট টিলায় গারো কমিউনিটি দেখা যাচ্ছে। চোখে পড়ছে জুম চাষের ক্ষেতও। কলমাকান্দা আরও প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে। নাহ! মনে হয় না আজ আর সম্ভব হবে। টিলার পাশেই আমরা দাঁড়ালাম। নিশু আপুর মত নিয়ে এপি আপু আর রত্না আপু ঢুকলেন পাশের এক গারো গ্রামে কোথাও ক্যাম্পিং করা যায় কি না খবর নিতে। কিছুক্ষণ পর আমরাও চললাম।

কিছুদূর এগিয়ে সুসং দুর্গাপুরের বিজয়পুরে গিয়ে দেখি একটি টিলার নিচে সাইকেল নিয়ে বসে আছেন রত্না আপু। বললেন কুকুরের জন্য উপরে উঠতে পারেন নি। আমরাও পাশে গিয়ে বসলাম। সেখানে সাইকেল নিয়ে মধ্যবয়সি এক দাদা এসে দাঁড়ালেন। আমাদের দেখে ওনার বেশ কৌতুহুল হলো। শুনলেন আমাদের কথা। ওনার নাম পালক অভিনাষ বাগী। এখানকার গুচ্ছগ্রামের চার্চের ফাদার তিনি। আমাদের প্রস্তাব দিলেন আমরা চাইলে টিলার উপরের চার্চের সামনে থাকতে পারি। না চাইতেই যেন আকাশের চাঁদ আমরা হাতে পেলাম। সানন্দেই রাজি হয়ে গেলাম আমরা। এরই মধ্যে উপর থেকে হতাশ হয়ে ফিরে এলেন এপি আপু। জানালেন কোনও ব্যবস্থা হয়নি। এসেই আমাদের নতুন বন্দোবস্তের কথা শুনে আনন্দে আধখানা তিনিও। আনন্দ চিত্তে দাদার পিছু পিছু আমরা চলে গেলাম  টিলার উপরে গুচ্ছগ্রামের দিকে।

চলবে...

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers