সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮ , ১৮ সফর ১৪৪৩

ফিচার
  >
মানচিত্র

দাস বিপ্লবে সফল একমাত্র দেশ হাইতি

নিউজজি ডেস্ক ৩১ জুলাই , ২০১৯, ১৩:২৩:৪০

9K
  • দাস বিপ্লবে সফল একমাত্র দেশ হাইতি

দেশটা চালাতেন টাইনো আদিবাসীরা। টাইনোরা পুরো হিস্পানোলিয়া দ্বীপের নাম দিয়েছিল ল্যান্ড অব হাই মাউন্টেন্স। আর এখানেই সেই দেশ। মানে কখনও বাইরের শক্তির নির্যাতন, কখনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়। জীবন জুড়ে যুদ্ধ সংগ্রামে থাকা মানুষগুলোর বসবাস অপূর্ব সব পাহাড় আর নীল সমুদ্রের মাঝখানে। হাইতি আজ আমাদের মানচিত্রের আয়োজন। 

হাইতি পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের স্বাধীন দ্বীপরাষ্ট্র। এর সরকারি নাম হাইতি প্রজাতন্ত্র । ক্যারিবীয় সাগরের হিস্পানিওলা দ্বীপের পশ্চিম এক-তৃতীয়াংশ এলাকা নিয়ে রাষ্ট্রটি গঠিত। দ্বীপের বাকী অংশে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র অবস্থিত। ১৮০৪ সালে হাইতি লাতিন আমেরিকার প্রথম স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এটিই দাসদের সফল বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট একমাত্র রাষ্ট্র। হাইতি প্রথমে স্পেনীয় ও পরে ফরাসি উপনিবেশ ছিল। হাইতির সংখ্যাগরিষ্ঠ আফ্রিকান দাসেরা ফরাসি ঔপনিবেশিকদের উৎখাত করলে হাইতি স্বাধীনতা লাভ করে। পোর্ত-ও-প্রাঁস দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। হাইতির আয়তন ২৭৭৫০ বর্গকিলোমিটার।

 

১৪৯২ সালের ৫ ডিসেম্বর । ইউরোপের পশ্চিমে, আটলান্টিক মহাসাগরের এক দ্বীপে স্প্যানিশ এক জাহাজ থেকে একজন উৎসুক অভিযাত্রী ও ভবিষ্যতের সব সাম্রাজ্যবাদীদের পথপ্রদর্শক পা রাখলেন। আদিবাসী তিয়ানো ও আরাওয়াকা জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এই দ্বীপটি তার বেশ পছন্দ হয়ে গেলো। এর নাম তিনি রাখলেন ‘লা ইসলা স্পেনোলা’, যার অর্থ ‘স্পেনীয় দ্বীপ’। পরে ল্যাটিনে যা ‘হিস্পেনিওলা’ নামে পরিচিত হয়ে উঠবে। এই অভিযাত্রী দ্বীপটিতে ‘লা নেভিদাদ’ নামে একটি উপনিবেশ গড়ে তুললেন। সমুদ্রযাত্রায় বিধ্বস্ত জাহাজের অবশেষ দিয়েই দ্বীপটির এই প্রথম ইউরোপীয় সেটলমেন্ট নির্মিত হয়েছিলো। এই অভিযাত্রী স্পেনে ফিরে পুনরায় ১৮৯৩ সালে এসে দেখতে পান, এই সেটলমেন্ট বিধ্বস্ত এবং এর ৩৯ অধিবাসী হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। তিনি আগের অঞ্চল থেকে কিছুটা পূর্বে ‘লা ইসাবেলা’ অঞ্চলে সেটলমেন্ট সরিয়ে নেন। ১৪৯৬ সালে ‘সান্তো দোমিঙ্গো’ নামক স্থানে আলোচ্য উপনিবেশের কেন্দ্র স্থাপিত হলো। এই অভিযাত্রীর নাম ক্রিস্টোফার কলম্বাস। ইউরোপের কাছে সম্পূর্ণ নতুন ও অচেনা এই ভূখণ্ডে তার আগমন পৃথিবীর ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিলো। দ্বীপটিতে বহিরাগত ইউরোপীয়দের আগমনে নতুন ও অপ্রতিরোধ্য রোগে আদিবাসী আরাওয়াকা জনগোষ্ঠী প্রায় শূন্যে মিলিয়ে গেলো। তিয়ানো জনগোষ্ঠীর অল্প কিছু মানুষ প্রাণ নিয়ে পালাতে সক্ষম হলো। উল্লেখ্য, তিয়ানো জনগোষ্ঠী দ্বীপটিকে ‘আইতি’ সম্বোধন করতো, তা থেকেই আজকের ‘হাইতি’ নামটির উদ্ভব।

সমগ্র ইতিহাস জুড়ে হাইতির জনগণ দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে আছে ক্ষুদ্র একটি শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণী, যারা বেশির ভাগ সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী। অন্যদিকে আছে বিশাল নিম্নবিত্ত শ্রেণী যাদের কোন ক্ষমতা নেই। বর্তমানে হাইতি পশ্চিম গোলার্ধের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ। অনেক হাইতীয় দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।

হাইতির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ইতিহাস দীর্ঘ। দেশটিতে অনেকগুলি স্বৈরশাসক শাসন করেছেন। এদের মধ্যে ফ্রঁসোয়া দুভালিয়ে-র নাম উল্লেখযোগ্য। ২১শ শতকের প্রারম্ভে এসে হাইতি একটি গ্রহণযোগ্য সরকার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা উন্নয়নের চেষ্টা করছে।

হাইতির সাথে বাংলাদেশের দারুণ সুসম্পর্ক। হাইতির শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সর্বদাই সক্রিয়। ২০০৪ সালে প্রথমবারের মত ইউনাইটেড ন্যাশনস স্ট্যাবিলাইজেশন মিশন ইন হাইতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা হাইতিতে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা শুরু করে। ২০১০ সালে হাইতি প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে সকল নারী পুলিশ কনটিংমেন্ট লাভ করে। ২০১২ সালে বাংলাদেশি পুলিশ ইউনিটের কর্মকর্তারা হাইতির শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাদের অবদানের জন্য জাতিসংঘ মেডেল লাভ করে। হাইতিতে কিছু বাংলাদেশ-ভিত্তিক এনজিও কাজ করে চলেছে। এর মধ্যে সবচেয় পরিচিত হল ব্র্যাক যা কিনা ক্ষুদ্রঋণ, কৃষিজ উন্নয়ন, নারী এবং কর্মসংস্থান প্রভৃতি বিষয়ে কাজ করে চলেছে। বাংলাদেশ ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়া ডিজিজ রিসার্চ এর অভিজ্ঞদেরকে হাইতিতে পাঠাচ্ছে, সেখানে মহামারি আকারে কলেরা ছড়িয়ে যাবার কারণ ও তা হতে মুক্তির উপায় খুঁজতে। ২০১০ সালে ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশ সরকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি মেডিকেল টীমকে হাইতি পাঠায়। এ দলে মোট ২০ জন চিকিৎসক এবং ১০ জন স্বাস্থ্য প্রশিক্ষক ছিলেন।

এত অসুখী জীবন যাপনের দেশেও সারা বছর পর্যটকের ভিড় লেগে থাকে। এর কারণ, অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দেশের পুরোটাই সুন্দর। তবু কিছু জায়গা আছে, যা বিশ্বব্যাপী খ্যাত। 

সিতাডেল লাফেরিয়্যা দূর্গ। এটির অবস্থান পাহাড়ের চূড়ায়। চারদিকে পাহাড়ের সবুজ, আকাশের মেঘ আর তার মাঝে প্রাচীন এই দূর্গটি এক মোহনীয় আবহের তৈরি করে। এটি নির্মাণের কারণ ছিল ফরাসী আগ্রাসন থেকে হাইতি অঞ্চলকে রক্ষা করা। হাইতির সেই সময়ের শক্তির পরিচায়ক দূর্গটি এখন হাজারো পর্যটকের আকর্ষণস্থলে পরিণত হয়েছে। রাতে দূর্গের আলোকসজ্জা ভিন্নভাবে আকর্ষণ করবে আপনাকে। এই দূর্গ ভ্রমণ একইসাথে আপনাকে ইতিহাস, রাজনীতি, প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। সাথে দেবে প্রকৃতির অপার শান্তি।

হাইতির জ্যাকমেল পাহাড়ের একটি জলপ্রপাতের নাম বাসিন ব্লিউ। প্রাকৃতিক দৃশ্যে পরিপূর্ণ অপূর্ব একটি ট্রেইল ধরে আপনি পৌছে যাবেন বাসিন ব্লিউতে। সেখানে কাটিয়ে আসতে পারেন চমৎকার একটি দিন। জলপ্রপাতের জলধারা তৈরি করেছে একটি একটি ছোট্ট পুকুর। টারকুইশ নীল রঙ সেই পুকুরের। তার মাঝে সাঁতার কাটা, ভেসে বেড়ানোসহ সবই করতে পারবেন আপনি। জায়গাটি খুবই নিরাপদ। তাই নিশ্চিন্তে উপভোগ করতে পারবেন সবটুকু সৌন্দর্য্য, যেভাবে আপনি চান সেভাবেই।

ক্যাথেড্রাল নর্টে ডেম ডি কেপ হাইতিয়ান । ক্যাথলিক এই ক্যাথেড্রালটির অবস্থান কেপ হাইতিয়ানে। সুন্দর এবং শান্তিময় একটি জায়গা এটি। কলোনিয়ান শহরটি ঘুরে এসে বিশ্রাম নিতে পারেন এখানে। চার্চের সামনে ছোট্ট পার্কটিও প্রশান্তি দেবে আপনাকে। দালানটির সাদা দেয়াল যে বহু বছরের ইতিহাস তুলে ধরে। ঝকঝকে শান্তিময় চার্চটির নির্মাণশৈলীও প্রশংসার দাবি রাখে। ভেতরে এবং বাইরে উভয়দিকে চমৎকার কারুকার্য এবং সার্বিক কাঠামো যে কোন পর্যটককে বাধ্য করে একবার থমকে দাঁড়াতে।

লাবাদি একটি বেসরকারি বন্দর। এর মালিক রয়াল ক্যারাবিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ক্রুজ কোম্পানি। সানন্দে এক সপ্তাহের ট্যুর পরিকল্পনা করে  বেড়িয়ে আসতে পারেন এখানে। শুভ্র বালির বিচ, স্ফটিক স্বচ্ছ পানি এই এলাকাকে করেছে মনোমুগ্ধকর। সমুদ্রকে উপভোগ করার সমস্ত আয়োজনই রয়েছে এখানে। বিশ্রাম নিতে পারবেন, ঘুরে বেড়াতে পারবেন, শপিং করতে পারবেন স্থানীয় নানান দ্রব্যাদি। আর নীল সমুদ্রে সাঁতরে বেড়ানো, ডাইভিং, প্যারাগ্লাইডিং তো থাকছেই।

রাজার প্রাসাদ। রাজা হেনরি ক্রিসটোফের প্রাসাদ ছিল এটি। কথিত আছে তিনি দাস থেকে রাজা হয়েছিলেন। ১৮৪২ সাথে ভূমিকম্পে প্রাসাদটি ধ্বংস হয়ে যায় কিছুটা। ঐতিহাসিক ভবনটি প্রাচীন সৌন্দর্য এবং জ্ঞানের ভান্ডার। একে প্রায়ই তুলনা করা হয় ফ্রান্সের ভার্সাইলিস প্রাসাদের সাথে। প্রাচীন এই ভবনটির বিস্তৃত সিঁড়ি শুরুতেই মুগ্ধ অভিভাদন জানাবে আপনাকে। এরপর এর বিশাল জানালা, অভ্যন্তরীণ সজ্জা, ভবনের সামনে বিস্তৃত বাগান সবকিছুই আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেবে রাজার রুচিবোধের সাথে। প্রাসদটির সামনেই রয়েছে বড় একটি ফোয়ারা। আর স্থির মূর্তিগুলো যেন প্রাসাদকে পাহারা দিতে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। 

এক নজরে –  

রাজধানী- পর্তোপ্রাঁস

সরকারি ভাষা- ফরাসি, হাইতীয় ক্রেওল

জাতীয়তাসূচক বিশেষণ-হাইতিয়ান 

সরকার- রিপাবলিক 

মাথা পিছু আয় - ৭৬১ ইউএস ডলার। 

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers