শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১ আশ্বিন ১৪২৮ , ৮ সফর ১৪৪৩

ফিচার
  >
মানচিত্র

আসাম, শান্তি আর অশান্তির জটিলতার প্রাচীন ভূমি

নিউজজি ডেস্ক ৩১ জুলাই , ২০১৮, ১২:৫৪:৪৮

  • আসাম, শান্তি আর অশান্তির জটিলতার প্রাচীন ভূমি

উত্তর-পূর্ব ভারতের অসাধারণ সৌন্দর্যের দেশ আসাম। এ রাজ্যটি হিমালয়ের দক্ষিণে অবস্থিত এবং এর অভ্যন্তরে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ, বরাক উপত্যকা এবং উত্তর কাছাড় পর্বতমালা। উত্তর-পূর্ব ভারতের আরও ছয়টি রাজ্য, যথা অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা এবং মেঘালয় দ্বারা আসাম পরিবেষ্টিত এবং আসামসহ প্রতিটি রাজ্যই উত্তরবঙ্গের একটি সঙ্কীর্ণ অংশ দ্বারা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত।এছাড়াও আসামের আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভূটান এবং বাংলাদেশের সঙ্গে।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে একটি শক্তিশালী নৃগোষ্ঠ, বর্তমান আসাম অঞ্চল দখল করে। পরে একটি সাম্রাজ্য (১২২৮-১৮২৬) প্রতিষ্ঠা করে। স্থানীয় অন্যান্য আদিবাসীদের মন জয় করে এরা অসম ('অনন্য' বা 'তুলনাহীন) নামে সম্মানিত হয়। এই থেকে এই জাতি এবং এদের রাজ্যের এলাকা আসাম নামে পরিচিত লাভ করে। অনেকে মেন করেন পুরোনো আচাম শব্দটাকে সংস্কৃত করে পরে এটাকে 'আসাম বা অতুলনীয়' করা হয়েছে। তাই ভাষায় 'আচাম' শব্দের অর্থ 'পরাস্ত হওয়া'। অসমিয় ভাষায়, আ-উপসর্গ যোগে 'আ-সাম'-এর মানে হয় 'অপরাজিত', 'বিজয়ী'। ব্রাডেন-পাওয়েল'-এর মতে 'হা-কম' থেকেই এর উৎপত্তি, যার অর্থ হল নিচু বা সমতল দেশ।

১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে- ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং সহযোগী কোম্পানীর স্থানীয় মিত্ররা বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজৌদ্দলাকে পরাজিত করে। কালক্রমে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই অঞ্চলের প্রশাসনিক পূর্ণ অধিকার লাভে সক্ষম হয়। ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা, বিহার, উড়ি্ষ্যা ও আসাম নিয়ে একটি প্রশাসনিক এলাকায় তৈরি করা হয়। এর নাম ছিল বাংলা প্রেসিডেন্সি। উল্লেখ্য এই সমগ্র এলাকার আয়তন ছিল ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল। ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বার্মিজ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর, আসাম ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে এই রাজ্যের কাছাড় নামক অঞ্চলকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির খাচি, গারো এবং জয়ন্তীয়া অঞ্চলকে আসামের সাথে যুক্ত করে। ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে আসামকে বাংলার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে আসামকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেখানে একটা পৃথক চিফ কমিশনারের অধীনে শাসন চালানো শুরু হয়। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের চেষ্টা করে। এই সময় আসামকে বাংলার পূর্বাংশের জেলাগুলোর সঙ্গে জুড়ে দিয়ে একজন লেফটেনান্ট গভর্নরের প্রশাসনভুক্ত করা হয়। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আবার আসামকে আলাদা চিফ কমিশনারের আওতায় নিয়ে আসা হয় এবং ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে পাকাপাকিভাবে এখানে আলাদা প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত ভাগ হওয়ার সময়ে, সিলেটের মুসলমান অধ্যুষিত জেলাগুলোর অধিকাংশ পূর্ববাংলার (পাকিস্তান) মধ্যে চলে যায়। অবশিষ্ট অংশ ভারতের অংশ হিসেবে স্বীকৃত হয়। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর কামরূপের দেওয়ানগুড়ি ভুটানকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রশাসনভুক্ত নাগা পাহাড়, জেলা নাগাল্যান্ডের অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে বোড়ো জাতিসত্তার মানুষ আসাম থেকে একাংশ ভেঙে 'উদয়াচল' নামে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল দাবি করে। অবশ্য সেই দাবি পূরণ হয় নি। ১৯৭o খ্রিষ্টাব্দের ২ এপ্রিল, আসামের মেঘালয়কে স্বায়ত্ত শাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়। এই সময় ৩৭টি সংসসদীয় আসনসহ মেঘালয়ের বিধানসভা গঠিত হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় সংসদে "North-Eastern Areas (Reorganization) Act, 1971" পাশ হয়। সেই মোতাবেক ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে জানুয়ারি খাচি, গারো আর জয়ন্তিয়া জেলা নিয়ে নতুন মেঘালয় রাজ্য গঠিত হয়। ওই একই সময়ে মিজো পাহাড়ের জেলাগুলোকে নিয়ে মিজোরাম নামক আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলও ঘোষিত হয়। সেই মিজোরামও এখন একটা আলাদা রাজ্য।

আসাম, উত্তুঙ্গ নীল পাহাড় এবং শ্যামলিমা সমৃদ্ধ রহস্যময় দেশ, উত্কলিত নদী উপত্যকা সহ ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের প্রবেশদ্বার। পর্যটকদের জন্য এক জনপ্রিয় গন্তব্য উত্তর-পূর্ব ভারতীয় অচিরপ্রবাস, আসামে বহু সংখ্যক পর্যটক আকর্ষণ আছে। মহান ব্রহ্মপুত্র নদ তিব্বত থেকে প্রবাহিত হয়, যা আসামের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ ধরে বয়ে চলে রাজ্যের সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। সকালের কোমল রোদ ও সন্ধ্যে বেলার শীতল হাওয়া উপভোগ করতে প্রায়সই এই নদতটে পর্যটকদের পদযাত্রা করতে দেখা যায়।

পর্যটকরা প্রায়ই এখানে নৌকা যাত্রা উপভোগ করে যা ব্রহ্মপুত্র থেকে নিকটস্থ নদী দ্বীপ মাজুলী পর্যন্ত নিয়ে যায়। মাজুলী বিশ্বের বৃহত্তম নদী দ্বীপ এবং বৈষ্ণব ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির একটি কেন্দ্র হিসাবে দাবী রাখে। স্পন্দনশীল রঙে উল্লসিত এবং সাংস্কৃতিক উন্মত্ততায় সমৃদ্ধিশালী, আসামে পর্যটকরা একটি আড়ম্বরপূর্ণ সময় কাটাতে পারেন। 

আসামের শহরগুলিতে ঐতিহাসিক অতীতের একটি মনোরম সংমিশ্রণ সহ শহুরে বিশ্বজনীন সংস্কৃতিও লক্ষ্যণীয়। পূর্বের আলোক, প্রাগজ্যোতিষপুর বা গৌহাটি পর্যটন আকর্ষণে সমৃদ্ধ, সোনার পৌরাণিক দেশ তেজপুর বা শোণিতপুর, ডিগবয় এবং শিবসাগর তৈল ক্ষেত্র, হাফলং এবং ভালুকপং-এর ন্যায় শৈল শহর এই ভাববিলাসী ঐশ্বর্যশালী পার্বত্য দেশকে ঘিরে রেখেছে।

বরাক আর ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার নামোনি আসাম অঞ্চলে বাংলাভাষী মুসলমানরা জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ। নির্বাচন এলেই এই বাংলাভাষী মুসলমান, এবং তার সঙ্গে বাঙালী হিন্দুদের নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা চোখে পড়ার মতো বেড়ে যায়। বারে বারেই এই বিপুল বাংলাভাষী মানুষ ব্যবহৃত হতে থাকেন রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসাবে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার যে অঞ্চলটা নামোনি অসম, সেখানে প্রায় ৫৫% মানুষ মুসলমান, আর তাঁরা মূলত বাংলাভাষী। যদিও অসমীয়া সমাজে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে খাতায় কলমে মাতৃভাষা বদল করে অসমীয়াকে নিজেদের ভাষা বলে তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন একটা সময়ে। 

আসামে ৩৩ জেলার মধ্যে ৯টিতে মুসলিম সংখ্যাগুরু।আরো কয়েকটিতে দ্বিতীয় সংখ্যাগুরু।ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশের সিলেটের সীমান্তবর্তী আসামের দুটি জেলায়ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।আর এসব কারনেই ক্ষণে ক্ষণে আসামের উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলো আসামের মুসলমানদের বাংলাদেশী হিসেবে চিত্রিত করে, অবৈধ অভিবাসী হিসেবে প্রচারনা চালায়, নির্যাতন, জুলুম করে চলেছে।আঞ্চলিক এই রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছে এখন বিজেপি’র সাম্প্রদায়িক নীতি।বর্তমানে আসামের নাগরিক তালিকায় স্থান মেলেনি নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা ৪০ লাখেরও বেশি অধিবাসীর। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স সেখানকার নিবন্ধনকারী সূত্রের বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে। রয়টার্স বলছে, তালিকায় স্থান না পাওয়ার কারণে এই অধিবাসীদের ভবিষ্যত এখন শঙ্কার মধ্যে। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা আবারও নাগরিকত্ব পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবে। 

আসামের রাজধানী গোহাটি থেকে রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়া চূড়ান্ত জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধন তালিকা উন্মুক্ত করেন। প্রথম ধাপে ১ কোটি ৯০ লাখ অধিবাসীকে তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিল। তবে বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কারণে চূড়ান্ত তালিকায় সেখান থেকে দেড় লাখ অধিবাসীকে বাদ দেওয়ার কথা ছিল। তাদের পাশাপাশি প্রথম ধাপে তালিকায় স্থান না পাওয়া ১ কোটি ৩৯ লাখ অধিবাসীর ভাগ্যও নির্ধারিত হওয়ার দিন ছিল আজ। ২২ লাখ পৃষ্ঠার এই নাগরিক তালিকাকে ঘিরে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ যখন তুঙ্গে, তখন কাতারভিত্তিক আল-জাজিরা জানিয়েছে, নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা ৩ কোটি ২৯ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ২ কোটি ৮৯ লাখকে চূড়ান্ত নাগরিকত্ব তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। রয়টার্স নিবন্ধন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ৪০ লাখ, ৭ হাজার ৭০৭ জন তালিকায় স্থান পায়নি।

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers