সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮ , ১৮ সফর ১৪৪৩

ফিচার
  >
মানচিত্র

মালদ্বীপ, এই স্বর্গ একদিন ডুবে যেতে পারে

নিউজজি ডেস্ক ২৩ অক্টোবর , ২০১৮, ১৫:২১:৪৫

24K
  • মালদ্বীপ, এই স্বর্গ একদিন ডুবে যেতে পারে

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সর্বোচ্চ উচ্চতা মাত্র দুই দশমিক তিন মিটার এবং গড় উচ্চতা মাত্র এক দশমিক পাঁচ মিটার, এরকম এক জল ডুবুডুবু দেশের নাম মালদ্বীপ। এক হাজার দুই শ’রও বেশি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশ । তাবৎ পৃথিবীর পর্যটকদের বিলাস যাপনের অন্যতম লক্ষ্য এই দেশ। ঘন নীল আর শ্যাওলা সবুজ ঢেউ খেলানো ভারত মহাসাগরের বুকে দোল খাওয়া এই অনিন্দ্য সুন্দর ভূখণ্ডের কোনও তুলনাই নেই।  

মালদ্বীপ নামকরণ মালদ্বীপের নামকরণ নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ লক্ষ করা যায়। কেউ কেউ দাবি করেন মালদ্বীপ অর্থ হচ্ছে ‘মেল দ্বীপ রাজ’ বা পুরুষশাসিত রাজ্য। মূলত ‘দ্বীপ’ একটি সংস্কৃত শব্দ আর ‘মাল’ শব্দটি দেশটির রাজধানীর নামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঔপনিবেশিক আমলে ডাচরা  তাদের নথিপত্রে এ দ্বীপপুঞ্জের নাম মালদ্বীপ বলে উল্লেখ করেন। পরে ব্রিটিশরাও একই নাম ব্যবহার করেন, যা দেশটির স্থানীয় নাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। শ্রীলঙ্কান প্রাচীন সাহিত্য ‘মহাবংশ’-এ মালদ্বীপকে বলা হয়েছে ‘মহিলাদ্বীপ’ বা নারীদের দ্বীপ। তবে কিছু কিছু পণ্ডিত মনে করেন, মালদ্বীপ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত মালাদ্বীপ থেকে যার অর্থ ফুলের মালার দ্বীপ। তবে প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে এ দ্বীপকে বলা হয়েছে ‘লাক্কাদ্বীপ’ বা শত হাজার দ্বীপ। তবে মালদ্বীপে এক হাজারের বেশি দ্বীপ থাকলেও এক লাখ দ্বীপ নেই। আবার আরব পর্যটক ইবনে বতুতা এ দ্বীপকে বলেছেন ‘মহল দ্বীপ’ বা রাজপ্রাসাদের দ্বীপ। আর মালদ্বীপের রাষ্ট্রীয় প্রতীকে ইবনে বতুতার ব্যাখ্যার নিরিখে এখনো মহল বা রাজপ্রাসাদের ছবি ব্যবহৃত হয়।

ইতিহাস ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া যায় মালদ্বীপে বসতি স্থাপনকারীরা ছিলেন দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর লোক। সঙ্গম যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০-৩০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে) এরা ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের কেরালা রাজ্য থেকে সেখানে যায়। প্রধানত জেলে সম্প্রদায়ের লোকরাই সেখানে প্রথম যায়। তবে প্রাচীন তামিল জনগোষ্ঠীর কিছু লোকও সেখানে যায়। মূলত এ দু’টি জনগোষ্ঠীর লোকদেরই এ দ্বীপের আদি বসতি স্থাপনকারী হিসেবে ধরা হয়। এরপর সময়ে সময়ে মালদ্বীপের দ্বীপগুলোতে বহু ভারতীয় ও শ্রীলঙ্কান মানুষ বসতি স্থাপন করে। বারো শতকে এ দ্বীপপুঞ্জে পারসিক মুসলমানদের আগমন ঘটে। তারা ‘বিদেশী সাধু’ বলে পরিচিত ছিলেন। এই বিদেশী সাধু বা পারসিকরা মালদ্বীপবাসীকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেন। আর পারসিকদের আগমনের পর থেকেই মালদ্বীপ আরব বণিকদের জন্য একটি অন্যতম বাণিজ্যিক যাত্রাবিরতিস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিজয়ের পরপরই অর্থাৎ ১১৫৩ সালে পারসিক মুসলমানরা এখানে ‘স্বাধীন ইসলামি সালতানাত’ প্রতিষ্ঠা করেন। তারা সুলতান নাম ধারণ করে ১৯৬৮ সাল পযন্ত এই সালতানাতব্যবস্থা কায়েম রাখেন। মাঝে ১৮৮৭ সাল থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত দেশটি ব্রিটিশদের আশ্রিত রাজ্য হিসেবে ছিল। ১৯৬৫ সালের ২৬ জুলাই পর্যন্ত এ দ্বীপরাষ্ট্রটি স্বাধীন হয়ে যায়। ১৯৫৩ সালে দেশটিতে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ চেষ্টা হয়েছিল। তবে ১৯৬৮ সাল থেকে দেশটিতে প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম আছে। এটি রাষ্ট্রপতিশাসিত একটি দেশ।

প্রাচীনকালে মালদ্বীপ কুরি শেল, কুড়ি দড়ি, শুকনো টুনা মাছ (মালদ্বীপ মাছ), অ্যামগ্রিজি (মাহেহারা), এবং কোকো দে মির (তভাককাশি) জন্য বিখ্যাত ছিল। স্থানীয় এবং বিদেশী বাণিজ্য জাহাজগুলি শ্রীলংকার এই পণ্যগুলি লোড করতে এবং হিন্দু মহাসাগরের অন্যান্য আশ্রয়স্থলগুলিতে তাদের পরিবহন করে। ঐতিহাসিকভাবে মালদ্বীপ কুরি শাঁস বিপুল পরিমাণে সরবরাহ, একটি যুগ যুগ আন্তর্জাতিক মুদ্রা। ২য় শতাব্দী থেকে দ্বীপসমূহ আরবদের 'মানি দ্বীপ' নামে পরিচিত ছিল। আফ্রিকাতে মুদ্রা হিসেবে শতাব্দীকালীন মুদ্রা হিসাবে মোন্তেটিয়ার মনিতা ব্যবহার করা হতো, এবং গোল্ড ব্যবসায়ের সময় পশ্চিমা দেশগুলো দ্বারা আফ্রিকাতে মালদ্বীপের বিপুল পরিমাণ কেরিকে চালু করা হতো। কোরি এখন মালদ্বীপের আর্থিক কর্তৃপক্ষের প্রতীক। মালদ্বীপের সরকার ১৯৮৯ সালে একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচী শুরু করে, প্রাথমিকভাবে আমদানি কোটা উদ্ধরণ করে এবং বেসরকারি খাতে কিছু রপ্তানি খোলার মাধ্যমে। পরবর্তীতে, এটি আরো বিদেশী বিনিয়োগ অনুমোদন প্রবিধান উদারন করেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রিয়েল জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রতি বছর ৭.৫% ছাড়িয়েছে। আজ মালদ্বীপের বৃহত্তম শিল্প পর্যটন, জিডিপির ২৮% এবং মালদ্বীপের ৬০% এর বেশি বৈদেশিক বিনিময় রসিদ। মাছ ধরার দ্বিতীয় প্রধান সেক্টর। 

পৃথিবীর মধ্যে মালদ্বীপের সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য বিশ্বব্যাপী আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয়। এখানকার সমুদ্রের রঙ অতি পরিস্কার ও নীল এবং বালির রঙ সাদা। সমুদ্রের মধ্যে হাজার ধরনের মাছ দেখা যায়। মালদ্বীপে বেড়াতে এলে আপনি থাকতে পারেন সমুদ্রের পানির ওপর বিশেষভাবে নির্মিত বাড়িতে। এসব বাড়ি থেকে পর্যটকরা সমুদ্রের বিভিন্ন রঙের মাছ ও প্রাণি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান; শুনতে পান সামুদ্রিক পাখির ডাক। আর যদি আপনি সমুদ্র সৈকতে থাকতে চান, তাহলে আপনার জন্য আছে বিশেষভাবে নির্মিত বাড়ি। সাধারণত সমুদ্রের মধ্যে নির্মিত বাড়িগুলো সৈকত থেক ১০ মিটার দূরে অবস্থিত। কাঠের সেতু দিয়ে সেগুলোকে সৈকতের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। কিছু কিছু জায়গায় কাঠের সেতুও থাকে না; পর্যটকরা ছোট নৌকায় করে সমুদ্রের বুকে নির্মিত বাড়িতে প্রবেশ করেন।

মালদ্বীপের রাংগালি দ্বীপের একটি হোটেলের কর্তৃপক্ষ সমুদ্রের ৬ মিটার গভীরে স্বচ্ছ গ্লাস দিয়ে একটি রেস্তোরাঁ নির্মাণ করেছে। এ রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে মোট ১২ জন অতিথি বসতে পারেন। এ রেস্তোরাঁয় শুধু লাঞ্চ ও ডিনার পরিবেশন করা হয়। রেস্তোরাঁর নাম 'ithaa undersea restaurant'। স্থানীয় ভাষায় 'ইথা' অর্থ মুক্তা। রেস্তোরাঁর দেয়াল গ্লাস দিয়ে তৈরি। এটি সমুদ্রের গভীরে গ্লাস দিয়ে নির্মিত একমাত্র রেস্তোরাঁ। এটি নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। রেস্তোরাঁয় মোট ৬ টেবিল আছে। প্রতিটি টেবিলে মাত্র ২ জন অতিথি বসতে পারেন। অতিথিরা সুস্বাদু খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের নীচের মনোরম দৃশ্য দেখতে পারেন। নানা ধরনের রঙিন মাছ তাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। সে এক মজার অভিজ্ঞতা। তবে, এত সুন্দর পরিবেশে খাবার খাওয়ার মূল্যও কিন্তু বেশি। এখানে সবচে সস্তা লাঞ্চের জন্য আপনাকে গুনতে হবে ২০০ মার্কিন ডলার।

মালদ্বীপের দর্শনীয় স্থানের মধ্যে এ জ্বলজ্বলে বিচ বিখ্যাত। এটি ভাদহু দ্বীপের একটি বিচ। মালদ্বীপে ভ্রমণ করতে গেলে ভাদহু দ্বীপের এ স্থানটি অবশ্যই ঘুরে দেখা উচিত। সূর্য অস্ত যাওয়ার পরেই ভাদহু দ্বীপের সৈকত জ্বলজ্বলে হয়ে ওঠে। আর অসাধারণ সে দৃশ্য দেখে চোখ জুড়ায় যে কোনো ব্যক্তির। ভাদহু দ্বীপের আরও বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। তবে পর্যটকদের কাছে এর সমুদ্র সৈকতই সবচেয়ে জনপ্রিয়। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ঢেউয়ের তালে তালে জ্বলজ্বল করতে থাকে এ দ্বীপের বালুময় সমুদ্র সৈকত। সমুদ্রের অগভীর পানি থেকে যেন বিচ্ছুরিত হতে থাকে অদ্ভুত আলো। কিন্তু কেন সে দ্বীপের সৈকত এভাবে জ্বলজ্বল করে? এ প্রসঙ্গে গবেষকরা জানাচ্ছেন, ফাইটোপ্লাংকটন নামে ক্ষুদ্র একধরনের প্রাণী তৈরি করে এ আলো। এটি অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে। আর তা দেখে মোহিত হয় মানুষ। ভাদহু দ্বীপটি মালে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে আট কিলোমিটার দূরে। পর্যটকরা তাই খুব সহজেই এ দ্বীপটিতে ভ্রমণ করতে পারেন।

সকালের চিকচিকে রোদে হুলহাঙ্গু বারের সামনে পেতে রাখা কাঠের বেঞ্চে বসে সামুদ্রিক খাবার খাওয়া, বাগিচা রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ করে ওপাশের সবুজ ঘাসের বিছানায় বসে বসে ক্লান্তি দূর করা, মাথার উপর প্রাচীন কোনও গাছ থেকে নেমে আসা ম্যাকাও পাখির সাথে কথোপকথন, সন্ধ্যে নামার আগে বিষণ্ণ ভালো লাগায় বালুকাবেলায় খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া, রাতের বেলায় তীরে এসে আছড়ে পড়া স্ট্রিং রে মাছের সাথে উৎসব, আরও বেশি রাত বেড়ে গেলে শুধুই প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে একাকার, কোনও কোলাহল নাই, নির্জনতা বলতে যা বোঝায় প্যারাডাইস আইল্যান্ডে কেবল তাই। 

প্যারাডাইস আইল্যান্ড নামের দ্বীপটির চারপাশে একতলা বিচ বাংলো দিয়ে সাজানো, এর ভেতরে আছে রিসেপশন অফিস, কনফারেন্স হল, রেস্টুরেন্ট, সুইমিংপুল, ফুটবল মাঠ, ফটোশন, ফিটনেস ক্লাব, চিলড্রেন পার্ক, স্পা, সুভেনির শপ, সেলুন ইত্যাদি। এছাড়া অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের জন্য আছে অনেকটা সমুদ্রের পানির উপরে তৈরি করা ওয়ার ভিলা, হেভেন ভিলা, হেভেন স্যুট, ওশেন স্যুট। রিসোর্ট ভাড়ার সঙ্গে ব্রেকফার্স্ট ও ডিনার কমপ্লিমেটারি থাকে। 

খন্ড খন্ড সাদা মেঘের উপর থেকে দেখছেন, আপনার বিমানটি বিশাল সমুদ্রের উম্মত্ত জলরাশির উপর অবতরণ করছে। চারদিকে কিছু নেই শুধু থৈথৈ নীলচে রঙের পানি আর পানি। ঢেউ আর ঢেউ। মনে হবে বিমানটি পানির তলদেশে তলিয়ে যাবে। কিন্তু না। আপনি ভয়ে যখন হতবিহ্ববল তখন পানির উপর ভাসমান এয়ারপোর্টটি আপনার নজরে আসবে, ক্ষনিক আগের আতঙ্ক পরিণত হবে আকর্ষণে। এরপরই আপনার মনে প্রশ্ন জাগবে। এই হিংস্র উদ্দাম ঊরনচন্ডী জলদেবীর উপর কিভাবে এয়ারপোর্ট টি স্বমহিমায় ভেসে আছে? মুগ্ধতার শুরু এখানেই হয়, শেষ হতে হতে আসলেই শেষ হয় না। অথচ সতর্ক করে দিচ্ছে অনেকেই যে, সমুদ্রের উচ্চতা সমুদ্রের মাত্রাটি মালদ্বীপের দ্বীপ রাষ্ট্রকে ডুবিয়ে দিতে পারে। ডুবে যাবার আগে একবার ঘুরে আসতে পারেন এই স্বর্গ থেকে। 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers