শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১ আশ্বিন ১৪২৮ , ৮ সফর ১৪৪৩

ফিচার
  >
মানচিত্র

সাত হাজার বছরের পুরোনো ত্রিনিদাদ টোবাগো

নিউজজি ডেস্ক ২২ জুলাই , ২০১৮, ১৩:১০:৪৩

  • সাত হাজার বছরের পুরোনো ত্রিনিদাদ টোবাগো

নীল আকাশ আর নীল সমুদ্রের অপরূপ মেলবন্ধনের দ্বীপাঞ্চল ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো। পৃথিবীর অতি প্রাচীন দেশগুলোর একটি এই দ্বীপপুঞ্জের দেশ। বহু উত্থানপতনের কালের সাক্ষী এই দেশে বাইরের সীমানার প্রতাপশালীদের লোলুপ দৃষ্টি ছিল সব সময়। তবুও রূপ বৈভব আর ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধেও টিকে থাকাটা তাদেরকে করেছে অনন্য ও অসাধারণ। 

ত্রিনিদাদ-টোবাগো নামটা কীভাবে এলো তা নিয়ে আছে বিস্তর বিতর্ক। বিখ্যাত জামাইকান ইতিহাসবিদ ই.এল. জোসেফ এর দাবী; ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন এই দ্বীপরাষ্ট্রের মাটিতে পা ফেলেন, তখন নাকি তিনি স্প্যানিশ ভাষায় বলেন, লা ইসলা ডে লা ত্রিনিদাদ। বাংলায় এর অর্থ হলো, ত্রিমূর্তি দ্বীপ। দূর থেকে ত্রিনিদাদ-টোবাগোকে দেখতে অনেকটা ত্রিশূলের মত লাগে বলেই হয়তো কলম্বাস এমন নাম দিয়েছিলেন। 

আর টোবাগো দ্বীপের চেহারা অনেকটাই চুরুটের মত বলে সপ্যানিশরা এই নাম দিয়েছিলো। স্প্যানিশ শব্দ টোবাগো এর বাংলা অর্থ চুরুট। এই টোবাগো শব্দটাই পরে ইংরাজি বানানে আর উচ্চারণে হয়েছে টোব্যাকো। 

ত্রিনিদাদ-টোবাগো লেসার অ্যান্টিলেসের দক্ষিণপূর্ব প্রান্তে থাকা একটা দ্বীপরাষ্ট্র। এই দ্বীপরাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান হচ্ছে ১০০২ থেকে ১১০১২ উত্তর অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশ হচ্ছে ৬০০৩০ থেকে ৬১০৫৬ অবধি। ভেনেজুয়েলার সী বীচ থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। ত্রিনিদাদ-টোবাগো এর মোট আয়তন হচ্ছে ৫১৩১ স্কোয়ার কিলোমিটার। এর মধ্যে ত্রিনিদাদ দ্বীপ ৪৭৬৮ স্কোয়ার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আছে। এটা দেশের মোট আয়তনের ৯২% দখল করে আছে। এই দ্বীপের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৮০ কিলোমিটার আর প্রস্থ হচ্ছে মাত্র ৫৯ কিলোমিটার। আর টোবাগো এর আয়তন মাত্র ৩০০ স্কোয়ার কিলোমিটার। দেশের মোট আয়তনের মাত্র ৬% দখল করে আছে। এই দ্বীপের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৪১ কিলোমিটার আর প্রস্থ হচ্ছে মাত্র ১২ কিলোমিটার। অবশিষ্ট স্থান কিছু ছোট ছোট নির্জন দ্বীপ দখল করে আছে। যেমন চাকাঁচাক্রে, মনোস, হুয়েভাস, গ্যাসপার র্গ্যান্ডে, লিটল টোবাগো আর সেন্ট জাইলেস আইল্যান্ড। 

এখানে কেউ থাকে না কারণ এই দ্বীপে পা ফেললে তার প্রাণসংশয় হতে পারে। যদিও ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী দেশ এই ত্রিনিদাদ-টোবাগো, এই দ্বীপরাষ্ট্র দক্ষিণ আমেরিকার টেকটনিক প্লেটের ওপরে রয়েছে, তবুও এই দ্বীপরাষ্ট্র উত্তর আমেরিকার অংশ বলে ধরা হয়। যেহেতু ত্রিনিদাদ-টোবাগো এর সরকারি ভাষা ইংরাজি, এর সংস্কৃতি আফ্রো- বৃটিশ সংস্কৃতির সন্তান তাই ত্রিনিদাদ-টোবাগোকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্তর্গত বলে ধরা হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য এই ত্রিনিদাদ-টোবাগো। সবচেয়ে বেশী টেস্ট আর ওয়ানডে ম্যাচও খেলা হয়েছে রাজধানী পোর্ট অফ স্পেনে।

ত্রিনিদাদ-টোবাগো দেশের ইতিহাস প্রায় ৭০০০ বছরের পুরানো। দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলা আর গুয়ানা থেকে আগত আমেরিকান ইন্ডিয়ান উপজাতি এখানে আসে। এরা চাষবাস করতে জানত। আর জানত সেরামিক এর জিনিষপত্র তৈরী করতে। ২৫০ খৃষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ এরা ত্রিনিদাদ-টোবাগো ছেড়ে অন্য ক্যারিবিয়ান দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৩০০ সাল নাগাদ এই দ্বীপরাষ্ট্র আরাওয়াক আদিবাসীদের দখলে চলে যায়। ১৪৯৮ সালের ৩১ জুলাই তারিখটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ত্রিনিদাদ-টেবাগোর ইতিহাসে। এই দিনেই ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রথমে টোবাগোতে পরে রিও ক্লারো মায়ারোতে পা দেন। পরে ১৫৩০ সালে জনৈক স্পেনীয় সেনা [সেডান] ত্রিনিদাদ-টোবাগোতে একটা উপনিবেশ তৈরীর কথা ভাবেন। এর পরে তিনি তাঁর কিছু সঙ্গীর সাথে জুটিয়ে টোবাগোতে উপনিবেশ বসান। এর ফলে বহু আরাওয়াক আর ক্যারিব উপজাতির মানুষকে ভিটেছাড়া হতে হয়। টোবাগোর ওরিনোকোতে তিনি একটা দূর্গ তৈরী করিয়েছিলেন। এই সময়ে অর্থ সঙ্কটে পড়া ত্রিনিদাদ এর আরাওয়াক দলপতি চাচিখ ওয়ান্নাওয়ারে সেন্ট জোসেফ অঞ্চলকে ডোমিঙ্গো ডে লা ভেরা এ ইবার্গুয়েইন নামক এক স্পেনীয় ব্যবসায়ীকে বিক্রি করে দেন এবং এই অঞ্চল ছেড়ে তিনি সদলবলে নৌকায় করে ডমিনিকায় চলে যান। তারিখটা ছিল ১১ নভেম্বর ১৫৯২। এর কয়েক বছর বাদে প্রতারণা করে আরেক স্পেনীয় ব্যবসায়ী আন্টোনিও ডে বের্রিয়েও সান জোসে ডে ওরুণা এলাকা কিনে নেন আরাওয়াকদের কাছ হতে। এখন এই জায়গাটার নাম বদলে হয়েছে সেইন্ট জোসেফ। 

২২ মার্চ ১৫৯৫ সালে কুখ্যাত বৃটিশ জলদস্যু স্যার ওয়াল্টার র্যা লে এই সেইন্ট জোসেফ এলাকাতেই আসেন। তারা জাহাজ সেই সময়ে সমগ্র ওয়েস্ট ইন্ডিজেই আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠছিলেন। তিনি সব জায়গাতেই যেতেন আর স্থানীয় লোককে বন্দী করে মারাত্মক অত্যাচার করে জানতে চাইতেন যে; ‘এল ডোরাডো’ কোথায়। স্পেনীয় ভাষায় এর মানে স্বর্ণনগরী। গুজব ছিলো যে, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার কোনও দেশে রয়েছে এই রহস্যময় সোনার তৈরী শহর। তা এই এল ডোরাডো কোথায় তা বলতে না পারলে ওয়াল্টার র্যা লে সেসব বন্দীদের খুন করতেন। তিনি এখানে এসে বের্রিয়েওকেও বন্দী করেছিলেন আর একই প্রশ্ন করেন। সুচতুর বের্রিয়েও তাকে জানান যে, আরাওয়াকরা নিশ্চয়ই জানে তা কোথায়। এইভাবেই বের্রিয়ে তার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। 

১৭০০ সালে ত্রিনিদাদ-টোবাগো আবার সেপনের সুনজরে পড়েছিলো। ত্রিনিদাদ, মেক্সিকো, দক্ষিণপূর্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পানামা, ভেনেজুয়েলা কলম্বিয়া ইত্যাদি দেশগুলো সেপনের চোখের মণিতুল্য ছিলো। তাদের অধিকাংশ ব্যবসা এসব দেশের মধ্যে চলতো। যদিও ত্রিনিদাদে বেশী লোক বসবাস করতো না। কিন্তু টোবাগোতে প্রচুর স্পেনীয় মানুষ বসবাস করতেন। তাদের হয়ে ক্রীতদাসের কাজগুলো করতো কয়েক হাজার জীবিত আমেরিকান ইন্ডিয়ান জনজাতি। “তাদের জীবনযাত্রা দুঃসহ ছিলো” মন্তব্য রৌমে ডে সেইন্ট লৌরেন্ট নামে জনৈক ফ্রেঞ্চ ব্যবসায়ী যিনি কাঠের ব্যবসার জন্য তার কর্মভূমি ডমিনিকা থেকে প্রায়ই আসতেন এই টোবাগোতে। তার দুষপ্রাপ্য বই চেয়বুলা ডে পোবলাসিওয়েন থেকে তৎকালীন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের সবকটা দেশের কাহিনী জানা যায়। আর সেসব কাহিনী শুনলে আতঙ্কে রক্ত হিম হয়ে আসে। বোঝা যায় ব্যবসায়ী হিসাবে বৃটিশ, ফ্রেঞ্চ আর স্পেনীয়রা কত নির্মম ছিলো। তাদের মনে দয়ামায়া বলে কোনও বস্তু ছিলোই না। অন্তত লৌরেন্ট তার বইতে তাই লিখেছেন। বইটা ছাপা হয়েছিলো ৪ নভেম্বর ১৭৮৩ সালে। এই বইটা উৎসর্গ করা হয়েছিলো স্পেনীয় রাজা তৃতীয় চার্লসকে। এই বইটা পড়েই তৃতীয় চার্লস সিদ্ধান্ত নেন যে, সেখানে বসবাস করা ক্রীতদাসদের মুক্তি দেবেন কিন্তু একটা শর্তে। তাদের প্রত্যেকের দেহে রাজার নামে উল্কি করতে হবে আর রাজার নামে আনুগত্য প্রকাশ করতে হবে। ক্রীতদাসদের সবাইকে ১০ বিঘা করে জমি দেওয়াও হয়। 

১৭৮৯ সালের ফরাসী বিপ্লব এখানেও বিরাট প্রভাব ফেলেছিলো। বহু মার্টিনিখবাসী ফরাসী ব্যবসায়ী আর তাদের আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ক্রীতদাসদের নিয়ে এখানে চলে আসে। কারণ সেই সময়ে মার্টিনিখে ঝামেলা চলছিলো। তা এই ফরাসীরাই এখানে আখ আর কোকোয়া চাষের সূচনা করেছিলো। এই আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষ, যারা ক্রীতদাস ছিলো; তাদের একাংশ এখানেই থেকে যায়। আজও তাদের বংশধররা ফ্রেঞ্চ আর স্পেনীয় ভাষায় কথা বলে। পোর্ট অফ সেপনের জনসংখ্যা ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৪ সালের মধ্যে ৩০০০ থেকে এক লপ্তে ১০৪২২ -এ দাঁড়ায়। ১৭৯৭ সালে এখানে বহু জাতির মানুষের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। যেমন মুল্লাটো, স্পেনীয়, আফ্রিকান, ফ্রেঞ্চ, বিভিন্ন ইউরোপীয় জলদস্যু আর সৈনিক। এই সময়ে পোর্ট অফ সেপনে মোট জনসংখ্যা ছিলো ১৭৭১৮, তার মধ্যে ইউরোপীয় মানুষের সংখ্যা ছিলো ২১৫১, স্বাধীন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষ এবং মুল্লাটো মানুষের সংখ্যা ছিলো ৪৪৭৬ আর ১০০০৯ জন ছিলো আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ক্রীতদাস আর ১০৮২ জন আদিবাসী মানুষ, যাদের মধ্যে আরাওয়াক আর ক্যারিব মানুষ সর্বাধিক।

টোবাগোর কথা বলতে গেলে,  ১৪৯৮ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন এই টোবাগোতে পৌঁছেছিলেন, তখন তিনি নাকি এই দ্বীপের নাম দিয়েছিলেন বেল্লাফর্মা। কিন্তু এই নামটা ৭ বছরের মধ্যেই পালটে হয় টোবাগো। যা আদতে স্পেনীয় শব্দ। এটাই বৃটিশদের বিকৃত উচ্চারণে হয়েছে টোব্যাকো। টোব্যাকো মানে তামাক। টোবাগো মানেও তাই। এই দ্বীপ আকাশ থেকে দেখলে মনে হয় চুরুট। তাই হয়তো এই নাম। ডাচরা আর চৌরল্যান্ডার্স  যারা আজকের লাটভিয়ার চৌরল্যান্ড প্রদেশ থেকে এসছিলো এই টোবাগোতে। বলা যেতে পারে যে, এরাই প্রথম ইউরোপীয় বাসিন্দা যারা বহু বছর ধরে এখানে বসবাস করেছে। এরা আজও অল্প সংখ্যক হলেও বসবাস করে। এরা এখানে টোব্যাকো আর কটন এর চাষাবাদ শুরু করেছিলো। সেটা ১৬ আর ১৭ শতাব্দীর মধ্যে বলে ধরা হয়। টোবাগো দ্বীপটার মালিকানা বারবার এক দেশ থেকে অন্য দেশের মধ্যে হাতবদল হয়েছে। যেমন ডাচ আর চৌরল্যান্ডার্সরা এই দ্বীপটা প্রথমে বিক্রি করে স্পেনীয়দের কাছে। আবার স্পেনীয়রা ফ্রেঞ্চদের কাছে আর অবশেষে ফ্রেঞ্চরা নেপোলিয়নের যুদ্ধে [১৮০৫] হেরে এই দ্বীপটা গ্রেট বৃটেনের কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। বলা ভালো ক্ষতিপূরণ হিসাবে দিতে বাধ্য হয়েছিলো তখনকার ফ্রান্স সরকার। ৮৪ বছর আলাদা দেশ হয়ে থাকবার পরে ১৮৮৯ সালে টোবাগো অবশেষে ত্রিনিদাদ এর সাথে মিশে যায়। এইভাবেই জন্ম হয় আজকের ত্রিনিদাদ-টোবাগো নামক দেশটার। বারবার এক দেশ থেকে আরেক দেশের হাতে চলে যাওয়ার জন্যই ত্রিনিদাদ-টোবাগোর বিভিন্ন অঞ্চলের নামে আমেরিকিন্ডিয়ান, স্পেনীয়, ফ্রেঞ্চ আর বৃটিশ ছাপ পড়েছে। ঠিক তেমনই এদেশের কালচারে বহু দেশের ছাপ পড়েছে।

তথ্য – উইকিপিডিয়া 

ছবি – ইন্টারনেট 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers