বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১, ১২ শ্রাবণ ১৪২৮ , ১৭ জিলহজ ১৪৪২

ফিচার
  >
মানচিত্র

অনিন্দ্য সুন্দর দেশ লাওস

নিউজজি ডেস্ক ১০ জুন , ২০২১, ১২:২৯:৩৩

  • ছবি: ইন্টারনেট

ঢাকা : কমিউনিস্ট শাসিত দেশ লাওস। এটি ইন্দোচীনের অন্তর্ভুক্ত। এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর অন্যতম এটি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কমিউনিস্ট সরকার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে এখনো দেশটিকে ঠিকভাবে খাপ খাওয়াতে পারেনি। বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি প্রতিবেশী বিশাল দেশ চীনেরও। কেন যেন আপন করে নেয়নি তাদের মাও জে দংয়ের দেশ চীন।

সাগর-মহাসাগেরর সাথে কোনো সংযোগ নেই অর্থাৎ স্থলবেষ্টিত দেশ লাওস। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ দেশটির উত্তর-পশ্চিমে মিয়ানমার ও চীন। পূর্বে ভিয়েতনাম, দক্ষিনে কম্বোডিয়া এবং পশ্চিমে থাইল্যান্ড। প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রভাবাধীনেই থেকেছে দেশটির ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়। এ জন্য লাওস তাদের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্কটে ভুগেছে। কম্বোডিয়া, বার্মা, ভিয়েতনাম, চীন এবং শ্যাম নামে পরিচিত থাইল্যান্ড এদের ওপর কর্তৃত্ব করেছে।

বর্তমানে লাওস নামের যে দেশটি তাদের আদি অধিবাসীরা মূলত দক্ষিন চীন থেকে আসে। একাদশ শতাব্দীর পর দেশের একটি অংশ খেমার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৩৪৫ সালে প্রথম দেশীয় সরকার কায়েম হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, দেশটির নাম ছিল তখন ‘ল্যান জেং’। এর ইংরেজি করলে দাঁড়ায় ‘ল্যান্ড অব মিলিয়ন এলিফ্যান্ট’। অর্থাৎ ল হাতির দেশ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ তখন বশ্যতা স্বীকার করেনি। দেশটির নামে (ল্যান জেং) রাজবংশ লাওসের ক্ষমতায়।

ল্যান জেং রাজবংশ বৌদ্ধইজমকে রাষ্ট্রীয় ধর্মের স্বীকৃতি দেয়। এতে করে খেমাররা তাদের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়। ল্যান জেং রাজা সেতাথিরাট ১৫৬৩ সালে ভিয়েনতিয়েনকে তাদের রাজধানী ঘোষণা করেন। তার আমল ল্যান জেং রাজবংশের স্বর্ণ যুগ। এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার পতন হলে বার্মা দেশটির কর্তৃত্ব কেড়ে নেয়। বার্মিজরা বেশি দিন টিকতে পারেনি। তবে মতার দ্বন্দ্বে সতের শ’ সালের দিকে লাওসের জনগণ তিনটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এগুলো ভিয়েতনাম, থাই ও চীনাদের প্রভাবাধীন রাজ্যে পরিণত হয়। ক্রমে ক্রমে থাই প্রভাব বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে ভিয়েতনামিরা থাইল্যান্ড আক্রমণ করে বসে।

এ নিয়ে দেশ দু’টির মধ্যে দীর্ঘ বিবাদ চলে। উনিশ শতকের শেষ দিকে থাইল্যান্ড নিজ দেশ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। এক চুক্তির মাধ্যমে তাদের প্রভাবাধীন অংশ ফ্রান্সের কাছে হস্তান্তর করে। ১৮৯৩ থেকে ১৯০৭ সালের মধ্যে এ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এক পর্যায়ে এটি ব্রিটিশ এবং ফ্রান্সের উপনিবেশের মধ্যে বাফার স্টেট হিসেবে কাজ করে। ফ্রান্স এটির রাজধানী পরিবর্তন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি দখল করে নেয় জাপান। অল্প কিছু দিন পর দেশটি স্বাধীনতা ঘোষণা করে। বেশি দিন লাগেনি ফ্রান্স দেশটির ওপর আবার কর্তৃত্ব্ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৫০ সালে লাওসকে স্বল্প স্বায়ত্তশাসনের আওতায় তাদের সাহায্যকারী দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। কার্যত ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত এর ওপর ফ্রান্সের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। এ সময় দেশটি ফ্রান্সের কাছ থেকে রাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা লাভ করে। জেনেভা চুক্তির আওতায় একই বছর দেশটি পুরো স্বাধীনতা পায়।

দেশটির ৬৯ শতাংশ মানুষ লাও সম্প্রদায়ের। তারা রাজনীতি ও আর্থ-সামাজিকভাবে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী। এরা যেহেতু দক্ষিন চীন থেকে আগত তাই চীনা ভাষার প্রভাব খুব বেশি। প্রায় ৮২ শতাংশ মানুষ চীনা প্রভাবিত লাও ভাষাতেই কথা বলে। বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন উপজাতির বাস রয়েছে দেশটিতে। এদের মধ্যে রয়েছে মং, ইয়াও, তিব্বত ও বার্মিজ ভাষার লোক। এদের বসবাস এলাকার বেশিরভাগই প্রত্যন্ত এবং বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে পার্বত্য এলাকায় এদের বাস। শহুরে জনতার সাথে মিশে গেছে কিছুসংখ্যক ভিয়েতনামি আর থাই জনগোষ্ঠী। দেশটিতে বৌদ্ধ ধর্ম ব্যাপক প্রচলিত। সংখ্যালঘু আর উপজাতীয় ধর্মবিশ্বাসীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক মোটেও ভালো নয়। রাজধানী ভিয়েনতিয়েনে কিছু খ্রিষ্টান ও মুসলিম রয়েছে। এখানে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারকদের তৎপরতাও লক্ষণীয়।

লাওস স্থলবেষ্টিত দেশ। পাহাড়ি এবড়োখেবড়ো ভূমি। এর বেশিরভাগ ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত। বনে রয়েছে ইন্দোচাইনিজ টাইগার, এশিয়াটিক এলিফ্যান্ট। এসব প্রাণীর একমাত্র আবাসস্থল লাওসের ঘন অরণ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো কিছু প্রাণী প্রজাতি আবিষ্কৃত হয়েছে লাওসে। সমতল ভূমির পরিমাণ খুব কম। উঁচু মালভূমি রয়েছে। মেকং নদী বয়ে চলেছে এঁকেবেঁকে। পশ্চিমাংশে বৃহৎ এলাকা এ নদীটি থাইল্যান্ডের সাথে সীমানা নির্ধারক হিসেবে বয়ে চলেছে।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ার দেশ লাওস। মৌসুমি বায়ুর প্রভাব রয়েছে। মে থেকে নভেম্বর বর্ষার মৌসুম। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল শুকনো আবহাওয়া বিরাজ করে। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী ঋতুগুলো হলো বর্ষা, শীত ও গ্রীষ্ম। দেশটির ভূমির ২১ শতাংশ জীববৈচিত্র্যের জন্য সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সংরক্ষিত এলাকাকে কেন্দ্র করে সরকারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে। গড়ে তোলা হবে পর্যটন স্পট। যার বাস্তবায়ন হলে এটি দণি এশিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। আফিম উৎপাদনের জন্য কুখ্যাত ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের’ চারটি দেশের অন্যতম লাওস। তবে ইদানীং আফিম উৎপাদনের হার কিছুটা কমেছে। 

পৃথিবীর অল্প যে কয়েকটি দেশ এখনো কমিউনিস্ট শাসন রয়েছে তার অন্যতম লাওস। তবে ১৯৮৬ সাল থেকে এ দেশটিতেও অর্থনৈতিক উদারীকরণের কার্যক্রম শুরু হয়। বিরাষ্ট্রীয়করণ এবং ব্যক্তি খাতের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হচ্ছে সেখানে। দেশটির অর্থনীতিতে একটি নীরব বিপ্লব ঘটেছে। ১৯৮৮ সাল থেকে দেশটি বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ধরে রেখেছে। তবে এ উন্নয়নের হার শহরকেন্দ্রিক। ভিয়েনতিয়েন, লুয়াং প্রাবাঙ্গসহ বড় বড় শহরগুলোতে রীতিমত অর্থনৈতিক বিপ্লবসাধিত হয়েছে।

দেশের প্রেসিডেন্ট চৌমালি সয়াসন। নির্বাচিত সংসদ কর্তৃক তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত। ক্ষমতাসীন লাও রেভ্যুলশনারি পার্টিরও প্রধান তিনি। এটিই একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল। অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের কোনো সুযোগ নেই।

দেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই ভঙ্গুর। কোনো রেল যোগাযোগই নেই। শহরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। গ্রামগুলো রয়ে গেছে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। মেঠোপথে যেতে হয় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। টেলিযোগাযোগের অবস্থাও তথৈবচ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ কম। কেবল শহরগুলোর জন্য বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পেরেছে সরকার।

শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নের জোয়ার বইলেও গ্রামের ওপর সামগ্রিক অর্থনীতি অনেকটা নির্ভরশীল। মোট জনশক্তির ৮০ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। যদিও মোট ভূমির ক্ষুদ্র একটি অংশ আবাদযোগ্য। মাত্র ৪ শতাংশ ভূমি চাষযোগ্য। আবার মোট ভূমির দশমিক ৩৪ শতাংশ আবাদ হয়। ধান উৎপাদন হয় এর ৮০ শতাংশে। ভাত তাদের প্রধান খাদ্য। এটি সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ধান উৎপাদনের সাথে নানা পালা-পার্বন ও উৎসব আমেজের ব্যাপার রয়েছে লাওসের মানুষের জীবনে।

লাওসের সেনাবাহিনী ‘লাও পিপলস আর্মি’ নামে পরিচিত। অল্প জনসংখ্যা আর দুর্বল অর্থনীতির দেশ হলেও এর সামরিক বাহিনীর আকার ছোট নয়। বিমান, নৌ আর স্থলবাহিনী নিয়ে এর সদস্যসংখ্যা ১৩ লাখ ৬৫ হাজার। অবাক হওয়ার কিছু নেই! পুরুষদের ১৫-৪৯ বছর বয়স পর্যন্ত সামরিক সদস্য হওয়া অনেকটা বাধ্যতামূলক। তবে যুদ্ধের উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত লাখ। বছরে প্রায় ৬৪ হাজার মানুষ সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। বাৎসরিক এ খাতে সরকারের ব্যয় প্রায় সাড়ে ৫ কোটি ডলার। দেশটির সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে রাসায়নিক জীবাণু অস্ত্র পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

ফ্রান্সের শাসনে থাকার সময় তারা দেশটিতে একটি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা পদ্ধতির প্রচলন করে। তা এখনো বহাল রয়েছে। এ শিক্ষাব্যবস্থায় সবার সমানভাবে অনুপ্রবেশের সুযোগ নেই। বিশেষ করে অভিজাত শ্রেণীকে শিক্ষিত করাই এর লক্ষ্য। তাই শিক্ষার হার অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে দেশটিতে।

দেশটির সংবাদমাধ্যম পুরোপুরি সরকার নিয়ন্ত্রিত। এর মধ্যে ইংরেজি ও ফ্রেন্স ভাষার দু’টি পত্রিকাও রয়েছে। বিদেশীদের জন্য ইন্টারনেট ক্যাফে রয়েছে তবে দেশীয়দের ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। নিজস্ব কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেল নেই। থাইল্যান্ড থেকে সম্প্রচারিত স্যাটেলাইট চ্যানেল তাদের বিনোদন ও সংবাদের প্রধান মাধ্যম।

এক নজরে লাওস

দেশের নাম : লাও পিপলস ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক

জনসংখ্যা : ৫৮ লাখ

রাজধানী : ভিয়েনতিয়েন

আয়তন : ৯১ হাজার ৪০০ বর্গমাইল

প্রধান ভাষা : লাও, ফ্রেন্স

প্রধান ধর্ম : বৌদ্ধ

গড় আয়ু : ৫৩ বছর (পুরুষ), ৫৬ বছর (মহিলা)

মুদ্রা : নিউ কিপ

প্রধান রফতানি : বস্ত্র, কাঠ, কফি

মাথাপিছু আয় : ৪৪০ ডলার

ছবি ও তথ্য - ইন্টারনেট 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers