রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ৮ কার্তিক ১৪২৮ , ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ফিচার
  >
মানচিত্র

বলিভিয়া : পৃথিবীর উঁচু দেশটির ঘরে ঘরে শিল্পী

নিউজজি ডেস্ক ১৬ আগস্ট , ২০২১, ১৩:২৫:৩৭

335
  • ছবি: ইন্টারনেট

দক্ষিণ আমেরিকার ভূমিবেষ্টিত দেশ বলিভিয়া। এর উত্তর ও পূর্বে ব্রাজিল, দক্ষিণ-পূর্বে প্যারাগুয়ে, দক্ষিণে আর্জেন্টিনা, দক্ষিণ-পশ্চিমে চিলি ও উত্তর-পশ্চিমে পেরু। দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন দেশ এটি।

১৬শ শতক থেকে ১৯শ শতকের শুরু পর্যন্ত বলিভিয়া স্পেনের একটি উপনিবেশ ছিল। ১৮২৫ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৫২ সালে এখানে একটি রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটে যার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বিপ্লবী নেতারা আদিবাসী আমেরিকানদের অধিকতর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ সুবিধা প্রদানের প্রকল্প গ্রহণ করেন। সরকার তাদের ভোট দেবার সুযোগ দেন, এবং পল্লী এলাকাগুলিতে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। বড় বড় জমিদারীগুলি ভেঙে দেয়া হয় এবং আদিবাসী আমেরিকান চাষীদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমি দেওয়া হয়। তবে এই সংস্কারগুলি বলিভিয়ার অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। পরবর্তী সরকারগুলি অর্থনীতির বড় অংশ বেসরকারীকরণের চেষ্টা করলেও এখনও বলিভিয়া সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র।

বলিভিয়া নিয়ে কথা বললে প্রথমে আসে চে-র নাম। সিআইএর প্রত্যক্ষ নির্দেশে বলিভিয়ার সামরিক বাহিনীর এক সৈনিকের গুলিতে চে-র নিহত হওয়ার ঘটনা সবারই জানা। হত্যার ঘটনায় মূলত জড়িত ছিলেন মায়ামিতে আশ্রয় নেওয়া কিউবার প্রতিবিপ্লবী ফেলিক্স রদ্রিগেজ। বিপ্লবপূর্ব কিউবায় একনায়ক বাতিস্তার পুলিশ বাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন রদ্রিগেজ। সিআইএ চে-র বলিভিয়া অভিযানের তথ্য পাওয়ার পর সে দেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। যে অঞ্চলটিতে চে-র গেরিলা বাহিনী যুদ্ধ করছিল, সেখানে মাসখানেক আগে থেকে মার্কিন সহায়তায় সামরিক অভিযান শুরু করেছিল বলিভিয়ার সেনা কমান্ড। সেই অভিযানেই একপর্যায়ে আহত চে ধরা পড়েন।

চে-র আটক হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর তাকে জেরা করার জন্য মার্কিন প্রশাসন সেখানে রদ্রিগেজকে পাঠায়। কিন্তু আহত ও বন্দী চে কোনো রকম প্রশ্নের উত্তর দেননি। তবে চে-কে হেয় করার উদ্দেশ্যে রদ্রিগেজ নানা রকম বানোয়াট তথ্য প্রচার করতে থাকেন। আটকের পর চে বুঝতে পেরেছিলেন, তার জীবন শেষ হয়ে আসছে। তাই আহত অবস্থায় দাঁড়িয়ে সেই সৈনিককে বলেছিলেন, ‘কাপুরুষ, মারো, গুলি করো। তোমাদের গুলিতে মরবে কেবল মানুষটি।’ সেটাই ছিল চে-র জীবনের শেষ বক্তব্য। বলিভিয়ার ভ্যালেগ্রান্দে নামের সেই প্রত্যন্ত জায়গার অজানা এক স্থানে তারা পুঁতে রেখে যায় চে-র মৃতদেহ। কিন্তু মৃত্যুর দিন থেকেই যেন হত্যাকারীদের পিছু নিয়েছেন চে। কারণ, হত্যাকারীরা সকল দেশের, সকল সমাজেই হয়ে পড়েছে ঘৃণিত।

মৃত্যুর অর্ধশত বছর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রস্তুতি নিচ্ছে চে-কে নতুনভাবে স্মরণ করার। কেবল কিউবা আর সমমনা রাষ্ট্রগুলোই নয়, আইরিশ প্রজাতন্ত্র চে-র প্রতিকৃতি আঁকা স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে, জাপানে মুক্তি পেয়েছে বলিভিয়ার অভিযানে চে-র নিহত সহযোদ্ধা, জাপানি বংশোদ্ভূত বলিভীয় তরুণ ফ্রেডি মায়েমুরাকে নিয়ে তৈরি একটি ছায়াছবি। আর চে যেখানে নিহত হয়েছেন, সেই বলিভিয়ায় চলে সপ্তাহব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন।

বলিভিয়ার মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই আদিবাসী। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও বলিভিয়া মহাদেশের দরিদ্র দেশগুলোর একটি। শহরে কিছু অবস্থাপন্ন লোকের দেখা মেলে। তাঁদের বেশির ভাগেরই পূর্বপুরুষ স্প্যানিশ। যদিও রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তাঁদের প্রাধান্যই সর্বাধিক। বাকি বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের কৃষক, খনিশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্পী।

দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ তাদের। তবে এর উত্তোলন ও রপ্তানি নিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চলছে বহু দিন থেকেই। আদিবাসী গ্রুপগুলোর দাবি, এসব মজুদ বিদেশি কোম্পনিগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। দেশটির মূল রাজনৈতিক সংকটের কারণও এটি। 

বলিভিয়ার বেশির ভাগ লোক আন্দেস পর্বতমালার দুইটি পর্বতশ্রেণীর মাঝখানে অবস্থিত একটি মালভূমিতে বাস করেন। দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা জুড়ে আন্দেস পর্বতমালা অবস্থিত। তবে ১৯৫০-এর দশক থেকে পূর্বের নিচু সমভূমিগুলিতে ধীরে ধীরে ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ গড়ে উঠেছে। বিশেষত ঐ এলাকায় খনিজ তেল ও গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হবার পর এটি ঘটেছে। এছাড়াও দেশটির উর্বর খামারভূমিগুলি বসতির জন্য খুলে দেওয়া হয়। ২০০০-এর দশকের শুরুতে এই অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র সান্তা ক্রুজ দে লা সিয়েরা লা পাজকে ছাড়িয়ে বলিভিয়ার বৃহত্তম শহরে পরিণত হয়।

চমৎকার সব প্রাকৃতিক দৃশ্য, ভিন্ন এবং অনন্য সংস্কৃতি, মজার মজার সব উৎসব, রঙ্গিন শহরগুলো, কেনাকাটার জায়গা সব মিলিয়ে বলিভিয়া আপনাকে দেবে ভিন্ন আমেজের আনন্দ।

আসুন জেনে নিই, বলিভিয়া ভ্রমণের জায়গাগুলো-

লেক টিটিকাকা - 

নীরব নিথর নীল জলের লেক টিটিকাকা। এটি শুধু বলিভিয়ার সবচেয়ে সুন্দর লেকই নয়, এটি বলিভিয়ার ট্রেজার্ড ল্যান্ডমার্ক এবং একই সাথে বিশ্বের সর্বোচ্চ নৌবাহী লেক। ভ্রমণকারীরা এখানকার রিসোর্টগুলোতে অবস্থান করেন, উপভোগ করেন শান্ত নীরব লেকের সৌন্দর্য্য।

অনেকে এক্সপ্লোর করতে পছন্দ করেন সমগ্র এলাকা যাকে মনে করা হয় ইনকা সাম্রাজ্রের বিস্তারের পটভূমি। একটি নৌকা নিয়ে লেকের পানিতে ভেসে বেড়াতে পারেন আপনি। অসাধারণ প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন, চাষাবাদের দৃশ্য অনেক কিছুই চোখে পড়বে আপনার। সহজ নিরন্তর জীবনের ছন্দ মন কেড়ে নেবে। দেখতে পাবেন ইনকা সভ্যতার অনেক ধ্বংসাবশেষও। শুধু লেকটি নয়, পুরো এলাকাটি একটি চৌম্বক আকর্ষণ তৈরি করে যেন, একবার ভ্রমণের পর আর তা ভোলার নয়।

তিওয়ানাকু -

ইউনেস্কো এই অঞ্চলকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে ২০০০ সালে। এটি একটি প্রি-কলাম্বিয়ান নৃতাত্ত্বিক সাইট, যার অবস্থান পশ্চিম বলিভিয়ায়। ইনকাদের গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি ছিল এখানে। এটি এখন পর্যন্ত স্থাপিত শহরগুলোর মাঝে সবচেয়ে পুরাতন, কিন্তু আধুনিক। আজকের তিওয়ানাকু এক রহস্য। কবে কখন কিভাবে এর স্থাপনা হয়েছিল কেউ জানে না। শুধু নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে এর প্রাচীনত্ব। বিস্ময়কর সেই সৃষ্টির মাঝে ঘুরে ঘুরে উপভোগ করতে পারেন সভ্যতার আদি সত্য, যখন মানুষের হাতে যন্ত্র বলতে ছিল শুধু নিজের হাত দুটি। মস্তিষ্ক খাটিয়ে প্রকৃতিকে ব্যবহার করে তারা সৃষ্টি করেছে কত কিছু, তার মাঝে হেঁটে বেড়ানো এক আশ্চর্য বিশ্বে প্রবেশের মতই রোমাঞ্চকর।

লা পাজ -

পেছনে বরফে ঢাকা পর্বতের সারি আর সামনে রঙ্গিন শহর। পর্বতের দৃশ্য যেন ব্যাকগ্রাউন্ড এই ছবির। লা পাজ বলিভিয়ার ৩য় জনবহুল শহর এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ সরকারি কার্যালয়ের অবস্থান এখানে। বলিভিয়ার জনগোষ্ঠীর বর্নিল জীবন উপভোগ করতে পারেন এখান থেকে। আবিষ্কার করতে পারেন ঘুরে দেখার মত অনেক কিছু, যোগ দিতে পারেন স্থানীয় উৎসবে।

ইয়াঙ্গাস রোড - 

বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক সড়কগুলোর এটি একটি। এই সড়কে বাইক রাইড খুবই বিপজ্জনক কিন্তু রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা। সড়কের নামই ‘Death Road’। পর্বতে পর্বতে ঘেরা, পর্বত কেটেই চলে গেছে পথ যেন বাতাসের মাঝে ভেসে চলেছে গাড়িগুলো। প্রচুর দূর্ঘটনটা তো ঘটেই এই সড়কে, ঘটে প্রচুর মৃত্যু।

একনজরে

পুরো নাম: প্লুরিন্যাশনাল স্টেট অব বলিভিয়া

রাজধানী: লা পাজ

বৃহৎ শহর: সান্তা ক্রুজ দে লা সিয়েরা

ভাষা: স্প্যানিশ, কুয়েচুয়া, আয়মারা, গুয়ারানিসহ আরো ৩৩টি স্থানীয় ভাষা রয়েছে।

সরকার: ইউনিটারি প্রেসিডেনশিয়াল কনস্টিটিউশনাল রিপাবলিক

প্রেসিডেন্ট: ইভো মোরালেস

আইনসভা: প্লুরিন্যাশনাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি

উচ্চকক্ষ: সিনেট

নিম্নকক্ষ: চেম্বার অব ডেপুটিজ

স্বাধীনতা: ৬ আগস্ট ১৮২৫ (ফ্রান্স থেকে)

আয়তন : এক লাখ ৯৮ হাজার ৫৮১ বর্গকিলোমিটার

জনসংখ্য: এক কোটি পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ১০২ জন

ঘনত্ব : প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৯ জন

জিডিপি : মোট ৭৩ দশমিক ৮৭৯ বিলিয়ন ডলার

মুদ্রা : বলিভিয়ানো (বব)

জাতিসংঘের সদস্যপদ : ১৪ নভেম্বর ১৯৪৫।

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট

নিউজজি/এস দত্ত

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন