সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮ , ১৮ সফর ১৪৪৩

ফিচার
  >
মানচিত্র

সুন্দর এক জটিল ভূখণ্ডের নাম তাইওয়ান

নিউজজি ডেস্ক ৭ নভেম্বর , ২০১৯, ১৩:০১:৪৪

15K
  • সুন্দর এক জটিল ভূখণ্ডের নাম তাইওয়ান

দুই কোটি ত্রিশ লক্ষ লোকের বাস তাইওয়ানে। বহির্বিশ্বের সাধারণ মানুষেরা জানে তাইওয়ান এক আলাদা দেশ। অথচ প্রশ্নটা বিশ্ব রাজনীতির এক জটিল অংশ। তাইওয়ান কি চীনের অংশ ? নাকি চীন থেকে আলাদা? এ নিয়ে সংশয় আছে অনেকের মধ্যে। এমনকি তাইওয়ানকে কি নামে ডাকা হবে তা নিয়েও। আজকের মানচিত্রের আয়োজন তাইওয়ান নিয়েই। 

বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসেছে – 

চীন আর তাইওয়ানের নেতারা দীর্ঘ ছয় দশক পর এই প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসার পর এ সব প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। খুব সহজ ভাবে বললে, চীন মনে করে তাইওয়ান তাদের দেশেরই অংশ। এটি চীন থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটি প্রদেশ। যেটি ভবিষ্যতে কোন একদিন চীনের সঙ্গে বিলুপ্ত হবে। তাইওয়ান নিজেকে কিভাবে দেখে সেটার উত্তর অবশ্য এতটা সরল নয়। সেখানে কোন কোন দল এবং জনগণের একটি অংশ তাইওয়ানকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে দেখতে চান। কেউ কেউ চীনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পক্ষে। আর জনগণের একটা বিরাট অংশ এখনো মনস্থির করে উঠতে পারেননি। তারা বরং তাইওয়ান এখন যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থাতেই থেকে যাওয়ার পক্ষে। অর্থাৎ চীনেরও অংশ নয়, আবার চীন থেকে আলাদাও নয়। 

চীনের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন তাইওয়ান মূলত দক্ষিণ চীন সমূদ্রের একটি দ্বীপ। এক সময় ওলন্দাজ কলোনি ছিল। তবে ১৬৮৩ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত চীনের রাজারাই শাসন করেছে তাইওয়ান। এরপর জাপানীরা দখল করেছে এই দ্বীপ। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়া হয় চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বাধীন চীনা সরকারের হাতে তুলে দেয়া হয় দ্বীপটি। কিন্তু চীনে মাও জেদং এর নেতৃত্বে কমিউনিষ্ট বাহিনির সঙ্গে যুদ্ধে হারতে থাকে চিয়াং কাইশেকের সরকার। চীনের বেশিরভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ হারায় তারা। এরপর চিয়াং কাইশেক আর তার কুওমিনটাং সরকারের লোকজন তখন পালিয়ে যায় তাইওয়ানে। সেখানে তারা ‘রিপাবলিক অব চায়না’ নামে এক সরকার গঠন করে। নিজেদেরকে সমগ্র চীনের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার বলেও দাবি করে তারা। কোন একদিন কমিউনিষ্টদের কাছ থেকে আবার পুরো চীনের নিয়ন্ত্রণ তারা নেবে, এমনটাই ছিল তাদের পরিকল্পনা। বহুদিন পর্যন্ত জাতিসংঘ থেকে বিশ্বের অনেক দেশ চিয়াং কাইশেকের সরকারকেই চীনের সত্যিকারের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আজ অনেকের কাছে শুনতে অবাক লাগতে পারে, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কিন্তু তাইওয়ানের সরকারই চীনের প্রতিনিধিত্ব করেছে। 

চিয়াং কাইশেক কিন্তু ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ বেইজিং এর সরকারকেই চীনের আসল সরকার বলে স্বীকৃতি দিল। তারপর থেকে একে একে বিশ্বের প্রায় সব দেশই বেইজিং এর পক্ষ নিল, এবং তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কমতে থাকলো। ১৯৮০র দশক পর্যন্ত চীন আর তাইওয়ানের মধ্যে চলেছে তীব্র বাকযুদ্ধ। কিন্তু এরপর সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ‘এক দেশ, দুই পদ্ধতি’ নামে চীন এক প্রস্তাব দেয়। যেখানে তাইওয়ান মূল চীনে বিলুপ্ত হবে, কিন্তু তাদের স্বায়ত্বশাসন দেয়া হবে। কিন্তু তাইওয়ান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। অবশ্য এর মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকেনি। ২০০০ সালে তাইওয়ানের নুতন প্রেসিডেন্ট হন চেন শুই বিয়ান। ২০০৪ সালে তিনি ঘোষণা দেন যে তাইওয়ান চীন থেকে আলাদা হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়। তার এই অবস্থান চীনকে ভীষণ রুষ্ট করে। ২০০৫ সালে চীন তড়িঘড়ি করে এক আইন পাশ করে। যাতে বলা হয়, তাইওয়ান যদি চীন থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করে, সেটা ঠেকাতে চীন প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করবে। তাইওয়ানের অর্থনীতি এখন চীনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে জনসংখ্যার একটা বড় অংশ এখন আর স্বাধীনতাকে কোন বাস্তবসম্মত বিকল্প বলে ভাবে না। তাইওয়ানের বড় দুই দলের মধ্যে ‘ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি’ এখনো অবশ্য স্বাধীনতার পক্ষে। অন্যদিকে কুওমিনটাং পার্টি (কেএমটি) চায় মূল চীনের সঙ্গে একত্রীকরণ।

তাইওয়ান পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপ,যা তাইওয়ান প্রণালীর পূর্বে চীনা মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্হিত। তাইওয়ান হচ্ছে ইউরোপ এশিয়া প্লেট ভূগঠনপ্রণালী দ্বারা গঠিত এবং ফিলিপাইন এর দক্ষিণে অবস্হিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে দ্বীপপুঞ্জসমূহ প্রজাতন্ত্রী চীনের অধীনে হ্য়। সাধারণত প্রজাতন্ত্রী চীন-শাসিত এলাকা বোঝাতেও "তাইওয়ান" ব্যবহৃত হয়। তাইওয়ান দ্বীপের মূল ভূখণ্ড ফুরমোজা নামেও পরিচিত যা পূর্ব এশিয়ার চীনা মূল-ভূখন্ড তীরবর্তী অঞ্চল এবং জাপানের মূল-ভূখন্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। জাপানের রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জের ঠিক পশ্চিমেই তাইওয়ান দ্বীপের অবস্থান। এর পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণে দক্ষিণ চীন সাগর ও লুজন খাড়ি, পশ্চিমে তাইওয়ান খাড়ি এবং পূর্বে পূর্ব চীন সাগর অবস্থিত। দ্বীপটি ৩৯৪ কিলোমিটার (২৪৫ মাইল) দীর্ঘ এবং ১৪৪ কিলোমিটার (৮৯ মাইল) প্রশস্ত। এখানে কাড়া পর্বত ও ট্রপিকাল বন রয়েছে।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ান সেই দেশ, যেখানে বেড়াতে গেলে আপনি দেখতে পবেন আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর অনন্য সব দৃষ্টান্ত। শুরুতেই যাবেই তাইপেই। এটা মূল শহর। বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন তাইপেই ১০১ এখানে অবস্থিত। ১০১ তলা দালানটি একটি মূর্তিমান বিস্ময়। দালানের স্থাপত্য ধরণ, প্রকৌশলবিদ্যার প্রয়োগ অবাক করে দেবে আপনাকে। আর এর ছাদ থেকে পুরো শহর দেখার সুযোগ মিস করবেন না কোনভাবেই।

চাইনিজ চিত্রকলার ভান্ডারের সাথে পরিচিত হতে চান? অবশ্যই যাবেন ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামে এখানে বিশ্বের চাইনিজ শিল্পকলার সবচেয়ে বেশী সংগ্রহ রয়েছে। এই সংগ্রহশালাটি তৈরি করেছেন চীনের সম্রাটেরা হাজারো বছরের ধারায়। সাত  লাখ ভিন্ন ভিন্ন সৃষ্টিকর্ম রয়েছে এখানে। এই সম্পদ অমূল্য।

পাহাড়ের উপর দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা সর্পিল রাস্তা। এ রাস্তায় একবার ভ্রমণ করলে যে কোন রোমাঞ্চকর যান্ত্রিক অভিজ্ঞতা ফিকে লাগবে আপনার চোখে। পথ চলে গেছে পাহাড় বেয়ে, যেখানে খাদ, নদী বা ঝর্ণা সেখানে গড়ে উঠেছে ব্রীজ। চোখ ধাঁধানো সুন্দরের মাঝে এই অভিযাত্রা আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে হয়ে থাকবে চিরস্মরণীয়। জায়গাটির নাম তরোকো জর্জ।

যেতে পারেন কেন্টিং ন্যাশনাল পার্কে। তাইওয়ানের ক্রান্তীয় দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল প্রাকৃতিক এলাকা নিয়ে এই ন্যাশনাল পার্ক গড়ে উঠছে। সান বাথ এবং ডাইভিং এর জন্য জনপ্রিয় এই পর্যটন এলাকাটি। সবুজে সবুজে ছেয়ে আছে এখানকার দীর্ঘ এলাকা, সাদা বালির বিচ, নীল জল সব মিলিয়ে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ যা মনকে প্রশান্ত করে, দেয় অনাবিল আনন্দ।

মন্দির এবং টি হাউজ এর জন্য বিখ্যাত তাইনান শহরটি তাইওয়ানের ৪র্থ বৃহৎ শহর। ঐতিহ্য এবং ইতিহাস এই শহরকে করেছে অনন্য। দিনের বেলা তো বটেই রাতের তাইনান আপনার জন্য অপেক্ষা করছে ভিন্ন সৌন্দর্য্য নিয়ে। শহর যেন ঘুমায় না এখানে। ঘুরে বেড়াতে পারেন চা বাগানে, স্বাদ নিতে পারেন নানান রকম চায়ের।

তবে আদৌ কি আপনি মন চাইলেই যেতে পারছেন তাইওয়ান? তাহলে এএফপির খবরে চোখ বুলিয়ে নিন। চীন তাদের নাগরিকদের ওপর ব্যক্তিগতভাবে তাইওয়ান সফরে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাইওয়ানের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অবনতির এর মধ্যেই চীন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে। ইং ওয়েনের দল তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করার পর থেকেই এই টানাপড়েন। তাইওয়ানকে শায়েস্তা করতে চীন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এরই মধ্যে দেশটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বন্ধ করেছে, সামরিক মহড়া বাড়ানোর পাশাপাশি তাইওয়ানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।

সে যাই হোক, সুন্দরের চেয়েও সুন্দর যেখানে, নিষেধাজ্ঞা সেখানে থাকবেই। এত নিষেধাজ্ঞার পরেও দুর্গম সব জায়গা দাপিয়ে বেড়ানোই পর্যটকের কাজ। তাইওয়ান ঘুরে বেড়াতে সমস্যা হবে না আশা রাখা যায়। 


 

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers