বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩২ আষাঢ় ১৪৩৩ , ৩০ মুহররম ১৪৪৮

ফিচার
  >
পাঠক বিভাগ

শেখ রাসেল: মৃত্যুঞ্জয়ী পিতার ভালোবাসা

মো. রিয়াদ হোসেন ১৮ অক্টোবর , ২০২২, ১৫:২২:৪৪

3K
  • ছবি: সংগৃহীত

ছোট শিশু! চোখের সামনে পিতামাতার রক্তে ভেজা শরীর, গগণবিদারী চিৎকার, মায়ের কাছে ফেরার আকুতি আর নির্মম ষড়যন্ত্র! শিশুটি হয়ত বুঝতেও পারেনি পিতামাতা আর নাই দুনিয়াতে। কেন জানি খুব জানতে ইচ্ছে হয় মৃত্যুর পূর্বে সেই ছোট শিশুটির হাহাকার। যে শিশুটি হয়ত ভবিষ্যত প্রজন্মের হাল ধরতো, সে শিশুটি সাক্ষী হয়েছিল সেই ঘনকালো অমানিশার।

হ্যাঁ! বলছি শেখ রাসেলের কথা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র ছিল শেখ রাসেল। আজ তার জন্মদিন। বঙ্গবন্ধুর অসম্ভব ভালোবাসার এক উৎস ছিল শেখ রাসেল। শেখ রাসেলকে নিয়েই ছিল পরিবারের আনন্দ আর ভালোবাসার মিলবন্ধন।

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসায় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলতুন্নেছা মুজিব এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোল জুড়ে আসে ছোট্ট শিশু রাসেল। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটি তখন আজকের রূপে ছিল না। দোতলার কাজ তখনো শেষ হয়নি, ধীরে ধীরে বাড়ির কাজ চলছিল সে সময়ে। নিচতলার উত্তর–পূর্ব দিকের ঘরটা ছিল শেখ কামাল এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। সেই ঘরেই রাত দেড়টায় জন্ম নিল রাসেল। জন্মের সময় শেখ রাসেল খুবই সুন্দর ছিল। পরিবারের সকলেই রাসেলকে অনেক ভালবাসত। শেখ রাসেলের জন্ম পরিবারে আনন্দের নতুন মাত্রাযুক্ত করে। বঙ্গবন্ধু সবসময় শেখ রাসেলের খোঁজখবর রাখতেন। সভাসমাবেশ থেকে ফিরতে রাত হলেও শেখ রাসেলকে আদর না করে ঘুমাতেন না। খুব চঞ্চল প্রকৃতির ছিল শেখ রাসেল। সারাবাড়ি মাথায় করে রাখত সবসময়। বঙ্গবন্ধু ৬৮ সালের পর থেকে নিয়মিতভাবেই কারাগারে বন্দি থাকতেন। সত্যি বলতে শেখ রাসেল পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ রাসেলসহ পুরো পরিবারকে কতটা ভালবাসতেন সেটা তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইতে স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠেছে তার ভেতরের চাপা কষ্টে। আর ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে বঙ্গবন্ধু অসংখ্যবার শেখ রাসেলের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি মাঝে মাঝে নিজেকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেন ছেলেকে সময় না দিতে পারার কারণে, এ বিষয়টিও স্পষ্ট ফুটে উঠেছে তার লেখায়।

শেখ রাসেল নামটি বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার দেয়া। বঙ্গবন্ধু দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত ছিলেন। তিনি নিয়মিত তার লেখা পড়তেন এবং শেখ ফজিলতুন্নেছা মুজিবকেও পড়ে শোনাতেন। ফলে বঙ্গমাতাও বার্ট্রান্ড রাসেলের লেখার ভক্ত হয়ে যান এবং ছোট ছেলের নাম রাখেন শেখ রাসেল। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট রাসেল। অনেক বছর পর একটা বাচ্চা আমাদের বাসার ঘর আলো করে এসেছে, আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। আব্বা বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, রাসেলের বই পড়ে মাকে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। মা রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে, নিজের ছেলের নাম রেখে দেন রাসেল।

রাসেল যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু কারাগারে। কেন্দ্রীয় কারাগারে যখন পরিবারের সবাই মিলে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখে করে সবাই ঘরে ফিরতেন, শেখ রাসেল তখন বঙ্গবন্ধুকে কাছে না পেয়ে অনেক কাঁদত। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে শেখ রাসেলকে নিয়ে বলেছেন : ৬ ফেব্রুয়ারি ২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, আব্বা বাড়ি চলো। কী উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তো বোঝেনা আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম—তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে  দেখতে এসো। ও কি বুঝতে চায়। কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে! দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি ওর জন্মদাতা পিতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল তখনো বুঝতে শিখেনি। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।

শেখ রাসেল শিক্ষাজীবন শুরু করে মাত্র চার বছর বয়সে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয়। প্রথম দিকে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানার সাথে স্কুলে যেত, পরবরর্তীতে স্কুলের বন্ধুদের সাথে স্কুলে যেত। প্রতিবেশী ইমরান এবং আদিল ছিল রাসেলের প্রিয় বন্ধু। বাড়িতে চঞ্চল প্রকৃতির হলেও স্কুলে খুব ভদ্র ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিল। স্কুলে শিক্ষকগণ তাকে খুব ভালোবাসত। সবার সাথে মিশত, কোনো অহংকার করত না। বন্ধুদের সাথে ফুটবল আর ক্রিকেট খেলাতে পটু ছিল শেখ রাসেল। শেখ রাসেলের একটা সাইকেল ছিল, সেটায় চড়ে ধানমন্ডি লেকের ধারে চক্কর মারত। ঢাকার পাশাপাশি টুঙ্গিপাড়ায়ও রাসেলের বন্ধুমহল গড়ে উঠেছিল। টুঙ্গিপাড়ায় গেলে বন্ধুদের জন্য উপহার নিয়ে যেত। শেখ রাসেল বঙ্গবন্ধুর মতো পশু-পাখি খুব ভালবাসত। বাড়িতে কবুতর পুষত এবং নিজে হাতে খাবার দিত। এ ছাড়া, রাসেলের একটা শখ ছিল ডাকটিকিট সংগ্রহ করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ডাকটিকিট সংগ্রহ করে কৌটায় রেখে বন্ধুদের দেখাত। পোশাকের ব্যাপারে রাসেল ছোট বেলা থেকেই খুব সচেতন ছিল। পরিস্কার কাপড় পড়ত, বাবার মতো প্রিন্স কোর্ট ছিল শেখ রাসেলের। দেশের বাইরে গেলে প্রিন্স কোর্ট পরেই যেত। এছাড়া কোনো অনুষ্ঠানে কি কাপড় পরা দরকার সে বিষয়ে বেশ সচেতন ছিল এই শিশু বালক। তার পোশাকে ব্যক্তিত্বের একটা বহিঃপ্রকাশ ঘটত। ছোট বয়সেই শেখ রাসেলের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বভাবের অনেক মিল লক্ষ্য করা যায়।

মুক্তিযুদ্ধচলাকালীন সময়ে ধানমন্ডি ১৮ নম্বরে একটি একতলা পুরাতন বাড়িতে বেগম মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ জামাল, শেখ রাসেলকে বন্দি করে রাখা হয়। বন্দি অবস্থায় ঠিকমত খাওয়া দাওয়া না করার কারণে প্রায়ই অসুস্থ থাকত শেখ রাসেল। প্রথম দিকে পিতা আর বড় ভাইয়ের জন্য কান্নাকাটি করলেও পরবর্তীতে চুপচাপ থাকত। খেলনা, বইপত্র, বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে দূরে থেকে চঞ্চল শিশুটি হঠাৎ করেই চুপচাপ হয়ে পড়ে। এর মধ্যে মেজ ভাই শেখ জামাল না বলে যুদ্ধ চলে যাওয়ায় আরও একা হয়ে যায় ছোট শিশুটি। এর কিছুদিনের মধ্যে শেখ হাসিনার পুত্র জয়ের জন্ম হওয়ায় বহুদিন পর শেখ রাসেল আনন্দিত হয়। যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু পরিবার একটি ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন। শেখ কামাল আর শেখ জামালের ফিরে আসাতে রাসেল অনেক খুশি হলো, কিন্তু পিতার চিন্তায় দিন পার করত তার পুরো পরিবার। অবশেষে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেন, কোটি কোটি বাঙালির মতো সেদিন রাসেলেরও আনন্দের সীমা ছিল না। ৭২ এর ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু পরিবার ধানমন্ডির ৩২নম্বর বাড়িতে উঠলেন।

রাসেল বাবাকে এত ভালোবাসত যে, দেশের ভেতরে অথবা দেশের বাইরে যেখানে হোক না কেন রাসেল বাবার সাথে যাওয়ার বায়না ধরতো। রাসেল বাবার সাথে ব্রিটেন, জাপান, সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ বেশ কিছু দেশ ভ্রমণ করে। রাসেল ১৯৭২ সালে লন্ডন, ১৯৭৩ সালে জাপান এবং ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করে। হয়ত বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন ছোট বয়স থেকেই শেখ রাসেলকে দেশ এবং দেশের বাইরের রাজনীতি সম্পর্কে অবগত করতে।

১৯৭৫ সালে রাসেল ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। শেখ মুজিবুর রহমানের ১৫ আগস্ট (সোমবার) সকালে এক বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল। স্বাধীনতার পর সেটাই ছিল প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গমন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঠিক করলেন ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির চারজন শিক্ষার্থীকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ফুল দেয়া হবে। সেই চারজনের মধ্যে একজন ছিল শেখ রাসেল। কিন্তু সেদিন কালো রাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারের নৃশংসভাবে হত্যা করা হলে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে শেখ রাসেলও শহিদ হয়।  কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ভয়াবহ হত্যার শিকার হয় শেখ রাসেল। মৃত্যুর পূর্বে মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিল সে, যেতে চেয়েছিল প্রিয় হাসু আপার কাছে। কিন্তু ইতিহাসের ঘৃণিত ঘাতকদের মনে একটু মায়াও হয়নি। যেতে দেয়নি তাঁদের কাছে, গুলি করে হত্যা করে।

অনেকেই মনে করেন যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত তারা রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নেয়ার জন্য জাতির পিতাকে হত্যা করেছে। কিন্তু শেখ রাসেলকে তাহলে কেন হত্যা করা হলো? প্রকৃতপক্ষে হত্যাকারীদের পরিকল্পনা ছিল মুজিবকে নয়, মুজিবের আদর্শ বাংলাদেশ থেকে মুছে ফেলা। কিন্তু ঘাতকেরা এটা হয়ত ভুলে গিয়েছিল মুজিব মানেই বাংলাদেশ।

লেখক: শিক্ষার্থী,  বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজ বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজজি/এস দত্ত/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers