শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১ আশ্বিন ১৪২৮ , ৮ সফর ১৪৪৩

ফিচার
  >
মানচিত্র

প্রিয় বসন্তের দেশ চীন

নিউজজি ডেস্ক ৯ ফেব্রুয়ারি , ২০১৯, ১০:৪৭:৩১

  • প্রিয় বসন্তের দেশ চীন

কয়েক হাজার বছরের ধারাবাহিক ইতিহাসে চৈনিক সভ্যতা পৃথিবীর আদিম সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই কারণে চৈনিক সভ্যতাকে মানব সভ্যতার অন্যতম সুতিকাগার বলা হয়।খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সাল থেকে চীনের শাং সাম্রাজ্যের (১৬০০ থেকে ১০৪৬ খ্রিস্টপূর্ব) আমলে লিখিত ও গ্রহনযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায়। প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ যেমন ‘রেকর্ড অব গ্রান্ড হিস্টোরিয়ান’ (১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) এবং ‘বাম্বু এ্যানালস’ এ সিয়া সাম্রাজ্য এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

 

চীন এশিয়া মহদেশের পূর্ব অঞ্চলে এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত। চীনের স্থলভাগের আয়তন প্রায় ৯৬,০০,০০০ কিমি২ (৩৭,০০,০০০ মা২) বর্গকিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে চীন এশিয়ার বৃহত্তম দেশ এবং রাশিয়া ও কানাডার পর চীন বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম দেশ।

 

চীন একটি পর্বতময় দেশ। এর মোট আয়তনের দুই-তৃতীয়াংশ পর্বত, ছোট পাহাড় এবং মালভূমি নিয়ে গঠিত। আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে চীনের ৩৩% উঁচু পর্বত, ২৬% মালভূমি, ১৯% অববাহিকা, ১২% সমতলভূমি এবং প্রায় ১০% ক্ষুদ্র পাহাড়। কয়েক মিলিয়ন বছর আগে ছিংহাই-তিব্বত মালভূমি সৃষ্টি হয়। আকাশ থেকে দেখলে মনে হবে চীনের ভূভাগ সিঁড়ির মতো পশ্চিম দিক থেকে পূর্বদিকে ধাপে ধাপে নেমে গেছে। সমুদ্র সমতল থেকে ছিংহাই-তিব্বত মালভূমির গড় উচ্চতা ৪০০০ মিটারের বেশি বলে মালভূমিটি "বিশ্বের ছাদ" নামে পরিচিত; এটি চীনের ভূমিরূপের প্রথম সিঁড়ি গঠন করেছে। মালভূমিটিতে অবস্থিত হিমালয়ের অন্যতম প্রধান পর্বতশৃঙ্গ চুমোলাংমা শৃঙ্গের উচ্চতা ৮৮৪৮.১৩ মিটার।

ক্রয়ক্ষমতার সমতার বিচারে চীনের অর্থনীতি বিশ্বের ২য় বৃহত্তম। এদেশের জিডিপি ৮.১৮৫ ট্রিলিয়ন আমেরিকান ডলার। আমেরিকান ডলার বিনিময় হারের দিক থেকে দেখলে এর অর্থনীতি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম (২০০৫ সালের হিসাব)। তথাপি, বিশাল জনসংখ্যার কারণে, চীনের মাথাপিছু আয়  ৬,২০০ আমেরিকান ডলার ।

 

পৃথিবীর এক পঞ্চমাংশ জনগোষ্ঠী চীনে বাস করে। এদের মধ্যে ৯২% জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এছাড়াও চীনে আরো ৫৫ জাতিগোষ্ঠীর লোক বসবাস করে। চীনের সবচেয়ে বেশি কথিত ভাষাগুলি চৈনিক-তিব্বতি ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও চীনা ভাষার ভেতরে একাধিক প্রধান দল আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কথিত ভাষাদলগুলি হল ম্যান্ডারিন চীনা ভাষা (চীনের জনসংখ্যার ৭০% এই দলের ভাষাগুলিতে কথা বলে), উ (যার মধ্যে সাংহাই ভাষা পড়েছে), ইউয়ে ভাষা (যার মধ্যে ক্যান্টনীয় ভাষা ও তাইশানীয় ভাষা অন্তর্গত), মিন চীনা ভাষা (যার মধ্যে হোক্কিয়েন ও তেওচিউ উপভাষা অন্তর্গত), সিয়াং চীনা ভাষা, গান চীনা ভাষা, এবং হাক্কা চীনা ভাষা। আদিবাসী সংখ্যালঘু গোষ্ঠীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত অ-চৈনিক ভাষাগুলির মধ্যে রয়েছে চুয়াং ভাষাসমূহ, মঙ্গোলীয় ভাষা, তিব্বতি ভাষা, উইগুর ভাষা, হমং ভাষা এবং কোরীয় ভাষা। আদর্শ বা প্রমিত চীনা ভাষা ম্যান্ডারিন ভাষাদলের বেইজিং উপভাষার উপর ভিত্তি করে সৃষ্ট হয়েছে। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের জাতীয় ভাষা এবং বিশাল দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ভাবে আদানপ্রদানের জন্য লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

চীনের গ্রামাঞ্চলের দিকে অবস্থিত লি নদী বিখ্যাত। এর ক্রিস্টাল ক্লিয়ার পানি, শহরের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে বয়ে যাওয়া এবং নদী পাশের চমৎকার পাহাড়ের জন্য। গুইলিনে অবস্থিত এই লি নদী শিল্পীদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বলা হয়ে থাকে, লি নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে চীনের চিত্রশিল্পীগণ এবং কবিগণ তাদের শিল্পকর্মের প্রেরণা পেয়ে থাকেন। ৮৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের লি নদীটির গুইলীং এবং ইয়াংসু এর মধ্যবর্তী স্থানটি সবচেয়ে বেশি সুন্দর। নদীটির দুপাশে চমকপ্রদ আড়াআড়ি পাহাড়, নলখাগড়ার বন, গ্রামগুলির সুসজ্জিত চাষাবাদ এবং ঘন বাঁশ বাগান পর্যটকদের নজর কেঁড়ে থাকে। মেঘলা এবং রৌদ্রজ্জ্বল দিনে লি নদীর অপরূপ সৌন্দর্য পর্যটকদের মন কেঁড়ে নেয়। পর্যটকদের সুবিধার্থে নদীটি ঘুরে বেড়ানোর জন্য ছোট ছোট বাঁশের নৌকা এবং সুসজ্জিত জাহাজ রয়েছে। পর্যটকরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী নৌকা বা জাহাজে চড়ে নদী ভ্রমণ করে থাকেন।

১৯৭৪ সালে সাংহাই প্রদেশের সিয়ান শহরের প্রান্তদেশে সেখানকার কৃষকেরা খনন কাজের মাধ্যমে যে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি উন্মোচিত করে তা নিঃসন্দেহে চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার – দ্য ট্যারাকোটা আর্মি। প্রায় ২০০ বছর ভূগর্ভস্থ ছিল এই টেরাকোটা আর্মি। এটি চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং এর সমাধি মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত। আসলে এই টেরাকোটা আর্মি জীবন্ত কোন সেনাবাহিনী নয়। সম্রাট কিন শি হুয়াং এর মৃত্যুর পর স্থানীয় লিনথং জেলার কৃষকেরা সম্রাটের সম্মানার্থে এসব পোড়ামাটির সৈন্যবাহিনী তৈরি করে। এখানে মানুষের মত দেখতে ৮০০০ টি সৈন্য মূর্তি আছে যেগুলো লম্বায়ও প্রায় মানুষের মত। এই মূর্তিগুলোর একটির সাথে অন্যটির চেহারার মিল নেই। তাই নির্মাণের দক্ষতা দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। সৈন্যর পাশাপাশি আরো রয়েছে ৫২০ টি ঘোড়া, ১০০ টির মত রথ এবং বেশকিছু বেসামরিক লোকজন। পোড়ামাটির এই সৈন্যবাহিনীতে সামরিক পদমর্যাদার স্বরূপ সাজানো হয়েছে। এক কথায় বলা যায়, প্রাচীন সামরিক বাহিনী যেভাবে সুসজ্জিত থাকতো, কৃষকদের তৈরি মূর্তিগুলোতে সেই রূপ দেয়া হয়েছে।

 

চীনের আরেকটি জনপ্রিয় পর্যটন স্থান হল বেইজিং এর নিষিদ্ধ নগরী । একসময় এই নগরীতে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ ছিল, তাই এর নাম হয় নিষিদ্ধ নগরী। এখানে চীনের প্রাচীন স্থাপত্যবিদদের দ্বারা নির্মিত এই প্রাসাদটিতে চার হাজারেরও বেশি সুসজ্জিত কামরারয়েছে। এসব কামরাগুলিতে লাল এবং হলুদ রংয়ের কারুকার্য রয়েছে। এই প্রাসাদের ছাদ সোনা দিয়ে তৈরি। এটি ‘ইম্পেরিয়াল প্যালেস’ নামেও পরিচিত। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জটিল প্রাসাদ। কথিত আছে এখানে ৯৮০টি ভবন ও ৯৯৯৯ টি কক্ষ আছে! মিং এবং কিং সম্রাটদের থেকে শুরু করে ১৯১২ সালে চীনের শেষ সম্রাট পুই পর্যন্ত এই প্রাসাদই ছিল সম্রাটদের বাসস্থান। বর্তমানে এই প্রাসাদটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থান হিসেবে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

চীনে ভ্রমণের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে সবার আগে ভেসে উঠে চীনের মহাপ্রাচীর  ‘দ্যা গ্রেট ওয়াল অফ চায়না’। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাচীর এবং চীনের প্রতীক। প্রাচীরটি চীনের পূর্ব উপকূল থেকে পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৫,০০০ কিলোমিটার। গড়ে এর উচ্চতা প্রায় ৬ থেকে ৮ মিটার এবং কিছু কিছু জায়গায় প্রায় ১৬ মিটার পর্যন্ত। চীনের এই প্রাচীরটি বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি। প্রাচীন যাযাবর জাতি, বিশেষত, যাযাবর মঙ্গোলিয়ানদের থেকে বাঁচানোর জন্য চীনা সম্রাটরা এই প্রাচীর নির্মাণ করেন। চীনে ভ্রমণে গেলে অবশ্যই দেখতে ভুলবেন না এই প্রাচীন আত্মরক্ষামূলক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শনটি।

আরো আছে: রেইনবো মাউন্টেইন, লাসায় অবস্থিত পোতালা প্রাসাদ, সাংহাই এর দ্যা বান্ড, ভিক্টোরিয়া হারবার, হুয়াংশান এর হলুদ পাহাড় (মাউন্ট হুয়াং), হংজ়ৌ এর ওয়েস্ট লেক, লেশান জায়ান্ট বুদ্ধ, হানি টেরেস, লংমেন গুহা, ইয়ুংগ্যাং গুহা ইত্যাদি।

উইঘুর হচ্ছে পৃথিবীর সর্বাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশ চীনের সর্ববৃহৎ নৃতাত্ত্বিকগোষ্ঠী। চীনের পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ প্রদেশ ও ফসল উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র জিংজিয়াংয়ে এদের বাস। এলাকাটি বিপুল তেল ও খনিজসম্পদে পূর্ণ। ১৬ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার (বাংলাদেশের প্রায় ১২ গুণ) আয়তনের জিংজিয়াংয়ে বসবাসরত ২.২ কোটি মানুষের ১.২ কোটিই মুসলমান। বাহ্যিকভাবে এরা স্বাধীন হলেও সত্যিকার অর্থে তারা পরাধীন। অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা চীনা সরকারের নির্যাতনের জাঁতাকলে পিষ্ট। আরাকানের মতো সেখানেও মুসলমানরা নিজ দেশে, বাপ-দাদার ভিটায় পরদেশিতে পরিণত হয়েছে। উইঘুরদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগুলো সমূলে ধ্বংস করার জন্য চীনা সরকার ক্রমাগত পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে চরম দুঃখের বিষয় হলো, বিশ্বমিডিয়ায় ঝড় তোলেনি ইউঘুরের পিতাহারা নিরীহ শিশুর কান্না। মুসলমান হওয়ায় তাদের বুকফাটা আর্তনাদ ফলাও করছে না বিশ্বমিডিয়া। আন্তর্জাতিক কোনো মিডিয়া যাচ্ছে না সেখানে। অন্যদিকে চীনা সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে তাদের ওপর নির্যাতনের বিষয় আড়াল করতে কৌশলী অবস্থানে রয়েছে।শত শত মুসলমান নিহত হলে মাত্র ১০-১২ জন নিহত বলে রাষ্ট্রীয় মিডিয়া প্রচার করছে। আর এখান থেকে খবরগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এভাবেই প্রচার করছে। ফলে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনা সরকারের ক্রমাগত নির্যাতনের ৯০ শতাংশই থেকে যাচ্ছে আড়ালে। ধারণা করা হয়, হিজরি প্রথম শতকে সাহাবায়ে কেরামের সোনালি যুগেই চীনে রোপণ করা হয় ইসলামের বীজ। দশম শতাব্দীতে ব্যাপক হারে এ অঞ্চলের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকে মুসলমানদের পরিমাণ। বর্তমান চীনে দুই কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মুসলিম বাস করে।

 

 

 

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers