মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৫ জিলকদ ১৪৪৭

ফিচার
  >
ভ্রমণ

সাইকেলের ডানায় উড়াল (১ম পর্ব)

আঞ্জুমান লায়লা নওশিন ১৩ অক্টোবর , ২০২৩, ১৪:৪৪:২২

3K
  • সাইকেলের ডানায় উড়াল (১ম পর্ব)

১ম দিন

ঢাকা থেকে মধুপুর

(১৯ জুলাই, ২০২১)

রফিক আজাদের ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কবিতাটি পড়ার পর থেকেই  চুনিয়া দেখার সাধ আমার। সেই শান্তিপ্রিয় সরল মানুষ আর লাল মাটিতে পা রেখে নির্জনে কিছুদূর হেঁটে চলার  ইচ্ছে তখন থেকেই।  কিন্তু সে ইচ্ছে সুপ্তই ছিল অনেক দিন। আগ্রহ প্রকাশ করলেও নানা টালবাহানায় আর যাওয়া  হয়নি লাল মাটির সবুজ গ্রাম চুনিয়ায়। সেই সুযোগ এল এবারের ঈদে।

ঈদের ছুটিতে শুধুই মেয়েরা মিলে সাইকেল নিয়ে ঘোরাঘুরির প্ল্যান করছিলেন আমাদের এপি আপু। প্ল্যান হয়েছিল ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ হয়ে নেত্রকোনার কলমাকান্দা গ্রামে যাওয়ার। সেখানে পদ্মাবতী নামের মায়াবতী এক দিদি আছেন, এর আগে বর্ডার ট্রিপে সেই দিদির বাড়িতে গিয়েছিল টিম অভিযাত্রী। সেই পদ্মাবতী দিদির বাড়ির উদ্দেশ্যে যাওয়ার প্ল্যান এই অভিযাত্রায়।  আমি প্রস্তাব দিলাম একদিন বাড়িয়ে যদি মধুপুর বনে যাওয়া যায় তাহলে আমিও যুক্ত হব। মধুপুরের চুনিয়াতে ক্যাম্পিং করার ইচ্ছেও অনেক দিনের। অন্যদের সাথে কথা বলে এপি আপু জানালেন মধুপুরে নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা হলে কারও আপত্তি নেই। আর দেরি না করে কল দিলাম আমার বন্ধু ড্রিঞ্জা চাম্বুগংকে। ওদের বাড়ি মধুপুরে । পুরো ব্যাপারটাই জানালাম ওকে। ও বললো মধুপুরের চুনিয়াতে ক্যাম্পিং না করে ওদের গ্রাম গায়রাতে ক্যাম্পিং করলে বেটার হবে। নিজে ঢাকায় থাকায়  লিয়াং রিছিল দাদার সাথে যোগাযোগ করে সব ব্যবস্থাই সে করল।

তো পরিকল্পনা হল ১৯ তারিখ ঢাকা থেকে ভোরে রওয়ানা হয়ে মধুপুর যাব আমরা। সেখানে রাতে থেকে পরদিন শেরপুর। শেরপুর থেকে কলমাকান্দা, কলমাকান্দায় ২ দিন থেকে কিশোরগঞ্জ, সেখান থেকে ঢাকা। মোট ৬ দিনের সফর। সঙ্গী নিশাত আপু, এপি আপু, শিল্পী আপু, রত্না আপু আর আমি।

পরিকল্পনা মতো ১৯ তারিখ ভোরে আমাদের যাত্রা শুরু। এফডিসির মোড়ে আমাদের এগিয়ে  দিতে এসেছেন সোহাগ ভাই। ভোরবেলা হলেও ঈদ যাত্রার কারণে রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট পোহাতে হল। উত্তরা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত পুরো রাস্তাই জ্যাম আর ভাঙা। একটু হেঁটে, একটু চালিয়ে সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা পার হলাম গাজীপুর চৌরাস্তা। এরপর সালনা রেলগেটের পাশে একটি ছোট্ট হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে নিয়ে মূল সড়ক এড়িয়ে চলতে শুরু করি গ্রামের রাস্তা দিয়ে। এখানকার পুরো পথটাই ভীষণ সুন্দর। বর্ষাকাল হওয়ায় গাছগাছালি আর মাঠগুলো অনেক বেশি সবুজ আর সতেজ হয়ে উঠেছে। খালগুলোতে টলটলে পানি। মনে হচ্ছিল কোনো বিলের রাস্তা ধরে চলছি।

এর মধ্যেই হঠাৎ ঘন মেঘে ভরে গেল আকাশ। বোঝাই যাচ্ছে ঝুম বৃষ্টি হবে। আমাদের সবার কাছে পঞ্চো, রেইনকোট আছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিলাম বৃষ্টিতে ভিজেই সাইক্লিং করব। নিজেদের কেডসগুলো ব্যাগে ভরে স্যান্ডেল পরে ঝুম বৃষ্টিতে চলল আমাদের সাইক্লিং। আহা!

গুগল ম্যাপে এপি আপু দেখছেন রুট । সেই রুট ধরেই চলছি আমরা। গড় এলাকার  উচু নিচু টিলার চমৎকার মাখনের মতো রাস্তা। চলতে চলতেই  ছলঙ্গা বাজারের আগে প্রায় ১ কিলোমিটারের মতো রাস্তায় বাঁধে বিপত্তি। পুরো রাস্তাটুকুই ভাঙা আর লাল মাটির কাদায় ভরা। এখানে সাইকেল চালানো তো দূরের কথা সাইকেল নিয়ে হেঁটে  যাওয়াই যেন দুর্গম পথ পেরুনো। আর লাল মাটির কাদা কাকে বলে?  দু’ কদম সাইকেলের চাকা ঘুরতে না ঘুরতেই পুরো চাকায় আটকে গেল কাদা। ব্রেকপ্যাড, গিয়ার সব কাদায় ভরে পুরো স্টাক! সাইকেল নিয়ে চলার আর কোনো উপায় নেই। গাছের ডাল দিয়ে খুঁচিয়ে কাদা কিছুটা ফেলে দিয়ে দু’ কদম এগিয়ে আবারও একই দশা। সামনে চলছেন ওভার কনফিডেন্ট এপি তালুকদার। এই যাত্রায় প্রথমবারের মতো ধপাশ করে পরে গেলেন কাদার মধ্যে। সাথে সাইকেলের প্যানিয়ারও। কাছে গিয়ে টেনে তোলার মতো কোনো উপায় নেই। অগত্যা নিজে নিজেই উঠে পাশের জমিতে জমে থাকা পানিতে ধুয়ে নিলেন কিছুটা। কিন্তু বিধি বাম। আবারও কনফিডেন্ট নিয়ে কিছু দূর চলতেই এপি আপুর সাইকেলের চাকা আর পা ডুবে গেল কাদার ভিতরে। আর ওঠে না। শেষমেশ পথের পথিক হলেন উদ্ধারকারী। এক যুবক ধরলেন সাইকেল আর এক চাচা ধরলেন এপি তালুকদারের হাত। এবার দে টান।  রক্ষা এবারের মতো। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরাও রক্ষা পেলাম  সেই লাল কাদার রাস্তা থেকে।

সামনে বাজারের আগেই একটি স্কুল। স্কুলের টিউবওয়েল এ পানি নেই বলে সাইকেল নিয়ে আমরা নেমে পরলাম পুকুরে। পুকুরে সাইকেল ডুবিয়ে দিয়ে একেকজন যেন গোসল করানো শুরু করল সাইকেলকে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী খড় দিয়ে ঘষে ঘষে সাইকেল কাদা ধুয়ে ওঠা হল এবার।

এর মধ্যেই কল দিল ড্রিঞ্জা আর মধুপুরের লিয়াং দাদা। আমাদের অবস্থা শুনে বুঝতে পারল পৌঁছুতে সন্ধ্যা হবে। এখনো অনেক পথ বাকি। কিন্তু ৪০/৫০ কিলো চালানোর পর থেকেই  আমার হাঁটুতে ক্যাচ ক্যাচ করে ব্যাথা হচ্ছিল। বেশি জোরে চালাতে পারছিলাম না। আমার কারণেই সকলের গতি অনেক স্লো হয়ে গেল। আমাকে সামনে রেখেই আমার গতিতেই এগিয়ে চলল সবাই সামনের দিকে।

বিকেল হয়ে আসছে। এখনও অনেক পথ বাকি। কিছুদূর চালিয়েই ভেঙে গেল রত্না আপুর সাইকেলের ব্রেক। ক্ষুধায় পেটের পোকাগুলো কামড় মারছে। খেতে হবে কোথাও। সামনের এক বাজারে সাইকেল সারাইয়ের দোকানে রত্না আপুর সাইকেল দিয়ে আমরা একটি ভাতের হোটেলে ঢুকলাম। সবজি দিয়ে ছোট মাছের চচ্চরি আর ডাল দিয়ে পেট ভরে খাওয়া হল ভাত। এরপর কড়া করে দুধ চা। পাশের মানুষগুলো আগ্রহ নিয়ে শুনতে  চাচ্ছেন আমাদের ভ্রমণের গল্প। হোটেল ওয়ালা নিজেই খুশি হয়ে দিয়ে দিলেন আমাদের চায়ের বিল। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এবার সাগরদীঘীর উদ্দেশে যাত্রা।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সাগরদিঘী পেরিয়ে গারো বাজারে আসতেই ওপাশ থেকে কল দিচ্ছেন লিয়াং দাদা। এখনও অনেক পথ বাকি। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত আমাদের গতিও অনেক কমে এসেছে। রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ আমরা পৌঁছালাম কাকরাইদ পচিশ মাইলে। সেখানে লিয়াং দাদা মোটর সাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন আমাদের জন্য।  আরেক ধাপ চা পর্ব হল সেখানে।

এখান থেকে আমাদের যেতে হবে আরও প্রায় ৮ কিমি.। লিয়াং দাদা এগিয়ে এসেছেন কারণ এরপর থেকেই  জঙ্গল।  তাই উনি সাথে থেকেই আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেলেন। গভীর বনের ভিতরের রাস্তা দিয়ে আমরা চলছি। কমে এসেছে আমাদের হেডলাইটের আলো। অন্ধকার বন থেকে ভেসে আসছে  ঝিঁ ঝিঁ পোঁকার ডাক। কেমন এক গা ছমছমে অনুভূতি। আর কতদূর জলছত্র? আর কতদূর টেলকি? কতদূর জলই? কতদূর গায়রা?

এই ভাবতে ভাবতেই ক্লান্ত শরীরেই রত্না আপুকে সামনে রেখে এই দিনের সর্বোচ্চ গতিতে আমরা এগিয়ে চললাম বাকি পথটুকু।  ঢাকা থেকে ১৪০ কিমি. চালিয়ে রাত সাড়ে ৯ টার দিকে আমরা পৌঁছলাম গায়রা গ্রামে ড্রিঞ্জাদের বাড়িতে।

বনের মধ্যে ছোট্ট গ্রাম গায়রা। ড্রিঞ্জাদের বাড়িতে পৌঁছে দেখি আংকেল, আন্টি, পূর্ণাসহ পরিবারের সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমরা সেখানে ঠান্ডা জলে গোসল করে খাবার ঘরে ঢুকে দেখি এলাহী কাণ্ড। নানা পদের সুস্বাদু সব খাবার রান্না করেছে আমাদের জন্য। পেট ভরে গাপুশ গুপুশ খেয়ে উঠতে না উঠতেই আন্টি দিলেন আরও এক গাদা আম, কাঠাল, আনারস, পেয়ারা। সব তাদের নিজেদের বাগানের। এত খাবার খেতে কূল না পেয়ে কিছু আমরা ব্যাগে নিলাম, যেখানে ক্যাম্প করছি সেখানে নেয়ার জন্য।

 

রাত ১১টার দিকে সাইকেল নিয়ে আমরা পাশে টিলার উপরে ড্রিঞ্জার ফুফুর বাসায় আমাদের আস্তানা গাড়লাম। প্ল্যান হল পরেরদিনের। মধুপুর পৌঁছুতে আমাদের রাত হওয়ায় আগেই প্রস্তাব দিয়েছিলাম এখানে একদিন বেশি থাকা যায় কি না। সবাই সানন্দে রাজি হয়েছিল প্রস্তাবে। প্ল্যান হল এখানকারই কোনো গ্রামে মেয়েদের নিয়ে আমরা ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করব। লিয়াং দা কে সব জানালাম আমরা। উনি আশ্বাস দিলেন আগামীকাল সব ব্যবস্থাই হবে। আর কোথায় কোথায় ঘুরব তাও ঠিক হল।

পরের দিন সকালের অপেক্ষায় আমরা সে রাতের মতো ক্লান্ত শরীরে ঘুমের সাগরে ডুবে গেলাম।

চলবে…

নিউজজি/নাসি

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers