রবিবার, ২ এপ্রিল ২০২৩, ১৮ চৈত্র ১৪২৯ , ১১ রমজান ১৪৪৪

ফিচার
  >
পাঠক বিভাগ

আলোচিত সেই দুর্ঘটনা নিয়ে কল্যাণের ‘খোলা চিঠি’

নিউজজি প্রতিবেদক ১৪ জুন , ২০১৭, ০২:১৬:২৩

15K
  • আলোচিত সেই দুর্ঘটনা নিয়ে কল্যাণের ‘খোলা চিঠি’

ঢাকা: জনপ্রিয় মডেল-অভিনেতা কল্যাণ কোরাইয়া অনেকদিন ধরেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। একটি দুর্ঘটনা তার জীবনকে এলোমেলো করে দিয়েছে। ভারাক্রান্ত মনে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার জীবনের ঘটে যাওয়া সে দুর্ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন তিনি। যা নিউজজি২৪ডটকম-এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

কল্যাণ কোরাইয়া লিখেছেন-

‘‘আমার জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সবচেয়ে কঠিন ঝড়টি নিয়ে কিছু কথা আমি বলতে চাই, যে কথাগুলো জানা আপনাদের জন্য হয়তো জরুরি না, কিন্তু কথাগুলো বলা আমার জন্য জরুরি। আমি বলতে চাই- আইনের নামে আমার ও আমার পরিবারের ওপর দিয়ে অকারণে যে সীমাহীন অবিচার হয়েছে সেই ঘটনাটা। আমি লিখতে পারি না, হয়তো গুছিয়ে সবকিছুর বর্ণনা দিতে পারব না, হয়তো আমার লেখায় অনেক বানান ভুল থাকবে, কিন্তু তার পরও আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করছি- আমি যে অন্যায়ের শিকার হয়েছি তা বর্ণনা করার।

৯ জানুয়ারি রাতে (১০ জানুয়ারি বলা যায়, যেহেতু রাত ১২ টার পরের ঘটনা) আমি আর আমার বন্ধু রসি তেঁজগাও থানার পাশে একটা সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হই। আমার ব্যক্তিগত গাড়িটি আমি নিজেই চালাচ্ছিলাম আর আমার পাশের সিটে বসে ছিল আমার বন্ধু রসি। রডবাহী একটি ট্রাকের পেছনে আমার গাড়িটি ঢুকে যায়, রসি মাথায় বেশ গুরুতর আঘাত পায়, আমি শারীরিকভাবে খুব একটা আঘাত না পেলেও, সারাশরীরে আমার গাড়ির সামনের কাচ এসে পড়ে। আশপাশের মানুষজন দ্রুত রসিকে আর আমাকে গাড়ি থেকে বের করে। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। একদিকে আমার বন্ধু রসি আহত হয়েছে, অন্যদিকে আমার গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আশপাশের মানুষজনকে দিয়ে রসিকে আল রাজি হাসপাতালে পাঠালাম চিকিৎসার জন্য, আর আমি গাড়িটি রাস্তার পাশে নিরাপদ জায়গায় রাখার চেষ্টা করতে লাগলাম, যাতে রাস্তায় জ্যাম না লাগে ও গাড়িটিও নিরাপদে থাকে। ইতোমধ্যেই আমি আমার বাবা ও দুলাভাইকে ফোন দিয়ে দুর্ঘটনার কথা বললাম। গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনোরকম চালানোর উপযোগী ছিল। বাসা খুব কাছে হওয়ায় বাবা ও দুলাভাইয়ের পরামর্শে গাড়িটি নিয়ে কোনোমতে বাসায় আসলাম। বাসায় গাড়িটি রাখার পর বাবা আর দুলাভাইকে নিয়ে আলরাজি হসপিটালে গেলাম রসিকে দেখতে। সেখানে গিয়ে ফোন করে জানতে পারি, রসিকে আলরাজি হসপিটাল থেকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা ঢাকা মেডিক্যালে যেতে যেতে রাস্তায় আমার ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যায়। ঢাকা মেডিক্যালে পৌঁছে লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট-এর কোনো রোগী এসেছে কি না! তখনো আমি জানি না, প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিক জিয়া ভাই পান্থপথে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছে। কয়েকজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, কে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। আমি উত্তর দিলাম, আমার বন্ধু অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। কীভাবে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে- এ রকম প্রশ্নও করল কয়েকজন। আমি বললাম, আমার গাড়িতে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। পরবর্তীতে, এই ঘটনাকে তিলকে তাল বানিয়ে ফেলা হলো। আমার গাড়িতে আমার বন্ধু অ্যাক্সিডেন্ট করেছে- এই ব্যাপারটাকে বানিয়ে ফেলা হলো, আমার গাড়িতে প্রথম আলোর জিয়া ভাইকে চাপা দেয়া হয়েছে।

সচেতন বা অবচেতনভাবে আমার ওপর ক্ষেপে উঠল প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ, অন্য পত্রিকা ও চ্যানেলেরও অনেক সাংবাদিক আমার ওপর ক্ষেপে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে লেখালেখি শুরু করে দিলেন। পরের দিন আমার বাসায় পুলিশ পাঠানো হলো, পুলিশের কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে প্রথমে তেজগাঁও থানা ও পরবর্তীতে কলাবাগান থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। আমার বিরুদ্ধে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ মামলা করল, আমাকে গ্রেফতার করা হলো। গ্রেফতারের পর আমাকে ৬ দিন জেলে কাটাতে হলো। এখন আমি জামিনে মুক্ত আছি, প্রতি মাসে আদালতে আমাকে হাজিরা দিতে হচ্ছে।

প্রথম আলোতে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, আমি মদ খেয়ে গাড়ি চালিয়ে জিয়া ভাইকে চাপা দিয়েছি। প্রশ্ন হলো, আমি যদি মদ খেয়ে বা না খেয়ে গাড়ি চালিয়ে জিয়া ভাইকে গাড়িচাপা দিয়ে থাকি, তাহলে কেন গাড়িচাপা দেয়ার পর ঢাকা মেডিক্যালে গেলাম? আর ঢাকা মেডিক্যালে গিয়ে যদি আমি জিয়া ভাইকে গাড়িচাপা দেয়ার (?) ঘটনা স্বীকার করি, তবে সেখানে আমাকে কেন কেউ আটকালো না? সেখানে তো অনেক সাংবাদিক ছিলেন, তারা কেন তাদের দায়িত্বের জায়গা থেকে আমাকে অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারে বিষদভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন না? আমি যদি কোনো সাংবাদিকের কাছে জিয়া ভাইকে গাড়িচাপা দেয়ার কথা বলে থাকি, তাহলে কে সেই সাংবাদিক, তার নাম পরিচয় ও তার ভাষ্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেলো না?

কী অপরাধ করেছেন আমার মা? আমার মাকে কেনো কাঁদানো হলো, কেনো তাকে থানায় গিয়ে মদ্যপ ও লম্পট ছেলের মা বলা হলো? আমার মায়ের চোখের জলের দাম কীভাবে দিবেন? ওই ঘটনার পর থেকে আমার মায়ের শারীরিক অবস্থার যে অবনতি হয়েছে, তার ওপর যে মানসিক নির্যাতন হয়েছে তার দায়ভার কে নিবে? আমার বিরুদ্ধে লেখার আগে আমার মোবাইল ট্র্যাকিং করে ঘটনার সময় আমার অবস্থান কেনো জেনে নেয়া হলো না? ঘটনার দিনে ওই সময়ে আমি পান্থপথে ছিলাম নাকি ছিলাম না, তা তো আমার মোবাইল ট্র্যাকিং করেও বের করা যেত। এবং এরপর আমি দোষী হলে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেত। কিন্তু সম্পূর্ণ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে আমার জীবনটা নষ্ট করে দেয়ার যে অপচেষ্টা করা হলো তা কতটা মানবিক? অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই, এই অপচেষ্টা অনেকাংশেই সফল হয়েছে। সামাজিকভাবে আমি ও আমার পরিবার হেয় প্রতিপন্ন হয়েছি, যার ফলাফল বাজেভাবে প্রতিনিয়ত ভোগ করছি। আমার অ্যাক্সিডেন্ট নিয়ে এটিএন নিউজ আওয়ার এক্সট্রাতে সাংবাদিক মুন্নি সাহা আমার ওই রাতের মোবাইল ট্র্যাকিং প্রকাশ করেছেন, অনুষ্ঠানটির লিংক প্রথম কমেন্টে দেয়া হলো। আপনারা যারা দেখেন নাই, তারা দেখে নিতে পারেন, অনেক কিছুই স্পষ্ট হবে।

আমি আর কথা বাড়াব না, শুধু দুইজন মানুষকে উদ্দেশ্য করে দুটি কথা বলব, মানুষ দুইজন হলো- আনিসুল হক ও জিয়া ইসলাম।

প্রিয় আনিসুল হক, আমি আপনার একজন ভক্ত। আপনার ‘মা’ উপন্যাস আমার খুবই প্রিয়। আপনি অনুমানের ওপর ভিত্তি করে আমার বিরুদ্ধে যা যা লিখেছেন তা নিয়ে আমার কোনো দুঃখ নাই। আপনি দয়া করে, একদিন সময় করে আমার বাসায় আসুন, আমার মায়ের সাথে কথা বলে যান প্লিজ। আমার ধারণা, আপনার সাথে কথা বললে আমার মায়ের ভালো লাগবে। যদি আমার বাসায় আসেন তাহলে আমার বুকসেলফে রাখা আপনার লেখা ‘মা’ উপন্যাসে একটা অটোগ্রাফ দিয়েন।

প্রিয় জিয়া ইসলাম, যে দুর্ঘটনা আপনার জীবনকে এলোমেলো করে দিয়েছে, সে দুর্ঘটনা আমার জীবনটাকেও এলোমেলো করে দিয়েছে। অথচ এ দুর্ঘটনায় আমাদের দুইজনের কারওই কোনো দোষ নাই। একদিন আমাকে সময় দিন ভাই, আমি আর আপনি চলেন আড্ডা দেই। আসুন আড্ডা দিতে দিতে হিসেব মিলাই কার জীবন কতটা এলোমেলো হয়েছে।

ভালো থাকুন সবাই। যারা পাশে ছিলেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’’

 

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন