সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮ , ১৮ সফর ১৪৪৩

ফিচার
  >
মানচিত্র

সুন্দরের করুণ ভায়োলিন কম্বোডিয়া

নিউজজি ডেস্ক ২৯ এপ্রিল , ২০১৯, ১১:১৯:২৩

9K
  • সুন্দরের করুণ ভায়োলিন কম্বোডিয়া

পথে পথে ছিনতাইকারীর আনাগোনা, বিদেশী দেখলেই যেকোনো কিছুতে বিশাল দাম হাঁকানো, লোকজনের সাথে মেশার প্রবণতা কম, বিপুল সম্ভাবনার দেশ হয়ে এখনও দরিদ্র দেশটির নাম কম্বোডিয়া। রূপ-বৈচিত্রে দারুণ নান্দনিক দেশটির ঐতিহাসিক সব স্থাপনাও খুব গুরুত্বপূর্ণ পর্যটকদের কাছে। 

ক্যাম্বোডিয়া বা (ভিন্ন নাম কম্বোডিয়া, কাম্বোডিয়া বা কাম্পুচিয়া অনেকে অনেক নামে ডেকে বা জেনে থাকেন) এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ। ‘কম্বোডিয়া’ নামটি (ইংরেজি Cambodia শব্দ হতে এসেছে, যার উৎস হল স্থানীয় খমের ভাষার প্রতেহ্ কম্পুচিয়া  অর্থাৎ ‘কম্বোজ প্রদেশ’। দেশটি কাম্পুচিয়া নামেও পরিচিত। খমের ভাষায় স্রোক খমায় অর্থাৎ ‘খমের দেশ’ নামটিও সুপ্রচলিত।

কম্বোডিয়ার উত্তর-পূর্বে লাওস, পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে ভিয়েতনাম, পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমে থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে থাইল্যান্ড উপসাগর। ফনম পেন দেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। প্রাচীনকাল থেকেই কম্বোডিয়াতে রাজতন্ত্র বিদ্যমান ছিল। এক হাজার বছরেরও আগে কম্বোডিয়া খমের জাতির আংকর সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল। আংকর সাম্রাজ্যটি ৬০০ বছর ধরে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত ছিল। ১৮৬৩ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত এটি একটি ফরাসি প্রোটেক্টোরেট ছিল।

খেমের রাজবংশের সুদীর্ঘ শাসনের ইতিহাস আছে কম্বোডিয়ায়। গৃহযুদ্ধের ইতিহাসও আছে কিছু কম্বোডিয়ার। তদুপরি ১৫ থেকে ১৮ শতকের মধ্যে কয়েকবারই থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের আগ্রাসন থেকে বাঁচতে লড়তে হয়েছে কম্বোডিয়াকে। একসময় ভিয়েতনামের আগ্রাসন থেকে বাঁচতে থাইল্যান্ডের সাহায্য নিতে হয়েছে। বিনিময়ে থাইল্যান্ডকে উত্তর-পশ্চিম কম্বোডিয়া দিয়ে দিতে হয়। এরপর থাইল্যান্ডের আগ্রাসন থেকে বাঁচতে ভিয়েতনামের সাহায্য নিতে হয়েছে। পরে এই দুই দেশের হাত থেকে মুক্তি পেতে ফ্রেঞ্চ মিশনারিদের স্বাগত জানাতে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফরাসিদের পতন হলে কম্বোডিয়া জাপানিদের দখলে যায়। আবার জাপানিরা যখন হেরে যাচ্ছিল তখন ফরাসিরা আবার দখল ফিরে পেতে তত্পর হয়। এর মধ্যেই ১৯৫৩ সালে কম্বোডিয়ার রাজা সিহানুক ফরাসিদের কাছ থেকে দেশকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করেন। নির্বাচন হয় এবং ১৯৫৫ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত তিনি দেশ পরিচালনা করেন। ১৯৬৮ সালে কমিউনিস্টরা কম্বোডিয়ায় নতুন গৃহযুদ্ধ শুরু করে। সিহানুক ১৯৭০ সালে দেশ ছাড়েন। তারপর কম্বোডিয়ায় অন্ধকার নেমে আসে।

কম্বোডিয়া–ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক কম্পুচিয়ার মধ্যে সংঘটিত একটি যুদ্ধ। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালে ভিয়েতনাম ও কম্পুচিয়ার স্থল ও নৌ সীমান্ত বরাবর বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের (যেগুলোতে কখনো কখনো কয়েক ডিভিশন সৈন্য জড়িয়ে পড়ত) মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধ আরম্ভ হয়। ১৯৭৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর ভিয়েতনাম পুরোদমে কম্পুচিয়ায় আক্রমণ চালায় এবং খেমার রুজ সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ভিয়েতনামি ও খেমার রুজ কমিউনিস্টরা তাদের নিজ নিজ দেশে মার্কিন-সমর্থিত সরকারগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু বাইরে ভিয়েতনামিদের সঙ্গে সহযোগিতা করলেও খেমার রুজ নেতৃবৃন্দ মনে মনে এই ভেবে শঙ্কিত ছিল যে, ভিয়েতনামি কমিউনিস্টরা ওই অঞ্চলে ভিয়েতনামের অধীনে একটি ইন্দোচীন ফেডারেশন গঠনের পরিকল্পনা করছে। ভিয়েতনামিদের দ্বারা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার সম্ভাব্য প্রচেষ্টা আরম্ভ হওয়ার আগেই খেমার রুজ নেতৃবৃন্দ তাদের দলের ভিয়েতনাম-প্রশিক্ষিত সদস্যদের বহিষ্কার করতে আরম্ভ করে। ১৯৭৫ সালের মে মাসে নবপ্রতিষ্ঠিত ও খেমার রুজের কর্তৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক কম্পুচিয়া ভিয়েতনামকে আক্রমণ করতে আরম্ভ করে। ভিয়েতনামের ফু কুয়োক দ্বীপে আক্রমণের মধ্য দিয়ে তাদের অভিযান শুরু হয়। তবে সংঘাত সত্ত্বেও ১৯৭৬ সালে সদ্য একত্রিত ভিয়েতনাম ও কম্পুচিয়ার নেতারা দুই দেশের মধ্যেকার কথিত 'মৈত্রী'র প্রমাণ দেয়ার জন্য বেশ কয়েকটি আলোচিত কূটনৈতিক আদান-প্রদান করেন। কিন্তু ভিতরে ভিতরে কম্পুচীয় নেতারা 'ভিয়েতনামি সম্প্রসারণবাদ' নিয়ে আতঙ্কিত থেকে যান। এ পরিস্থিতিতে ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল কম্পুচিয়া ভিয়েতনামের ওপর আরেকটি বড় ধরনের আক্রমণ চালায়। ভিয়েতনাম সরকার কম্পুচীয় আগ্রাসনে হতবাক হয়ে পড়ে এবং কম্পুচীয় সরকারকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার জন্য ১৯৭৭ সালের শেষদিকে একটি পাল্টা আক্রমণ চালায়। ১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে ভিয়েতনামি সামরিক বাহিনী কম্পুচিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করে, কারণ তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জিত হয় নি — খেমার রুজ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করতে অনিচ্ছুক রয়ে যায়।

১৯৭৮ সাল জুড়ে দেশ দুইটির মধ্যে ছোটখাট সংঘর্ষ চলতে থাকে, এবং চীন উভয়পক্ষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু কোনো পক্ষই আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে নি। ১৯৭৮ সালের শেষদিকে ভিয়েতনামি নেতারা গণতান্ত্রিক কম্পুচিয়ার খেমার রুজের কর্তৃত্বাধীন সরকারকে অপসারণ করার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ এটিকে তাঁরা খুব বেশি চীনপন্থী এবং ভিয়েতনামবিরোধী বলে বিবেচনা করছিলেন। ১৯৭৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর ১,৫০,০০০ ভিয়েতনামি সৈন্য গণতান্ত্রিক কম্পুচিয়া আক্রমণ করে, এবং মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে কম্পুচীয় বিপ্লবী সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করে। ১৯৭৯ সালের ৮ জানুয়ারি নম পেনে ভিয়েতনামপন্থী গণপ্রজাতন্ত্রী কম্পুচিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং দশ বছরব্যাপী ভিয়েতনামি দখলদারিত্বের সূচনা হয়। এই সময়ে জাতিসংঘে খেমার রুজের গণতান্ত্রিক কম্পুচিয়া কম্পুচিয়ার বৈধ সরকার হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে, এবং ভিয়েতনামি দখলদারিত্ব প্রতিরোধ করার জন্য বেশ কয়েকটি সশস্ত্র প্রতিরোধ দল সংগঠিত হয়। পর্দার অন্তরালে গণপ্রজাতন্ত্রী কম্পুচিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন সিজিডিকের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় লিপ্ত হন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে ভিয়েতনাম সরকার বেশকিছু অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক নীতিসংক্রান্ত সংস্কার সাধন করে, এবং ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বরে কম্বোডিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়।

খেমার রুজের শাসন অবসানের পর দুই দশক ধরে মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া। অর্থনৈতিকভাবে দেশটি সম্ভাবনাময়। তেল ও গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের বড় ধরনের মজুদের কারণে দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়ছে। বিশেষ করে চীন ও প্রতিবেশী ভিয়েতনাম তাদের বড় বিনিয়োগকারী। তৈরি পোশাক রপ্তানি দেশটির সবচেয়ে বড় শিল্প। দেশটির রপ্তানির ৮০ শতাংশই এ খাত। পর্যটনের সম্ভাবনাও প্রচুর। দেশটিতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছে ১৯৯৩ সালে। তবে দুর্নীতি-জর্জরিত কম্বোডিয়া এখনো বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্র। এক-তৃতীয়াংশ লোকের দৈনিক আয় এক ডলারেরও কম।

প্রধান কাজ কৃষি। মেকং নদীর পানি দিয়ে সেচের কাজ চলে। উৎপাদিত পণ্য মূলত ধান।

কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন শহরটি ছোট হলেও বেশ সাজানো গোছানো ও পরিষ্কার। সে দেশে উবারের মতই গ্র্যাব এবং পাসএপ নামক এপগুলো ব্যাবহার করে চাইলেই শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে আসতে পারবেন স্বল্প খরচে।৪-৫ ডলার দিয়েই বেশ ভালো ভাবে ঘোরা যাবে।

আর শহরের দর্শনীয় স্থানগুলোর সবই মোটামুটি কাছাকাছি হওয়ায় ভাড়া খুব বেশী গুনতে হবেনা আপনাকে। নমপেন শহরটি মেকং নদীর তীরে অবস্থিত এবং শহরের মধ্যখান দিয়েই বয়ে গেছে নদী। নদীর দুই ধারে রয়েছে দেশী বিদেশী বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, পাব ও বার যা কিনা আপনাকে কিছুটা হলেও পাতায়া কিংবা ফুকেটের আনন্দ দেবে।

কম্বোডিয়ার দর্শনীয় জায়গা গুলোর মধ্যে রয়েছে রয়েল প্যালেস, গণহত্যার স্মৃতি সম্বলিত “কিলিং ফিল্ড” নামক বধ্যভূমি, বীর সৈন্যদের সম্মানে তৈরি ওয়াথ ফেনম নামক স্মৃতি সৌধ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কয়ার এছাড়াও রয়েছে বেশ কিছু নয়নাভিরাম টেম্পল এবং ফুলের বাগান সম্বলিত পার্ক। রাজধানী থেক বেশ দূরে অবস্থিত ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্গত এনকর এখানে আপনি খুঁজে পাবেন সে দেশের প্রাচীন সভ্যতার দারুণ সব নিদর্শনগুলো। ৪-৫ হাজার টাকা খরচে ৪৫ মিনিটের ফ্লাইটে সহজেই আপনি যেতে পারবেন সিয়েম রিপ নামক শহরে এবং সেখান থেকে স্পটটিও বেশ কাছে।

একনজরে

দেশের নাম : কিংডম অব কম্বোডিয়া

রাজধানী : নমপেন

সরকার : ইউনিটারি পার্লামেন্টারি

কনস্টিটিউশনাল মনারকি

মুদ্রা : রিয়েলা

সরকারি ভাষা: মালয়

স্বীকৃত ভাষা : খেমার

জাতিগোষ্ঠী : খেমার (৯০%), ভিয়েতনামি

(৫%), চীনা (১%), অন্যান্য (৪%)

ধর্ম : বৌদ্ধ

আইনসভা : উচ্চকক্ষ : সিনেট

নিম্নকক্ষ : জাতীয় পরিষদ

ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা : ৯ নভেম্বর ১৯৫৩

আয়তন : এক লাখ ৮১ হাজার ৩৫ বর্গ কিমি

জনসংখ্যা : এক কোটি ৪৫ লাখ ৫৮ হাজার

৩৩২ জন

ঘনত্ব : প্রতি বর্গ কিমিতে ৮১ দশমিক ৮ জন

জিডিপি : মোট ৪৯.৯৬০ বিলিয়ন ডলার (মাথাপিছু : তিন হাজার ২৬২ ডলার)

জাতিসংঘে যোগ : ১৪ ডিসেম্বর ১৯৫৫।

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers