সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮ , ১৮ সফর ১৪৪৩

ফিচার
  >
মানচিত্র

হাজার বছর ধরে কান্নাপ্রিয় দেশ ইয়েমেন

নিউজজি ডেস্ক ৩ জুন , ২০২০, ০০:৪৪:৩৪

3K
  • হাজার বছর ধরে কান্নাপ্রিয় দেশ ইয়েমেন

ঢাকা : ৩ হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার জাগ্রত নিদর্শনের দেশ ইয়েমেন। লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা প্রাচীন এ জনপদ সমৃদ্ধির সড়ক থেকে বিচ্যুত হয়ে আজ আরবের সবচেয়ে দরিদ্র দেশে পরিণত। সুউচ্চ পর্বতমালা ইয়েমেনের উপকূলীয় সমভূমিকে অভ্যন্তরের জনবিরল মরুভূমি থেকে পৃথক করেছে। 

কারণ ইয়েমেন ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন বাণিজ্য কেন্দ্র এবং এ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধিশালী দেশ। বাণিজ্য এবং কৌশলগত ভৌগোলিক কারণে এ অঞ্চলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল পার্সিয়ান, অটোমান, ব্রিটিশ। আল্লাহর নবী হজরত নুহ (আ.) এর ছেলে শ্যাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইয়েমেনের রাজধানী সানা নগরী। শুধু তাই নয়; ইয়েমেনের বর্তমান ভূখণ্ড একসময় হজরত দাউদ ও হজরত সোলায়মানের রাজত্বের অংশ ছিল। এ জনপদে অনেক নবী-রাসুলের আবির্ভাব যেমন হয়েছে, তেমনিভাবে আল্লাহর ঘর কাবা ধ্বংস করতে উদ্যত আবরাহা তার হস্তিবাহিনী নিয়ে রওনা দিয়েছিল এ সানা থেকে। তার সেই ফিল রোডটি এখনও রয়েছে। সেই গির্জার স্মৃতিও খুঁজে পাওয়া যায় এখানে যেটি নির্মাণ করে পবিত্র কাবার পরিবর্তে এ গির্জাকে তীর্থ কেন্দ্র বানাতে চেয়েছিল আবরাহা। 

বর্তমানের ইয়েমেন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস দেখতে হলে ফিরে যেতে হবে ৭০০ শতকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। তখন ইসলামের প্রসার চলছে দিকে দিকে। খলিফা ইসলাম প্রচারের জন্য একের পর এক রাজ্য জয় করে চলেছেন। রাজ্য জয় হলে ধর্মের সঙ্গে পাওয়া যায় প্রভাব, প্রতিপত্তি, রাজনীতি ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ। এরপরে ১১ শতকে ইয়েমেন সরাসরি খলিফার শাসনে চলে আসে। খলিফার শাসন আমলেই ইয়েমেন অটোমান সাম্রাজ্যের আক্রমণের শিকার হয়, দখল করে নেয় দেশটির দক্ষিণাঞ্চল। রুটির মতো ভাগ হয়ে যাওয়া দেশটির উত্তরাঞ্চলের দখল নেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। ১৯১৮ সালে অটোমান শাসকদের কবল থেকে মুক্ত হলেও ইয়েমেন ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের কলোনি হিসেবে পরাধীনতার ঘানি ও গ্লানি বহন করেছে। বিংশ শতাব্দীর বেশিরভাগ সময় ইয়েমেন দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। উত্তরে ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্র (ওয়াইএআর) এবং দক্ষিণে পিপলস ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব ইয়েমেন (পিডিআরওয়াই)। ১৯৯০ সালে দুই দেশ একত্রিত হয়ে রিপাবলিক অব ইয়েমেন বা ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র গঠন করে। ১৯৯০ সালের ২২ মে ইয়েমেনের একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন। এইদিন দুই ইয়েমেন মনে করে সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একত্রিতভাবে একটি অভিন্ন রাষ্ট্র গঠন করার এখনই সময়। অতি সম্প্রতি ইয়েমেনের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ হয় তাতে সশস্ত্র সমর্থন দেয় হুথি শিয়ারা। স্বভাবতই ইরান শিয়াদের প্রতি সমর্থন জানায়। এই অজুহাতে সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশগুলো হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। 

দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশ ইয়েমেনের অবস্থান আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ প্রান্তজুড়ে। ৫ লাখ ২৮ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দেশটির জনসংখ্যা ২ কোটি ৪০ লাখ। জনসংখ্যার শতকরা ৯৯ ভাগ মুসলিম এবং বাকি এক ভাগ অমুসলিম। মুসলিমদের মধ্যে শতকরা ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ সুন্নি এবং ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ শিয়া। এ দেশের সীমান্তে রয়েছে উত্তরে সৌদি আরব, পশ্চিমে লোহিত সাগর, দক্ষিণে এডেন উপসাগর ও আরব সাগর এবং পূর্বে ওমান। 

ইয়েমেনের রাজধানী সানা হলেও ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে নগরীটি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ কারণে ইয়েমেনের রাজধানী দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর এডেনে স্থানান্তর করা হয়েছে। ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি আরবের ১১০০ মাইলের সীমান্ত আছে। ঘটনা ও বাস্তবতায় আজ সৌদি আরব কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মিসর, মরক্কো, জর্ডান, সুদান, সেনেগালকে সঙ্গে নিয়ে কৌশলগত মৈত্রী গড়ে তোলে। মৈত্রীর সমর্থনে থাকল আমেরিকা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। ২০১৫ সালের মার্চ থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী অবস্থানে ক্রমাগত বিমান হামলা চালানো শুরু করে। এখন সৌদি আরব ইয়েমেনে যে বোমা ফেলছে, তার গায়ে লেখা মেইড-ইন আমেরিকা, আরবের সামরিক বাহিনী যে বিমানে বোমা বহন করে হুতিদের মাথায় আর বাসস্থানে ফেলে দিয়েছে, সে বিমানগুলো কেনা হয়েছে ইংল্যান্ড থেকে, যে পাইলটরা হুতিদের মৃত্যু উপহার দিয়ে আসে, তারা আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসে। 

এ যুদ্ধাবস্থার দরুন দেশটিতে পণ্যবাহী জাহাজ প্রবেশের ওপর সৌদি আরবের বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে সেখানে খাদ্য-সাহায্য সরবরাহের সুযোগ খুব সীমিত। এ অবস্থায় ইয়েমেন ধীরে ধীরে দুর্ভিক্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে আরেকটি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা অক্সফ্যাম। জাতিসংঘের বরাত দিয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২১ মাসের বেশি সময় ধরে চলা ইয়েমেন যুদ্ধে ১০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে। 

দুর্ভিক্ষের প্রান্তসীমায় দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের অর্থনীতির মেরুদণ্ড মোটামুটি ধুলায় মিশে গেছে। হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র না থাকার পরও অনেক বেসামরিক বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্রিজ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে। এমনও দেখা গেছে, বিয়ে বাড়ির বরযাত্রার লাইনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে মারা গেছে হতভাগা মানুষ। লাখ লাখ মানুষ সামান্য দুই মুঠ খাবারের জন্য হাহাকার করছে, ধ্বংসপ্রাপ্ত হাসপাতালে; এমনকি রাস্তাঘাটে পড়ে আছে অপুষ্টিতে ভোগা শিশু। নেই বিশুদ্ধ খাবার পানি, ফলে ছড়িয়ে পড়ছে মহামারীরূপে কলেরা। ইয়েমেনের ইতিহাসে বলে যে ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্র সাম্রাজ্যবাদের গোরস্থান। 

১৯৬০ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের ইয়েমেনের শিয়া ইমামকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ করার পরই নিজেকে দেখতে পান হাতির মতো সমস্যার কাদায় আটকে গেছেন। ইয়েমেনের ২ কোটি ২৪ লাখ নাগরিকের মধ্যে ২ কোটি ১২ লাখ মানুষেরই জরুরি ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন। ৩ লাখ ৭০ হাজার শিশুসহ অন্তত ২০ লাখ মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছেন। তিনি বলেন, ইয়েমেনে যুদ্ধরত পক্ষগুলো যদি অবিলম্বে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরে ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশটি যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনবে। সূত্র : ইন্টারনেট 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers