বুধবার, ১৬ জুন ২০২১, ১ আষাঢ় ১৪২৮ , ৫ জিলকদ ১৪৪২

ফিচার
  >
প্রাণী ও পরিবেশ

তোমায় দেব রডোডেনড্রন এনে

নিউজজি ডেস্ক ১৯ ডিসেম্বর , ২০১৯, ১৩:৩০:৫০

  • তোমায় দেব রডোডেনড্রন এনে

রডোডেনড্রন পাহাড়ের ফুল। বসন্তের শেষে এর দেখা মেলে। অনেকগুলো রং হয় এর। সাধারণত উচ্চতা ভেদে এই ফুলের রঙের তারতম্য হয়। আমরা পাহাড়ের গায়ে গায়ে যে রডোডেনড্রন গুচ্ছের দেখা পেয়েছি, তার সবই প্রায় লাল বা গাঢ় কমলা। নীচের দিকে পেয়েছি হালকা বেগুনি, গোলাপি রঙের রডোডেনড্রন। নেপালে নাকি রডোডেনড্রন জাতীয় ফুল কিন্তু আমাদের কাছে, মানে রবিঠাকুর পড়া বাঙালিদের কাছে রডোডেনড্রন মানে শেষের কবিতা। 

ইউরোপে রেনেসাঁ-রিফর্মেশন-শিল্প বিপ্লব হওয়ায় পূর্ববর্তী আমলের পালের বদলে দ্রুতগামী জাহাজ নিয়ে বণিক ও ঔপনিবেশিক শক্তি এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার নানা দেশ দখলে ব্যস্ত। তখনকার সেই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্রান্তিকালের মধ্যেও ভারতবর্ষের পূর্ব হিমালয়ান অঞ্চলের নামগোত্রহীন একটি পার্বত্য ফুল চলে গেল ইউরোপের ঘরে ঘরে, এমনকি মহারানির বাগানে। সে ফুলের নাম রডোডেনড্রন। নাম শুনলে মনে হবে ইউরোপীয় কোনও ফুল। কিন্তু একেবারেই উপমহাদেশীয় ফুল রডোডেনড্রন। চুপিসারে শতবর্ষ আগেই আদি বিশ্বায়নের দূত হয়ে এশিয়ার এক নিভৃত কোণ থেকে গিয়ে পুরো ইউরোপ জয় করলো। রাজকীয় বাগান থেকে নাগরিকের বাসগৃহ পর্যন্ত উচ্ছলিত হলো এই ফুলের গুচ্ছে, গন্ধে, বর্ণে। রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসুর লেখা ছাড়িয়ে স্থান পেল জেমস জয়েসের ক্ল্যাসিক উপন্যাস ‘ইউলিসিস’-এর পাতায়। ইংল্যান্ডের উইন্ডসর গ্রেট পার্ক এবং অন্যান্য বিশ্ববিখ্যাত উদ্যানে রডোডেনড্রনের মন মাতানো সমারোহ ইউরোপের এক পরিচিত ছবি হয়ে দাঁড়াল। অথচ অযত্নে অবহেলায় হিমালয়ের পার্বত্য ধূলায় মুখ লুকিয়ে ছিল রডোডেনড্রন। বিলাতের এক তরুণ উদ্ভিদ বিজ্ঞানী জোসেফ ডালটন হুকার প্রেমে পড়লেন এই ফুলের। ইংল্যান্ড থেকে সবাই যখন বৃটিশ-বাংলায় আসছেন সম্পদের লোভে, জোসেফ ডালটন হুকার তখন সন্ধান করছেন প্রকৃতির রূপ ও রস এবং জীববৈচিত্র্য। তাঁর হাত ধরে এশিয়ার এই পাহাড়ি ফুলের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল ইউরোপে এবং সেই সূত্রে বিশ্বের সর্বত্র। দার্জিলিং, সিকিম, নেপাল, আসাম, মেঘালয়, ভুটানের পথে পথে ছড়িয়ে আছে যে ফুল, সে ফুল আজ ইউরোপের অভিজাত সম্ভ্রান্ত পুষ্পের অন্যতম। শিল্পে, সাহিত্যে, প্রেমে, আবেগে, গানে, কবিতায় রডোডেনড্রনের মতো অন্য কোনও ফুল স্থান করে নিতে পারেনি। উপমহাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের সঙ্গে হিমালয়ের স্মৃতি বলতেই কাঞ্চনজঙ্ঘা আর রডোডেনড্রন। জীবনের কোনও এক অংশে দার্জিলিঙ-কাঞ্চনজঙ্ঘায় ভ্রমণ স্মৃতিতে রডোডেনড্রনের রঙিন উচ্ছ্বাস অনেককেই নস্টালজিক করে। স্মৃতি ও অতীত ঝাপসা হলেও ঔজ্জ্বল্য হারায় না বহুবর্ণা ও বহু বাহারের প্রেমমথিত রডোডেনড্রন গুচ্ছ। রবীন্দ্রনাথ যেন এ ফুলের যথার্থ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অপরূপ করে রেখেছেন ‘শেষের কবিতা’য় উদ্ধৃত পঙক্তিকে: “প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে অরুণকিরণে তুচ্ছ/উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেনড্রন গুচ্ছ।” অমিত রয় আর কেটি মিত্তিরের আল্ট্রা-মর্ডান প্রেমের পরশ জাগিয়ে দিয়ে রডোডেনড্রন এখনও অনেকের মধ্যে নিয়ে আসে হারানো প্রেমের স্মৃতিকাতর আকুতি। ব্যক্তি মানুষের মতো সামাজিক মানবমণ্ডলীও রডোডেনড্রনের প্রেমে মগ্ন। নেপালের জাতীয় ফুল আর সিকিমের রাষ্ট্রীয় ফুলের জায়গাটি তাই রডোডেনড্রন ছাড়া অন্য কোনও পুষ্পই দখল করতে পারেনি। ইরান, মধ্য এশিয়া এবং বিশ্বের কোনও কোনও দেশে যেমন গোলাপ রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সমাদৃত এবং উৎসব মুখরিত হয়, রডোডেনড্রনও তেমনিভাবে পূর্ব হিমালয়ান অঞ্চলের লোকসমাজে সমাদৃত ও উদযাপিত হয়। প্রতি বসন্তে সিকিমে আয়োজিত হয় ‘রডোডেনড্রন উৎসব’। উৎসবে সমবেত হয় বৃহত্তর হিমালয়ান জনগোষ্ঠী। সঙ্গে থাকে শত শত রঙ, বাহার ও প্রজাতির রডোডেনড্রন। পুষ্পালোকের সেই নন্দন-কাননে ভিড় জমায় বিশ্বের হাজার হাজার পর্যটক।

বৃটিশের বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের (১৮৫৭) দশ বছর আগেকার (১৮৪৭) সালের কথা। রডোডেনড্রন নামটি তখনো পযন্ত কেউ জানতেন না। সে সময় জোসেফ ডালটন হুকার নামের ত্রিশ বছর বয়েসি ইংল্যান্ডের এক তরুণ উদ্ভিদবিজ্ঞানি জাহাজে পাড়ি দিলেন সম্পদে ভরপুর উপনিবেশ বৃটিশ-বাংলার পথে। সবাই যখন বাংলার সম্পদ আহরণ করে বিলাতে ধনী হতে মশগুল, তখন এই তরুণ উদ্ভিদবিজ্ঞানি চাইলেন পাহাড়ি-পর্বত ঘুরে ঘুরে জীববৈচিত্র্যের সন্ধান করতে। শাশ্বত বাংলার অর্থনৈতিক সম্পদ বা রাজনৈতিক ক্ষমতা তাকে আকৃষ্ট করল না, আকৃষ্ট করল চিরায়ত প্রকৃতি ও পরিবেশ। তিনি আগ্রহী হলেন প্রাণবৈচিত্র্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-সুষমার অনুসন্ধান কাজে। তাঁর ভ্রমণ পরিকল্পনায় সে কারণে বাংলা বা ভারতের শহর কিংবা বাণিজ্যকেন্দ্র নেই। প্রকৃতিকে সরাসরি জানতে এবং প্রাণ ভরে দেখতে তিনি তাঁর গন্তব্য ঠিক করেন অখণ্ড বাংলার উত্তরবঙ্গ, আসাম, সিকিম, নেপাল আর তিব্বত। শহরের চেয়ে বহুদূরের অরণ্য-পাহাড়ের পটভূমিকায় ছডড়িয়ে থাকা সুবিশাল হিমালয় পর্বতমালার পূর্বাঞ্চলের অপরূপ-প্রকৃতিসমৃদ্ধ অঞ্চল ও জনপদ এই তরুণ বিজ্ঞানীর পছন্দের জায়গা। ঔপনিবেশিক শক্তির পেছন পেছন আলোকিত ইউরোপ থেকে নানা বিদ্যায় পারদর্শী জ্ঞানী-গুণী-বিজ্ঞানীরা তখন অল্প অল্প করে বৃটিশ-বাংলায় আসতে শুরু করেছেন। কেউ চান নতুন দখলকৃত অঞ্চলে নিজেদের খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচার করতে। কেউ চান ছাপাখানা স্থাপন করে বইপত্র, পত্রিকা, ব্যাকরণ চর্চা করতে। এশিয়াটিক সোসাইটির মাধ্যমে অনেকে দলবদ্ধ হয়ে শুরু করলেন ভারতচর্চা। এদের বলা হতো ওরিয়েন্টালিস্ট, যারা প্রাচ্যের প্রাচীন বিষয়কে আধুনিক ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করতেন। প্রাচীন মন্দির, স্থাপনা, ক্ষেত্র অনুসন্ধানে এলেন প্রত্নতাত্ত্বিকগণ এবং বিচিত্র সংস্কৃতির সন্ধানে নৃবিজ্ঞানীরা। এসব কৃতবিদ ইউরোপীয়দের হাতে ভারত নবরূপ লাভ করতে থাকে। ধীরে ধীরে জন্ম নেয় আধুনিক ভারতের আদি কাঠামো। রেনেসাঁর-পূর্ব পুরুষরূপে প্রণোদনা জাগাতে লাগলেন নানা ক্ষেত্রের নানা গুণীজন। প্রাচীন ভারত জেগে উঠল এসব বিদেশির স্পর্শে। উপনিবেশবাদের তীব্র শোষণ ও অন্ধকারের মধ্যেও মানব মনীষার ছোঁয়ায় জ্বলে উঠলো কিছু কিছু আলো।

জোসেফ ডালটন হুকার নিজের নাম যুক্ত করলেন সেই আলোকিত মানুষদের আদি তালিকায়। হিমালয়ান উদ্ভিদ, গুল্ম, লতা-পাতা-পুষ্প অনুসন্ধানে তার অবদান চিহ্নিত হলো ইতিহাসের পাতায়। বিশেষত রডোডেনড্রনের সুবাদে তিনি রইলেন অমর হয়ে।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers