মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ৫ সফর ১৪৪৮

ফিচার
  >
মানচিত্র

সোমালিয়া এক সময়ের আফ্রিকার সুইজারল্যান্ড

নিউজজি ডেস্ক ১৪ এপ্রিল , ২০২৩, ১৪:০৬:২০

3K
  • সোমালিয়া এক সময়ের আফ্রিকার সুইজারল্যান্ড

ঢাকা: ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক দেশ। কালো মানুষের দেশ। আফ্রিকার দেশ। সোমালিয়া। শান্তি ও সমৃদ্ধিতে যে দেশ ছিল আফ্রিকার সুইজারল্যান্ড, আজ সেই দেশ এক বিভীষিকার নাম। সোমালিয়ার নাম শুনলেই সবার চোখে ভাসে যুদ্ধ বিগ্রহ আর জলদস্যুদের কথা। অথচ রাজধানী শহর মোগাদিসুর রয়েছে বর্ণাঢ্য ইতিহাস। 

সোমালিয়ার পশ্চিমে ইথিওপিয়া, উত্তর-পশ্চিমে জিবুতি, উত্তরে এডেন উপসাগর, পূর্বে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পশ্চিমে কেনিয়া। মালভূমি, সমভূমি ও উচ্চভূমি নিয়ে সোমালিয়া গঠিত। দেশটির আবহাওয়া মূলত উষ্ণ, কদাচিত বৃষ্টি হয়। সোমালিরা মূলত মুসলিম ধর্মাবলম্বী। সুদূর অতীতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল এটি। মধ্যযুগে বেশ কয়েকটি সোমালি সাম্রাজ্য আঞ্চলিক বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিত। এর মধ্যে আজুরান সাম্রাজ্য, আদেল সালতানাত, ওয়ারসাংগালি সালতানাত ও গেলেদি সালতানাত উল্লেখযোগ্য।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এতে উপনিবেশ স্থাপন করে ব্রিটেন ও ইতালি। ইতালির উপনিবেশের সমাপ্তি ঘটে ১৯৪১ সালে। ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হয় তারা। ১৯৬০ সালে বেসামরিক সরকারের অধীনে স্বাধীন সোমালি প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়। ব্রিটেন ও ইতালির দখল থেকে সোমালিয়া স্বাধীন হবার পর থেকে প্রায় এক দশককাল দেশটি গণতন্ত্র উপভোগ করে। এ সময় দেশটির শান্তি ও সমৃদ্ধি তাকে এনে দেয় ‘’আফ্রিকার সুইজারল্যান্ড’’ পরিচিতি। সোমালিয়ার প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আদম আবদুল্লাহ ওসমান। তিনি ব্রিটেন ও ইতালি-শাসিত অঞ্চলগুলোকে পুনরেকত্রিত করে ‘আধুনিক সোমালিয়া’ প্রতিষ্ঠা এবং সাত বছরব্যাপী দেশ শাসন করেন। তারপর অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন আবদিহ রশিদ আলী শারমারকে। ষাটের দশকে এই ‘আধুনিক সোমালিয়া’র কাহিনী ছিল স্বাধীনতা, সমৃদ্ধি ও গণতন্ত্রের। দেশটির দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট আলী শারমারকে-কে ১৯৬৯ সালে তারই দেহরক্ষীদের একজন হত্যা করে। গণতান্ত্রিক দেশের নিয়ম অনুযায়ী সোমালিয়া পার্লামেন্টের স্পিকার মুখতার মোহামেদ হুসেইন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। ছয় দিনের মাথায় জেনারেল সিয়াদ বারের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় এক সামরিক অভ্যুত্থান। অবসান ঘটে সোমালিয়ার গণতান্ত্রিক যুগের। সোমালিয়ায় সামরিক স্বৈরাচারী শাসন চলে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। এই অপশাসনের প্রতিক্রিয়ায় দেশটিতে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় দেশটির সমাজ। লাখ লাখ মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে আশ্রয় নেয় উদ্বাস্তুশিবির অথবা প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে। অনেকে শরণার্থী হয়ে চলে যায় আরো দূরে – আমেরিকা, ব্রিটেন ও কানাডায়। ২০০০ সালে অন্তর্বর্তী ফেডারেল সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে খানিকটা স্থিতিশীল হয় দেশটি। 

সোমালিয়ায় পাতাহীন এক ধরনের গাছ দেখতে পাওয়া যায়। বছরের বারো মাসের মধ্যে কখনোই এই গাছে পাতা হয় না। এমনকি প্রচণ্ড বৃষ্টির মৌসুমেও এই গাছে পাওয়া যাবে না একটি পাতা। এই গাছগুলো যেখানে জন্মায় তার চারপাশে অন্য কোনো গাছ জন্মাতে পারে না। প্রায় সাত ফুট উচ্চতা নিয়ে শুষ্ক মাটির বুকে দিব্যি দাড়িয়ে আছে গাছগুলো। সোমালিয়ার যে অঞ্চলে এই গাছগুলো জন্মায়, সেই অঞ্চলটি মূলত শুষ্ক পরিবেশ আর পাথুরে ভূমির জন্য পরিচিত। প্রাকৃতিক এই বৈরি অবস্থা এবং পাতাহীন বৃক্ষের এই অঞ্চল থেকে প্রায় প্রতিদিনই মানুষ পালিয়ে অন্য কোনো অঞ্চলে চলে যায়। প্রায় প্রত্যেক সোমালীই এই গাছ সম্পর্কে জানে। স্থানীয়রা এই গাছটির নাম দিয়েছে ‘মৃত্যু বৃক্ষ’। শুধু গাছটিকে নামাঙ্কিত করেই ক্ষান্ত দেয়নি নীরিহ সোমালীরা, দেশটির সবচেয়ে ভয়ংকর গাছ হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছে গাছটিকে।

সেমালিয়াতে জলদস্যুতা এখন বিশাল বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। দুবাই এবং অন্যান্য দেশে থাকা সোমালিরা বিনিয়োগ করছে এই ব্যবসায় বিপুল পরিমাণে। সোমালি জলদস্যুদের লুট করা টাকায় বন্দর ঈলে বিশাল বিশাল ভিলা এবং হোটেল তৈরি হয়ে গেছে। এক সময়কার গরীব জেলেরা এখন মার্সিডিজ বেঞ্জ হাকাচ্ছে। শুধুমাত্র ২০০৮ সালেই সোমালিয়ান জলদস্যুরা আয় করেছে একশ পঁচিশ মিলিয়ন ডলার। বিশাল মুনাফার কারণে সোমালিয়ার অনেক যুদ্ধবাজ গোত্র নেতারাই সুসংগঠিত উপায়ে শুরু করেছে জলদস্যু ব্যবসা। দলে দলে দরিদ্র জেলে ছেলেরা জলদস্যু দলে নাম লেখানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এই ব্যবসার আসল লোকজনেরা রয়েছে পর্দার অন্তরালে। অন্যসব ব্যবসার মতই সম্মুখসারির জলদস্যুদের হাতে টাকার খুব সামান্য অংশই যায়। বেশিরভাগ অংশটাই চলে যায় নেপথ্যের হোমড়া চোমড়াদের কাছে। 

অভিযোগ রয়েছে সোমালিয়ার সেনাবাহিনী, কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রি ও নেতারা এমন কি ইউরোপ আমেরিকার অনেক বড় বড় ব্যাবসায়ি এই লুটের টাকার ভাগ পেয় থাকে। এছাড়াও যুদ্ধবাজ গোষ্ঠি নেতারা ও জঙ্গি সংগঠনগুলোও টাকার ভাগ পায়। ইউক্রেনিয়ান একটি জাহাজকে জলদস্যুরা যখন দখল করে নেয়, তখন শিপিং কোম্পানী খুব দ্রুতই মুক্তিপণ হিসাবে তিন মিলিয়ন ডলার দিতে রাজী হয়ে যায়। কিন্তু, তারপরও কয়েক সপ্তাহ লেগে যায় জাহাজটির মুক্তি পেতে। এর অন্যতম কারণ ছিল যে, এই মুক্তিপণের টাকার ভাগ নেবার জন্য অসংখ্য লোক যুক্ত ছিল। এর মধ্যে যেমন ছিল জলদস্যুদের নেতারা, তেমনি ছিল যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সোমালিয়ান সরকারের লোকজন এবং তাদের শত্রু ইসলামী জঙ্গী সংগঠন আল-শাবাব। জলদস্যুদের মুক্তিপণের টাকার ভাগ শাবাব পায় সে ব্যাপারে অনেকেই দৃঢ় মত পোষণ করে থাকে। মুক্তিপণের অর্থে দ্রুত ঝলমলে হয়ে উঠছে সোমালিয়ার সমুদ্রপাড়ের জেলে বসতিগুলো। জলদস্যুদের অর্থায়নে সেখানে উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ঘটছে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার। গড়ে উঠছে বিলাসবহুল হোটেল। আর এই জলদস্যুরা সেখানে রাতারাতি সেলিব্রেটি হয়ে উঠছে। দেশটির অন্যান্য অংশ থেকেও বিনিয়োগকারীরা সেখানে অর্থ খাটাচ্ছে। জলদস্যুদের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি আইল থেকে দস্যুদলের সদস্য বশির আবদুল্লে টেলিফোনে রয়টার্সকে বলেন, “এখানে এমন অনেক জলদস্যু আছে যারা কখনওই বন্দুক নিয়ে সমুদ্রে যায়নি। কিন্তু দস্যুবৃত্তির কাজে লাগানোর জন্য নৌকাসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু কাজে লাগিয়ে তারা কাড়িকাড়ি অর্থ বানাচ্ছে।” অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জলদস্যুতা এখন সোমালিয়ার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।

আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কিত সোমালিয়ার ইসলামপন্থী উগ্র জঙ্গি সংগঠন আল-শাবাব। সোমালিয়াতে নৈরাজ্যের আধিপত্য স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই। সংগঠনটি সোমালিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দুর্গম গ্রামগুলোতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে। গত কয়েক দশকে খরা, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অন্যান্য কারণে অন্তত পাঁচ লাখ সোমালিয়ার নাগরিক শরণার্থী হিসেবে কেনিয়ায় আশ্রয় নেয়। আল-শাবাব জঙ্গিরা আর্থিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এই শরণার্থীদের মধ্য থেকে বড় একটা অংশকে দলভুক্ত করে। এই সংগঠনটি ওহাবী জিহাদী মিশন পরিচালনা করছে শান্তিপূর্ণ ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কিন্তু তারা এ জন্য বেছে নেয় সন্ত্রাসী কার্যকলাপ। আল-শাবাব আরবি শব্দ যার বাংলা অর্থ যুবক বা তরুণ। আল-শাবাবের পুরো নাম হরকত আল-শাবাব আল মুজাহিদিন। সংক্ষেপে আল-শাবাব নামেই পরিচিত। সোমালিয়ার বিলুপ্ত ‘ইউনিয়ন অব ইসলামিক কোর্টস’র চরমপন্থী যুব সংগঠন হিসেবে আল- শাবাব যাত্রা শুরু করে। ২০০৬ সালের দিকে সংগঠনটি তত্পরতা শুরু করে এবং সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুসহ বিভিন্ন শহর ও বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা।

সোমালিয়ার বেশ কিছু অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে আল-শাবাবের। অবৈধ ব্যবসা, অপহরণ, মুক্তিপণের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও শুল্ক ও কর আদায় করে। এক সময় সোমালিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মাকিসামুইর তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। এ ছাড়া বেশকিছু বিমান বন্দর, সমুদ্র বন্দর, নদী বন্দর থেকে অর্থ লাভ করে এই আল-শাবাব। তারা দস্যুবৃত্তির পাশাপাশি প্রাকৃতিক ক্ষেত্র থেকেও অর্থ লাভ করে থাকে। তারা তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার সড়ক, সেতু থেকে টোল আদায় করে। তারা ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে ২.৫% হারে কর্পোরেট যাকাত আদায় করে। দুর্ভিক্ষের সময় তারা চাকরিজীবীদের বেতন থেকে ৫% হারে কর্তন করে তহবিল সংগ্রহ করতো। সোমালি ডায়াসপোরা তাদের মোট জনসংখ্যার ১৪%, তাদের প্রেরিত অর্থ সাহায্যও তাদের অর্থের অন্যতম উৎস। 

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers