সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১ , ৬ শাওয়াল ১৪৪৫

ফিচার
  >
উৎসব

নিঝুমদ্বীপের চেওয়া উৎসব

নিউজজি ডেস্ক ১৮ মার্চ , ২০২৩, ১৩:০৪:৪১

356
  • নিঝুমদ্বীপের চেওয়া উৎসব

ঢাকা: উৎসবের দেশ বাংলাদেশ। এদেশের বৈচিত্র্যময় ছয় ঋতুর প্রতিটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য। প্রতিটি ঋতুই মেতে ওঠে কোনো না কোনো উৎসবে। পরিচিত উৎসবগুলোর মধ্যে রয়েছে পহেলা বৈশাখ, ঈদ, দুর্গা পূজা, বড়দিন এবং বিজু। চেওয়া উৎসব এমন কোনো পরিচিত উৎসব না হলেও শীতকালে উপকূলীয় অঞ্চলে চেওয়া মাছ ধরার সময়ে মনে হয় যেন উৎসব এবং এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিঝুমদ্বীপের হাজারো মানুষের আশা-আনন্দ।

প্রতি বছর নিঝুমদ্বীপসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত চলে এই উৎসব। এই সময় যেসব জেলেদের বাড়িতে চলে প্রস্তুতি আয়োজন, উঠানে সবাই জাল মেরামতে ব্যস্ত থাকে, আর যেখানে মাছ শুকানো হয় সেখানে ছোট ঘর তৈরি করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখে। মাছ বেশি ধরা পরলে রাতেই ফিরতে হয় মাছ রাখার জন্য। নিঝুমদ্বীপ বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার একেবারে দক্ষিণ-পশ্চিমে ছোট-বড় প্রায় ১১টি দ্বীপ নিয়ে একটি ইউনিয়ন। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর নিঝুমদ্বীপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি।

দ্বীপটিকে ঘিরে রেখেছে সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বন, একেবেঁকে যাওয়া সরু খাল। শুধু তাই নয়, নিঝুমদ্বীপ পরিযায়ী পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এখানে শীতে বিভিন্ন প্রজাতির হাজারো পাখি দেখা যায়, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত এবং নদী। নদী ও সাগরের মিলনস্থলে জেগে ওঠা দ্বীপে বাস করে হাজারো মানুষ। দ্বীপের মানুষের জীবিকার একটি বড় অংশ মাছ শিকারের ওপর নির্ভরশীল।

এখানকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষিজীবি হলেও তাদের আয়ের সিংহভাগই আসে মৎস্যখাত থেকে। এছাড়া কিছু মানুষ ম্যানগ্রোভ বন থেকে মধু সংগ্রহ করে জীবিকা অর্জন করে এবং ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ ছাড়াও প্রত্যেক বাড়ির আশেপাশে রয়েছে দেশি গাছগাছালি। তবে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে খেজুর বাগান।

ফলে শীতকালে এখানে খেজুর রসের প্রতুলতা থাকে এবং রস থেকে সুমিষ্ট গুড় তৈরি করা হয় বিক্রির জন্য। নিঝুমদ্বীপের মানুষের প্রধান পেশা কৃষি এবং ধানের খুবই ভালো ফলন দেখা যায় এই দ্বীপে। মজার ব্যাপার হলো, একসময় এই দ্বীপের মানুষ প্রকৃতিতে আপনি বেড়ে ওঠা উড়ি ধানের ভাত খেয়ে জীবনধারণ করত।

মোহনার কারণে নিঝুমদ্বীপ সংলগ্ন জলাভূমিগুলো দুই ধরনের পানিতে বসবাসকারী নানান প্রজাতির মাছের একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মিঠা ও লোনা পানির মাছের বেঁচে থাকার স্বার্থে একে অন্যের আবাসস্থল ব্যবহার করতে হয়। নদী দূষণের কারণে মিঠা পানির বিপদাপন্ন মাছ আশ্রয় নিয়েছে মোহনাতে। দ্বীপের মিঠা পানির মাছের মধ্যে পাঙাশ, বোয়াল, চিতল, পাবদা, শিং, কই, ভেদা, ফলি এবং লোনা পানির ইলিশ, রিঠা, কোড়াল, পোয়া, খল্লা বাটা, ফাসা, কাইন মাগুড় উল্লেখযোগ্য।

বছরে মাছ আহরণের নির্দিষ্ট কিছু সময় আছে এবং সেই সময়ে জেলেরা জাল তৈরি ও মাছ ধরা নিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকেন। মাছভেদে জালের ভিন্নতা রয়েছে। মাছের মৌসুমে এই দ্বীপে যেন উৎসব লেগেই থাকে। তবে উৎসবের পাশাপাশি রয়েছে উদ্বেগও। কারণ জেলেরা দ্বীপ থেকে নৌকা নিয়ে প্রায় ১০০-১৫০ কিলোমিটার দূরে সাগরে এক অনিশ্চয়তার মাঝে মাছ ধরতে যায়। 

নিঝুমদ্বীপে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে ইলিশ। এতে অবশ্য সাধারণ মানুষের চেয়ে মহাজনদের আনন্দই বেশি। সাধারণ মানুষের আনন্দ চোখে পড়ে চেওয়া উৎসবের সময়। কারণ এই সময় মহাজনের কাছে দেনার চিন্তা মাথায় থাকে না।

এখন কি আর বুঝতে বাকি আছে চেওয়া উৎসব কী! চেওয়া লোনা পানির একটি সুস্বাদু মাছ। নিঝুমদ্বীপে তিন প্রজাতির চেওয়া মাছ পাওয়া যায়। তবে লাল চেওয়াই বেশি ধরা পড়ে। এই মাছটি সারা বছর পাওয়া গেলেও শীতের মৌসুমে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই বেশির পরিমাণ এতই যে, সারারাত মাছ ধরার পরে মাঝে মাঝে সকালে সেগুলো তীরে আনার জন্য প্রয়োজন হয় বাড়তি খালি নৌকা। চেওয়া মাছ ধরা হয় বেহুন্দী নামে এক ধরনের জাল দিয়ে। প্রতি নৌকায় ৮-১০ জন মানুষের একটি দল থাকে।

মৌসুমে সবাই নৌকা, জাল এবং রান্নার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে দুপুরের পরেই দ্বীপ থেকে প্রায় ৫০-৬০ কিলোমিটার দূরে সাগরে জাল ফেলতে যায়। জাল ফেলে উজানের জন্য ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তবে জেলেরা প্রতিদিন চেওয়া মাছ ধরতে সাগরে যান না, প্রতি অমাবস্যা এবং পূর্ণিমায় ভরা ও মরা কাটালে এই মাছ ধরা হয়। কাটাল সাধারণত ৪-৫ দিন ধরে চলতে থাকে এবং মাঝিরা তখন একটানা মাছ ধরেন। প্রতিদিন একই সময়ে তারা সাগরে যান এবং পরের দিন দুপুরের আগে মাছভর্তি নৌকা নিয়ে ফিরে আসেন সেগুলো শুকানোর জন্য।

নিঝুমদ্বীপে থাকাকালীন সময়ে আমার একবার সৌভাগ্য হয়েছিল দ্বীপ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে জেলেদের সঙ্গে রাত্রিযাপনের। প্রায় ৫ ঘণ্টা নৌকা চলার পর আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাই। ওই জায়গায় আগে থেকেই ছোট খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে প্লাস্টিকের একটা বড় জার বেঁধে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। চেওয়া মাছ শিকার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজটি হচ্ছে পানির ১০-১৫ফিট গভীরে বাঁশের খুঁটি পোঁতা।

মূলত জারের সঙ্গে জালগুলো বেঁধে দেওয়া হয় জোয়ারের সময়। ভাটা শুরু হলেই মাছ আহরণের জন্য জাল তোলা হয় । জাল তুলে মাছগুলো একটি বাঁশের তৈরি খাঁচিতে পরিষ্কার করার জন্য ঢালা হয়। মাছ ঢালার পর যে ভয়ানক কাজটি করতে হয় তাহল মাছের সঙ্গে উঠে আসা সামুদ্রিক সাপগুলো হাত দিয়ে সাবধানে পানিতে ফেলে দেওয়া। কারণ সামুদ্রিক সাপ মারাত্মক বিষাক্ত।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন