সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮ , ১৮ সফর ১৪৪৩

ফিচার
  >
মানচিত্র

ভূতুড়ে তবুও নিরাপদ গন্তব্য জিম্বাবুয়ে

নিউজজি ডেস্ক ২০ জুলাই , ২০১৯, ১২:৪৫:১২

9K
  • ভূতুড়ে তবুও নিরাপদ গন্তব্য জিম্বাবুয়ে

রানওয়েতে বিমানের চাকার শক্ত কামড়, তারপর নামবেন, গা ছমছম বিমানবন্দর। মনে হবে এ কেমন দেশে পা রাখলেন, কোথাও কোনও মানুষ নেই। মানে পৃথিবীর সবচেয়ে ভুতুড়ে বিমানবন্দরে নেমেছেন আপনি। তবুও আফ্রিকার সবচেয়ে নিরাপদ গন্তব্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে জিম্বাবুয়ে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য উদ্যান, প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ ও ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত -সব মিলিয়ে জিম্বাবুয়ে বেড়াতে যাওয়ার জন্য খুবই আকর্ষণীয়। তবে যাবার আগে এদেশ সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক। আমাদের মানচিত্র বিভাবগের আজকের আয়োজন- জিম্বাবুয়ে। 

জিম্বাবুয়ে একটি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। জিম্বাবুয়ের ভূ-প্রকৃতি মরু এবং সাভানা তৃণভূমি নিয়ে গঠিত। দেশটির অধিকাংশ এলাকা একটি মালভূমির উপর অবস্থিত। উত্তরে জাম্বেসি উপত্যকা এবং দক্ষিণে লিম্পোপো উপত্যকা। জিম্বাবুয়ের জলবায়ু মূলত উপক্রান্তীয়।

জিম্বাবুয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ অংশে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। দেশটি এর দক্ষিণ-পূর্ব অংশে অবস্থিত ১৪শ শতকে পাথরে নির্মিত মহান জিম্বাবুয়ে শহরের নামে নামকরণ করা হয়েছে। জিম্বাবুয়ের জনগণকে দুইটি প্রধান জাতিগত ও ভাষাগত দলে ভাগ করা যায় নদেবেলে ও শোনা ভাষা। তবে ইংরেজি ও আরবি ভাষাও প্রচলিত আছে। নদেবেলেরা প্রধানত দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে বাস করে। বাণিজ্যিক খামারপ্রধান জেলার কেন্দ্রে অবস্থিত শহর হারারেই এই দেশের রাজধানী। যার নাম ১৯৮২-এর আগপর্যন্ত সালিশ্বুরি ছিল, এটি দেশটির প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র ও সবচেয়ে জনবহুল শহর, ২০০৯ সালে যার আনুমানিক জনসংখ্যা ধরা হয় ১৬,০৬,০০০ এবং মহানগর এলাকায় ২৮,০০,০০০ (২৮ লাখ)। প্রশাসনিকভাবে হারারে হারারে প্রদেশ নামের একটি প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত শহর।

প্রায় দুই হাজার বছর ধরে এদেশে লোকজন বসবাস করছে। বর্তমান জিম্বাবুয়ে এলাকাটি অতীতে একাধিক বৃহত্তর আফ্রিকান রাজত্বের কেন্দ্র ছিল, যাদের মধ্যে আছে মহান জিম্বাবুয়ে, মুতাপা ও রোজওয়ি সাম্রাজ্য। ১৮০০-এর দশক থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত জিম্বাবুয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশ দক্ষিণ রোডেশিয়া নামে পরিচিত ছিল। ১৯৬৫ সালে এখানকার শ্বেতাঙ্গ অধিবাসীরা রোডেশিয়াকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করলেও যুক্তরাজ্য এটিকে স্বীকৃতি দেয়নি। ১৯৮০ সালে দেশের সংখ্যাগুরু কৃষ্ণাঙ্গ জনগণ জিম্বাবুয়ে নামে দেশটিকে স্বাধীন করে।

১৯৬৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত স্বাধীন জিম্বাবুয়ের দাবীতে রোডেশিয়ান বুশ যুদ্ধ বা জিম্বাবুয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়। ১৯৮০ সালে ল্যাংকাস্টার হাউস এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়। ১৯৮০ সালের পর থেকে প্রায় চার দশক ক্ষমতায় ছিলেন রবার্ট মুগাবে। আশির দশকের শুরুতে যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীন হয় আফ্রিকার এ দেশটি। তখন থেকেই ক্ষমতায় ছিলেন রবার্ট মুগাবে। বেশ কয়েক বছর ধরে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছিল। কিন্তু ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ ছিলেন তিনি। ৬ নভেম্বর ২০১৭, ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন নানগাগওয়াকে বরখাস্ত এবং ক্ষমতাসীন দল জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন-প্যাট্রিওটিক ফ্রন্ট  থেকে বহিষ্কার করেন মুগাবে। এর ফলে সামরিক অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বর্তমানে এমারসন নানগাওয়া প্রেসিডেন্ট জিম্বাবুয়ের।  

রোডেশিয়া ১৯০৩-০৪ সাল থেকেই নিজেদের বিভিন্ন শহরের ভেতর ক্রিকেট খেলতো। ১৯৬৪-৭৩ সাল পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেট খেলা দেশগুলার বাইরে সবচেয়ে শক্তিশালী দল ছিলো রোডেশিয়া। ১৯৮১ সালে আইসিসির সহযোগী দেশ হয়ে ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামে জিম্বাবুয়ে। বিশ্বকে তাক লাগিয়ে প্রথম ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে আপসেট ঘটায় জিম্বাবুয়ে। তারা টেস্ট স্ট্যাটাস পায় ১৯৯২ সালে। আর প্রথম টেস্ট জয় পায় ১৯৯৫ সালে, পাকিস্তানকে ইনিংস এবং ৬৪ রানে হারিয়ে। তবে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট ইতিহাসের রূপকথা বলা যায় ইংল্যান্ডের প্রথম জিম্বাবুয়ে সফরকে। রাজনৈতিক কারনে ইংল্যান্ডের এই সফর বহুল আলোচিত। সফরের ওয়ানডে সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে ইংল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করেছিল তারা। তবে  ১৯৮৩ সালে বিশ্বকাপে অভিষিক্ত জিম্বাবুয়েকে ছাড়া এবারই প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, খেলোয়াড়দের পাওনা পরিশোধ সহ নানামুখী জটিলতায় বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্র থেকে অনেকটাই বিস্মৃত জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের অবস্থা এতোটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে, আইসিসি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে বোর্ড। আইসিসির সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে জিম্বাবুয়ের।

২০০০ সালের মার্চ থেকে মুগাবের সমর্থকেরা শ্বেতাঙ্গ জমিদারদের জমি জবরদখল করা শুরু করে। এর ফলে দেশটির অর্থনীতিতে ধ্বংস নেমে আসে, মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছে (২০০৭ সালে এর হার ১১,০০% ছিল, যা সমগ্র বিশ্বে সর্বোচ্চ) এবং তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল। জাতিসংঘ দেশটির উপর স্মার্ট স্যাংশন বা চতুর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও এর কোন ফল হয়নি। ২০০৫ সালে নির্বাচনে মুগাবে আবার ক্ষমতায় আসেন, যদিও ধারণা করা হয় তিনি এতে ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় নিয়েছিলেন। পূর্বে দেশটিতে বেকারত্ব ও দরিদ্রতার হার উভয়ই প্রায় ৮০%।    জিম্বাবুয়ের আর্থিক সংকট এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল যে ৩৫ লাখ কোটি জিম্বাবুয়ান ডলার দিয়ে মিলতো মাত্র ১ মার্কিন ডলার! ২০০৮ সালে চরমতম অবস্থায় পৌঁছায় জিম্বাবুয়ের অর্থনীতি। মুদ্রাস্ফীতির হার দাঁড়ায় ৫০ কোটি শতাংশে, যার জেরে রোজের বাজার করতে যেতে প্লাস্টিক ব্যাগ ভর্তি টাকা নিয়ে বেরোতেন বাসিন্দারা। দিনে দুইবার করে দাম বাড়ার রেওয়াজ ছিল জিনিসপত্রের।অর্থনীতির এই করুণ দশায় জিম্বাবুয়ের অনেক নাগরিক দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছেন।    

অধিক উচ্চতা ও প্রশস্ততার কারণে যে জলপ্রপাতটি সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত হবার গৌরব অর্জনের পাশাপাশি চলে গেছে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের একদম উঁচু তালিকায় সেই মোসি ওয়া তুন্যা বা ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতটির মূল অংশ জাম্বিয়ায় হলেও দেখা মিল্বে ঠিকঠাক জিম্বাবুয়ে থেকেই। জাম্বিয়া আর জিম্বাবুয়ে দুই দেশই এই জলপ্রপাত দেখার জন্য পার্ক তৈরি করেছে। তবে আশি ভাগ দেখা যায় জিম্বাবুয়ে থেকেই। ফলে জিম্বাবুয়েকেই বেছে নিতে হবে একদম শুরুতেই। 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী জিম্বাবুয়ের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ এর মতো  । অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর তুলনায় জিম্বাবুয়েতে মুসলিমের সংখ্যা কিছুটা কম। জিম্বাবুয়ের ইসলামিক সেন্টারের পরিসংখ্যান মোতাবেক সেদেশে মুসলমানের সংখ্যা ২ লাখের একটু বেশি। দীর্ঘ এক শতাব্দী পর ১৯৮০ সালে জিম্বাবুয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতা অর্জন করতে জিম্বাবুয়ের জনগণকে বিশ বছর ধরে লড়াই করতে হয়েছে। উপনিবেশ আমলে খ্রিস্টধর্ম ছিল জিম্বাবুয়ের রাষ্ট্রীয় ধর্ম। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিপেক্ষতার ঘোষণা দেওয়া হয়। সে সূত্রে জিম্বাবুয়ের মুসলমানরা কোনো প্রকার বিঘ্নতা ছাড়া ধর্মচর্চা ও দ্বীনের প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে ব্যাপক স্বাধীনতা লাভ করে। 

জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারেতে একটি ইসলামিক সেন্টার রয়েছে। সেন্টারটির নাম ‘ইকরা দারুল ইলম’। বেশ কয়েকটি সমৃদ্ধ সংস্থাও রয়েছে। এছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা রয়েছে। তারা বিভিন্নভাবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে থাকে। জিম্বাবুয়ের প্রধান মুফতি ইসমাইল ইবনে মুসা মেঙ্ক সারাবিশ্বে বিখ্যাত। তিনি গত কয়েক বছর ধরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রভাবশালী মুসলিমদের তালিকায় সেরা দশে স্থান পেয়েছেন। জিম্বাবুয়ের প্রতি ৫০টি মুসলিম-পরিবার মিলে একটি ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গন প্রতিষ্ঠা করেছে। এছাড়াও ছোট-খাটো আরো কিছু ধর্মীয় শিক্ষালয় গড়ে ওঠেছে। যেগুলোতে ক্রমাগত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে জিম্বাবুয়ের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবিভাষা শিক্ষা অনুষদ চালু রয়েছে। জিম্বাবুয়েতে ১শ’র বেশি মসজিদের পাশাপাশি কয়েকশ’ নামাজঘর আছে। প্রত্যেকটিতে বিকেলে মক্তব-শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। 

এক নজরে জিম্বাবুয়ে - 

রাজধানী এবং বৃহত্তম নগরী - হারারে

সরকারি ভাষা - ইংরেজি

স্বীকৃত আঞ্চলিক ভাষা - শোনা, ন্ডেবেলে

জাতীয়তাসূচক বিশেষণ – জিম্বাবুয়ান 

সরকার - রাষ্ট্রপতি শাসন

রাষ্ট্রপতি - এমারাসন নানগাওয়া

প্রতিষ্ঠিত- ১৯০১ 

ঘোষিত - ১১ই নভেম্বর ১৯৬৫ 

পরিচিত - ১৮ই এপ্রিল ১৯৮০ 

বর্তমান সংবিধান- ১৫ মে ২০১৩ 

জনসংখ্যা - আনুমানিক ১৬,১৫০,৩৬২

মাথা পিছু আয় – ২২৭৬ ডলার 

ছবি ও  তথ্য – ইন্টারনেট 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers