বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ , ২ মুহররম ১৪৪৮

ফিচার
  >
বিশেষ দিবস

বিশ্ব চিঠি দিবস: ডাকপিয়নের ঘণ্টায় জেগে ওঠা স্মৃতি

বাহাউদ্দিন গোলাপ ১ সেপ্টেম্বর , ২০২৫, ১৭:৪১:০৮

6K
  • বিশ্ব চিঠি দিবস: ডাকপিয়নের ঘণ্টায় জেগে ওঠা স্মৃতি

​একসময় মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, মায়া, অভিমান আর প্রতীক্ষার আরেক নাম ছিল—চিঠি। সাদা পাতার উপর ছড়িয়ে পড়া নীল কিংবা কালো কালির অক্ষরগুলো যেন প্রিয় মানুষের হাতের স্পর্শ, হৃদয়ের নিঃশব্দ ধ্বনি আর অশ্রুজলের নীরব সাক্ষী হয়ে ফুটে উঠত। একটি খাম, তার গায়ে লেগে থাকা ডাকটিকিট—এসবই ছিল এক একটি অমূল্য স্মৃতি বহন করার মাধ্যম।

আজ যখন আমরা বিশ্ব চিঠি দিবস উদযাপন করি, তখন অনিবার্যভাবে বুকের গভীরে এক অব্যক্ত ব্যথা জেগে ওঠে, এক মায়াবী সময়ের জন্য মন কেঁদে ওঠে, যখন চিঠি ছিল হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগের এক অনন্য সেতু।

চিঠি ছিল অপেক্ষার এক মধুরতম শিল্প। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার সেই মায়াবী শব্দ অথবা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের হালকা ঝনঝন শব্দ মানেই ছিল বুকের ভেতর এক তীব্র আলোড়ন। হয়ত দূর সমুদ্রপাড় থেকে আসা খামের ভেতরে জমা ছিল প্রবাসীর কণ্ঠস্বরহীন কিন্তু হৃদয়স্পর্শী ভাষা। হয়তো গ্রামের মাটির সোঁদা গন্ধ মিশে যেত চিঠির পাতায়, যে চিঠি শহরে থাকা সন্তানের কাছে পৌঁছে দিত মায়ের দোয়া আর মমতার সুগন্ধ। আবার প্রেমপত্রের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকত লাজুক হৃদয়ের উচ্ছ্বাস, কাগজের প্রতিটি অক্ষরে লুকানো থাকত অনন্ত স্বপ্ন আর প্রতিশ্রুতির রঙ।

চিঠির সেই ভালোবাসা শুধু দিনেই নয়, রাত জেগেও লেখা হতো। হারিকেন বা কেরোসিন বাতির মৃদু আলোয় একেকটি প্রেমপত্র রচিত হতো গভীর আবেগে। শব্দ বেছে নিতে হতো সময় নিয়ে, একেকটি বাক্যে মিশে যেত হৃদয়ের অস্থিরতা। অক্ষরের আড়ালে চাপা থাকত অভিমান, প্রকাশ পেতো লুকানো স্বপ্ন। এই চিঠি লেখার জন্য বাজারে পাওয়া যেত নানা রঙের, নানা ডিজাইনের প্যাড। সাদা, নীল, গোলাপি কিংবা ফুলেল নকশার কাগজে লেখা হতো সেই চিঠি। সাথে থাকত খাম—সাদা, বাদামি কিংবা রঙিন, যা বহন করত ব্যক্তিত্বের ছাপ। অনেক সময় প্রেমপত্রে রাখা হতো শুকনো গোলাপফুল, কিংবা বকুল ফুলের মালা—যেন অক্ষরের সঙ্গে মিলেমিশে সুবাসও পৌঁছে যায় প্রিয়জনের কাছে। আসলে তখন প্রেমের প্রস্তাবই প্রথম জানানো হতো একটি চিঠির মাধ্যমেই।

কালের স্রোতে প্রযুক্তির বিকাশে ই-মেইল, ইনবক্স, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা মেসেঞ্জারের ক্ষুদে বার্তাগুলো পৃথিবীকে এক মুহূর্তের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু এই দ্রুততার ভিড়ে আমরা হারিয়েছি অপেক্ষার সেই রোমাঞ্চ, কালি শুকোবার সময়ের ধৈর্য, আর কাগজের ভাঁজে জমে থাকা সুগভীর আবেগ। হাতে লেখা চিঠির প্রতিটি অক্ষর ছিল যেন লেখকের আঙুলের একান্ত ছোঁয়া, তার অন্তরের আর্তি। সেই স্পর্শ কোনো ডিজিটাল অক্ষরে পাওয়া যায় না।

তবুও চিঠির আবেদন মুছে যায়নি। সাহিত্যে, সংগীতে, চলচ্চিত্রে—চিঠি আজও এক চিরন্তন প্রতীক হয়ে বেঁচে আছে। রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র কেবল ব্যক্তিগত আবেগেরই দলিল নয়, বরং বাংলার প্রকৃতি, সমাজ ও মানুষের অন্তর্জগতের এক অমূল্য নথি। নজরুলের ব্যক্তিগত চিঠিতে ধ্বনিত হয় তাঁর সংগ্রামী মনন আর পারিবারিক স্নেহের সুর। জীবনানন্দ দাশের চিঠিতে আমরা পাই তাঁর নিঃসঙ্গতার ছায়া, যেমন পাই অস্থির সময়ের আঁধার ভেদ করার স্বপ্ন।

কবিতাতেও চিঠি এক চিরন্তন অনুষঙ্গ। “পত্র দিও” —এই ছোট্ট অনুরোধই হয়ে উঠেছে বাংলা কাব্যের এক গভীর আকুতি, যেখানে বিরহিনী নারী তার প্রিয়জনকে একখানা পত্র পাঠাতে আহ্বান জানায়। কবিরা বারবার চিঠিকে ব্যবহার করেছেন বিরহ, প্রতীক্ষা আর প্রেমের প্রতীক হিসেবে। অক্ষরের ভাঁজে জমে থাকা অশ্রুবিন্দু যেমন হয়ে উঠেছে কবিতার অলঙ্কার, তেমনি চিঠির পাতায় লেখা স্বপ্ন হয়ে উঠেছে চিরন্তন ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি।

চিঠি কেবল সাহিত্যের পাতাতেই নয়, সংগীতের সুরেও অমর। বাংলা গানে চিঠি যেন হাজারো প্রেম, বিরহ, আর স্মৃতির কথা বলেছে। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে সেই বিরহকাতর আকুতি আজও বাজে—“চিঠি দিও প্রতিদিন, চিঠি দিও।” ‘অনুরোধ’ চলচ্চিত্রের এই গানটিতে নায়িকা তার প্রিয়জনকে প্রতিদিন চিঠি লিখতে অনুরোধ জানায়, যেন সেই চিঠিগুলো এত বড় হয় যে তা পড়তে পড়তে সকাল, দুপুর আর রাত কেটে যায়। আবার লোকগানে উচ্চারিত হয়—“চিঠি দিও, পত্র দিও জানাইও ঠিকানা”—যা এক বিরহী হৃদয়ের আকুলতা প্রকাশ করে। জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে অমর হয়ে আছে—“বলেছিলে তাই চিঠি লিখে যাই, কথা আর সুরে সুরে।”ভূপেন হাজারিকার “শরত বাবু খোলা চিঠি দিলাম তোমায়”কোনো ব্যক্তিগত প্রেমপত্র নয়, এটি সমাজের প্রতি এক শিল্পীর শিল্পিত খোলা চিঠি। বনশ্রী সেনগুপ্ত গেয়েছেন—“আজ বিকেলে ডাকে তোমার চিঠি”—যেখানে চিঠি পাওয়ার আনন্দে ফুটে ওঠে নতুন ভালোবাসার আবেশ। আগুনের কণ্ঠে গাওয়া—“আজকে তোমার চিঠি পেয়েছি, মিষ্টি ভাষায় লিখেছ তুমি”—প্রেমিকার অক্ষরে গোলাপের সুবাস মিশিয়ে দেয়।

আজকের দিনে যখন এই প্রবহমান ধারা প্রায় শুকিয়ে গিয়েছে, তখন প্রতি বছর ১ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব চিঠি দিবস। এর সূচনা হয়েছিল ২০১৪ সালে, অস্ট্রেলিয়ার লেখক ও চিঠিপ্রেমী রিচার্ড সিমকিনসের উদ্যোগে। যখন চিঠি লেখার রীতি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছিল, মানুষ ভুলে যাচ্ছিল হাতের লেখা আর খামের ভাঁজে জমা আবেগের ভাষা, তখনই এই দিবস চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে আবার মনে করিয়ে দেয়া যে চিঠি কেবল একটি বার্তা নয়—এটি হলো অপেক্ষার সৌন্দর্য, হৃদয়ের গভীর সঞ্চয়, মনের মায়ার এক ধীর প্রবাহ।

আজকের দিনে চিঠি যেন নিছক নস্টালজিয়ার আরেক নাম। তবু বিশ্ব চিঠি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আবেগকে তাড়াহুড়া করে প্রকাশ করা যায় না। ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা কিংবা অভিমান—এসবের জন্য দরকার নিবিড় প্রকাশভঙ্গি। চিঠি আমাদের শেখায় কীভাবে হৃদয়ের গোপন কথাগুলো ধীরে ধীরে সাজিয়ে তুলতে হয়, কীভাবে শব্দকে মায়ার রঙে রাঙিয়ে দিতে হয়।

এই দিনে যদি আমরা আবার কাগজ-কলম হাতে নিই, যদি আবার প্রিয়জনকে একখানা চিঠি লিখি—তাহলে হয়তো আমরা ফিরে পাবো সেই হারানো মায়া। পৃথিবী আবার শোনাবে সেই অনন্ত প্রতীক্ষার সুর, সেই ডাকপিয়নের ঘণ্টার শব্দে জেগে উঠবে স্মৃতির আলোড়ন। চিঠি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি এখনো হৃদয়ের সবচেয়ে নরম আশ্রয়। ডিজিটাল যুগেও বিশ্ব চিঠি দিবস আমাদের কণ্ঠে সেই অমলিন প্রতিজ্ঞা নিয়ে আসুক—আমরা লিখব, আমরা পৌঁছে দেব হৃদয়ের বার্তা কাগজের বুকে, সময়ের ভাঁজে রেখে যাব অক্ষরের মতো অমর ভালোবাসা।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers