বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৮ শাওয়াল ১৪৪৭

ফিচার
  >
পাঠক বিভাগ

“বাবা” পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিক্ষক -মুকুল

মুকুল ১ ডিসেম্বর , ২০২৪, ১৩:৪৫:০৮

318
  • “বাবা” পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিক্ষক -মুকুল

প্রিয় বাবা

“তোমাকে মনে পড়ে, আমার স্বপ্নভঙ্গের দিনগুলোতে, কিংবা পরম সুখের মুহূর্তগুলোতে। বাবা, তোমাকে মনে পড়ে “শুপাড়ি নিবাস”-এর প্রতিটি দেয়ালের স্পর্শে , খুব মনে পড়ে ! জাগরণে, গভীর ঘুমে... হৃদয় দুমড়ে যায়, যখনই মুষড়ে পড়ি অমানিশার ঘোর কুয়াশায়। স্তম্ভিত ফিরে পাই, মনে পড়তেই “শত বর্ষ পর কীভাবে চলবে এ দুনিয়া” তুমি তাও বলেছিলে সেই আমার পুতুল খেলার ছেলেবেলায়। তোমার চলে যাওয়ার ৮ বছরেই তোমার শত ভাবনা বাস্তব হলো চোখের সামনে। শুধু বাবা বলেই নয়, তুমি সত্যি আমার হিরো, একাল—সেকালের সেরা হিরো। তোমার কাছ থেকে জেনেছি সৃষ্টিকর্তা ও তার বিধানকে। সাথে তুমি শিখিয়েছ রেডিওতে গভীর মনোযোগে ইংরেজি খবর শুনতে (বুঝব না জেনেও)। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, হাসন রাজা’র প্রতি তোমার কাছ থেকেই প্রথম আগ্রহ অনুভব করেছি। বুঝতাম না আমি, আমার অতি বালক বেলায় লালন সাইজী’র নির্ভিক প্রশ্ন ( যিনি রাজাদের রাজা তিনি আবার চোরেরও রাজা তাহলে আমি এখন কার কাছে অভিযোগ দিব?) এর উত্তর আমার কাছ থেকেই কেন বার বার বাবা জানতে চাইতে তুমি (?)। এগুলো সেসময় খুবই অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও কিছুকাল পরেই বুঝতে পেরেছি তুমি মূলত বীজ রোপণ করতে চেয়েছ আমার মগজে, যদি কোনও কালে ভরপুর ডাল-পাতা যুক্ত কোন বৃক্ষ হয়ে পথহারা ক্লান্ত পথিকের নির্মল ছায়ার কারন হিসেবে দাড়াতে পারি বা প্রচলিত বিদ্যা চর্চার বাইরেও ভিন্ন ও অনন্য উপায়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারি, যেন মানুষ তার অতি - বিপদ এবং দিকভ্রান্ত সব ভুলে যাওয়া মনে তোমার এ প্রিয় সন্তানকে স্মরণ করার মতো উপযুক্ত মানুষে পরিণত হই আমি । কিন্তু বাবার কোন ইচ্ছে আমি পুরুণ করতে পারিনি, বাবার প্রয়াসের কোনও প্রতিফলন আমার মধ্যে খুঁজে পাই না। শুধু অবনত চিত্তে, গভীর শ্রদ্ধায় তোমাকে স্মরণ করি, তোমার দর্শন উপলব্ধি করার মৃদু চেষ্টাও করি, পেরে উঠি আবার উঠি না। বাবা, তুমিই প্রথম কাঠের রেডিওতে খবর শোনার পর আমাকে বুঝাতে,"পশ্চিমাদের সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টি মধ্যপ্রাচ্যেকে আস্তে আস্তে ঘিরে ধরছে অক্টোপাসের মতো৷ প্রথম প্রথম ভাবতাম বাড়ির পশ্চিম পার্শ্বের প্রতিবেশীর কিছু অন্যায্যতায় নিজেকে মধ্যপ্রাচ্য ভাবছেন বাবা- কারণ পশ্চিমা, মধ্যপ্রাচ্য, সাম্রাজ্যবাদ এসব শব্দের সাথে আমার বয়স অনুপাতে বড় বেশি অলীক, বেমানান । তোমার মুখে সবচেয়ে বেশি শুনেছি তিন শব্দের একটি চিরন্তনী বাক্য—“বাচতে হলে পড়তে হবে/ জানতে হবে অনেক”। এ জীবনে ভালো কিছু যা ই শিখেছি, তুমিই তার একমাত্র শিক্ষক, তুমি কেমন করে জানতে ইংরেজি না বোঝা ছোট্র সন্তানকে পাশে বসিয়ে ইংরেজি খবর শুনলে শব্দগুলো মগজে সেট হয়ে যাবে, বিশাল শব্দ ভাণ্ডার গড়ে দিয়েছ তুমি আমার অভ্যন্তরে, আমারই অজান্তে। প্রতিদিন নানা উচ্চারণে তোমার স্মৃতি আমাকে বার বার পুলকিত করে। বাবা তোমাকে হারানোর বেদনা আমায় অতটা পরাস্ত করেনা যতটা মুশরে পরি একজন শ্রেষ্ঠ ও অনন্য শিক্ষকের অনুপস্থিতির ভাবনায়। তোমার কৌশলি শিখন প্রক্রিয়ার সুফল প্রতিদিন পাই, প্রতিনিয়ত আমাকে আলোরিত করে, সমৃদ্ধ করে । শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত এখন খেটে খাওয়া মানুষ কীভাবে সন্তানের জন্যে হয়ে উঠলে দুনিয়ার সেরা শিক্ষক শুধু সেটা আমায় শেখালে না বাবা! তুমি ওপার থেকে দোয়া করো বাবা , তোমার নাতনী মাবশূ হোসেনকে তোমারই শিখন পদ্ধতি প্রয়োগে আমি যেন সফল হই। মাবশূ জীবনে যা ইচ্ছে হোক, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ যেন তোমাকেও ছাড়িয়ে যায়। আমি তো পারিনি বাবা, আমার মেয়ে যেন তোমার শিখন প্রক্রিয়ার স্থায়ী রূপ দিতে পারে, দুনিয়ার সবাই যেন বুঝতে পারে সন্তানের প্রথম ধর্মালয়, প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় তার বাবা, ঠিক যেমন ছিলে তুমি। কিছুই জানা হলো না বাবা, সুযোগ পেলাম না, ২৫ বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত নিশ্চুপ তোমার মলিন মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে, তোমার আমানত গুছিয়ে রাখার যে দায়িত্ব আমার কাঁধে পরেছিল তা সত্যিই আমাকে ঘিরে তোমার স্বপ্ন ভঙ্গ করে দিয়েছে একটু একটু করে। আমাকে গোছাতে একটুও সময় আমিই দিতে পারিনি, দিতে দেয়নি কেও । আমাকে নিয়ে তোমার যত ইচ্ছে, যত প্রয়াস তার সবই অনুজদের প্রতি বণ্টনে তোমার আদর্শই আমাকে বাধ্য করেছিলো, বণ্টনের জন্য সম্পদ রেখে যাওনি ঠিকই কিন্তু যা রেখেছো, সন্তানদের দেবার চেষ্টা করেছ তার পদতলে দুনিয়ার সমস্ত সম্পদের পাহাড় অবনত থাকবে, একাডেমিক শিক্ষার সুযোগ তোমার জীবনে খুব বেশি না থাকলেও সম্পদ ও সম্পত্তির তফাৎ তুমি খুব ভালো করে অনুভব করেছ । তোমার অন্য সন্তানদের আমার মতো বালক বেলায় শ্রমিক হতে দেইনি আমি । বালক শ্রমিকের অভিজ্ঞতায় নিজে কাটিয়েছি প্রাইমারি ছেড়ে অনেকগুলো বছর। তুমি সব দেখেছো তবু ওরা অস্বীকার করে। কোন আফসোস নেই আমার , তাদের অস্বীকার আমাকে বিচলিত করে না, কারণ আমি তো তোমারই কাজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম সানন্দে যখন আমার কাঁধের হাড় একদম অল্প আঘাতে টুকরো হয়ে যাওয়ার বয়স। মাথার ওপর ছায়াহীন জীবনের নির্মমতা,আমি তোমার আর কোন সন্তানকে মোকাবিলা করতে দিতে চাইনি। পৃথিবীতে কে তোমাকে কীভাবে চেনে আমি ভাবি না বাবা, আমার সমস্ত ভাবনা জুড়ে সব সময় যে অনুভূতি বারবার আমাকে শিহরণ জোগায়, পথ হারিয়েও নতুন পথে পৌঁছুতে সাহস আর শক্তি জোগায়, অচেনা মুল্লুক মুহূর্তে আপন করে নেয়ার অমোঘ শক্তি আর কেও দেয় নি আমাকে, সে কেবলি তুমি বাবা। মরহুম হাসেন প্রামানিক, প্রিয় বাবা—যেখানেই থাকো সর্বোত্তম প্রাপ্তীতে থাকো। আমার জীবনের যে মৌলিক কাঠামো তুমি রচনা করার প্রয়াস করেছিলে তা যেনো আমি বাস্তবায়ন করে তোমার স্মৃতিকে আরও মহিমান্বিত করতে পারি, অনেকে যেন তোমার মতো বাবা হ’বার স্বপ্ন দেখে!

 *মহান আল্লাহ তোমাকে নিশ্চয়ই জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করবেন, রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সগিরা " আমীন

(২৯ নভেম্বর-২০১৬, তোমাকে হারিয়েছি ৮ বছর, হারিয়েছি একজন সাক্ষী, যার অনুপুস্থিতিতে পরিবারিক আদালতে হেরে গেছি আমি, বিজয়ী হয়েও পড়াজয়ের গ্লানিবোধ নিয়ে টিকে থাকা তুমিই শিখিয়েছিলে, তাই টিকে আছি, যতদিন প্রকৃতি তোমার হয়ে সাক্ষ্য না দেয় )।

নিউজজি/নাসি 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers