মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৫ জিলকদ ১৪৪৭

ফিচার
  >
ভ্রমণ

সাইকেলের ডানায় উড়াল (৫ম পর্ব)

আঞ্জুমান লায়লা নওশিন ১০ নভেম্বর , ২০২৩, ১৫:০১:২৮

560
  • সাইকেলের ডানায় উড়াল (৫ম পর্ব)

(২১/০৭/২০২১)

আজ ঈদের দিন। কোরবানির ঈদ। পরিবার পরিজন ছেড়ে কত দূরে, কোন বনের মধ্যে আছি! কোথায় নতুন জামা, আর কোথায় বা বাহারি সব খাবার? ঘুম থেকে উঠে কেমন বিষন্ন লাগছিল চারদিক। মনেই হচ্ছে না ঈদের দিন। তবুও কেউ কেউ ঈদ মোবারক জানালাম একে অপরকে। আর পরক্ষণেই  ভুলে গেলাম ঈদের কথা। সাথের এই অসাধারণ মানুষদের সাথে অনন্য এক অভিযাত্রায় আছি এই বা কম কী?

আগের দিন বেশ রাত জাগা আর বৃষ্টির কারণে কিছুটা বেলা করেই ঘুম থেকে ওঠা হয়েছে আমাদের। তার উপর আজ পথ অনেক কম।  আমাদের রুট প্ল্যান অনুযায়ী আজ ৬৫ কিমি. পথ সাইক্লিং করব।  পথ কম বলেই আমরা আজ বলতে গেলে প্রায় হেলে দুলে চলছি।

বনকে বিদায় জানিয়ে বন থেকে বের হয়ে আবারও মাটির রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চললাম।  কিছু পথ এগিয়ে মধুপুর জাতীয় উদ্যানের পাশে চায়ের টানে থামলাম সেই বাসন্তি রেমার দোকানে। দিদি দুধ জ্বাল দিচ্ছেন। দুধ এখনো ঘন হয়ে না আসায় বললেন চা দিতে  কিছুটা দেরি হবে। 

যেহেতু ঈদের দিন, আমরা আমাদের স্টোভে সেমাই রান্না করার উদ্যোগ নিলাম। সেমাই,চিনি, গুড়ো দুধ আমরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। এপি আপু স্টোভ জ্বালিয়ে তৈরি করলেন সেমাই। সেই সেমাইয়ের স্বাদের কথা আর নাই বা বললাম।  বাসন্তী দিদিসহ অন্যরা মিলে সেমাই খেলাম আমরা। দিদি চা দিলেন। সাথে  নিজেদের গাছের আমও দিলেন আমাদের খাওয়ার জন্য। দিদির গাছের মিষ্টি আম প্রাণ ভরে খেতে খেতে চলছিল আমাদের গল্প আর আড্ডা।  এখান থেকে বিদায় নেবেন লিয়াং দাদারা। ভাবতেই কেমন লাগছে। গত দুইদিন ধরে সার্বক্ষণিক আমাদের সাথে আছেন ওনারা।  সব ধরনের সহযোগিতা করছেন একটুও বিরক্ত না হয়ে।  এ দিকে, বেলাও অনেক হয়ে গেছে।  প্রায় সাড়ে ১০টা।  এ সব পর্ব শেষে বাকি পথের নির্দেশনা দিয়ে লিয়াং দা, শান্ত দা  ও তুষার দাদা এবারের মতো বিদায় নিলেন আমাদের কাছ থেকে।

বাসন্তী দিদির দোকানে ঈদের দিনের সেমাই খাওয়া হচ্ছে

বাসন্তী দিদির দোকান থেকে সাইকেলে চেপে আমরা পেড়িয়ে গেলাম মধুপুর উদ্যান।  সেখানে দুখলা বাজার পেরিয়ে আমাদের রুট প্ল্যান অনুযায়ী উপরের দিকে যাচ্ছি আমরা।  কোরবানির ঈদ হওয়ায় রাস্তার ধারে অনেকেই কোরবানি দিচ্ছে। প্রায় ২ কিমি. এগিয়ে যেতেই রেজাউল নামের স্থানীয় এক ভদ্রলোক মোটরসাইকেল থামিয়ে কথা বললেন আমাদের সাথে।  দোখলা বাজারে ওনার দোকান আছে। আমরা যে পথে শেরপুর যাচ্ছি তার চেয়েও শর্টকাট পথ উনি আমাদের দেখালেন। ওনার দেখানো পথ অনুযায়ী এখান থেকে শেরপুর শহর ৪৯ কি.মি.। নিশু আপু, এপি আপু ম্যাপ দেখলেন। সিদ্ধান্ত হল ওনার দেখানো পথেই আমরা যাব।

এবার পেছনে ফিরে আমরা চালানো শুরু করলাম। উঁচু নিচু টিলার পথ। রাস্তাও ভীষণ চমৎকার। এমন পথে সাইক্লিং এ দারুণ মজা।  রত্না আপু আর আমি সামনে। আসলে এই ৫ জনের টিমে সবচেয়ে কম স্পিড আমার । আমি বেশি স্পিডে সাইক্লিং  করতেই পারি না। খুব ক্লান্ত হয়ে যাই। এখানে যারা আছে তারা সবাই একেকজন ম্যারাথনিস্ট।  ৫০ কি.মি., ফুল ম্যারাথন, হাফ ম্যারাথন, রেইস এসব এনাদের কাছে পানি ভাত। এ দিকে, আমি একবার ১০ কি.মি. ম্যারাথন দৌঁড়েই কাহিল হয়ে পড়েছিলাম। আমার হাঁটুর জোর কম। তাই অন্যরা যখন দাঁড়িয়ে যায়, আমার স্পিড কম বলে আমাকে আগেই শুরু করতে বলে। আর রত্না আপু একেবারে নর্মাল  প্রায় ৬ হাজার টাকার একটা সাইকেল নিয়ে এসেছেন। এই সাইকেলে সোজা রাস্তায় এক ঘণ্টা চালানোর সামর্থ্য হয়ত হবে না আমার। সেই সাইকেলে শুধুমাত্র মনের জোরে আর হাঁটুর জোরেই রত্না আপু শত শত কিলোমিটার সাইকেল চালাচ্ছেন। ওনারও কষ্ট হচ্ছিল ভীষণ। 

দুখলার আগে ভুটিয়া গ্রামে রত্না আপু আর আমি গল্প করে করে সামনে এগিয়ে চলছি।  পিছনে নিশু আপু, এপি আপু আর শিল্পী আপু। এপি আপুর সাইকেলে কি একটা সমস্যা হওয়ায় পেছনে ওরা দাঁড়িয়ে সাইকেল ঠিক করছে। সামনে আমরাও রাস্তার ধারে নেমে বসে পড়লাম। সেখানে প্রায় ৩০-৩৫ বছর বয়সি লাল ম্যাক্সি এক গারো নারী এসে দাঁড়ালেন। রত্না আপু আমাকে বলছিলেন পা দুটো শুষ্ক হয়ে গেছে, একটু শর্ষের তেল হলে ভালো হত।  কথা বলতে বলতেই ঐদিক থেকে এপি আপুদের পাঠানো আইসক্রিম ওয়ালার কাছ থেকে আইসক্রিম নিলাম আমরা। এর মধ্যেই দেখি ম্যাক্সি পরা ঐ দিদি শর্ষের তেলের বোতল নিয়ে এসেছেন। রত্না আপু যখন আমাকে শুষ্ক পায়ের কথা বলছিলেন, সেটা  উনি নিজের থেকেই ওনার বাড়ি থেকে তেল নিয়ে এসেছেন। অচেনা অজানা মানুষের প্রতি এই গারো নারীর আন্তরিকতা দেখে শ্রদ্ধায় আমার মাথাটা নত হয়ে এল।  তেল মাখা শেষ হলে রত্না আপু আর আমি ওনার সাথে গল্প করছিলাম।

কথা বলতে বলতেই জানতে পারলাম উনি মুসলমান।  আমি অবাক হয়ে বললাম আপনার চেহারা দেখে মনে করেছি আপনি গারো। উনি বললেন উনি গারোই ছিলেন, প্রেম করে বিয়ে করে কনভার্টেড হয়ে মুসলমান হয়েছেন। পাশেই ওনাদের গ্রাম। ওনার নাম আসলে মায়াবী নখরেক। কী সুন্দর নাম! পুরোই মায়ায় ডোবানো। সেই মায়াবী নখরেক বিয়ে করে ধর্ম পরিবর্তন করে হয়েছেন আছিয়া বেগম।

মায়াবী দিদির সাথে গল্প

পরে সেই মায়াবী দিদির জীবনের অনেক গল্প শোনা হল। আসলে মায়াবী দিদির আগে এক সংসার ছিল । গারো সংসার।  সেই সংসারে ১৫ বছরের এক ছেলেও আছে। বছর তিন আগে হাজব্যান্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায় টানাপোরেনের মধ্য যাচ্ছিল।  সেই সময় এই গ্রামের এক মুসলিম পুরুষ ( মায়াবী দিদির বর্তমান হাজব্যান্ড) তাদের বাড়ির পাশে কলাবাগানে কাজ করতে যেতেন। তিনিও বিবাহিত ছিলেন। সেখানেই দুজনের দৃষ্টিবিনিময়, কথাবার্তা। ব্যাপারটাকে এলাকার মানুষ আরও বাড়াবাড়ি করে কেলেঙ্কারি তৈরি করে।  কেলেঙ্কারি এড়াতে সেই লোকের সঙ্গে ঢাকায় পালিয়ে গিয়ে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে বিয়ে করেন মায়াবী দিদি। সেখানে তার নাম দেয়া হয় আছিয়া বেগম। পরে মায়াবী দিদির পরিবার ঢাকায় গিয়ে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন দিদিকে। তিনি ফেরেন নি। নতুন ধর্ম, নতুন সংসারকে আঁকড়ে ধরেছেন। বিসর্জন দিয়েছেন গারো সংস্কৃতিকে।  ঐতিহ্যবাহী সেই থামী ছেড়ে ধরেছেন মাক্সি। ১৫ বছরের ছেলেটার সাথেও নেই সম্পর্ক। আহা মায়াবী দিদি।! প্রেমের  জন্য মায়াবী সবটা বিসর্জন দিয়েছে। পরিবার, সন্তান, ধর্ম, সংষ্কৃতি আর নিজের ভীষণ সুন্দর নামটি। দিদির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সামনে এগুতে এগুতে রত্না আপু আমার আমি কেবলই হাহাকার করছিলাম একজন মায়াবীর আছিয়া বেগম হওয়ার যন্ত্রণার জন্য।

দুখলা বাজার পার হয়ে কিছুদুর এগুতেই পাশের এক বাড়ি থেকে আসছিল তাঁতের শব্দ। আমরা সাইকেলে নিয়ে গেলাম সেখানে।  নকরেনি জুমাং তাত শিল্প। ভিতরে ঢুকে দেখি অনেক গারো নারী সেখানে কাপড় বুনছেন। আমরা সবাই একটা করে গামছা কিনে বিদায় নিলাম।

সামনে এগুচ্ছি। বনের মধ্য দিয়ে ভীষণ সুন্দর রাস্তা।  ‍শুনশান নিরবতা চারদিকে।  কিছুদূর এগিয়ে দেখি এক ক্ষেতে অনেকগুলো আনারস স্তূপ করে রাখা আছে বিক্রির জন্য। সেখানে এক দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম আনারস কেনা যাবে কি না। বললেন এগুলো তার নয়। আমরা খুব করে আনারস খেতে চাচ্ছি বলে তিনি সেখান থেকে একটা তুলে কেটে আমাদের দিলেন। দাদার বাড়িটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে গরিব গেরস্ত। কিন্তু ওনাদের কি শিল্পবোধ। পুরো বাড়িটিই নানা রঙের পর্তুলিকা আর ফুল দিয়ে সাজানো, টিপটপ। ধন সম্পদ হয়ত ওনাদের তেমন একটা নেই, কিন্তু ওনাদের আছে অনেক বড় শিল্পীবোধ সমৃদ্ধ মন।

দুই পাশে আনারস ক্ষেত ছুঁয়ে ছুঁয়ে এভাবে অনেকটা পথ চললাম আমরা। এবার একটানা চালিয়ে আমরা  ঢুকলাম জামালপুর সদরে। সেখানে একটা ছোট্ট দোকানে নাস্তা করে নিলাম আমরা। ঠাঁঠাঁ রোদে আরও কিছু পথ চালিয়ে আমরা পেলাম ব্রহ্মপূত্র নদ। নৌকায় সেই নদ পাড় হলে আমাদের পথের দূরত্ব অনেক কমে এল। এখান থেকে শেরপুর মাত্র ১৯ কি.মি.।

আনারস ক্ষেত

উত্তপ্ত রোদ পড়েছে।  যেন জ্বলে যাচ্ছে সবকিছু।  ব্রহ্মপূত্র নদ পার হয়ে নদীর পাশেই গাছের তলায় আমরা ম্যাট পাতলাম। একটু জিরিয়ে নেয়া যাক এবার। পাশের বাজার থেকে নিশু আপু সবার জন্য পানি নিয়ে আসলেন। স্টোভ জ্বালিয়ে কফি বানালাম আমরা। আর সাথে করে নিয়ে আসা ড্রিঞ্জাদের বাড়ির আনারস কাটলেন নিশু আপু। এখানে বেশ কিছুক্ষণ থেকে আমরা সামনে এগিয়ে গেলাম। ঈদের দিন।  গ্রামের রাস্তা দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়রা সাজুগুজু করে রাস্তায় বেরিয়েছে। দেখে ছোটবেলার কথা মনে পড়ছিলো। ছোটবেলায় গ্রামে আমরাও এভাবে সেজেগুজে ঈদগাহ মাঠে যেতাম।  মাঠের পাশে মেলা বসতো।  সেই মেলা থেকে পুতুল, হাড়িপাতিল, বেলুন, খেলনাসহ নানা ধরণের জিনিসপত্র কিনতাম। বাড়ি ফিরে গিয়ে ভুড়িভোজ সেড়ে আবারও নতুন জামা পরে সবাই মিলে ঘুরে বেড়াতাম। আহা! আমার ছোটবেলা। আমার সোনার খাঁচার দিনগুলো।

বেশ খানিক পথ সাইকেল চালিয়ে কসুমহাটি বাজার পেরিয়ে একটি গ্রামে আমরা খানিক বিশ্রাম নিলাম। সেখানে গ্রামের মহিলারা জড়ো হয়ে বিস্ময় নিয়ে গল্প করছিলেন আমাদের সাথে। এখান থেকে শেরপুর আর মাত্র ৬ কি.মি.। সূর্যও প্রায় হেলে পড়েছে। শেরপুরে আমরা থাকব আমার মেজো ভাইয়ের বাসায়। ঈদের ছুটিতে ও বাড়িতে গেছে।  আমরা থাকব বলে বাসার চাবি দিয়ে গেছে দিলিপ নামের এক দাদাকে।  সেই দাদাকে কল দিয়ে জানালাম আমরা কাছিকাছি চলে এসেছি।  শেরপুর থানার মোড়ে এসে দাদা কল দিতে বললেন।

শেষ বিকেলে সন্ধ্যার আগে আমরা পৌঁছালাম শেরপুর শহরে। দিলীপ দাদার সাথে গেলাম আমাদের থাকার জায়গায়। এখান থেকে শিল্পী আপু আমাদের থেকে বিদায় নেবেন। ৫ কন্যার দলটি ৪ কন্যার দল হয়ে গেল। শিল্পী আপুর বাড়ি জামালপুরের বকশিগঞ্জে। এখান থেকে বাকি পথ সাইকেল চালিয়ে বাড়িতে ফিরবেন তিনি। তাকে  এই পথে সঙ্গ দিতে শেরপুরে এসেছেন ওনার পরিবারের দুই সদস্য। সাথে টিফিন বাটি ভর্তি করে নিয়ে এসেছেন শিল্পী আপুদের বাড়ির কোরবানির মাংস। এদিকে বাড়িওয়ালা এসে আমাদের জন্য খিচুড়ি আর গরুর মাংসও দিয়ে গেলেন। শিল্পী আপুর বাড়ি থেকে এত মাংস আসায় আমরা আর রান্না করলাম না। শুধু ভাত রান্না হল। সবাই ফ্রেশ হয়ে প্রাণভরে সেই খাবার খেলাম। রাত ৯টার দিকে শেরপুর শহরে একটু ঘুরে নিউমার্কেট এলাকায় চা খেয়ে বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম। আগামীকাল আমাদের গন্তব্য নেত্রকোণার কলমাকান্দা গ্রাম।

চলবে...

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers