সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২২ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
পাঠক বিভাগ

জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার লিখিত রূপ হচ্ছে সংবিধান

ফজলে রাব্বি ২৫ সেপ্টেম্বর , ২০২৪, ১৫:৫৪:৪৩

736
  • জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার লিখিত রূপ হচ্ছে সংবিধান

যদিও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(২) এ বলা হয়েছে, “জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান…”, তবুও জনগণের একটা বিরাট অংশের মধ্যে সংবিধান সম্পর্কে কথা বলতে অনীহা আছে, ভীতি আছে। আর অজ্ঞতা তো আছেই।

জনগণ তার ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র চলবে এটা অনেকেই, এমনকি জনগণ নিজেও বিশ্বাস করতে চায় না। রাষ্ট্র ব্যাপারটা এমন নয় যে উপর থেকে নাযিল হয়েছে, আপনাকে মানতেই হবে। আর না মানলে অনন্তকাল আগুনে জ্বলতে হবে।

তাহলে রাষ্ট্র কী? রাষ্ট্র একটা কল্পনা মাত্র। রাষ্ট্র এমন একটা গল্প যা আপনি, আমি, আমরা সবাই সাধারণ নাগরিকরা মিলে তৈরি করেছি এবং এই গল্পে বিশ্বাস করি। এখন জনগণ একত্রিত হয়ে রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে সম্মত হয়। তারপর সেই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ধরুন একটা কমিটি লাগবে। সেই কমিটি হচ্ছে সরকার। এখন জনগণ বলে দিবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার কীভাবে চলবে এবং অন্যান্য কাজ করবে। তাহলে সর্বপ্রথম জনগণ সবকিছু বলে দিবে (সব বলতে না পারলেও মৌলিক কিছু নীতি বলবে, যেমন, রাষ্ট্রের মধ্যে কোন বৈষম্য থাকবে না, যেটাকে আমরা সাম্য বলতে পারি। এটাই গণতন্ত্রের মূল কথা। তারপর কথা বলার অধিকার থাকবে, ভোট দেয়ার অধিকার থাকবে মানে সকল মানবাধিকার থাকবে) এবং সবশেষে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

এখন জনগণ কেন ভুলে যায় যে সংবিধান জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। এখানে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণ যে সরকার নির্বাচন করে তারা জনগণকে নানা ভয়ভীতির মধ্যে রাখে। যেমন: নির্বাহী বিভাগ: পুলিশ দিয়ে মামলা দিতে পারে, রিমান্ডে নিয়ে তথ্য উদ্ধারের নামে নির্যাতন করতে পারে, গুম করতে পারে, ক্রসফায়ার দিতে পারে প্রভৃতি।

আইন বিভাগ: জনগণ ভোট দিয়ে আইন সভায় এমপি বা সংসদ সদস্য নির্বাচন করার পর জনগণের আর কোন কাজ নেই (জনগণ সংসদ সদস্যদের ভোট দিয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনা দায়িত্ব পালন করার জন্য। কিন্তু জনগণের কাছে যে এই দায়িত্ব পালন বা অ-পালনের জন্য জবাবদিহি করতে হবে সেই কথা লুকিয়ে রাখে অথবা বলা হয় না)।

বিচার বিভাগ: জেল জুলুমের ব্যবস্থা করতে পারে।

এরকম আরও নানা ধরনের ভীতি আছে যার মাধ্যমে জনগণকে সবসময় সন্ত্রস্ত করে রাখা হয়। এভাবে সদা ভীতির চাপে থেকে জনগণ ভুলে যায় যে এই রাষ্ট্র জনগণের স্বার্থ দেখার জন্য। তখন মনে হয় যেন জনগণই রাষ্ট্রের দাস, যেন রাষ্ট্রের জন্য জনগণ, জনগণের জন্য রাষ্ট্র নয়।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(১) এ বলা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ,...” কিন্তু বাস্তবে জনগণ কী প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার মালিক!

সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের মতে সংসদ যেকোন আইন বানাতে পারবে। মৌলিক অধিকারের অনুচ্ছেদ ২৬ এর (৩) এ আলাদা হরে বলা আছে, “সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রণীত সংশোধনের ক্ষেত্রে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই প্রযোজ্য হইবে না।”তারমানে সংসদ এই ১৪২ ধারা অনুযায়ী জনগণের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার বিরোধী আইন বানাতে পারবে। এই যে একদিকে বলা হলো জনগণ মালিক, জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন সংবিধান। আরেকদিকে জনগণ একবার যাকে ভোট দিবে সেই সংসদ সদস্যরা জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা বিরোধী, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার বিরোধী আইন করতে পারবে বলা মানে জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। এই ব্যাপারে জনগণ সচেতন। এজন্যই জনগণ মনে করে না যে জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার চরম অভিব্যক্তি রূপে এই সংবিধান।

১৯৭০ সালে পুরো পাকিস্তানের (পশ্চিম-পূর্ব) সরকার নির্বাচনের জন্য সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় (৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ - ১৭ জানুয়ারি ১৯৭১)। সেখানে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে (যেখানে ১৫১টি আসন পেলেই সরকার গঠন করা যায়)। আর প্রাদেশিক নির্বাচনে বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের) ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে। তারমানে শেখ মুজিব পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে না দিয়ে ঢাকা শহরে গণহত্যা চালায়। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়।

এখানে দেখার বিষয় হচ্ছে, ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়েছিল জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদে সরকার গঠনের জন্য। তখন পরিস্থিতি ছিল এক রকম, জনগণ সরকার গঠনের জন্য ভোট দিয়েছে। কিন্তু যখন স্বাধীনতা যুদ্ধ সংগঠিত হলো, যুদ্ধ জয়ের পর সংবিধান প্রণয়নের জন্য জনগণ থেকে আর ভোট নেয়া হলো না। জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো না। এখানেই জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়।

বর্তমানে ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হাজারো মানুষ খুন হয়েছে। ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। এত রক্তের পরে যদি আবারো জনগণকে জিজ্ঞেস না করে, জনগণের সাথে কথা না বলে যদি সংবিধান সংস্কার, পুনর্লিখন বা নতুন করে প্রণয়নও করা হয়, তবে ১০, ১৫ বা ২০ বছর পর আবার জনগণ বিপ্লব করবে। জনগণ তার ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা বলার জন্য, তার অভিপ্রায়ের প্রকাশের জন্য আবার রক্ত দিবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না বাংলাদেশের পুরো জনগোষ্ঠীর মতামত নেয়া হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের জনগণ প্রতিবাদ জানিয়ে যাবে। এই রাষ্ট্র হচ্ছে জনগণের। এই জনগণকেই জিজ্ঞেস করে, মতামত নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান তৈরি করতে হবে। গণমানুষ থেকে আসা কোন গণবিধান না হলে জনগণ কোন নির্দিষ্ট, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া বিধান মেনে নিবে না।

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪

লেখক: লেখক ও অনুবাক

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers